Friday April16,2021

করোনা এমনভাবে বিরক্ত করছে যে জীবন হাপিত্যেশ হবার জো। যেখানেই যাও আর যেখানেই থাকো আজকাল করোনা কথাবার্তায় ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় নিজেকে পুশইন করবেই। ঘরে, বাহিরে বা কাজে সর্বত্রই করোনার জয় জয়কার। আলোচনার বিষয়বস্তু প্রথম স্থান দখল করে আছে করোনা, করোনা এবং করোনা ।

[দূর্গে চারিপাশে এখনও প্রচুর বরফ]

সেই করোনার বিরক্তিকর পরিবেশ থেকে একটু দুরে সরতে গত দুদিন পূর্বে হঠাৎ করেই এক চমকপ্রদ রোদের দিনে গাড়িতে বসা এবং ছুট।  বেশি দুরে নয় । লিঞ্জ আমার বসবাসের শহর। এই শহর থেকে মাত্র ২৭ কিলোমিটার দুরে ২৫ বা ৩০ মিনিটের রাস্তা । অষ্ট্রিয়ায় এখনও বেশ ঠান্ডা।  সকাল বা সন্ধ্যায় বরাবরই দুই থেকে চার/পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। তবে দুপুরে গত কয়েকদিন যাবৎ ভালোই রোদ উঠছে। যদিও রোদ থাকে তারপরেও শরীরে একটি ঠান্ডার জ্যাকেট বা গরম কাপড় লাগবেই । তাপমাত্রা কখনো ১২ থেকে ১৬ উঠানামা করছে। গত দুদিন পূর্বেও তেমনটাই। বলা যায় কোথাও যাবার জন্য শতভাগ উপযোগী আবহাওয়া।

[ভাল্লুকের মতন বিশাল এই কুকুরটি আমার নয়]

লিঞ্জ শহরটি অষ্ট্রিয়ার অঙ্গরাজ্য ওবারওষ্টারাইখের অংশ। ওবেয়ার্নকির্খে শহরটি মিউলফির্টেলের ভিতরে পরে। এই মিউলফির্টেলও ওবারওষ্টারাইখের অংশ। এই ওবেয়ার্নকির্খের অংশেই ভাক্সেনবেয়ার্গ ( ভাক্সেন হলো নাম এবং বেয়ার্গ অর্থ পাহাড়) বুয়ুর্গ( দূর্গ) ।

[দূর্গের কিনারা থেকে নীশ আকাশ]

এই দূর্গের ছোট্ট ইতিহাস হলো, ১১৪০ খ্রি: উলরিখ এবং ছোলো ফন ভিলহেয়েরিং ( অথবা উইলহেয়েরিং বলা যায়) এই দূর্গটি নির্মান করেন । এই দূর্গটি হেয়ার্ছোগসডরফ ( একটি পৌরসভা) হতে আরো সাড়ে তিন কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এবং বর্তমানে এই জায়গা রোটেনফেলস্ বা আল্টভাক্সেনবেয়ার্গ ( পুরনো পাহার দুর্গ) নামে পরিচিত। এই দূর্গের মালিক লর্ডস অফ উইলহেয়েরিং ভাক্সেনবেয়ার্গ নাম প্রথমে পরিচিতি লাভ করেন এবং পরবর্তীতে শুধুমাত্র ভাক্সেনবেয়ার্গ নাম থেকে যায়। ১৭৫৬ সালে এই দূর্গটি বাজ ( মেঘের বিজলী ) পরে পুড়ে যায় এবং প্রায় পুরোটাই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ভাক্সেনবেয়ার্গ সাংস্কৃতিক সমিতি ১৯৫০ সাল থেকে কিছুটা সংস্কারের কাজ করে। ২০১৩ সাল থেকে দূর্গের ৩০ মিটার উঁচু টাওয়ারটি লুক আউট পয়েন্টে রূপান্তরিত করা হয়।

[দূর্গের পিছনের অংশ  হেঁটে যাবার স্টিলের পথ]

এই দূর্গটি মিউলফিয়ের্টেলের একটি পুরাতন এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাচীন দূর্গ। মূল দূর্গের আয়তন ৮৮৫ বর্গমিটার এবং বাহিরের অংশ ১২৬০ বর্গমিটার জুড়ে। ৩০ মিটার উঁচু গোলাকার ডৌনজোন সংরক্ষণ করা হয়েছে । দূর্গটির তিন মিটার প্রাচীর বেধ সহ দশ মিটার ব্যাস রয়েছে। এই হলো মোটামুটি প্রাচীনতম ভাক্সেনবেয়ার্গ দূর্গ।

[দূর্গের উপরে টাওয়ারের পাশে দোল খাওয়ার বেন্চ]

চমৎকার রোদ ঝলমল দিনে ভাক্সেনবেয়ার্গে মোটামুটি হাতে গোনা দশ/ বারো জনকে দেখতে পেলাম। সবাই দূর্গের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরিতে ব্যস্ত।  ৩০ মিটার টাওয়ারের একেবারে উঁচুতে উঠতে হয় একেবারেই সরু গোলাকার একটি লোহার সিড়ি । সিড়িটি প্রায় ৮০ ডিগ্রি খাড়া সিড়ি। ওপরে কেবলমাত্র একজন করে উঠতে হয়। টাওয়ারের উপরে আট বা দশ জনের জায়গা হবে। সেই টাওয়ার থেকে সমগ্র মিউলফিয়ের্টেল দেখা যায়। উপর থেকে মিউলফিয়ের্টেল দেখতে বেশ সুন্দর।  চারিদিকে সাজানো গোছানো ছোটো ছোটো টিলার উপরে বাড়ি ঘর। মাঝে মাঝে চিকন সরু রাস্তা । আবার পাশ দিয়েই বড় রাস্তায় গাড়িগুলো ছুটে যাচ্ছে। দূর্গের চারিপাশে হেঁটে হেঁটে ঘোরার বেশ চমৎকার জায়গা। একজন চারুশিল্পির অনেকগুলো ম্যাটালের ভাস্কর্য দূর্গের নানান পজিশনে দাঁড় করানো আছে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে কেউ যেন খুব পজিশনে বসে আছে। এই দূর্গে যারাই আসে সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত থাকে। আমরাও অনেক ছবি তুললাম এবং দূর্গের চারিপাশেই ঘোরাঘুরি করে সারাদিন পাড় করা। আশে পাশে অনেকগুলো বেন্চ আছে । যে বেন্চগুলোতে দুইজন মানুষ একসাথে শুয়ে বা বসে চমৎকার দোলনে উপর থেকে সমগ্র দূশ্য উপভোগ করতে পারে কিংবা রোদের তাপ উপভোগ করতে পারে। ভালো রোদ থাকার কারণে দূর্গের ওপরে এবং নিচে ঘোরাঘুরিটি বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠে।

[চারুশিল্পির ম্যাটালের ভাস্কর্য দূর্গের পজিশনে]

এইভাবেই সারাদিন পাড় করে অনেক ছবি তুলে, হঠাৎ  একটি চমৎকার ও সুন্দর দিন কাঁটানো হলো। হঠাৎ প্ল্যানে যে কোনো ঘোরাঘুরি যেন একটু বেশিই আনন্দের হয় । ভাক্সেনবেয়ার্গের এই রোদ্দুর ঝলমলে দিনটি অনেকদিন স্মৃতিতে থাকবে।

 

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম।