Tuesday March2,2021

‘পৃথিবীর সব ভাষা বেঁচে থাকুক আপন মহিমায়’- এই প্রতিপাদ্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সংগঠন ‘মুক্ত আসর’ ও ভারতের ‘ছায়ানট (কলকাতা)র যৌথ আয়োজনে অনলাইনে অনুষ্ঠিত হলো চারদিন ব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা সম্মেলন। এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন ৯টি দেশের (বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, পেরু, নেপাল, রাশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া ও জার্মানি) ৩৭জন বিশিষ্ট শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষাবিদ, সংগীতশিল্পী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। নিজস্ব জাতিসত্তা রক্ষার্থে মাতৃভাষা চর্চা ও অনুশীলন অপরিহার্য। মাতৃভাষা চর্চার মাধ্যমে বিশ্বের প্রতিটি দেশ জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইতিহাস, ঐতিহ্যকে ধারণ এবং সমাজ ও রাষ্ট্র তথা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে বাস্তবে তার প্রয়োগ নেই উচ্চশিক্ষায় ।

 

 

বাংলাকে অগ্রাহ্য করার প্রবণতার ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার অনেকাংশে পিছিয়ে গেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভাষা-বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। যে বৈষম্য ক্রমেই সামাজিক-সাংস্কৃতিক বৈষম্য ও পার্থক্যের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। এই সংকট উত্তরণে বাংলাদেশের ‘মুক্ত আসর’ ও ভারতের ‘ছায়ানট (কলকাতা)’ যে উদ্যোগ নিয়েছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এ উদ্যোগ মাতৃভাষা চর্চার প্রচার-প্রসার ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক বৈষম্য দূরীকরণে অনেকটা সহায়ক হবে । সম্মেলনে ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক বলেন, ‘এতো আয়োজন তো একেবারে বিস্ময়কর।’ এ প্রসঙ্গে ভারতের নজরুল সংগীতশিল্পী ও ছায়ানটের (কলকাতা) সভাপতি সোমঋতা মল্লিক বলেন, ‘আমরা কলকাতায় প্রতিবছর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকি। এবার করোনাভাইরাসের কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংগঠন ‘মুক্ত আসর’ ও আমাদের সংগঠন ‘ছায়ানট (কলকাতা)’-এর যৌথ উদ্যোগে অনলাইনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা সম্মেলন আয়োজন করেছি।

 

 

এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য-নতুন প্রজন্মের কাছে মাতৃভাষার গুরুত্ব উপস্থাপন করা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাঙালিরা কিভাবে বাংলা ভাষাকে অন্তরে ধারণ করছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন সে বিষয়েও বিশদ আলোচনা হয় এই সম্মেলনে।’ অনুষ্ঠান সম্পর্কে মুক্ত আসরের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আবু সাঈদ বলেন, ‘এই প্রথম অনলাইনে চারদিন ব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। এই অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে মাতৃভাষায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদকপ্রাপ্ত জাতীয় অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম ও মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা সংযুক্ত ছিলেন; যাঁদের সুচিন্তিত মতামত আমাদের সমৃদ্ধ করেছে। আলোচকদের আলোচনা নিঃসন্দেহে বাংলা ভাষাসহ অন্যান্য ভাষার চর্চা বৃদ্ধি ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস।’ ১৯ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টায় অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের ভাষাসংগ্রামী, বিশিষ্ট রবীন্দ্রগবেষক আহমদ রফিক। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও গবেষক অধ্যাপক পবিত্র সরকার, মুক্ত আসরের প্রধান উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) মাসুদুর রহমান বীর প্রতীক, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, লেখক ও সাংবাদিক সৈয়দ হাসমত জালাল, বাংলাদেশ ইতিহাস অলিম্পিয়াড জাতীয় কমিটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অধ্যাপক ড.আবেদা সুলতানা, ডা. আহমেদ হেলাল, নুরুন আখতার প্রমুখ।

 

অনলাইনে চার দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা সম্মেলনে আলোচনা ও প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় অধ্যাপক ও বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ড. রফিকুল ইসলাম, ভাষাসংগ্রামী প্রতিভা মুৎসুদ্দি, ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের অধ্যাপক ড. স্বরোচিষ সরকার, গবেষক ও লেখক মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক, মঞ্চ ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব খ.ম. হারুন, বাংলাদেশ ইতিহাস অলিম্পিয়াড জাতীয় কমিটি সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অধ্যাপক ড. এমরান জাহান, ডা. আহমেদ হেলাল, যুক্তরাজ্য থেকে কবি শামীম আজাদ, গবেষক ও উন্নয়নকর্মী মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, গবেষক শুভ্র জ্যোতি চাকমা, গবেষক হাসিনুল ইসলাম, নজরুল সংগীতশিল্পী ও শব্দসৈনিক বুলবুল মহালনবীশ, নজরুল সংগীতশিল্পী শহীদ করির পলাশ, প্রশিক্ষক ড. কাজী সামিও শশী, অনুবাদক এ এইচ এস মোহাম্মদ, ভারতের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও শব্দসৈনিক পঙ্কজ সাহা, আসামের বিশিষ্ট গবেষক ড. রেজাউল করিম, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ই-লার্নিং বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. বদরুল হুদা খান, গবেষক ড. শুভ্রদত্ত, নজরুল সংগীতশিল্পী সালাউদ্দিন আহমেদ, অস্ট্রেলিয়া থেকে শিল্পী রহমান, পেরুর বিশিষ্ট চলচ্চিত্র ও লেখক ওয়াল্টার ভিয়ানোয়েভা, নেপালের শিক্ষক মুকেশ শ্রেষ্ঠা, রাশিয়ার শিক্ষাবিদ ভিক্টোরিয়া চারকিনা, ভারতের মিতালী সরকার, যুক্তরাজ্য থেকে প্রিয়জিৎ সরকার দেব, জার্মানি থেকে হাবিব বাবুল, শিক্ষক ও সংগীতশিল্পী শায়লা রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শান্তা তাওহিদা, মুক্তবন্ধু নাফিজা রহমান মৌ প্রমুখ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা সম্মেলনের সহযোগিতায় ছিল বাংলাদেশ ইতিহাস অলিম্পিয়াড জাতীয় কমিটি ও স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশন।

ড. এরশাদুল হক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক ।