Monday April12,2021

অ্যাডভোকেট আনসার খান :দেশের ভেতরে গণতন্ত্রীপন্থী জনগণের প্রবল আন্দোলন ও তীব্র বিরোধিতা, অন্যদিকে জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মহলের আপত্তি, নিন্দা ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সত্ত্বেও মিয়ানমারের সামরিক জান্তা তাদের বর্বর সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে এবং সকল আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি উপেক্ষা করে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক জনগণের ওপর তীব্র দমন-পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে।এমনকি জান্তা বিরোধী আন্দোলনকারী মানুষকে রাজপথে গুলি করে হত্যা করেছে। 

উল্লেখ্য যে,গেলো পহেলা ফেব্রুয়ারী দক্ষিনপূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী জনগণের ভোটে নির্বাচিত ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসী(এনএলডি)র নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক সরকারকে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশটিতে সামরিক স্বৈরতান্ত্রিক শাসন চাপিয়ে দিয়েছে।এর ফলে দেশটির প্রায় বারো বছরের পরীক্ষাধীন থাকা গণতান্ত্রিক বেসামরিক শাসনের অবসান ঘটে এবং আবারও দেশটি সামরিক জান্তার শাসনে ফিরে যায়।

১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ শাসনাধীন থেকে স্বাধীন হওয়ার পরবর্তী বছর কয়েক বেসামরিক শাসনে থাকলেও ১৯৬২ সালে বেসামরিক শাসন উৎখাত করে সামরিক জান্তা রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত জান্তা শাসন অব্যাহত ছিলো। মাঝে ২০১১ থেকে ২০২১ সালের একত্রিশে জানুয়ারি পর্যন্ত মিয়ানমারে নির্বাচিত বেসামরিক শাসন বজায় ছিলো এবং ওই সময়কালে গণতান্ত্রিক চর্চার পরীক্ষা চলে আসছিলো বলে মনে করেন বিশ্লেষকগণ।কিন্তু গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকতা পাওয়ার আগেই আবারও দেশটিতে সেনা শাসন জেঁকে বসেছে।তবে এও বলা হয় যে,বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও অদৃশ্যে পর্দার অন্তরালে রাষ্ট্র ও সরকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ সামরিক বাহিনীর হাতেই ছিলো।

গণতন্ত্রীপন্হী নেত্রী অংসান সুচির নেতৃত্বাধীন এনএলডির বেসামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার কারণ হিসেবে গতবছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ভোট কারচুপি ও জালিয়াতির অভিযোগ এনেছে সামরিক জান্তা।ওই নির্বাচনে পার্লামেন্টের মোট ৪৭৬ আসনের মধ্যে সূচির এনএলডি পার্টি পেয়েছে ৩৯৬ আসন এবং সামরিক বাহিনী সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি(ইউএসডিপি)পেয়েছে মাত্র ৩৩ আসন।সূচির দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার কারণে রাষ্ট্র শাসনে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা খর্ব হওয়ার আশংকা দেখা দেয়,যা সামরিক বাহিনীর পক্ষে সহজে মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি।এর থেকেই সূচির বেসামরিক সরকার ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়।ক্ষমতার ওই লড়াইয়ের অংশ হিসেবে সামরিক জান্তা অস্ত্রের জোরে সুচি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে নিয়ে সামরিক শাসন জারী করে জান্তা ঘোষণা করে পরবর্তী এক বছরের মধ্যে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করবে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ বেসামরিক সরকার উৎখাতের জন্য একটি অজুহাত মাত্র।সরকার উৎখাতের পেছনে রয়েছে আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের প্রভাব ও সামরিক বাহিনীর রাষ্ট্র শাসনে নিজেদের কর্তৃত্ব অব্যাহত রেখে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর দখল বজায় রাখার প্রচেষ্ঠার অংশ। অন্যদিকে,ক্যু সংঘটনের মূলহোতা সামরিক বাহিনীর সুপ্রীম কমান্ডার জেনারেল মিন আন হ্লাইং এর ব্যক্তিগত স্বার্থও বেসামরিক সরকার উৎখাতের পেছনে একটি মূখ্য ভূমিকা রেখেছিলো বলে মনে করা হয়।জেনারেল মিনের চাকরির মেয়াদ এবছরের জুলাই মাসে শেষ হওয়ার কথা। তিনি তার মেয়াদ অন্তত আরও একবছর বাড়াতে চেয়েছিলেন।কিন্তু নির্বাচনে সূচির দলের ভূমিধস বিজয়,সেনাসমর্থিত দল ইউএসডিপির অপ্রত্যাশিত পরাজয় জেনারেল মিনের স্বপ্ন ভেঙে দেয়, তার চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধির সম্ভাবনা তিরোহিত হয়ে যায়।কারণ সুচির সাথে তার সম্পর্কে ফাটল ধরেছিলো অনেক আগেই। যেকারণে সুচি তার চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করবেন না বলে নিশ্চিত ছিলেন জেনারেল মিন।

জেনারেল মিন এটিও জানেন,তার চাকরির মেয়াদ শেষ হলে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে তাকে জেনেভার আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।এছাড়াও বিগত বছরগুলোতে তিনি ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন।চাকরি চলে গেলে এসব সম্পদ অরক্ষিত হওয়ার আশংকা বিদ্যমান আছে। কাজেই এসব বিশ্লেষণ করে এটি বলা যায় যে,মিয়ানমারের সবচেয়ে শক্তিশালী জেনারেল মিন তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং সম্পদের সুরক্ষার জন্যই সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে বেসামরিক শাসন উৎখাত করে নিজের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা কুক্ষিগত করে দেশে জান্তা শাসন কায়েম করেছেন।

তবে শুরু থেকেই জনগণের প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে সামরিক জান্তা। অন্যদিকে যেমনটা উল্লেখ করেছি,আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাতের বিষয়টি সহজভাবে গ্রহণ করেনি।এই দ্বিমুখী আপত্তি,জনগণের প্রবল প্রতিরোধ, বাধা,এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্বেও সামরিক জান্তা টিকে আছে রাষ্ট্র ক্ষমতায়।

প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এতোটা প্রতিরোধ ও বাধার মূখেও সামরিক জান্তা টিকে আছে কেমন করে এবং শেষপর্যন্ত কী জান্তা শাসন আরও দীর্ঘস্হায়ী হতে পারে? মিয়ানমারের জনগণ কী পিষ্ট হতে থাকবে জান্তা শাসনে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজে দেখতে হলে সামরিক জান্তার ক্ষমতার উৎস, দেশটির অতীত শাসনতান্ত্রিক ইতিহাস, প্রতিবেশীদেশগুলোর সরকারি অবস্থান এবং অপরাপর বিশ্বশক্তিগুলোর মিয়ানমারের সামরিক জান্তার প্রতি কী মনোভাব রয়েছে সেসব বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।এছাড়াও আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের বিষয়টি তো আছেই।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী বাহিনী এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সাত দশক সময়কালের মধ্যে তিন দশকেরও অধিক সময়কাল পর্যন্ত দেশটি প্রত্যক্ষভাবে শাসন করেছে সামরিক বাহিনী এবং বাকীটা সময়েও পরোক্ষভাবে শাসনকার্য পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ ওই বাহিনীর হাতেই ছিলো।এছাড়া ২০০৮ সালে জান্তা নিয়ন্ত্রিত সরকার কর্তৃক প্রণীত এবং এখনো বহাল থাকা মিয়ানমারের সংবিধানে সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতায়িত করা হয়েছে,তাদের অটোনমাস ক্ষমতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিলো। ওই সংবিধান অনুযায়ী দেশের পার্লামেন্টে সামরিক বাহিনীর জন্য ২৫ শতাংশ আসন নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে এবং সামরিক বাহিনী সংক্রান্ত যেকোনো আইন প্রস্তাব পাস করার ক্ষেত্রে ওই বাহিনীর সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সম্মতি ব্যতীত তা পাস হবে না বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

সংবিধান অনুযায়ী সরকারের মন্ত্রীসভার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়,যেমন-প্রতিরক্ষা,স্বরাষ্ট্র ও সীমান্ত বিষয়ক মন্ত্রণালয়গুলো সামরিক বাহিনীর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এসব কারণে সামরিক বাহিনী দেশের শাসন ব্যবস্হার ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সুসংহত করার সূযোগ পেয়ে আসছে বিধায় ওই বাহিনীই শাসনের কলকাঠি নিয়ন্ত্রণের কর্তায় পরিণত হয়েছে। আর্থিক, বৈষয়িক ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সুচির দলের গত নির্বাচনে বিশাল জয় পাওয়ায় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর এসকল সুবিধা রহিত করার একটি আশংকাও করেছিলো সামরিক নেতৃত্ব। এটিও সুচির সরকার উৎখাতের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকগণ।

সামরিক জান্তার এতোসব ক্ষমতা লাভ এবং দশকের পর দশক ধরে সেটি ভোগ করার ফলে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে একটি লোভের জন্ম দিয়েছে।কাজেই রাষ্ট্রের ওপর তাদের কর্তৃত্বের প্রতি যেকোনো প্রতিবন্ধকতা বা চ্যালেঞ্জ তৈরি হলে সেটি সহজভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয় সামরিক বাহিনীর পক্ষে। ২০১৫ সালে সূচি ও তার দল এনএলডি’র রাষ্ট্র ক্ষমতার শীর্ষে চলে আসা সামরিক বাহিনীর মাথাব্যথার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছিলো।তখন থেকেই সূচি ও সামরিক জান্তার মধ্যে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই শুরু হয়েছিলো এবং ২০২০ সালের নভেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে সূচির দলের একক বিজয় অর্জন করা ও সামরিক বাহিনী সমর্থিত দলের বড়ধরণের ভরাডুবির কারণে ক্ষমতার লড়াই তুঙ্গে ওঠে,যার চুড়ান্ত পরিণতি হলো সামরিক জান্তার ক্ষমতা দখল ও বেসামরিক শাসনের অবসান এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্হা বিনির্মাণের স্বপ্নের ইতি টানা।

সামরিক জান্তার ক্ষমতা দখলের প্রতিবাদে জনগণ আন্দোলন করছে, রক্ত ঝরাচ্ছে রাজপথে। অন্যদিকে,আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে তেমন কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। জাতিসংঘ, আমেরিকা ও পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলো তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সামরিক জান্তার ওপর। কিন্তু রাশিয়া ও চীনের মতো বিশ্বশক্তিগুলো সামরিক জান্তার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।ওই দুটি রাষ্ট্রের কারণে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সর্বসম্মতিক্রমে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি বা নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারেনি। চীন তো একধাপ এগিয়ে বলেছে এটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সরকারের পরিবর্তনকে-‘ক্যাবিনেটের রিসাফল’বলে অভিহিত করেছে।প্রতিবেশী ভারত,বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, পাকিস্তান ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো উল্লেখ করার মতো তেমন কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। উপরোক্ত বিশ্লেষণ থেকে এটি বোঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে,সামরিক জান্তা ক্ষমতায় টিকে থাকতে তেমন কোনো অসুবিধে হবে না।তবে জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলন তীব্রতা পেলে একটি সফলতা আসতে পারে।অথবা গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে।

লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।