Sunday April11,2021

আবারও ফিরে এসেছে শোকাবহ সেই ২৫ ফেব্রুয়ারি, দেশের ইতিহাসের কলঙ্কময় এক অধ্যায়। বিডিআর বিদ্রোহ ও পিলখানা হত্যাযজ্ঞের এক যুগ অর্থাৎ ১২ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ২০০৯ সালের এই দিনে বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) কথিত কিছু বিপথগামী সদস্য দাবি-দাওয়ার নামে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নির্মম হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে পিলখানায় নারকীয় তাণ্ডব চালিয়ে মহাপরিচালকসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। এ ঘটনায় নিহত হয় নারী ও শিশুসহ আরও ১৭ জন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ, তার স্ত্রী, বাসার কাজের মেয়ে ও বেড়াতে আসা আত্মীয়রাও। আজও সেইদিনের ঘটনা স্মরণ করে শিউরে উঠে গোটা জাতি। 

নারকীয় এ হত্যার ঘটনায় ২০০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর লালবাগ থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা হয়। পরে এসব মামলা নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তরিত হয়। হত্যা মামলায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২৩ বেসামরিক ব্যক্তিসহ প্রথমে ৮২৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে সম্পূরক অভিযোগপত্রে আরও ২৬ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করায় আসামির সংখ্যা বেড়ে হয় ৮৫০ জন। বিস্ফোরক আইনে করা অপর মামলায় ৮০ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় সিআইডি। পরে আরও ২৬ জনকে অভিযুক্ত করে মোট ৮৩৪ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয়া হয়।

রাজধানীর পুরান ঢাকার আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ইতিহাসের কলঙ্কজনক এ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন, ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে (তিন বছর থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত) কারাদণ্ড, ২৭৮ জনকে খালাস এবং চার আসামি বিচার চলাকালে মারা যাওয়ায় তারা অব্যাহতি পান।

আদালতের রায় ঘোষণার পর ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে যায়। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে আসামিরা দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল ও জেল আপিল করেন। এর মধ্যে ৬৯ জনকে খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। গুরুত্বপূর্ণ এ মামলার শুনানির জন্য সুপ্রিম কোর্ট বিশেষ উদ্যোগ নেন।

২৯ হাজার ৫৯ পৃষ্ঠার দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ও দীর্ঘতম এ হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি প্রকাশ করেন হাইকোর্ট। রায়ে ১৩৯ জনকে ফাঁসি, ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন ও ২০০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন আদালত।

রায়ের দৈর্ঘ্য ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যার দিক থেকে এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হত্যা মামলার রায়।

২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টের বিচারপতি মো. শওকত হোসেন, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারের সমন্বয়ে গঠিত বৃহত্তর বেঞ্চ উভয়পক্ষের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি করে রায় দেন।

সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণার পর হাইকোর্টের দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায় লেখার কাজ শুরু করেন বিচারপতিরা। পূর্ণাঙ্গ রায়ের ১ থেকে ১১ হাজার ৪০৭ পৃষ্ঠা পর্যন্ত লিখেছেন বিচারপতি শওকত হোসেন, ১১ হাজার ৪০৭ পৃষ্ঠা থেকে ২৭ হাজার ৯৫৯ পৃষ্ঠা পর্যন্ত লিখেছেন বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী এবং ২৭ হাজার ৯৫৯ পৃষ্ঠা থেকে ২৯ হাজার ৫৯ পৃষ্ঠা পর্যন্ত লিখেছেন বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার ।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিদ্রোহের নামে পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর (বিজিবি) সদর দফতরে নারকীয় এ হত্যাকাণ্ডে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ হারান। এ ঘটনায় শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছিল গোটা জাতি। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলায় ৮৫০ বিডিআর জওয়ানকে আসামি করা হয়। এদের মধ্যে বিচারকাজ চলাকালে বিভিন্ন সময় ৪ জনের মৃত্যু হয়।

কেমন ছিল সেই দিনটি:
২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯, সকাল ৯টা ২৭ মিনিটের দিকে বিজিবির বার্ষিক দরবার চলাকালে দরবার হলে ঢুকে পড়ে একদল বিদ্রোহী সৈনিক। এদের একজন তৎকালীন মহাপরিচালকের বুকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে। এরপরই ঘটে যায় ইতিহাসের সেই নৃশংস ঘটনা। বিদ্রোহী সৈনিকরা সেনা কর্মকর্তাদের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করে তাদের পরিবারকে জিম্মি করে ফেলে। পুরো পিলখানায় এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। চারটি প্রবেশ গেট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আশেপাশের এলাকায় গুলি ছুঁড়তে থাকে তারা।

বিদ্রোহীরা দরবার হল ও এর আশপাশ এলাকায় সেনা কর্মকর্তাদের গুলি করতে থাকে। তাদের গুলিতে একে একে লুটিয়ে পড়তে থাকেন সেনা কর্মকর্তারা। ঘটনার ৩৬ ঘণ্টা পর এ বিদ্রোহের অবসান হয়। পিলখানা পরিণত হয় এক রক্তাক্ত প্রান্তরে। পরে পিলখানা থেকে আবিষ্কৃত হয় গণকবর। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় সেনা কর্মকর্তাদের লাশ। ৩৬ ঘণ্টার এ হত্যাযজ্ঞে ৫৭ সেনা কর্মকর্তা, একজন সৈনিক, দুই সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী, ৯ বিজিবি সদস্য ও ৫ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হন।

পিলখানা বিদ্রোহের পর বিডিআরের নাম, লোগো, পতাকাও পরিবর্তন করা হয়।