Sunday April11,2021

১৯৭৫ সা‌লের অাগস্ট মাসের প্রায় শেষ‌ ।ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগা‌রের ২৬ সে‌লে আমি । ভো‌রেই ঘুম ভাঙ‌লো। বিছানা থে‌কে বাই‌রে তা‌কাই, দে‌খি আমার  সে‌লের সাম‌নেই একজন মানুষ দা‌ঁড়ি‌য়ে।অবাক হই। এত ভো‌রে জেল পু‌লিশ ছাড়া আর  কা‌রো তো এখা‌নে থাকার কথা নয় । লোহার গরাদটা ঠে‌লে বারান্দায় যে‌য়ে দে‌খি হো‌সেন তৌ‌ফিক ইমাম। কে‌বি‌নেট সে‌ক্রেটা‌রি। একবছর আগে  তা‌ঁকে একবার দে‌খে‌ছিলাম। বি‌শেষ ক্ষমতা আইনে ‌বিনা‌বিচা‌রে যা‌দের অাটক রাখা হয়, প্র‌তি ছয় মাস অন্তর তা‌দের একটা ট্রাইবুনা‌লে আটকাদেশ  রি‌ভিউ হয়। তি‌নি ছি‌লেন ওই ট্রাইবুনা‌লের সদস্য। চেয়ারম্যান ছি‌লেন বিচারপ‌তি সোবহান। আমাকে  একবার সেখা‌নে নেওয়া হয়। একবার মাত্রই। আমার  আটকাদেশ বারবার বাড়া‌নো হ‌য়ে‌ছে য‌দিও। ‌ অামা‌কে ও অন্য‌দের রি‌ভিউ‌তে না নি‌য়ে অামাদের কথা না শু‌নেই হ‌য়ে যেত।
‌সেখা‌নে কেন অামা‌কে অাটক রাখা যু‌ক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দি‌তে গি‌য়ে স্পেসাল ব্রা‌ঞ্চের ডিএস‌পি তালুকদার বল‌লেন, ১৯৬৬ সা‌লে ৭ জুন ছয় দফার অা‌ন্দোল‌নে অা‌মি গ্রেফতার হ‌য়ে‌ছিলাম, ১৯৬৭ সা‌লে শিক্ষা দিব‌সে মি‌ছি‌লে পু‌লি‌শের উপর আক্রমণের  একটা মামলা ছিল ইত্যা‌দি। আমার  সব‌চে‌য়ে বড় অপরাধ আমি  মু‌ক্তিযুদ্ধ ক‌রে‌ছি, সে‌হেতু আমি  দুর্ধর্ষ। আমি  জে‌লের বাই‌রে থাকা রা‌ষ্ট্রের জন্য অ‌নিরাপদ। তৌ‌ফিক ইমাম অস্বস্তি বোধ কর‌ছি‌লেন এসব ব্যাখ্যায়। বারবার বল‌ছি‌লেন, এখনকার কথা বলুন। তালুকদারের কা‌ছে পা‌কিস্তান অাম‌লের ফাইল। ষাট দশ‌কে এই তালুকদার সা‌হেব ছি‌লেন অামা‌দের ভী‌তি। কী তৎপরতা না ছিল তার। অাগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় ১৯৬৮ সা‌লে লিফ‌লেট বিতর‌ণের অ‌ভি‌যো‌গে অামা‌কে গ্রেফতার করার জন্য উ‌নি অামা‌দের বাসায় রেইড ক‌রে‌ছি‌লেন দুইবার। বা‌ড়িঘর তছনছ ক‌রে‌ছি‌লেন লিফ‌লেটের খো‌জে। আমরা  লিফ‌লেট‌টি বিতরণ ক‌রি যখন বঙ্গবন্ধু‌কে গোপ‌নে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থে‌কে ঢাকা ক্যান্টন‌মে‌ন্টে নেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু‌কে কোথায় নেওয়া হ‌য়ে‌ছে তার খবর কেউ জান‌তো না।জনগণ‌কে জানা‌নোর জন্যই ওই লিফ‌লেট।
তৌ‌ফিক ইমাম‌কে অা‌মি বললাম, আপনি  এখা‌নে। আমাদের  রি‌ভিউ কি এখা‌নেই হ‌বে! উ‌নি অামার দি‌কে বিমর্ষ দৃ‌ষ্টি‌তে তাকা‌লেন। ।আমি  ‌কথা না বা‌ড়ি‌য়ে আমার  সে‌লে এ‌সে তাকে বস‌তে বললাম‌ে। তখনও তার জে‌লে এ‌ন্ট্রি রে‌জি‌স্ট্রেসন(জে‌লের ভাষায় আমদানি  হয়‌নি । জি‌জ্ঞেস করলাম খা‌বেন কিছু। উ‌নি পা‌নি চাই‌লেন। সক‌লেই, অামার সেল‌মেটরা ঘুম থে‌কে উ‌ঠে একবার ক‌রে উ‌কি দি‌য়ে যা‌চ্ছেন অামার সে‌লে, কে এ‌সে‌ছেন দেখ‌তে। শ্র‌মিক নেতা রুহুল অা‌মিন ভুঁইয়া এ‌সে আমার  পা‌শে বস‌লেন।   আমার কা‌জের ক‌য়েদী‌টি‌ এ‌সে যাওয়ায় তা‌কে বললাম দুজ‌নের জন্য চা নাস্তা নি‌য়ে অাস‌তে। সে‌লের রান্নাঘর(‌জে‌লের ভাষায় চৌকা) থে‌কে দ্রুত নি‌য়ে আসলো  সে।‌ তৌ‌ফিক ইমাম সু‌স্থির হ‌লেন।
‌তৌ‌ফিক ইমাম অা‌গের রা‌তেও বঙ্গভব‌নে কাজ ক‌রে‌ছেন। প্র‌তি‌দিন গভীর রাত পর্যন্ত কাজ কর‌তেন। কিন্তু গতরা‌তে খন্দকার মোশতাক তা‌কে বল‌লেন, বাবা তোমার অ‌নেক প‌রিশ্রম যা‌চ্ছে, বৌমা একা, অাজ তাড়াতা‌ড়ি বা‌সায় চ‌লে যাও। বাসায় যাওয়ার দুই ঘন্টা পর তা‌কে গ্রেফতার করতে অা‌সে পু‌লিশ। তারপর সরাস‌রি জে‌লে। প‌রে এক‌দিন তৌ‌ফিক ইমাম ব‌লে‌ছি‌লেন ১৫ আগস্ট  একজন ক্যা‌প্টেন দুইজন সিপাই নি‌য়ে তার সরকা‌রি বাসভবন থে‌কে নি‌য়ে যায় বাংলা‌দেশ বেতার স্টেশনে। মোশতাক তা‌ঁকে শপথ অনুষ্ঠা‌নের ব্যবস্থার কথা ব‌লেন। তি‌নি দ্রুত মন্ত্রণাল‌য়ের স‌চিবদের ,‌বিভাগীয় প্রধান ও ডি‌সি‌দের নতুন সরকা‌রের কথা জানান এবং মোশতা‌কের নি‌র্দে‌শে মন্ত্রী‌দের শপ‌থের ব্যবস্থা ক‌রেন। তার কা‌ছে ম‌নে হয়নি ম‌ন্ত্রি যারা হ‌য়ে‌ছি‌লেন তা‌দের ম‌ধ্যে ভী‌তি কাজ করেছিল। ত‌বে ফ‌নি মজুমদা‌রের কথা তার জানা নেই। তি‌নি যখন শপথ নেওয়ার জন্য সকল‌কে ফোন ক‌রেন,তা‌দের কথায় ভ‌ী‌তির কোন অাভাস পাননি। বরং তাদের কেউ কেউ কি ড্রেস প‌রে অাস‌বেন তা জান‌তে চে‌য়ে‌ছি‌লেন।
‌জে‌লের বাই‌রে যোগা‌যো‌গের জন্য প্রথম দি‌কে দুএকবার অামার সাহায্য নি‌য়ে‌ছেন তৌ‌ফিক ইমাম। অল্প সম‌য়েই বাই‌রে তার যোগা‌যোগ, কারাগার কতৃপ‌ক্ষের সা‌থে সম্পর্ক স্থাপন ইত্যা‌দি ক‌রে ফে‌লেন। ‌সেসময় অা‌রো ক‌য়েকজন স‌চিব বা স‌চিব পদমর্যাদার চাকু‌রে ব‌ন্দি ছি‌লেন। কিন্তু এস‌বে তার সমকক্ষ কাউ‌কে দে‌খি‌নি। তার প‌রিবা‌রের সা‌থে দেখা সাক্ষাত হ‌তো নিয়‌মিত। জেল ডাক্তার স্পেসাল ডায়াট লি‌খে দি‌তেন ।
‌জেল খানায় তখন হাওয়া বদল হ‌য়ে গেল। আগস্টের  পর যারা এ‌সে‌ছেন তা‌দের দা‌মি দা‌মি সিগা‌রেট–‌বেনসন হে‌জেস, ট্রিপল ফাইভ ইত্যা‌দি। প্রচুর খাবারও অাস‌তো বাই‌রের থে‌কে। জেল গে‌টে গা‌ড়ির লাইন। অার নামাজ ও কোরান পড়া শেখা শুরু হ‌লো। জে‌লের যে জমাদার অামা‌দের বাজার ক‌রে দি‌তেন, জেল অ‌ফি‌সে অামা‌দের জমাকৃত টাকার বিপরী‌তে, তি‌নি ‌চা‌হিদা দে‌খে নামাজ শেখা, দী‌নিয়াত বই ও তস‌বি কি‌নে মজুত ক‌রে রাখ‌তেন। তৌ‌ফিক ভাই কোরান পড়া শেখা শুরু কর‌লেন। তার শিক্ষক ছি‌লেন খা‌লেক মজুমদার। শহীদুল্লাহ কায়সার হত্যার দ‌ন্ডিত অাসামী।পরে জামাতই ইসলা‌মির অ‌ফিস সে‌ক্রেটা‌রি । তৌ‌ফিক ইমাম কোরান পড়া শিখ‌লেন দ্রুত।‌ শিক্ষককে পাঞ্জা‌বি উপহার দেন।
এর ‌তিন মাস পর জিয়ার শাসনকা‌লে, জে‌লে অাস‌লেন খন্দকার মোশতাক‌ । অামা‌দের ২৬ সে‌লেই তা‌কে রাখা হয়। অামার পা‌শের সেল‌টিই ছিল তার।
২৬ সে‌লেই বেশ ক‌য়েকজন আওয়ামীলীগ  লীগ নেতা ছি‌লেন। মোশতা‌কের শাসন অাম‌লে সময়ই গ্রেফতার হ‌য়ে। মোশতা‌কের সা‌থে ওঠাবসা ক্যারাম খেলা শুরু ক‌রতে দে‌রি ক‌রেন‌নি তারা। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর মাত্র চার মাসও পার হ‌য়নি তখন। তৌফিক ইমাম ছি‌লেন এর‌ ব্যা‌তিক্রম।
‌জেনা‌রেল জিয়ার সা‌থে তৌ‌ফিক ইমা‌মের সুসস্পর্ক ছিল। ৭১ সা‌লে পার্বত্য চট্টগ্রা‌মের ডি‌সি ছিলেন তৌ‌ফিক ইমাম। একসা‌থে তারা ভার‌তে গি‌য়ে‌ছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জিয়া‌কে সাহায্য ক‌রে‌ছেন নানান ভা‌বে।
১৯৭৬ সালে ক‌র্ণেল তা‌হে‌রের বিচার শুরু হওয়ার আগেই  তৌ‌ফিক ইমাম চ‌লে গে‌লেন বাই‌রের হাসপাতা‌লে। অামা‌কে গোপ‌নে ব‌লে গে‌লেন জে‌লে প্রিজনার‌দের প‌রিজন‌দের সা‌থে দেখা সাক্ষাত বন্ধ থাক‌বে দুই মাস, তাই তি‌নি হাসপাতা‌লে চ‌লে যা‌চ্ছেন। বুঝ‌তে পারলাম ক‌র্ণেল তা‌হের ও জাসদ নেতা‌দের বিচার জেল গেট অ‌ফি‌সেই হ‌বে। অামাদের কু‌মিল্লা জে‌লে ট্রান্সফার করা হয় । তিন মাস পর ফি‌রে অা‌সি ঢাকায়। তৌ‌ফিক ইমামও হাসপাতাল থে‌কে ফি‌রে‌ছেন। তার বিরু‌দ্ধে দু‌র্নিতীর মামলার ট্রায়াল শুরু হ‌লো। মামলা‌টিতে ডকু‌মেন্টা‌রি এ‌ভি‌ডেন্স ছিল শক্ত। তি‌নিও জা‌নেন নির্ঘাত শা‌স্তি। চেষ্টা ক‌রেও ট্রায়াল থামা‌তে পা‌রে‌ননি। অামার ঘ‌নিষ্ঠ‌ এক অাইনজীবী তখন সাম‌রিক অাদাল‌তের বি‌শেষ প্র‌সিকিউটর। অামার অাইনজীবীও। তাঁর স্বজনরা তার কা‌ছেও ছু‌টে‌ গে‌লেন মামলার পরামর্শ নি‌তে য‌দিও তি‌নি তার মামলার সা‌থে সম্প‌র্কিত নন।। মামলার ট্রায়া‌লের শেষ প‌র্বে অভূতপূর্ব ঘটনা ঘট‌লো। তার মামলার প্র‌সি‌কিউটর সমা‌প্তি বক্তব্যে যেখা‌নে যথাযথভা‌বে মামলা প্রমান কর‌তে পে‌রে‌ছেন দা‌বি ক‌রে অ‌ভিযু‌ক্তের শা‌স্তি দা‌বি কর‌বেন সেখা‌নে নি‌জেই বল‌লেন তি‌নি অ‌ভিযুক্ত‌কে দোষী প্রমান কর‌তে ব্যর্থ হ‌য়ে‌ছেন। কোর্ট হতভম্ব। প্র‌সি‌কিউটরের চাকু‌রি গেলেও অ‌ভিযুক্ত রেহাই পে‌লেন। অাজ অব‌ধি এই ঘটনা বাংলা‌দে‌শে অ‌দ্বিতীয়।
‌তৌ‌ফিক ইমাম অসম্ভব‌কে সম্ভব কর‌তে পার‌তেন।
৭৫ আগস্ট  পর্যন্ত সরকা‌রে সফলতা ও ব্যর্থতা, কি কি কার‌ণে দে‌শের প‌রিবর্তন হলো ব‌লে তি‌নি ম‌নে ক‌রেন কথাপ্রস‌ঙ্গে ব‌লে‌ছেন মা‌ঝেম‌ধ্যে । কিছু বি‌শেষ বি‌শেষ ঘটনার কথাও ব‌লে‌ছেন।
‌জেল জীব‌নের অাড়াই বছর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগা‌রে একসা‌থে ফ্লোরে  ব‌সে দুপু‌রে খে‌য়ে‌ছি। বি‌কে‌লে ব্যাড‌মিন্টন বা তাস খেলে‌ছি।অ‌ঢেল সম‌য় কত গল্প কত কথা হ‌য়ে‌ছে। ‌তৌ‌ফিক ভাই‌কে ম‌নে প‌ড়ে।
মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ, লেখক এবং প্রকাশক ।