Sunday April11,2021

ধর্ষণ নিয়ে নারীর অশ্লীল পোশাককে দায়ী করায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ছবক দিলেন তারই সাবেক প্রথম স্ত্রী জেমিমা গোল্ডস্মিথ ও দ্বিতীয় স্ত্রী, বিবিসির সাবেক উপস্থাপিকা রেহাম খান। এ নিয়ে প্রথমে মুখ খোলেন প্রথম স্ত্রী জেমিমা গোল্ডস্মিথ। ইমরান খানের সমালোচনা করেন মানবাধিকারকর্মীরা। এক্ষেত্রে ইমরান খানকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী রেহাম খান যে পরামর্শ দিয়েছেন তা হলো তিনি যতই কম কথা বলবেন ততই সবার জন্য মঙ্গল। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে তিনি ক্রিকেটের প্লেবয়-কাম পাকিস্তানের রাজনীতিক ইমরান খানের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তাদের দাম্পত্য টিকে ছিল ১০ মাস। ওই সম্পর্ক নিয়ে তিনি একটি টুইটের জবাব দিয়েছেন। টুইটে তাদের দাম্পত্য জীবন এবং ব্যক্তিত্বের সংঘাত নিয়ে কৌতুক করা হয়েছিল।
এর জবাবে রেহাম খান লিখেছেন, আপনারা কেন এটা ভাবছেন যে আমাদের সেই সম্পর্কের রসায়ন ঠিকমতো কাজ করছিল না?

উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালে প্রথম স্ত্রী হিসেবে বৃটিশ ধনকুবেরের কন্যা জেমিমা গোল্ডস্মিথকে ঘরে তুলেছিলেন ইমরান খান। সেই সম্পর্ক টিকে ছিল ২০০৪ সাল পর্যন্ত। তাদের রয়েছে দুটি সন্তান। ধর্ষণের জন্য নারীদের দায়ী করে ইমরান খানের মন্তব্যের জবাবে তিনি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে টুইট করেছেন। লিখেছেন, এর দায় বর্তায় পুরুষদের ওপর। ‘তোমরা যারা বিশ্বাসী তারা নিজেদের চোখকে নিবৃত করো এবং গোপন অঙ্গগুলোর হেফাজত করো’।

ওদিকে ইমরান খানের মন্তব্য বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হওয়ার পর তার পক্ষ নিয়েছে ইমরান খানের অফিস। সেখান থেকে বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ভুলভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ৬৮ বছর বয়সী ইমরান খান রোববার এক প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে ক্রমবর্ধমান যৌন হামলার জন্য নারীদের অশালীনতাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ধর্ষণের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে নারীদের উচিত শালীন ও মার্জিত পোশাক পরা। এ সময় ইমরান খান ভারতের বলিউডি সিনেমার কথা তুলে ধরেন। বলেন, ১০৭০ এর দশকে ইংল্যান্ডের যৌনতা, মাদক, রক অ্যান্ড রোল কালচার ঢুৃকে পড়েছে। এর ফলে নৈতিকতার অবনমন ঘটেছে। এর ফলে যৌন হামলার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এরপরেই তিনি ইসলামের পর্দা প্রথার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই পর্দা প্রথা এমন হামলা বন্ধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইমরান খানের ভাষায়- বিশ্ব ইতিহাস বলে যে, যখন সমাজে তুমি অশালীনতা সৃষ্টি করবে তখন দুটি ঘটনা ঘটবে। এক, যৌন অপরাধ বৃদ্ধি পাবে। দুই, পারিবারিক ব্যবস্থা ভেঙে যেতে থাকবে।

ইমরান খান আরো বলেন, নারীদের এমন সব হামলা থেকে রক্ষার জন্য একটি আইন করবে তার সরকার। মর্যাদা রক্ষার জন্য পুরো সমাজের জন্য এটা প্রযোজ্য হবে। তবে পাকিস্তান সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ইমরান খানের বক্তব্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেভাবেই তার বক্তব্যকে বিতর্কিত করে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। তারা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী সামাজিক পদক্ষেপের বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি ধর্ষণের মতো প্রবণতাকে পুরোপুরি নির্মূল করার কথা বলেছেন। কিন্তু সজ্ঞাতে হোক বা অজ্ঞাতে হোক, ইমরান কানের বক্তব্যের অংশবিশেষ নিয়ে প্রচার করা হচ্ছে, তিনি যা বলতে চাননি সেভাবেই তা প্রচার করা হচ্ছে। মুখপাত্র বলেন, ইমরান খান ধর্ষণের সব ঘটনা মোকাবিলার জন্য সরকারের সব ব্যবস্থা পরিপূর্ণভাবে প্রয়োগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বিশ্বের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের অন্যতম ইমরান খান। তিনি দু’বার বিচ্ছেদপ্রাপ্ত। তিনি স্বল্পবসনা নারীদের পার্টিতে নতুন নন। তিনি যখন ব্যাচেলর তখন লন্ডনের ভিআইপি নাইটক্লাবে অংশ নিয়েছেন। সেখানে পার্টি করেছেন ফ্যাশন গুরু বলে পরিচিত সুসানাহ কনস্টানটিনের সঙ্গে। ১৯৯৫ সালে জেমিমা গোল্ডস্মিথের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আগে তিনি তার সঙ্গেই চুটিয়ে পার্টি করতেন। পরে পাকিস্তানি সংস্কৃতির সঙ্গে বড় রকম জটিলতার কারণে ৯ বছর পরে জেমিমা গোল্ডস্মিথের সঙ্গে তার বিবাহ ভেঙে যায়। কারণ, জেমিমা গোল্ডস্মিথ ছিলেন ইহুদি পরিবারের। এরপর দ্বিতীয় স্ত্রী রেহাম খানের সঙ্গেও তার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। তিনি ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাপ পার্টির (পিটিআই) এক প্রকাশ্য মিটিংয়ে অংশ নিয়েছিলেন। এ জন্য তার ব্যাপক সমালোচনা করা হয়েছিল। এ সময় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো রেহাম খানের ব্যাপক সমালোচনা করে। তারা বলেন, রেহাম খান তার স্বামীর খ্যাতির সূত্র ধরে নিজের ব্যক্তিগত সুনাম বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

ইমরান খানের তৃতীয় ও শেষ স্ত্রী বুশরা ওয়াটু। তাকে রক্ষণশীল এক অনুষ্ঠানে বিয়ে করেন ২০১৮ সালে। ওই বিয়েতে তাকে দেখা যায় চোখমুখ পুরোপুরি ঢাকা অবস্থায়। ইসলামিক রীতি মেনে তিনি এমনটা করেছিলেন। এসব অতীতকে পিছনে ফেলে ইমরান খান বলেন, ভারতের দিল্লি বিশ্বে ধর্ষণের রাজধানী হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া বলিউডের ছবিতে অশালীনতা ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, পাকিস্তানের সমাজে ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়ছে ধর্ষণ। এটা থামাতে প্রয়োজন ইসলামিক রীতিনীতি। তিনি বলেন, আমাদের পারিবারিক ব্যবস্থা এখনও অটুট আছে। আমাদের বিচার ব্যবস্থাকে আমরা ঠিকঠাক করতে পারি। প্রতিষ্ঠানকে ঠিকঠাক করতে পারি। কিন্তু যদি পারিবারিক ব্যবস্থা ভেঙে যায় তাহলে তা আর গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

ওদিকে ইমরান খানের বিবৃতিকে ত্রুটিপূর্ণ, বিপজ্জনক ও সংবেদনশীল নন বলে অনলাইনে এক বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন কয়েক শত মানুষ। এই বিবতিতে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের নিরপেক্ষ অধিকার বিষয়ক পর্যবেক্ষক হিউম্যান রাইটস কমিশন মঙ্গলবার বলেছে, তারা ইমরান খানের বক্তব্যে হতাশ হয়েছে। তারা বলেছে, ইমরান খানের মন্তব্য কোথায়, কিভাবে এবং কেন ধর্ষণ হয়েছে তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণই নয়। একই সঙ্গে এতে ধর্ষিতার ওপরই দায় দেয়া হয়। সরকারকে অবশ্যই জানতে হবে যে, ধর্ষণের জন্য শিশু, তরুণীরাও অনার কিলিংয়ের শিকার হচ্ছে।
পাকিস্তান অত্যন্ত রক্ষণশীল একটি দেশ। সেখানে ধর্ষিতাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। ধর্ষণের অভিযোগ খুব কমই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হয়।