Sunday April18,2021

বিজয় ঐতিহাসিক ২রা র্মাচ, ১৯৭১

 —-সন্ধ্যা ৬-০০টায় আমি প্রথম      

    বাড়ীতে বাংলাদেশের পতাকা উড়াই  -মোহাম্মদ আহ্সানুল করিম

 

১লা র্মাচ, ১৯৭১। হঠাৎ সাবেক পাকিস্তানের সামরিক সরকার “জাতীয় সংসদ অধিবেসন” স্থগিদ ঘোষণা করে। তখন আমি পাবনা জেলা স্কুলের ১০ম শ্রেণীর ছাত্র ও ক্লাস-ক্যাপ্টেন। সে হিসেবে স্কুল-ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালনও করি।

 

শহরের মধ্যে চারিদিকে খন্ড খন্ড মিছিল হচ্ছে। স্কুলের ৯ম ও ১০ম শ্রেণীর ছাত্ররা মিছিলে যেতে চায়। হেডমাষ্টার লোহানী স্যারের সাথে দেখা করে এসে ছাত্রদের বললাম, মিছিলে যেতে আমারও মন চাইছে। কিন্তু আমরা জেলা স্কুলের ছাত্র, সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হঠাৎ মিছিলে যাওয়া ঠিক হবে না।

 

পাবনা জেলা স্কুলের ছাত্র তথা জেলার মেধাবী ছাত্র হিসেবে এক/দুই দিন পরিস্থিতি দেখতে হবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে যে কেউ মিছিলে যেতে পারে। আমার ক্লাসমেট শহীদ গামা, শহীদ লতিফ, শহীদ হাসেম, রেজা, বাবু, খোকন, প্রমুখরা (পরে সবাই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়) মিছিলে রওয়া হলো।

 

এবারই প্রথম দেখলাম, মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদুনি গ্যাস নেই। তখন পাবনার ডিসি ছিলেন নূরুল কাদের খান। উনি স্বাধীন-বাংলা সরকারের অর্থসচিব ছিলেন। দুপুরে স্কুল ছুটি হয়ে গেল। পাবনা টাউনহল মাঠে বিকালে জনসভা-পথসভাও থাকে।

 

১লা র্মাচ, ১৯৭১-এ আওয়ামী লীগ, ন্যাপ (ভাসানী), ন্যাপ (ওয়ালী), সিপিপি, ইত্যাদি দলের যুব-ছাত্রদের পথসভা হলো। শহর ঘুরে সন্ধায় বাড়ী ফিরলাম। রাতে ঢাকা-কোলকাতা-বিবিসি-ভোওয়া খবরে বুঝলাম ঢাকায় চরম অবস্থা। বড় ভাইয়েরা ঢাকা ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে। আব্বা-আম্মার তাই বাড়তি দুঃশ্চিন্তা।

 

-২-

১৯৬৪-এ পাবনা জেলা স্কুলের সবে ৩য় শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছি। মাস পরেই ২১ ফেব্রুয়ারী আমার প্রথম মিছিলে যাওয়া এবং পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদুনি গ্যাসের অভিজ্ঞতা। এরপর ১৯৬৬-এ (ভুট্টা আন্দোলন) গুলির মিছিলের অভিজ্ঞতা। আমার কয়েক গজ সামনে=পাশে থাকা আহমেদ রফিকের থোরায় গুলি লাগে।

১৯৬৯-এ “আগরতলা মামলা” থেকে মুজিবমুক্তির মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদুনি গ্যাস ছাড়াও পুলিশের ধাক্কায় কাঁটা তারে পড়ে যাই। তাতে কয়েক যায়গায় কেটে যাওয়ার দাগ এখনও আমার শরীরে বিদ্যমান। এরপর ছাত্রলীগে যোগদান। আমার বাবা মোঃ ইসরাইল হোসেনও ৮ম শ্রেণীতে পড়াকালে মসলিম ছাত্রলীগে যোগ দেন। তাই গভীর ভাবে না হলেও আমরা চারভাইও ছাত্রলীগে সম্পৃক্ত।

 

২রা র্মাচ, ১৯৭১-এ যথারীতি স্কুলে গেলাম। পরিস্থিতি আরও অস্থির। প্রথমে মোহাম্মদ ইকবাল ভাই (সাবেক পাবনা জেলার মুক্তিযোদ্ধা প্রধান এবং জাসদনেতা ও এমপি) এবং ঘন্টাখানিক পরে রফিকুল ইসলাম বকুল ভাই (সাবেক পাবনা মহকুমার মুক্তিযোদ্ধা প্রধান, পরে আওয়ামী-বিএনপি নেতা ও এমপি) এলেন। উভয়ই আমার বড়ভাইদের(রেজাউল করিম, ডঃ রেজওয়ানুল করিম ও ডঃ আনোয়ারুল করিম) ক্লাসমেট।

 

 

বলমাম, আপনারাও জেলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে মিছিল করে যাওয়া যাবে না। যারা যাবে ব্যক্তিগতভাবে যাবে। সে চেষ্টা করবো। আমিও যাব। দুপুরে স্কুল ছুটি হয়ে গেল। বিকাল সাড়ে ৩-০০টায় স্কুলের অনেক ছাত্র পাবনা টাউনহল মাঠে পৌঁছালাম। সেখানে জানলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রনেতারা দুপুর ১২-০০টায় স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলেছে।

 

বিকাল ৪-০০টায় রফিকুল ইসলাম বকুল ভাই টাউনহল মাঠে(বর্তমানে স্বাধীনতা চত্তর) স্বাধীন বাংলার পতাকা তুললেন। হঠাৎ আবেগে একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। সবার আগে আমি বাড়ীতে “স্বাধীন বাংলার পতাকা” উড়াবো। তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে হলুদ-লাল-সবুজে কাগজের পতাকা বানিয়ে সন্ধ্যা ৬-০০টায় বাড়ীর গেটে লাগিয়ে দিই। এর পরের ঘটনাবলী নিবন্ধে বলার বিষয় নয়।

 

 

-৩-

১৯৭২-এ ছাত্রলীগ বিভক্ত এবং ৬ দফা, গণম্যান্ডেট, ও স্বাধীনতার অঙ্গীকারের বিরোধী স্বৈরমুখী সরকার ও সমাজতন্ত্রমুখী সংবিধান প্রণীত হওয়ায় আমি মূল ছাত্রলীগে নিষ্ক্রীয় হই। সমাজতন্ত্রের রাজনীতি করায় জাসদ ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নে আমার যোগ দেয়ার প্রশ্নই আসে না। ১৯৭১ পর্যন্ত পাবনায় ন্যাপ (ভাষানী) ও নকশালবাদী ছাত্রদের সাথে ছাত্রলীগে রক্তারক্তির সম্পর্ক ছিল। ন্যাপ (ওয়ালী) সাথেও সুসম্পর্ক ছিল না।

 

১৯৭২-৭৫ কালে আওয়ামী লীগের দুঃশাসন ও জনগণের অধিকার হরণ আমাকে বিচলিত করে। জাসদ ও আওয়ামী বিরোধীতার কারণে আমার খেলারসঙ্গী, সহপাঠী ও সহযোদ্ধা কয়েকজনকে রক্ষীবাহিনীর হাতে প্রান হারায়। ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধুর বিনা-নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি হন ও একদলীয় স্বৈরমুখী রাজনীতি ও সরকার চালু করেন। অদূর ভবিষ্যে ৩০ হাজার নয়, দশগুণ তথা ৩ লক্ষ রাজনৈতিক হত্যার সম্ভবনা অমূল ছিল না।

 

রাষ্ট্রনীতি নিয়ে সবে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছি। সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ নীতির জন্য ধর্মীয় আবেগ বাড়ন্ত ছিল। জাসদ ও ন্যাপ বাইরে রেখে একদলীয় স্বৈরমুখী রাজনীতি চালু করায় সংঘর্ষিক রাজনীতি বাড়তে থাকে। স্বাধীনোত্তর ভারেতর স্বার্থাগ্রাসন এবং সমাজতন্ত্র হাজার বছরের মুসলিম গণতন্ত্রী জীবনদর্শনের বিরোধী হওয়ায় সেনাবাহিনীও বিরুদ্ধে যাবে।

 

স্বভবতঃই রক্তাক্তভাবে পটপরিবর্তনের আশংখায় আমি বেশ বিচলিত ছিলাম। ২১ জুন, ১৯৭৫-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে এসে পরিস্থিতি দেখে বুঝলাম, মুজিব-সরকার ১৯৭৫ পার হবে না। তবে দু’মাসের মধ্যেই ১৫ আগষ্ট হবে, তা ধারণাও করতে পরিনি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কয়েক বছর রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থা বুঝতে চেষ্টা করেছি। এজন্যে আমার একাডেমিক ফলাফলও অভিভাবকদের কাংখিত পর্যায়ে হয়নি।

 

জাতির চরম ক্রান্তিকালে স্বাধীনতার প্রভাবশীল “নাগরিক ঘোষক” হিসেবে জেঃ জিয়ার প্রতি ১৯৭৬ পর্যন্ত আমার বেশ শ্রদ্ধা ছিল। শাহ্ আজিজসহ রাজাকার-মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন করায় সে শ্রদ্ধা হ্রাস পায়। মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনদর্শায় তথা স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের মধ্যে রাজাকার-মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন করা কোনভাবেই সমীচীন নয়।

 

-৪-

কয়েক বছর বিশ্বের রাষ্ট্রব্যবস্থা বুঝবার চেষ্টা করায়, প্রজ্ঞা না হলেও ইতোমধ্যে রাষ্ট্রব্যবস্থা বিষয়ে কিছুটা জ্ঞান হয়েছে। ভাগ্য অনুকূল থাকায় প্রথম সুযোগেই এরশাদ সরকারের মাধ্যমে উপজেলা-জেলা পুনর্গঠন করাতে পেরেছি। ভিত্তি হওয়ায় সময়ের সাথে সাথে এখন এগিয়ে নিতে পারলেই সমৃদ্ধিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বাস্তব রূপ পাবে। তবে ২৫ থেকে ৩৫ বছর লাগবে।

 

সরকারের উদ্যোগ ছাড়া রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনর্গঠণ/সংস্কার হয় না। গণতন্ত্রে দু’মেয়াদে বেশী টানা ক্ষমতায় থাকাও কাম্য নয়। গণতন্ত্রে কোনদল ৩০/৩৫ বছর টানা ক্ষমতায় থাকে না। কথা বাঁধে জন্যে ভাল বক্তা নই। রাজনৈতিক দলে যুক্ত হলেও প্রধান দলনেতা হওয়া কঠিন ব্যাপার। দলনেতাসহ সরকর-প্রধান হওয়া আরও কঠিনতর ব্যাপার। বরং একলা চলাই ভাল হবে।

 

আমি নির্দলীয়-নিরেপেক্ষ থাকলে, বিপদে পড়লে সরকার আমার রূপরেখা বিবেচনায় নিবে। সেজন্যে উপজেলা-জেলা পুনর্গঠণ শেষ হলে, আমার রূপায়িত সম্মৃদ্ধিশীল গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রূপরেখাসহ উপজেলা-জেলা পুনর্গঠণের পরের কর্মসুচী আঃলীগ, বিএনপি, জাসদসহ প্রভাবশীল দলগুলো নেতাদের কাছে তুলে ধরি। প্রথমে ৪ অক্টোবর, ১৯৮৪-তে সালে আঃলীগ নেতা শেখ হাসিনার কাছে তুলে ধরি। ১০/১১ বার বৈঠক হয়েছে।

 

যখন সরকার বিপদে পড়েছে, আমার তাগিদে সরকার সে পুনর্গঠণ/সংস্কার করেছে। এভাবেই একটু করে

“উচ্চতর সম্মৃদ্ধিশীল বাংলাদেশ গড়ে উঠছে। বাকী কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগ, সুষমমুখী জাতীয় বেতন স্কেল, দুইকক্ষ সংসদ, এবং সরকার প্রধানপদে কারও দুইবারের বেশী না হওয়ার ব্যবস্থা চালু হলে ১ম-পর্ব গড়া শেষ হবে। ২য়-পর্বে ১০টি প্রদেশভিত্তিক হলে বাংলাদেশ “কয়েক শতাব্দী” উচ্চতর সম্মৃদ্ধিশীল থাকবে।

 

 

-৫-
৩৮ বছর পরেও আমার রাষ্ট্রচিন্তা বাইরে বাংলাদেশ যায়নি। রাষ্ট্রনীতির সংস্কারক হিসেবে আমর একলা চলার ধারা একেবারেই ব্যতিক্রম। অনেকের কাছেই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। বলেছি, দল-মত-স্বার্থের উর্দ্ধে একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি নিরাবছ্ন্ন লেগে না থাকলে কোন রাষ্ট্রগঠন সম্ভব নয়। আমি যা অর্জন করতে পেরেছি, তা অভাবনীয়।

 

আমার প্রচেষ্টায় ৮টি আঞ্চঃ ক্যান্টঃভিত্তিক প্রতিরক্ষা-কাঠামো স্বনিয়ন্ত্রিত ও গণতন্ত্রমুখী হওয়ার (১৯৯০) পরে শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হতে পারেন। আমার উদ্যোগে সুপ্রীমকোর্ট পূনর্গঠিত হওয়ায় বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারও করতে পারেন। ৯ম সংসদ নির্বাচনে গণম্যান্ডেটকৃত ১নং অঙ্গীকার (তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সংস্কার, গণতন্ত্র ও কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠা) প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ১১ বছরেও রক্ষা করেননি।

বাবার মতো মেয়েও রাজনীতিকে মিথ্যাচারী, স্বে্চ্ছাচারী, প্রতারণা ও ঠকবাজী মনে করেন। অঙ্গীকাররক্ষা, আত্মকৈফৎ, নৈতিকতার কোন বালাই নেই। বাবার মতো ৩য় গ্রেডে প্রজ্ঞাধারী হওয়ায় পরিনতি ভাবতেও পারেন না। স্বামী পদার্থ বিজ্ঞানী হলেও ন্যুনত ধারণা নেই যে, অজৈব থেকে জৈব পদার্থের প্রতিক্রিয়া বেশী। আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অঙ্গীকাররক্ষা বোধ থাকলে ৯ম সংসদ মেয়াদেই দেশ গড়ার ১ম-পর্ব শেষ হতো।

 

এখন ভেবে দেখছি, এর মূলে ২রা র্মাচ সন্ধ্যা ৬-০০টায় বাসায় আমার পতাকা তোলাও অন্যতম প্রধান কারণ, ২রা র্মাচে ছাত্রদের স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা। তখনও স্বাধীনতার ঘোষণা ও পতাকা উত্তোলনের কারণ ও ভিত্তি না হলেও কিশোর বয়সে আমার উপর ভীষণ প্রভাব রাখে। জাতিরও স্বাধীনতার চেতনা বাড়াতে প্রভাব রাখে। বিজয় ঐতিহাসিক ২রা মার্চ, ১৯৭১।

 

মোহাম্মদ আহ্সানুল করিমঃ  রাষ্ট্র-বিশেষজ্ঞ, মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক বিসিএস কর্মকর্তা। ১৯৮২ থেকে “সম্মৃদ্ধিশীল গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ” গঠনে ভিত্তিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর গণতন্ত্রমুখী পুনর্গঠনের উদ্যোগী এবং প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরেখা (১৯৮৫), প্রগতিশীল গণতন্ত্র (১৯৯১), ও সংবিধান সংশোধনের দিকগুলো (২০১০) নিবন্ধ/বইযের লেখক। পূর্বে প্রকাশিত নিবন্ধের সময়োচিত সংশোধন করা হয়েছে।