Sunday April11,2021

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এখন শুধু আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পালা। পিছনে ফিরে তাকানোর কোনও সুযোগ নেই। সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে এদেশকে আমরা জাতির পিতার স্বপ্নের শোষণ-বঞ্চনামুক্ত, ক্ষুধা-দারিদ্র্য-নিরক্ষরতামুক্ত, অসাম্প্রদায়িক চেতনার সোনার বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবো, ইনশাল্লাহ্। এটাই আজকের দিনে আমাদের প্রতিজ্ঞা।’

বুধবার (১৭ মার্চ) বিকেলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে দেয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজকের বাংলাদেশ যে অবস্থানে পৌঁছেছে, সেখান থেকে তাকে সহজে অবনমন করা বা নামানো যাবে না। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ, আমরা এই করোনা ভাইরাস মহামারির অভিঘাত সফলভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছি। তবে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘দেশবিরোধী অপশক্তি এখনও দেশ-বিদেশে সক্রিয় রয়েছে। তারা নানা অপতৎপরতার মাধ্যমে এ অর্জনকে নস্যাৎ করতে চায়। জাতির পিতার এই শুভ জন্মদিনে আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে সকল অপতৎপরতা প্রতিহত করে প্রিয় মাতৃভূমিকে উন্নয়ন অগ্রগতির পথ ধরে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাই। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখি।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আজকের দিনটি আমাদের জন্য অত্যন্ত মাহাত্ম্যপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। ১৭ মার্চ, ১৯২০ সালের এই দিনে বাংলাদেশের এক নিভৃতপল্লী টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নিয়েছিল এক শিশু, পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা সাহারা খাতুনের কোলে। টুঙ্গিপাড়া গ্রামকে আলোকিত করে যে শিশু এ ধরিত্রীতে আগমন করেছিল সেই শিশুই আলো জ্বালিয়েছিল বাঙালি নামের এক জনগোষ্ঠীর জীবনে। এনে দিয়েছিল স্বাধীনতা।’

তিনি বলেন, ‘১৭ মার্চ আমরা প্রতিবছর জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে উদযাপন করি। শিশু দিবসে প্রতিটি শিশুর জন্য আমার আন্তরিক ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। এ বছর আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূরণ হচ্ছে। আমরা মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী একযোগে উদযাপন করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত “মুজিব চিরন্তণ”- এ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আমরা দেশে এবং বিদেশে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। আজ তার সূচনা পর্ব। তবে আমাদের উৎসব ১৬ ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্তই চলতে থাকবে সমগ্র বাংলাদেশব্যাপী। কারণ ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় দিবস। সে পর্যন্ত সাড়া বাংলাদেশ থাকবে উৎসবমুখর।’

এসময় তিনি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিব জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম মোহাম্মদ সোলিহ ও ফার্স্ট লেডি ফাজনা আহমেদকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। ভ্রাতৃপ্রতিম মালদ্বীপের জনগণের প্রতিও আন্তর্জাতিক শুভেচ্ছা জানান তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইউশিহিদে সুগা বাংলাদেশের জনগণকে শুভেচ্ছা বাণী পাঠিয়েছেন। আমি দেশবাসীর পক্ষ থেকে তাঁদের ও তাদের দেশের জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’

এছাড়াও আরও অনেক দেশের সরকারপ্রধান, রাষ্ট্রপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিশিষ্টজনেরা যেসব বার্তা পাঠিয়েছেন প্রতিদিনের অনুষ্ঠানমালায় একে একে সেগুলো উপস্থাপন করা হবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমি আজকের দিনে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। শ্রদ্ধা জানাই জাতীয় চার নেতা, ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও দুই লক্ষ মা-বোনের প্রতি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের জানাই আমার সশ্রদ্ধ সালাম।’

মুজিবকন্যা বলেন, ‘মাত্র সাড়ে ৩ বছর জাতির পিতা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, একটা যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ গড়ে তুলে যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে যাত্রা শুরু করেন তখন ৭৫-এর ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়।’

এসময় তিনি ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানার পক্ষ থেকে ১৫ আগস্টে শাহাদাৎবরণকারী সবাইকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

বঙ্গবন্ধুকন্যা আরও বলেন, ‘বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। আর সেই সংগ্রামের পথ বেয়ে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীনতা, স্বাধীন রাষ্ট্র ও স্বাধীন জাতির মর্যাদা। একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত, শোষণ-বঞ্চনা, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের এক জনপদকে একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার মতো কঠিন দায়িত্ব পালন করেছিলেন মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে। অসাধ্য সাধন করেছিলেন তিনি।’

মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও যুদ্ধ পরবর্তী দেশ গড়ার কাজে যেসব বন্ধুপ্রতিম দেশ এবং নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন ও আমাদের সাহায্য করেছিলেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘অনেক স্বপ্ন ছিল জাতির পিতার, এই বাংলাদেশকে নিয়ে। তিনি চেয়েছিলেন, বাংলাদেশকে উন্নত, সমৃদ্ধ সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবেন। কিন্তু ঘাতকের নির্মম বুলেট আমাদের কাছ থেকে তাঁকে কেড়ে নেয়, ৭৫-এর ১৫ আগস্ট। এরপর অনেক সংগ্রামের পথ বেয়ে আজ বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতীক্ষার প্রহরের আজ অবসান হতে চলেছে। আজ এমন এক সময়ে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী পালন করছি, যখন স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশ মর্যাদাশীল উন্নয়নশীল দেশের কাতারে সামিল হওয়ার চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করেছে। মাথাপিচু আয় সম্মানজনক, ২ হাজার মার্কিন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৫ ভাগে হ্রাস পেয়েছে। দেশ খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। মানুষের গড় আয়ু ৭৩ বছরে উন্নীত হয়েছে। আর্থ-সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ প্রভূত উন্নয়ন সাধন করেছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত ১২ বছরে নিরলস প্রচেষ্টা ও জনগণের ঐকান্তিক পরিশ্রমের ফসল আজকের এই প্রাপ্তি। আমি বাংলাদেশের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি, তারা আমাকে তাদের সেবা করার সুযোগ দিয়েছেন বলে।’

এসময় তিনি অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।