Monday April12,2021

নশ্বর এই পৃথিবীর বুকে মানবতা, বাকস্বাধীনতা ও অধিকারের জন্য যুদ্ধ করে জয়ী হওয়া, অবিনশ্বর রূপে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রের নাম বাংলাদেশ। অথচ অবিনশ্বর এই রাষ্ট তার জনগণকে সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখতে যেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে, দৈত্যরূপে নতুন করে আবির্ভূত হয়েছে। যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন রাষ্ট্রটি আজ তার আপন জনগণকে ইহ জগত থেকে চির বিদায় দিতেও কার্পণ্য করে না। ক্ষমতার দম্ভ আর অহমিকা আজ ভয়াল রূপে হাজির আথচ এই রাষ্ট্রটির জন্য এই মাটির সাধারণ জনতারাই রক্ত দিতে একটুও দ্বিধান্বিত ছিলো না, শুধুমাত্র ন্যায় আর নৈতিকতার কল্যাণে। আজ রাষ্ট্রটি দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর পাড় করে এসেছে অথচ রাষ্ট্রটি আজও ন্যায় আর কল্যাণকর হতে সক্ষম হলো না । আজ রাষ্ট্রটি আর্শীবাদ না হয়ে জনতার জন্য অভিশাপ রূপে সামিল।

 

এই রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনরা নিজেদের আপন স্বার্থে, ক্ষমতার অভিনব চর্চার অভিলাষে, এই রাষ্ট্রের জনমানুষের সাথে নিষ্ঠুর আর রুষ্ট আচরণ করতে একটুও পিছ পা হয় না । রক্ত দিয়ে গড়া এই রাষ্ট্রটি আজ ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার অতি লোভের কুষ্ঠরোগের ছোঁয়ায় দিনকে দিন নিঃশেষিত হচ্ছে ভাগারে। সাধারণভাবে বেঁচে থাকার যৎসামান্য অধিকারটুকু জনতার হাতে নেই। জনতাও আজ অবাক চোখে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে। প্রতিকার ? সে যেন এক গোলকধাঁধার চক্র। অবশেষে রক্তেই সেই সমাধানের  আভাস দেয়।

 

এই রাষ্ট্র আজ তার আপন স্বার্থে,  আপন জনতাকে ইহ জগত থেকে চিরতরে বিদায় দেবার অধিকার রাখে। রাষ্ট্র তার বন্দবস্ত, নিজের ক্ষমতা বলে তৈরি করেই রেখেছে। তৈরি করে রেখেছে এমন এক ডিজিট্যালের মহাবলয়, যে বলয় রাষ্ট্রের জনতাকে অক্টোপাসের মতন আঁকড়ে ধরে অনায়াসেই। দু’কলম লিখেছো বা দু’ টি ছবি রাষ্ট্রকে কিছু বুঝাতে এঁকেছো, তুমি জনতা সে অধিকার রাখো না। সুতরাং হরণ হবে চিরতরে তোমার অধিকার।  যেন মোচড়ে আবার না কখনো জাগ্রত হও, রাষ্ট্র তাই তার ডিজিট্যালের খঞ্চি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তোমাকে বিদায় জানাবে। অবাক চোখে দেখা ছাড়া কিছুই করার থাকবে না। ৫৭ ধারা এমনই এক সুচারু তীর, যার নিশান অতিব ভয়ঙ্কর, এ তীর যেন রুখবার নয় । এ রাষ্ট্র আজ ডিজিট্যালের সাথে ডিজিট্যাল অট্টহাসিতে বিরাজমান । রাষ্ট্র আজ ডিজিট্যাল ক্ষমতার মহা প্রলয়ের সাথে রাষ্ট্রের জনতাকে চির অম্লান করে দেবার ক্ষমতার অধিকারী।

 

রাষ্ট্র তার ডিজিট্যাল বলয়ে আজ লেখক মুশতাককে  নীরবে  ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। যে ঘুম ভাঙার নয় । আজ লেখক মুশতাক, কাল কে ? কেউ উত্তরটি দেবার দক্ষতা রাখে না। এটা যে রাষ্ট্রের আপন মর্জিতেই চলবে।  ভাবছেন, দু’ তিনজন মুক্ত হয়েছিলো আইনের জাল ছিঁড়ে । অবাক হবার নয়, রাষ্ট্র চাইলে তাদেরকে আবার ডেকে এনে চির বিদায় দিতে পারে । কেননা সে বন্দবস্ত রাষ্ট্রকে তৈরি করতে আমরাই সহায়তা করেছি, নিরব থেকে। সুতরাং নিরবতার ফলাফল মুশতাক থেকে আরো বহুদূর । কেননা এ রাষ্ট্র আজ ভয়ের রাষ্ট্রে পরিণতি লাভ করেছে। সুতরাং পথ সামনে একটিই খোলা। হয় ভয়ে কুঁকড়ে থাকো নতুবা ভয়কে জয় কর। মাঝামাঝি কোনো পথ  রাষ্ট্র খোলা রাখেনি ।

 

শত-হাজার জনে চিৎকার চেঁচামেচি করলেও রাষ্ট্রের  ক্ষমতাসীনদের কিছুই হবার নয় । আর হবেই বা কেনো ? রাষ্ট্র যে অধিকার নামের অস্ত্রটিকে অনেক আগেই অকেজো আর ভোঁতা করে রেখেছে। শুধুই কি অকেজো ? সাথে আছে শত হাজার বিদ্যান- জ্ঞানী- গুণীজনের সমস্বরে স্তুতি  আর নীরব  সমর্থন।  এই রাষ্ট্রের কোনো অস্বস্তি বা উদ্বেগ নেই, নেই কোনো পরিক্রমা, নেই কোনো দায়িত্ব বা উত্তর দেবার প্রয়োজন।  ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে এই রাষ্ট্রের যেমন প্রয়োজন হয় না জনমানুষের মত, ঠিক তেমনি রাষ্ট্রের জনগণকে এই রাষ্ট্র মূল্যায়ন করতেও কোনো আরজ বা তোয়াক্কা করার প্রয়োজন বোধ করে না ।

 

কি বলে এখন চিৎকার করবে ? মুশতাককে হত্যা করা হয়েছে ? মুশতাকের দায়িত্ব রাষ্ট্রের কাঁধে ছিলো ? মুশতাককে তিলে তিলে মেরেছে ? মুশতাককে প্রাণ দিতে হলো রাষ্ট্রের অবহেলায় ? এসব প্রশ্নের কোনো মূল্য নেই। আসল সত্য হলো রাষ্ট্র নিজেই মুশতাককে সরাসরি হত্যা করেছে। শত প্রশ্ন করা যাবে । তাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় নিয়োজিতদের কিছুই আসে যায় না । কেননা এই রাষ্ট্রের ক্ষমতায়নের শক্তিধরেরা ভালো করেই জানে, দু’ দিন দু’ কলম হয়তো কেউ লিখবে অথবা দু’ চার জায়গায় সেমিনার হবে, নতুবা হাতে গোনা দু’ চারজনে দু’ চার কথা বলবে, এই তো, বেশ এবং শেষ ।

 

কেউ হয়তো ভেবে থাকবেন তাতে করে রাষ্ট্রের অধিক ক্ষমতাসীনদের পিলে চমকিয়ে যাবে, কিংবা ভয়ে আঁতকে উঠবে অথবা তাদের ক্ষমতার চেয়ার কেঁপে উঠবে, তাহলে বলতেই হয় এমন ভাবনাকারীদের আরো অনেক ভাববার রয়েছে । বুঝতে হবে রাষ্ট্রের ক্ষমতা যখন আঠারো কোটি জনগণকে বৃদ্ধা অঙুলি প্রদর্শন করতে পারে, তাহলে এমন দু’ চারজন মুশতাকদের তিলে তিলে হত্যা করেও এই রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনরা অনায়াসেই হজম করারও ক্ষমতা রাখে ।

 

অপেক্ষা করুন, সামনেই দেখা যাবে এমন হত্যাকে যায়েজ করবার লোকের অভাব হবে না । শত প্যাঁচ আর কথার ফুলঝুরি দিয়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনদের পক্ষেই দাঁড়িয়ে যাবে এই রাষ্ট্রের শত- হাজার বিদ্যানরা। জ্ঞানের সিন্দুক খুলে রাষ্ট্রের জনগণকে বিলিয়ে যাবে জ্ঞান আর জ্ঞান । তাদের জ্ঞান গরিমার কাছে হার মানবে সকল যুক্তি, সকল পথ। কেননা তারাই বলবে, কেবল তাদের বলার প্লাটফর্ম এই রাষ্ট্র নিজেই তৈরি করে দিয়েছে।  তারা বিহিন ভিন্ন কেউ আওয়াজ তোলার অধিকার রাখে না,  এই রাষ্ট্র  তা অনুমোদন করেনি।

 

এখন কেউ দৃঢ়চেতা হয়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনদের খুনি বলবে ? দু’ দিন পরে যে তাকেই মুশতাকের পরিণতি ভোগ করতে হবে । সেটা কিন্তু রাষ্ট্র অন্যায়ভাবে করবে না, করবে আইনের দ্বারাই । ৫৭ কেবলি ৫৭ নয় । এটা এমন এক অস্ত্র যা অধিকারকে দাবিয়ে রাখতে সক্ষম একটি অস্ত্র । বাকস্বাধীনতাকে হরণ করার অস্ত্র, মানবাধিকারকে খর্ব করার অস্ত্র। চিন্তা শক্তিতে ভষ্ম করার অস্ত্র, এমনকি তিলে তিলে হত্যা করার অস্ত্র । রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনদের বিপরীতে বলবে, সে সুযোগ নেই । রাষ্ট্র মুশতাককে উদহারণ হিসেবে দিয়েছে তোমাদের সামনে, ভেবে দেখবার জন্য, কোন পথে হাঁটবে ?

 

হ্যাঁ আজ মুশতাক, কাল হয়তোবা কিশোর অথবা ভিন্ন কেউ । চির বিদায় অনেককেই করা যাবে। তবে এমন ক্ষমতাসীনদেরও সময়ে একদিন বিদায় হতে হয়। সে বিদায় কিন্তু বড়ই নির্মম হয়, বড়ই নির্মম।

 

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক,  শুদ্ধস্বর ডটকম ।