Monday April12,2021

অ্যাডভোকেট আনসার খান :“দল-দাস”-না-কি, “দলীয় প্রধানের দাস”-এমন একটা ভাবনায় পড়েছি অনেকদিন ধরেই।এ নিয়ে একটা লেখা জরুরি বলে মনে করছি অনেক দিন ধরে। 

ভাবনাটা তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতান্ত্রিক কাঠামোর অবস্থান এবং বাস্তবে দল পরিচালনা এবং দলের প্রতি দলীয় নেতাকর্মীদের আনুগত্যের মাত্রার সাথে দলীয় প্রধানের প্রতি আনুগত্যের মাত্রার সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্যের মাত্রা নির্ণয় ও পর্যালোচনা করলে দেখতে পাওয়া যাবে,-দলের নেতাকর্মীরা যতটা না তার দলের প্রতি অনুগত, তার চেয়ে অনেক বেশিমাত্রায় দলীয় প্রধানের প্রতি অনুগত।

“দল এবং দলীয় প্রধান”- দুটো ভিন্ন বিষয়। দলের গঠন এবং পরিচালনা পদ্ধতি, দলীয় প্রধান নির্বাচন করা ইত্যাদি বিষয়গুলো দলীয় সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত হয়ে থাকে। দল একটা স্হায়ী সংগঠন, কিন্তু দলীয় প্রধান দলের সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারায় বর্ণিত বিধি অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচিত বা মনোনিত হয়ে থাকেন এবং তার দায়িত্ব কী তাও বর্ণনা বা লিপিবদ্ধ করা থাকে দলের গঠনতন্ত্রে।কিন্ত বাস্তবে এসবকিছু গঠনতন্ত্র মোতাবেক পরিচালিত হয় না।

দলীয়প্রধান ও দলের প্রতি দলীয় নেতাকর্মীদের আনুগত্য থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার অর্থ,- দাসত্বসূলভ আনুগত্য থাকা যুক্তি নির্ভর নয়।বরং দলের ঘোষিত আদর্শ এবং এর গঠনতন্ত্রের প্রতি অনুগত থাকা হচ্ছে নেতাকর্মীদের মূল কর্তব্য ও দায়িত্ব।নেতৃত্বের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করার অধিকারসহ আনুগত্য থাকাটাই স্বাভাবিক।

গণতান্ত্রিক বিধি-বিধান অনুযায়ী পরিচালিত একটা রাজনৈতিক দলে দলীয় প্রধান,-দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রধান,-এটাই বাস্তবতা।দলের প্রধান হলেও তিনি এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না।দলীয় যথাযথ ফোরামেই দলীয় সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত হওয়ার কথা।অর্থাৎ দল যদি গঠনতান্ত্রিক বিধান মতে আদর্শিক ভিত্তিতে পরিচালিত হয়,-তবে সংগঠনে কখনো ব্যক্তিবাদ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।তবে,দেশে রাজনৈতিক দলগুলোতে ব্যক্তিবাদ তথা দলীয় প্রধানের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ;তার ইচ্ছেই দলের ইচ্ছে, -এমন একটা অবস্থা দলগুলোতে বিরাজমান আছে।

রাজনৈতিক ব্যবস্হায় রাজনৈতিক দলগুলোর হালচাল পর্যালোচনায় দেখা যাবে,প্রত্যেকটা দলের নিজস্ব গঠনতন্ত্র আছে এবং দলগুলোর পরিচালনা পদ্ধতিতে গণতান্ত্রিক নীতিমালা প্রয়োগের মাধ্যমে দল পরিচালনার কথা বলা আছে। বলা আছে গণতান্ত্রিক বিধিমালা অনুযায়ী নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে দলীয় কাউন্সিলরদের ভোটে এবং কাউন্সিলর কারা,কীভাবে নির্বাচিত হবে তা-ও বলা আছে গঠনতন্ত্রে।এমনকি,দলের সদস্যদের দায়িত্ব-কর্তব্য কী সেটাও লিপিবদ্ধ করা থাকে।

 

তবে,রাজনৈতিক দলগুলোর পরিচালনা পদ্ধতির লিখিত রূপ এবং বাস্তবে পরিচালনা পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। বাস্তবে দল পরিচালনায় গঠনতন্ত্র অনুসরণ করা হয় না বললেই চলে।বিস্তৃত আকারে ব্যাখ্যা করলে দেখা যাবে, দলের নেতৃত্ব নির্বাচন, দলীয় নীতি নির্ধারণ,সিদ্ধান্ত গ্রহন প্রক্রিয়া ইত্যাদিতে গণতান্ত্রিক নীতিমালার খুব একটা প্রয়োগ হয় না।বরং দলীয় প্রধানের ইচ্ছেটাই প্রাধান্য পেয়ে থাকে ওই সব বিষয়ে।

অন্যতম বড় অগণতান্ত্রিক দিক হলো,দলগুলো,”ব্যক্তির”নামে পরিচিতি পেয়ে থাকে। ব্যক্তির নামে দলের পরিচিতি দলের ভেতর অভ্যন্তরিণ গণতন্ত্র চর্চার জন্য হুমকিস্বরূপ বলে বিবেচনা করা হয়।অথচ পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে এমনটা দেখা যায় না।সেখানটায় ব্যক্তির নামে দলের পরিচয় কল্পনাই করা যায় না।ওখানটায় দলীয় প্রধানের কর্মকাণ্ডের ভূলগুলো তোলে ধরে নেতাকর্মীরা সমালোচনা করে থাকেন হরদম।

দলগুলোর জন্য নেতৃত্ব নির্বাচন করাও বেশ কঠিন হয়ে থাকে ব্যক্তির নামে দলের পরিচিতি পাওয়ার কারণে। তাছাড়া,সকল গণতান্ত্রিক নীতিমালা উপেক্ষা করে স্বজ্ঞানে হোক বা অনিচ্ছা সত্ত্বেই হোক দলীয় প্রধানের পদকে প্রায় স্হায়ী করা হয়েছে।ফলে দলীয় প্রধান হিসেবে একই ব্যক্তি আজীবন ওই পদে বহাল থেকে দলের ওপর কর্তৃত্ববাদী ভূমিকা চাপিয়ে দেন।দলীয় প্রধান হিসেবে তিনি হয়ে ওঠেন দলের অবিসংবাদী নেতা।অবস্থা এমন পর্যায়ে পর্যবসিত হয় যে,নেতার আদেশ-নির্দেশ দলের সকলপর্যায়ের নেতাকর্মীদের জন্য বাধ্যকর হয়ে ওঠে।নেতার অস্বাভাবিক ক্ষমতার উত্থানের কারণে দলের সকলস্তরের সদস্য ও নেতাকর্মীরা অধস্তনরূপে গণ্য হয়ে পড়েন।তাদের মধ্যে দলীয় আনুগত্যের চেয়ে আশ্চর্যজনকভাবে প্রধান নেতার প্রতি আনুগত্যের প্রবণতার মাত্রা ব্যাপক পরিমাণে বৃদ্ধি পায় এবং এ প্রবণতা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকায় একটা সময়ে দলীয় আনুগত্য-“দলীয় নেতার প্রতি দাসসুলভ” আনুগত্যে রূপান্তরিত হয়।

দলে টিকে থাকা,পদ-পদবী পাওয়ার আকাঙ্খা, বিভিন্ন প্রকারের বৈষয়িক স্বার্থ ও সূ্যোগ-সূবিধা ভোগ করার মনোবাসনা থেকে দলের একশ্রেণীর নেতাকর্মী,সদস্যরা নিজেদের বিবেক- বুদ্ধি প্রধান নেতার পদতলে বন্ধক রেখে অন্দ্ব আনুগত্য প্রকাশ করে,- যা তাদেরকে-” দল-দাস থেকে প্রধাননেতার দাসত্বের পর্যায়ে অবনমিত করে।” যে বা যারা বিবেক-বুদ্বি বন্ধক রাখায় দ্বিধান্বিত হয়ে থাকে তারা ছিটকে পড়ে দল থেকে অথবা নিরবেই দল ও রাজনীতি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।

দলীয় প্রধানের প্রতি আনুগত্যের মাত্রা এতোটাই দৃঢ় যে, কোনো অজুহাতেই তার কোনো সিদ্ধান্ত, মতামত,কর্মকাণ্ড বা নির্দেশনার প্রতি বা দল পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে উপেক্ষা, অবজ্ঞা,অবমাননাকর মন্তব্য বা আকারে-ইঙ্গিতে সমালোচনা করা যাবে না। এমনটা করলে দলে টিকে থাকার সূযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবার শংকা দেখা দিতে পারে।

মূলত ব্রিটিশ প্রথার,-“রাজা বা রাণী কোনো ভূল বা অন্যায় করতে পারেন না”-এমনটা তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক দলের দলীয় প্রধানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে বিশ্বাস করে দলের নেতাকর্মীদের বড় অংশটা।এরা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে, তাদের নেতা কোনো ভূল বা অন্যায় করতে পারেন না।নেতা সর্বদাই সঠিক। এভাবেই দলীয় প্রধানকে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকার দেওয়া হয়েছে এবং ফলে দলে নেতাকে কর্তৃত্ববাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা যায় এবং তার পরিবার সদস্যরাও দল পরিচালনায় অভাবনীয় ক্ষমতার অধিকার পেয়ে থাকে।

দলে নেতার একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পেছনে মূখ্য কারণ হচ্ছে দলে সত্যিকার গণতন্ত্র চর্চার অভাব।

বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যাবে,- গত ৫০-বছরেও গণতন্ত্র কাঠামোগত ভাবে ভিত্তি পায়নি এবং সেকারণে দলগুলোতেও অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা একেবারেই হয়নি। কখনো কোনো দলের প্রধান নেতা দলীয় কনভেনশনে প্রকাশ্য বা গোপন ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন,এমন নজিরও দেখতে পাওয়া যায়নি বিগত এই পাঁচ দশক সময়কালে।এমনকি, বিদ্যমান দলীয় প্রধানের বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়ার মতো সাহসও অন্যকোনো নেতা দেখাতে পারেননি। অর্থাৎ দলে দলীয় প্রধানের নিরংকুশ প্রাধান্য ও কর্তৃত্ব এমনভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত যে,তাকে চ্যালেন্জ করার মতো বিকল্প নেতা সৃষ্টির কোনো সূযোগ রাখা হয়নি দলগুলোতে।

দলীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীভূতকরণ ও ব্যক্তিগতকরণ দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর যেমন,তেমনি রাজনৈতিক ব্যবস্হার ওপরও সূদুরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।দেশে উদার গণতন্ত্রের চর্চা ব্যাহত হচ্ছে, একইভাবে রাজনৈতিক দলগুলোতেও গণতান্ত্রিক চর্চা একদম নেই বললেই চলে।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের মূখে গণতন্ত্রের বুলি যতটা জোরে উচ্চারিত হোক না কেন,জাতীয় থেকে স্হানীয়,-সকল পর্যায়ের নেতৃত্ব নিজ নিজ অবস্থান থেকে দলীয় ক্ষমতা একদম নিজেদের হাতে কুক্ষিগত ও কেন্দ্রীভূত করে রাখতে সদা তৎপর ও সচেষ্ট থাকে। ফলে এলাকাভিত্তিক মাসলম্যান সৃষ্টি হয়,যারা নিজেদের এলাকায় গডফাদার হিসেবে ওই এলাকায় নিজের আধিপত্য কায়েম করে। এসব কিন্তু প্রকৃত গণতন্ত্র, সুশাসন ও সুস্থধারার রাজনৈতিক ব্যবস্হা কায়েমের পথে বড় বাধা এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার জন্যও বিপজ্জনক প্রতিবন্দ্বক।

উদারনৈতিক গণতন্ত্রের অন্যতম মূল কথা হলো,-ক্ষমতা,-সেটা দলীয় হোক বা রাষ্ট্রীয় হোক,একে ছড়িয়ে দিতে হবে সকল শাখা-প্রশাখায়। অর্থাৎ ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নয়,এক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূতকরণ নয়,বরং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করে বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে বিভাজন করে দিতে হবে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য।রাজনৈতিক দলগুলোতে তাই দলীয় নেতৃত্ব ও দল পরিচালনার ক্ষমতা একক হাতে যাতে কেন্দ্রীভূত না হয়, দলে যাতে ব্যক্তির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত না হতে পারে সেজন্য দলগুলোর নানান শাখা কমিটি গঠন করে দল পরিচালনায় সকল নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করার বিধান রাখা হয় এবং সবগুলোর সমন্বয়ে ও সকলের মতামত নিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দলগুলোর কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে মর্মে বিধান লিপিবদ্ধ আকারেই রাখা হয়েছে প্রায় সবকটা দলের গঠনতন্ত্রে।কিন্তু বাস্তবে গঠনতান্ত্রিক বিধান উপেক্ষিত হয়ে আসছে সব দলেই।

ফলে দলগুলোতে কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্ব বিকশিত হয়েছে। প্রধাননেতার প্রতি দ্বিধাহীন চরম আনুগত্য প্রদর্শন করেই নেতাকর্মীদের দলে টিকে থাকতে হয়।এসব কিছু দলে,রাষ্ট্রে ও সমাজে গণতন্ত্র বিকাশে হুমকিস্বরূপ।তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো তাই উদারনৈতিক গণতন্ত্র চর্চার দিক থেকে পিছিয়ে আছে।

লেখক: কলামিস্ট, রাজনীতি বিশ্লেষক।