Tuesday April20,2021

 আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর এই দিনটিতে একটা উপপাদ্য থাকে। এ বছর নারী দিবসের উপপাদ্য ‘করোনাকালে নারী নেতৃত্ব, গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব।’ নারী-পুরুষের যৌথ উদ্যোগে সমতার বিশ্ব গড়ার প্রত্যয় এবারের মুখ্য বিষয়। দিনটি পালনে নারীর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা মুখ্য হয় অনেক দেশে। আবার কোথাও নারীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা গুরুত্ব পায়। তবে নারী দিবসের শুরুটা ছিল নারীর সম-অধিকার, মর্যাদা ও অসম শ্রমমজুরির প্রতিবাদে। ১৮৫৭ সালে নিউইয়র্কের সুতা কারখানার কর্মজীবী নারীদের শিল্প-কারখানায় শ্রমসময় কমানো, মানবিক আচরণবিধির প্রয়োগ, শ্রমমজুরির বৈষম্য দূরীকরণসহ আরও অন্য ধরনের স্বাধীনতা প্রদানকে কেন্দ্র করে নারী শ্রমিকরা রাজপথে নেমে আসেন। সেদিন অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে এই ঐক্যবদ্ধ মিছিলে সরকারি বাহিনীর দমন-পীড়ন সারা বিশ্বকে হতবাক করে দেয়। প্রকাশিত হয় নারীর প্রতি অমানবিক আচরণ ও অধিকার হরণের করুণ ইতিহাস। নারীর এই ন্যায্য দাবি ও বঞ্চনার ইতিহাসে বিক্ষুব্ধ হন বিভিন্ন দেশের নারী নেত্রীরাও। সবাই ঐক্যবদ্ধ হতে থাকেন নারীর প্রতি এই অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে। প্রতিবাদে সোচ্চার হতে থাকেন বিশ্বের অসংখ্য নারী শ্রমিক।
বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করে তাদের এই দাবি আদায়ের লক্ষ্য ক্রমেই জোটবদ্ধ হতে থাকে। এরই জোরালো উদ্যোগ হিসেবে ১৮৫৭ সালে মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। সেই মিছিলে চলে সরকার লেঠেল বাহিনীর দমন-পীড়ন। ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুুয়ারি নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়।
ক্লারা জার্মান কমিউনিস্ট পার্টিও একজন স্থপতি। ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। সেই সম্মেলনে ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয় ১৯১১ সাল থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা। ১৯১৪ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ পালিত হতে লাগল। বাংলাদেশেও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার লাভের পূর্ব থেকেই দিবসটি পালিত হতে শুরু করে। ১৯৭৫ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হলে দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে ।
তখন থেকেই নারীর অধিকার এবং স্বাধীনতা আদায়ের দিন হিসেবে ৮ মার্চকে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে উদ্যাপন করা হয়। বাংলাদেশও ১৯৭১ সাল থেকে দিবসটি পালন করছে। বিশ্বের কয়েকটি দেশ এই ৮ মার্চকে সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে দিবসটির তাৎপর্য কোনো নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিদিনের কর্মযাত্রায় নারীরা যদি তাদের সম্মান, অধিকার ও ন্যূনতম বাঁচার পথকে অবারিত করতে না পারে, তাহলে দিনটির গুরুত্ব কতটুকু দেওয়া হলো সেটা বিবেচনায় আনতে হবে। উন্নয়নের গতিধারায় আজকের বাংলাদেশে নারী অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রারও চালিকাশক্তি। কৃষি, শিল্পকারখানা, অবকাঠামোগত নির্মাণ, অফিস-আদালতসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেভাবে নারীর কর্মক্ষমতা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, তাতে নির্দ্বিধায় বলা যায় শ্রমবাজারে নারীরা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। তারপরও শ্রমজীবী নারীরা আজও নারী দিবসের যথার্থ সুফল থেকে অনেক দূরে। দেশের পোশাকশিল্প, যা দেশের অর্থনীতির সম্ভাবনার নিয়ন্ত্রক, সেক্ষেত্রে নারীদের যুগান্তকারী ভূমিকাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বর্তমানে আমাদের দেশে যদিও সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে নারী-পুরুষের মজুরিবৈষম্য নেই বললেই চলে, কিন্তু ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষি ও শিল্পের উৎপাদনশীলতায় নারী যে বৈষম্যের দুর্বিপাকে পড়ে, তা আন্তর্জাতিক শ্রম আইনেরও চরম লঙ্ঘন বলা যায়। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যেমন রাস্তাঘাট, কালভার্ট, সেতু ও বহুতল ভবন নির্মাণে নারী শ্রমিকের ন্যায্য পাওনাকে যেভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়, পুরুষের তুলনায় তা যেমন দৃষ্টিকটু একইসঙ্গে নীতিবহির্ভূতও। একইভাবে কৃষিজমিতেও নারী কৃষকের ভূমিকা কোনো অংশে কম নয়। সেখানেও নারী-পুরুষের ভিন্ন শ্রমমজুরি দেখা যায়। আর অবকাঠামো নির্মাণে শত শত নারী শ্রমিকও এই বিভাজন থেকে মুক্ত নয়। নারী শুধু যে দেশের উৎপাদনশীলতায় কায়িক শ্রম দিচ্ছে তা নয়, গৃহস্থালির যাবতীয় কাজকর্মও একজন গৃহিণীকেই সামলাতে হয়। উপার্জনক্ষম মহিলারা এই গৃহকর্মের দায়বোধ থেকে নিজেকে বাঁচাতেও চায় না।
উন্নয়নের গতিধারায় আজকের বাংলাদেশে নারীরা অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রারও চালিকাশক্তি। একটা সময় ছিলো যখন নারীদেও কোন অধিকার ই ছিলো না। বিশ্বজুড়ে নারীঅধিকার আদায় করতে হয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম করে। যে কারনে নির্বাচনে প্রতিযোগীতা করা তো দুরের কথা ভোটের অধিকার অর্জন করতে হয়েছে সংগ্রাম করেই। বলা হয় মানুষ দু’পায়ে হাঁটলে আগায়। সমাজেরও দুটি পা, একপা পুরুষ তো অন্য পা নারী। যে সমাজে নারী পুরুষ একসাথে সমমর্যাদায় কাজ কওে তখন সমাজও অগ্রগামী হয়। তাই সমাজ রাষ্ট্র তথা দেশকে অগ্রগামী করতে নারীকে শিক্ষিত কওে গড়ে তোলার পাশাপাশি তার কর্মসংস্থানের জায়গার ব্যবস্থাও জরুরী। এদেশের নারীরা যেমন ১৯৫২ বাংরাভাষার দাবীতে আন্দোলন সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়েছে তেমনি ১৯৭১ সালেও তারা অনেকে পুরুষের পাশাপাশি সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাথে বাংলার লক্ষ লক্ষ নারীর অসীম ত্যাগও জড়িয়ে আছে।
এত অর্জন এত ত্যাগের পরও বাংলাদেশে শহরে-গ্রামে নারী নির্যাতন ও হত্যা এবং ফতোয়াবাজি নারী জীবনে অভিশাপ যেন শেষ হয় না । প্রতিদিন দৈনিক পত্রিকায় একাধিক টা নারী নির্যাতনের সংবাদ থাকে। উল্লেখ্য যে এ বিষয়ে সবাই একমত, সংবাদপত্রে প্রকাশিত নারী নির্যাতনের ঘটনার তুলনায় অপ্রকাশিত সংখ্যা অনেক বেশি। তাই শুধু ৮ মার্চের মধ্যে দিনটির গুরুত্ব আটকে রাখলে দিবসটি তার মর্যাদা ক্ষুন্ন করা হবে । প্রতিদিনের কর্মযোগে নারী যতক্ষণ না তার যথার্থ অধিকার ও মর্যাদা অর্জন করতে পারবে, সে অবধি দিবসটির তাৎপর্য সত্যিকার অর্থে হয়ে উঠবে না। বাংলাদেশে এখনও নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আইন, আইনের বিভিন্ন ধারা ও উপধারা বিদ্যমান। জাতিসংঘ কর্তৃক প্রণীত সিডও সনদের গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধারা থেকে বাংলাদেশ এখনও সংরক্ষণ প্রত্যাহার করেনি, যে কারণে অভিভাবকত্ব ও উত্তরাধিকারের বিষয়গুলো এখনও বৈষম্যমূলক ধর্মভিত্তিক আইন দ্বারাই নিষ্পন্ন হয়। নারীর ক্ষমতায়নের একটা বড় প্রতিবন্ধকতা উগ্রবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর নারীবিরোধী প্রচারণা। এই গোষ্ঠী ওয়াজ মাহফিল থেকে শুরু করে মসজিদের খুতবায়, ধর্মীয় তালিমে নারী ও ভিন্নধর্মাবলম্বীদের ব্যাপারে বিষোদ্গার প্রকাশে অক্লান্ত হলেও দেশে ঘটে চলা অব্যাহত নারী নির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কখনও টুঁ শব্দটিও উচ্চারণ করে না। সম্প্রতি এরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রভাব বিস্তার করেছে। ইউটিউবে ছেড়েছে অজস্র নারীবিরোধী ঘৃণ্য উক্তিতে ভরা ওয়াজের ক্লিপ, যেগুলো প্রায়ই ফেসবুকে শেয়ারও করা হয়। প্রতিনিয়ত এসব হেইটস্পিচ বা ঘৃণ্য প্রচারণার ফলে নারীবিরোধী পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধ আরও জোরদার হচ্ছে। তাদের এসব প্রচারণা নারীর শিক্ষা ও চাকরির বিপক্ষে এবং বাল্যবিয়ের পক্ষে মানুষকে প্রভাবিত করে, যা সংবিধানের মূল চেতনাবিরোধী। সেজন্য আইনগত, সামাজিক, রাজনৈতিকসহ সব ক্ষেত্রের প্রতিকূল পরিবেশকে অনুকূল পরিবেশে পরিণত করতে হবে। তাহলেই কেবল নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে আমরা অর্থপূর্ণ অগ্রগতি আশা করতে পারব। সময় এখন তাই দৃষ্টি বদলের।
কাজী সালমা সুলতানা , লেখিকা এবং গণমাধ্যম কর্মী ।