Tuesday April20,2021

১৬৩ মিলিয়ন মানুষের দেশ বাংলাদেশ  ( ২০১৯ ) এবং সমগ্র ইউরোপে ৭৪৬,৪ মিলিয়ন মানুষ।  হিসেবটা সহজ, বাংলাদেশ চালানো মানে চার ভাগের একভাগ ইউরোপ চালানো। যদিও অংকের হিসেবটা সহজ কিন্তু কর্মটি মোটেও সহজ নয় । ভৌগলিক, অর্থনৈতিক কিংবা শিক্ষা এগুলো হিসেবে না এনেই কথাটি বলছি। আমরা সাধারণ জনগণ যতই সমালোচনা করি না কেনো ( অবশ্যই সমালোচনা করার অধিকার আছে যেহেতু আমরা টেক্স পেয়ার ) গভীরভাবে ভাবলে আমাদের সমালোচনার মুখ হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। সাদা চোখেই দেখা যায় কর্মটি ভীষণ জটিল। তার ওপরে আছে আমাদের এই উপমহাদেশের একটি বিশেষ মানষিকতার প্রভাব। বিশেষ মানষিকতা বললাম কারণ আমরা দীর্ঘদিন অন্যের দ্বারা শাসিত হবার কারণে আমাদের মানষিকতায় এক প্রকার জ্যালিটিনের বেশ আবির্ভাব রয়েছে। অনেকটা মোমের মতন।। ঠান্ডায় জমে যাওয়া এবং তাপে গলে যাওয়া। নিজস্ব কোন ফর্ম যেন ধরে রাখাই সম্ভব নয়। অবশ্য এর বহুবিধ কারণও নিহিত আছে।

 

যা বলতে চাচ্ছি সেটা বলার জন্য একটি পর্যবেক্ষণের কথা বলি। পর্যবেক্ষণটি শুদ্ধস্বর ডটকম পত্রিকার চতুষ্কোণ কথোপকথনে গতকাল  ( ০৬ /০৪ তারিখের ) আমার করা ( আমি সঞ্চালনায় ছিলাম ) একটি প্রশ্নের সূত্র ধরে পর্যবেক্ষণটি বলেন চতুষ্কোণের অতিথি শুদ্ধস্বর ডটকম পত্রিকার প্রধান সম্পাদক হাবিব বাবুল। উনার ভাষ্যনুযায়ী দেশের সরকার লকভাউনটি দিয়েছে এটা সঠিক এবং এই লকডাউনটি দেবার পিছনে হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের রক্ষার্থে একটি চিন্তাভাবনা অবশ্যই সরকারের আছে। সত্যি বলতে সাধারণভাবেই আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার হাল করুণ ( করোনা চেখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ দিয়েছে )। এই অবস্থায় লকডাউন না দিলে  যে হারে করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ এসে হানা দিচ্ছে, তাতে করে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সেই কঠিন দ্বিতীয় ওয়েভের কারণে এবার মনে হচ্ছে প্রথমবার যতটা সামাল দেওয়া গেছে, দ্বিতীয়বার ততটা সামাল দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে ।   পর্যবেক্ষণটি বলতে গিয়ে হাবিব বাবুল ভাই যা বললেন, সেটা একটু ভাবনার বিষয়।  উনার ভাষ্যনুযায়ী সরকারের মাথায় বড় ভাবনাটি হলো হাসপাতালগুলো। সরকার বেশ অবগত আছে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সমন্ধে।  কেননা এত ঘণ জনবহুল দেশে রোগীর সংখ্যা ক্রমানুসারে যদি বাড়তেই থাকে তাহলে হাসপাতালগুলো কলাপ্স করবে।  তখন সরকারের পক্ষে আর কিছুই নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব হবে না ।

 

বিশ্বে এখন সবগুলো দেশেই নতুন করে দ্বিতীয় ওয়েভ শুরু হয়েছে। নতুন করে সবগুলো সরকারকেই লকডাউন নিয়ে ভাবতে হচ্ছে এবং নতুন করে চালু করেছে লকডাউন।  উপায় নেই এ ছাড়া। আমরা সাধারণ জনগণ প্রায়শই সমালোচনা করি সরকার এক সপ্তাহ লকডাউন দিলো তার মানে কি এক সপ্তাহ পরে আর করোনা থাকবে না ? না বিষয়টি মোটেও এমন নয়। লকডাউনের অর্থ আর মর্মার্থ এক নয় । লকডাউন বিশ্বের সকল দেশ দিচ্ছে করোনাকে কেবলমাত্র  নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য।  সব দেশই এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহ দিয়ে প্রথমে শুরু করে বা করছে এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বুঝে লকডাউন বাড়াচ্ছে। এভাবেই সরকারগুলোকে করতে হচ্ছে এবং করছে। বাংলাদেশ সরকার একি পদ্ধতিতেই হাঁটছে। এটাই অজানা করোনার বিপরীতে বর্তমান পদ্ধতি।

 

কেনো সরকার মাত্র এক সপ্তাহ লকডাউন দিলো ? এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয় অবশ্যই সরকারকে ভাবতে হয়েছে। জনমানুষের ভাবনায় যেন এমন আঘাত না আসে, হায় হায় শুরু হয়ে যায়।  কেননা মানুষকে তো তার জীবন চালাতে হবে। একবার ভাবুনতো সরকার যদি বলতো টানা পাঁচ সপ্তাহ লকডাউন।  তাহলে জনমানুষের মানষিক অবস্থার প্রথম শকটি কত উঁচুতে উঠে যেতো ? জীবন চালানোর নানান হিসেবে জড়সড় হয়ে যেতো । মানুষের ভাবনায় এমন আঘাত আসতো যেটা আর বলার নেই।

 

এদিকে আবার এক সপ্তাহ লকডাউন নিয়েও সরকার বিপাকে পড়েছে। কেননা জনমানুষের নিকট যে বার্তাটি আসলো সেটার সঠিক ব্যবহার ভুল হলো। স্মরণ করুন গত বছর প্রথম লকডাউনটির কথা । সেই সময়ে সরকার কিছুই না বুঝে বিশ্বের অন্যান্য দশটি দেশের মতন এক সপ্তাহ লকডাউন দিয়েছিলো এবং জনগণ সেটাকে ছুটির আমেজে সমুদ্র ভ্রমণে কাঁটিয়েছিলো । অথচ সেই প্রথম লকডাউনটির সময়ে সরকারের উচিত ছিলো ভ্রমণ অঞ্চলের সকল হোটেল রেস্টুরেন্ট প্রথমেই বন্ধ করে দেওয়া।  মূলত সেই প্রথম লকডাউনটির সময় সরকার তেমনটা বুঝে শুনে দিয়েছিলো তেমনটা আজও বলা যাবে না । তবে এবার শিক্ষা গ্রহণ করেই করেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে সমস্যা হচ্ছে সেই ঘণ জনবসতির কারণে। এবার জনগণ ছুটছেন গ্রাম অঞ্চলে। বিষয়টি এখন কেমন হলো ? যে গ্রাম অঞ্চলে করোনা ছিলো না, এখন সেখানেও করোনার ছড়াছড়ি হলে অবাক হবার নয় ।

 

জীবিকার কারণে রাজপথে ব্যবসায়ীরা নেমে এসেছেন। সামনেই আবার রমজান মাস এবং ঈদ পার্বণ। ব্যবসায়ীদের বিপদটাই সেখানে । সারা বছরের ব্যবসা এই পার্বণে। ওরাই বা কি করবে ? তবে সরকারের এখানে একটি মারাত্মক ভুল আছে বলেই দেখতে পাই । সরকারের প্রয়োজন ছিলো লকডাউনের পূর্বেই তাদের জন্য সরাসরি প্রণোদনা ঘোষণা করার । বই প্রকাশকদের করুন কান্না শুনতে পাচ্ছি।  দিনের কয়েক ঘন্টা বইমেলা খোলা রাখা আর বন্ধ রাখা মূলত সমান। সরকার হয়তো সরাসরি বন্ধ করার সাহস দেখাননি। কেননা তারা তো অনেক ইনভেস্ট করেছেন ইতিমধ্যেই।  তবে সরকারকে এখানে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতেই হবে। মোদ্দা কথা সরকারের হাতে জনগণের অনেক টাকা জমা আছে। সেই জমা টাকা কমে আসবে তারপরেও সেই টাকা থেকে সর্বক্ষেত্রেই প্রণোদনা দিতেই হবে। তা ছাড়া আপাতত কোনো উপায় নেই ।

 

এবারের পহেলা বৈশাখ মেলা বা শোভাযাত্রা হবে না ঘোষণা এসেছে, ভালো সিদ্ধান্ত । তবে সরকারের লকডাউন উপেক্ষা করে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে গতকাল থেকে পরীক্ষা শুরু হলো, এটা মোটেও ভালো কিছু কওমি কর্তৃপক্ষ করলেন না । কেউ আবার ভাববেন না আমি কওমি মাদ্রাসার বিরুদ্ধে কিছু বলছি কিনা, না মোটেও না। আমি বলছি করোনার ভয়াবহতার বিষয়টি নিয়ে।  শিক্ষামন্ত্রী একবার বলেছিলেন, একবছর শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা না করলেও জীবন শেষ হয়ে যাবে না। কথাটি নিয়ে সমালোচনা হলেও অসত্য কিন্তু তিনি বলেননি। তা ছাড়া পড়াশোনা তারপরেও চলেছে । সমস্যা, ভুলত্রুটি অবশ্যই আছে এবং থাকবে। উপায় নেই বহুল জনবসতির দেশ যে ।

 

লেখার মূল উদ্দেশ্যটি বলেই শেষ করবো। জনমানুষদের একটু অনুধাবন করতেই হবে কেনো এই লকডাউন। আরো অনুধাবন করতে হবে এই লকডাউন আরো বাড়তে পারে বা বাড়বে। তাহলে করণীয় কি ? করণীয় সরকারকে প্রথমেই অনেক বেশি এগিয়ে আসতে হবেই। ছোটোখাটো ব্যবসায়ী এবং সকল পর্যায়েই সরকারকে দ্রুত প্রণোদনার ব্যবস্থা কম করে হলেও করতেই হবে। এ ছাড়া উপায় নেই বলেই মনে হচ্ছে। আর গরিব মেহনতি মানুষের জন্য সকল সংগঠন, সমাজ, এলাকাভিত্তিক প্রতিষ্ঠিত জনমানুষদের সাথে নিয়ে এবং সাথে নিয়মতান্ত্রিক আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে অন্তত খাদ্যের নিশ্চয়তার ব্যবস্থা করতেই হবে।  সরকারকে প্রথমে করতে হবে লিখছি বটে তবে সরকার প্রণোদনার বিষয়টি শতভাগ সঠিক বন্টনের ব্যবস্থা না করতে পারলে এবারের দ্বিতীয় ওয়েবটি আমাদের ভোগাবে এবং বেশ ভোগাবে। যা কিনা করোনা নিয়ন্ত্রণ রাখা মুশকিল তো হবেই এবং একটা মহামারীর সম্ভাবনা থেকেই যাবে।  ভয় দেখানোর জন্য বলছি না । এটাই কঠিন ও ভয়ঙ্কর বাস্তবতা হতে পারে।

 

তবে সরকার-সরকার করে মাথা ঘামানোর পূর্বে জনমানুষের প্রথম দায়িত্ব হবে নিজেকে, পরিবারকে প্রথমেই যে করেই হোক নিরাপদদ রাখা। জানি জীবিকার কারণেই অনেকের পক্ষেই অসম্ভব হবে। তবে ভাবতেই হবে যে যদি এমন ধ্বংসাত্মক করোনা পেয়ে বসে সেটা কিন্তু আরো ভয়ানক হবে। তখন সবকুল হারানোর অবস্থা হবে। যে করেই হউক নিজেকে নিরাপদ রাখাটা এখন শতভাগ ফরজ। সময় নিশ্চয়ই এক সময় ঘুরে দাঁড়াবে। বিনীত অনুরোধ সকল জনমানুষের নিকট কোনো প্রকার অবহেলা না করে, সর্বত্র দিয়ে হলেও নিজেকে আগে রক্ষা করুন। আপনি নিরাপদ তো আপনার পাশেরজন নিরাপদ এবং সমাজ নিরাপদ এবং জাতী নিরাপদ । বিপদে মানুষকে সর্বত্র দিয়েই লড়তে হয় । সর্বাত্মক চেষ্টা থাকলে এই লড়াইটিতেও নিশ্চয়ই আমরা জয়ী হব এবং বাংলাদেশ জয়ী হবে।

 

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম।