Sunday April11,2021

লাঙলের ফলায় ধার আছেতো মাটি উপরে ফেলা যায়। বিনা ধারে অকেজো। রাজনীতি চলে মানুষের দ্বারা এবং সেই মানুষই রাজনীতির মূলে। বিনা মানুষে রাজনীতির কি মূল্য? পরিশেষে বলা যায়, রাজনীতির জন্য মানুষ এবং মানুষের জন্যই রাজনীতি।
পঞ্চাশ বছরের বাংলাদেশ।  সর্বে হিসেবে রাজনীতিকরাই  পঞ্চাশ বছরের বেশির ভাগ সময় ক্ষমতায়।  কালেভদ্রে তিন তিনবার সেনারা ক্ষমতায় হাত বসিয়েছে তবে সেই মানুষের কল্যাণেই খুব বেশি দিন সুবিধে করতে পারেনি। সুবিধে/ অসুবিধে নিয়ে তর্ক- বিতর্ক থাকতেই পারে । তবে সরে এসেছে সবাই বা বাধ্য হয়েছে।
এই যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশের পিছনের ইতিহাসে সেনাদের ইতিহাস জড়িয়ে। সেই পশ্চিমা সেনাদের হুমকি/ ধামকির বিপরীতে পূর্বের জনমানুষেরা হাতে অস্ত্র তুলে নিতেও কার্পণ্য করেনি। এমনকি রক্ত দিতেও দ্বিধান্বিত ছিলো না । রক্তের বিনিময়েই এই স্বাধীন দেশ। অথচ এই দেশেই রাজনীতিকদের অপরাজনীতির কল্যাণেই আবার সেনারা এসেছিলো । যা ছিলো অন্তত এই বাংলা ভূমির জন্য  অকল্পনীয় এবং অনাকাঙ্খিত অবশ্যই । কেননা বিশ্বে সেই সময়ের অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, রুখে দিয়েছিলো তাদের বঞ্চনা এই বাংলার আপামর জনসাধারণেরা এবং স্বাধীন হয়েছিলো। সুতরাং এই দেশে আর যাই হউক সেনা আসার কথা ছিলো না। তবে সত্য হলো কয়েকবার এসেছে।
কেনো উপরে সেনা শাসনে কথা বলছি। লক্ষণীয় যে গতকাল ২৪ মার্চ চলে গেলো। এই স্বাধীন দেশে এরশাদ এই দিনটিতে বুটের তলায় বাংলাদেশকে চেপে ধরেছিলো।  স্বৈরাচার এরশাদ তার হাত লাল করেছিলো জাফর, জয়নাল, দিপালী সাহা, রাউফুন বসুনিয়া, শাহজাহান সিরাজ, সেলিম, দেলোয়ার, নুর হোসেন, জেহাদ, ডা: মিলন সহ অসংখ্য নাম না জানা শহীদদের রক্তে। সেই রক্তে রঞ্জিত খুনি এরশাদ কে এই দেশের রাজনীতির মাঠে আবার এই দেশের মূল পরিচালনাকারীরাই প্রতিষ্ঠিত করেছিলো। এই সব কিছুর পিছনেই রাজনীতির নামে অপরাজনীতি এবং ক্ষমতা।
আজকের দিনে এরশাদকে স্বৈরাচার বললে অনেকেই তেড়ে আসেন । অনেক যুক্তি দেখান। আজকের দিনে রাজনীতিকদের হাতে কতটা স্বৈরাচারীতা চলছে, সেই যুক্তি দেখিয়ে। সত্যি বলতে তখন থ হয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না এবং খণ্ডন করাও মুশকিল হয়ে যায়।  আরো লক্ষণীয় যে, এরশাদকে স্বৈরাচার থেকে মুক্তি দিতে রাজনীতিকরা যেন রীতিমোন দায়বদ্ধতায় চুক্তি করেছে। এমনকি জাতীয় পার্টির স্লোগান আছে,  ” এরশাদকে যারা স্বৈরাচার বলে- জুতা মারো গালে গালে ” কোন দেশে এই স্লোগান হয় ? এই বাংলার মাটিতে । আর জুতা পড়ছে কাদের গালে ? আমি, আপনি, আমরা যারা রাজনীতিকদের বিশ্বাস করে রাজপথে ঘাম ঝরিয়ে ছিলাম, পুলিশের লাঠিতে পিঠ লাল করেছিলাম এবং টিয়ার গ্যাসে চোখ অন্ধ করেছিলাম তাদের গালে । আজকের দিনেও যারা এরশাদকে স্বৈরাচার বলে গাল খাচ্ছে ,সেই আমরাই কতিপয় নরধম আর বলির পাঠারা। আফসোস রাজনীতিকরা চোখ উল্টিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বলেই আজকে প্রয়াত এরশাদও রাজনীতির মানিক রতন। নুর হোসেন সহ শত তরুণ শহীদরা নিশ্চয়ই উপর হতে খিল খিল করে হাসে। নিশ্চয়ই ভাবে, আমরাতো বিদায় হয়ে এসে যেন একপ্রকার বেঁচে গেছি। কিন্তু তোমরা যারা আজও সেই স্বৈরাচারকে গ্রহণ করতে পারোনি, তাদের গালে জুতা আর গালাগাল হজম করতে হয়, আফসোস।
প্রায় দশ বছর যাতনা সয়ে বহুল প্রত্যাশার গণতন্ত্রের আশায় বুক বেঁধে ছিলো এই ভূমির মানুষেরা। বুক বেঁধে ছিলো বড় আশা নিয়ে, দেশ এখন থেকে অন্তত  গণতন্ত্রের পথে চলবে। মানুষ তাদের আপন মর্যাদা ফিরে পাবে। বলার অধিকার পাবে। জবাব চাইতে পারবে। দেশের মূল মালিক জনগণ তাদের মালিকানার অধিকার ফলাতে পারবে। কেননা গণতন্ত্রে যে সব কিছুই সহায়ক ভূমিকায় থাকে। গণতন্ত্র আছে তো সকল কিছুর চর্চা একটি নিয়ম- নৈতিকতার আওতায়, একটি সুন্দরের সৃষ্টি করে। সৃষ্টি করে একটি সৃজনশীল ও প্রত্যাশার  দেশ। যেখানে মানুষ মানুষের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। সরকার তার জনগণের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। হায় রে কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র তুমি আজও এই বাংলায় অধরাই রয়ে গেলে ।
সেই অধরা গণতন্ত্রের অভাবেই আজকের দিনে দেশের এমন হাল। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। রাজনীতিকরাই রাজনীতিকদের বড় শত্রু।  ক্ষমতাই সকল কিছুর মূলে। ক্ষমতার লোভে স্বাধীনতার মূল চেতনাও বিকিয়ে দেওয়া মামুলি বিষয়। আজকের দিনে সূবর্ণজয়ন্তীতে এসেও ভাবতে হয়, দেশ আজ কোথায় দাঁড়িয়ে? কোথায় আজ রাজনীতি সবল চর্চা ? কোথায় আজ অধিকার? কোথায় আজ দেশের মানুষের মূল্য?
এ যেন এক ভবের দেশ । এই ভবের দেশে সবাই আজ ভাবের মহত্বে একাকার। আমি হনু কে রে, আজকের সরকার।  যেমন খুশি তেমন খেলে । পাশার গুটি উল্টিয়ে দিয়ে চলছে দিন- রাত ভবের ভাবে। সরকার আছে তার আপন ভাবনায় । কিভাবে সেই ৪১ পর্যন্ত থাকা যায়। রাজপথে আজ বিরোধীরা পাটিসাপটার মতন চ্যাপটা হয়ে আছে। সেটাইতো হবার কথা। কেননা জনগণ যে আর রাজনীতিকদের প্রতি বিশ্বাস রাখে না । বারবার রক্ত কেনো রাজনীতিকদের জন্য দিবে ? রাজনীতিকরা যে বারবার জনগণের চোখের জল আর রক্ত নিয়ে ব্যবসা করে। সুতরাং যা হবাই তাই হচ্ছে এবং চলছে।
তবে সমস্যা আবার ঘুরেফিরে সেই জনগণের ঘাড়েই মূলত এসে পরে। সব হারা হয় জনগণ।  সুতরাং বেঁচে থাকার মতন বেঁচে থাকতে হলে এক সময় জনগণকেই লাঙলের ফলার মতন ধারালো হতেই হবে। সব উল্টিয়ে পাল্টিয়ে নতুনের আশায় বুক বাঁধতে হবেই। আজ হেরে গেলে আগামীতেও হার মেনে নিতে হবে। আরো দেরী হবে তো আরো কঠিন সামনে এসে দাঁড়াবে। তখন আর উপায় থাকবে না। একবার একজনকে নামিয়ে ভিন্নজনকে ক্ষমতা দিয়েই বা কিসের লাভ ? সবাই তো একি রসুনের দল। সুতরাং নতুনত্বের সৃষ্টি করাই উত্তম। এটাও পরিষ্কার বেশ, কার পিছনে এসে নতুনত্বের যাত্রা শুরু হতে পারে? আমরা কেমন জানি যে তিমিরে ছিলাম, বন্দিশালার মতন সেই তিমিরেই পরে আছি।

আফসোস, ভারতে একজন কেজরিওয়ালের আগমন হয়। একজন তরুণ কানাইয়ায় প্রতি মানুষের আস্থা রাখে দেখতে পাচ্ছি। অথচ আঠারো কোটির দেশে একজনও কি আছেন ?

বুলবুল তালুকদার 
যুগ্ম সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম