Wednesday April14,2021

একাত্তরের ৭ মার্চ : বিশ্ব ইতিহাসের এক অবিনাশী ভাষণের দিন : রায়হান ফিরদাউস

 

 

 

বছর ঘুরে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের মার্চ মাস এলেই ইতিহাসের পাতা ফুঁড়ে বাংলা নামে এই দেশের জন্ম ইতিহাস যেন কথা বলে ওঠে।পাকিস্তান নামক এক ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের স্বৈরশাসক ১৯৭১ সালের ১ লা মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করার সাথে সাথে গোটা পূর্ব বাঙলা প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠে,গণবিষ্ফোরনের এমন ক্রোধপূর্ন প্রকাশ ইতোমধ্যে কখনো দেখেনি কেঊ।তারই ধারাবাহিকতায় ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় বিশাল ছাত্র জনসভায় প্রথম বারের মতো স্বপ্নের স্বাধীন বাঙলার পতাকা প্রদর্শিত হয়।পরদিন ৩ মার্চ ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত লাখো জনতার উপস্তিতিতে ঘোষণা করা হয় স্বাধীনতার ইশতেহার। এই সভা চলাকালীন সময়ে মঞ্চে এসে উপস্থিত হন
বাঙলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।তিনি জনগণকে অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং ঘোষনা করেন যে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তিনি পূর্নাঙ্গ দিক নির্দেশনা দেবেন।

তার পরের তিন দিন সারা বাংলাদেশ ছিলো প্রতিবাদ,প্রতিরোধ, মিছিল আর জনে জনে জনতার জমায়েতের দেশ।গোটা জাতি স্বাধীকারের সীমারেখা ডিঙ্গিয়ে স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে। সব ছাপিয়ে”বীর বাঙালি অস্ত্র ধর,বাংলাদেশ স্বাধীন কর “এই শ্লোগানই   মূল শ্লোগানে পরিনত হয়। তারপর এলো প্রতিক্ষার ৭ই মার্চ। বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করার মতো যেন ধৈর্য নেই মানুষের! সকাল থেকেই ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে সমবেত হতে থাকে বিভিন্ন স্তরের মানুষ— নারী পুরুষ শিশু।লক্ষ লক্ষ ছাত্র শ্রমিক কৃষক সহ আপামর মুক্তিকামী জনতার উপস্তিতিতে পুরো ময়দান উপচে পড়ছে,তিল ধারনের স্থান নেই।রেসকোর্স ময়দানকে মাঝখানে রেখে পুরো ঢাকা শহরের আবালবৃদ্ধবনিতা জড়ো হয় রমনার এই সবুজ ভূমিতে।তারপর কবির ভাষায়” শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে কবি এসে দাড়ালেন এবং শোনালেন তার অমর কবিতাখানি।”

বাঙালির জনগনমন অধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সেদিন মাত্র উনিশ মিনিটের ভাষনে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে বাঙলার মানুষের অমানুষিক দুঃখ কষ্ট, ত্যাগ তিতিক্ষা এবং বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরেন।অত্যন্ত দক্ষ এবং কৌশলের সংগে সামরিক স্বৈরাচারের কাছে কয়েকটি দাবী পেশ করে অনতিবিলম্বে তিনি জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহবান জানান।এবং “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।”এই যাদুকরী লাইন দুটি উচ্চারণ করে ” জয় বাংলা”রণধ্বনি দিয়ে তাঁর বক্তব্যের সমাপ্তি টানেন।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিঃশব্দে নীরবে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁর যাদুকরী জলদগম্ভীর কন্ঠ নিসৃত প্রতিটি শব্দ,বাক্য শ্রবন করছিলো তাদের হ্নদয়-আত্মা দিয়ে।এ-তো ভাষন নয়,যেন এক মহাকবির সদ্য রচিত মহা গীতিকবিতা।

আর কবিতাটি সমাপ্ত হওয়ার সাথে সাথে পুরো রমনার এই হ্নদয় মাঠখানি ফেটে পড়েছিলো একটি শ্লোগান আর একটি রণধ্বনিতে।শ্লোগানটি ছিলো,বীর বাঙালি অস্ত্র ধর,বাংলাদেশ স্বাধীন কর।এবং জয় বাঙলা ছিলো রণধ্বনি।

মাত্র উনিশ মিনিটের এই মহান ভাষনে তিনি বলেছিলেন অসহযোগ আনদোলনের কথা,গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ার কথা এবং তিনি না থাকলেও যার যা কিছু আছে,তাই নিয়ে শত্রæর মোকাবিলা করার কথা।এতো বাস্তবধর্মী এত দূরদর্শী ভাষন প্র্থিবীর ইতিহাসে বিরল।আসন্ন মুক্তিযুদ্ধের রণনীতি, রণকৌশল তিনি তাঁর প্রিয় জনগনের কাছে তুলে ধরেন অসম্ভব বিচক্ষণতার সাথে।

এই ভাষনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করে ইউনেস্কো এই ভাষনকে বিশ্বের প্রামান্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয় ২০১৭ সালে।
বস্তুত এই মহান ভাষন যারা ময়দানে উপস্থিত থেকে শুনতে পেয়েছেন তারা অত্যন্ত ভাগ্যবান।অথচ পঁচাত্তরের ১৫ আগষ্টে জাতির জনককে হত্যা করার পর দীর্ঘ একুশ বছর সামরিক স্বৈরাচারী গোষ্ঠী বাঙলার মানুষের স্মৃতি থেকে এই ভাষন কে মুছে দিতে উদ্যত হয়েছিলো।এ ভাষনে উজ্জীবিত হয়ে যে জাতি মহান মুক্তিযুদ্ধ করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে,সেই ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানতে দেয়া হয়নি; ইতিহাস বিকৃতির এক মহোৎসব হয়েছিলো মুজিবের এই বাঙলায়।কিন্তু সত্য তার আপন শক্তিতে পুনরায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।

ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জ্যাকব যে ফিল্ডের” উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেসঃ দ্য স্পিচেস দ্যাট ইন্সপায়ার্ড হিস্ট্রি ” বইতেও ৭ মার্চের এই অবিস্মরণীয় ভাষনটিকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।এই ভাষন এখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে,সার্বজনীন স্বীকৃতি। সত্য চিরকাল চির ভাস্বর।কেউ ইতিহাসের পাতা থেকে সত্যকে মুছে ফেলতে পারে না।ইউনেস্কো কর্তৃক এই ভাষনের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি সেটাই আবার জানান দিয়ে গেলো আমাদের।

আজ মহান ৭ মার্চের এই ফাগুনের আগুন ঝরা দিনে আসুন আমরা শ্রদ্ধাভরে অবনত মস্তকে স্মরণ করি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠতম বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে যিনি আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন বাঙলা নামে একটি দেশ।তার সূচনা পর্বে দিয়ে গেছেন এক মহান গীতিকবিতা-৭ মার্চের অবিনাশী ভাষণ।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, দৈনিক বাঙলার জাগরণ ।