Sunday March7,2021

হাসিনা আকতার নিগার :  “যারা গুলি ভরতি রাইফেল নিয়ে এসেছিল ওখানে

যারা এসেছিল নির্দয়ভাবে হত্যা করার আদেশ নিয়ে

আমরা তাদের কাছে

ভাষার জন্য আবেদন জানাতেও আসিনি আজ।

আমরা এসেছি খুনি জালিমের ফাঁসির দাবি নিয়ে।”

  • একুশে ফেব্রম্নয়ারি ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন। আর পরবর্তীকালে একুশের পথ অনুসরন করেই এসেছিল ’৭১, আমরা পেয়েছি স্বাধীনভূমি বাংলাদেশ।

 

বিংশ শতকে সারা পৃথিবী জুড়ে নানা দেশের জনগণ তাদের অধিকার, বিশ্বাস, স্বাধীনতা তথা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন করে গেছে, প্রাণ দিয়েছে বহু তরুন; কিন্তু একমাত্র বাংলাদেশের তরুনরাই ১৯৫২ তে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন নিজের মুখের ভাষাকে প্রতিষ্ঠার দাবিতে। পশ্চিম পাকিসত্মানী শাসক গোষ্ঠী উর্দূকে পুরো পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পাঁয়তারা যখন চালাচ্ছিল তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুন সমাজ তার বিরুদ্ধে রুখে দাড়াঁয়। যার মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলার সাত কোটি মানুষের মুখের ভাষা রক্ষা পায়। তাদের এই মহান আত্মত্যাগ পরবর্তীকালে দেশের স্বাধীনতাকামী তরুন সমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছে পাকিস্তানিদের শোষণ ও শাষণের বিরুদ্ধে গিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীনতা করার যুদ্ধে অংশ নিতে।

 

এতোদিন একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল শোকের দিবস আর এখন এই দিনটি পরিণত হয়েছে সারাবিশ্বের সকল জনগণের মুখের ভাষা রক্ষার অধিকারের ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে’। এই দিনটির মাহাত্ত্ব আজ পুরো পৃথিবীময় ছড়িয়ে গেছে।

 

১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পর পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে করার দাবি হচ্ছিল। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান গণ পরিষদের অধিবেশনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি প্রত্যাখ্যাত হয়। এই সময় সরকার সরকারী ধরনের স্ট্যম্প, কয়েন, নিয়োগ পরীক্ষা থেকে বাংলাকে বাদ দিয়ে দেয়। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ শহরে সাধারন ধর্মঘট পালন করে। হরতাল চলাকালে পুলিশ শামছুল হক, শাখাওয়াত আলী, কাজী গোলাম মাহবুব, ওলি আহাদ, শেখ মুজিবুর রহমান, আবদুল ওয়াহেদ, আবদুল মতিন প্রমুখ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে গ্রেপ্তার করে এবং ছাত্রদের মিছিলে বেপরোয়া লাঠি চার্জ করে। এই পুলিশি অত্যাচারের প্রতিবাদে ১২ মার্চ বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয় এবং ১৩ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত ঢাকার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত হয়।

 

আন্দোলনের তীব্রতার মুখে ১৫ মার্চ মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন আন্দোলনরত সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সাথে সমঝোতা বৈঠকে বসতে বাধ্য হয়। ভাষা আন্দোলনে গ্রেপ্তারকৃত সব রাজবন্দির মুক্তি, পুলিশি অত্যাচারের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম ও রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠাসহ ৮টি শর্ত স্বাক্ষরিত হয়।

 

অথচ ২১ মার্চ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্সে এক নাগরিক সংবর্ধনায় ঘোষণা করেন, ‘উর্দু, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। অনুষ্ঠান স্থলেই এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদ আসে নাগরিক সমাজের কাছ থেকে; তা সত্ত্বেও ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে জিন্নাহ পুনরায় উর্দূকে পাকিসত্মানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দিলে ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করে।

 

১৯৪৮ এ মাওলানা আকরাম খানের নেতৃত্বে সরকার পূর্ব বাংলা ভাষা কমিটি গঠন করে। এই কমিটি ১৯৫০ এর ৬ ডিসেম্বর তাদের কাজ শেষ করে কিন্তু ১৯৫৮এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় উর্দূ দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত, এতে দুই অঞ্চলের মধ্যে নৈকট্য স্থাপিত হবে। অন্যদিকে ১৯৪৯ তে কেন্দ্রীয় পাকিসত্মান শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ড ‘পাকিসত্মানের সব ভাষার লিখন প্রণালী আরবী হরফ করার’ সুপারিশ করে।

 

রাষ্ট্রভাষার বাংলা করার দাবি প্রতিষ্ঠা চরম প্রকাশ পায় ১৯৫২ সালে। তবে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ নানা পর্যায়ে বাংলাকে অবদমিত করে রাখার প্রচেষ্টা অব্যহত ছিল। এমনকি ১৯৪৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় পাকিস্তান শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ড ‘পাকিস্তানের সব ভাষার লিখন প্রণালী আরবী হরফ করার’ জোর সুপারিশ করে।

 

১৯৫২এর ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পুনঃঘোষণা করেন। এর প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতা মওলানা ভাষানী ঢাকা বার কাউন্সিলে সকল বিরোধী পার্টির নেতাদের নিয়ে এক সভা ডাকেন। এতে অংশ নেয়া অন্যান্য দলগুলো হলো খিলাফাত-এ-মজলিশ, তামুদ্দিন মজলিশ, বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ এবং পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ।

 

এছাড়া ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ছাত্র ধর্মঘট ও সভা আহবান করে। এই সভায় ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট, ছাত্রসভা, বিক্ষোভ মিছিল এবং ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘ভাষা দিবস’ হিসেবে গ্রহণ করে প্রদেশব্যাপী হরতাল পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। কিন্তু ২০ তারিখে সরকার স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্যে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে। এর মাধ্যমে ঢাকায় কোন প্রকার সভা, সমাবেশ, শোভাযাত্রা, বিক্ষোভ মিছিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে ছাত্রসংগঠনগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে সভা করে ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত নেয়।

 

১৯৫২ সাল ২১ ফেব্রুয়ারি, ৮ ফাল্গুন বৃহস্পতিবার। কুয়াশাচ্ছন্ন এই সকালেই পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পুলিশ ঘিরে ফেলে। অন্যদিকে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের নির্দেশ সংবলিত চিরকুট জাহানারা লাইজু এবং নিযাম নামের দুটি ছেলে-মেয়ে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেয়। সেই অনুসারে সকাল ৯ টা থেকে শহরের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ার কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা জমায়েত হতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। প্রায় ২০-২৫ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর জনসমুদ্রে পরিণত হয়। ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা হবে কিনা এ নিয়ে বেলা সাড়ে ১১টায় আমতলায় সভা শুরু হয়। সিদ্ধান্ত হয়, দশজনের এক একেকটি দল মিছিল আকারে বিশ্ববিদ্যালয় গেট অতিক্রম করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবে।

 

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইতিহাসের ছাত্র হাবিবুর রহমান শেলী’র (সাবেক বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা) নেতৃত্বে প্রথম দলটি পুলিশের কর্ডন ভেদ করে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারী দলগুলোর মধ্যে একদল ছাত্রী ও যোগদান করেন। প্রথমদিকে ছাত্রদের গ্রেপ্তার করা হতে থাকে। ভাষা আন্দোলনে প্রথম গ্রেপ্তার হন হাবিবুর রহমান। একটু পরই পুলিশ মারমুখী হয়ে উঠে। লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে মারে। নিজেদের বাঁচাতে ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন ও মেডিকেল কলেজের মধ্যবর্তী দেয়াল ভেঙ্গে ফেলে এবং পুলিশের দিকে ইট পাটকেল ছুঁড়তে থাকে। ফলে সংঘর্ষ কলা ভবন চত্বর থেকে মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রাঙ্গণেও ছড়িয়ে পড়ে। অসংখ্য ছাত্র পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেলে আহত হন। পুলিশের পাল্টা হামলায় ছাত্রদের একটি বড় অংশ ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের কাছে (বর্তমান মেডিকেল কলেজের পাশে শহীদ মিনারের পাশে) জমায়েত হতে থাকে।

 

বিকেল ৩টায় হঠাৎ করে পুলিশ জমায়েত হওয়া ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষণ করে। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালিন জেলা ম্যজিস্ট্রেট খোরায়েশি। গুলিতে আবুল বরকত, রফিক উদ্দিন, আবদুল জাববার ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। আবদুস সালাম গুলিবিদ্ধ হয়ে ৭ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজে মারা যায়।

 

ছাত্রদের উপর পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনার পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন তিন দিনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা পরিণত হয় মিছিল, বিক্ষোভ আর শোকের সমন্বয়ে এক উত্তাল নগরীতে।

 

শহীদদের জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নামে। ২৩ তারিখ রাতে বর্তমান শহীদ মিনারের কাছে ছাত্ররা সম্মিলিতভাবে কারফিউয়ের মধ্যেই ডা. সাঈদ হায়দারের পরিকল্পনায় ১০ ফুট উচ্চতা আর ৬ ফুট প্রস্থ বিশিষ্ট শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। শহীদ শফিকের বাবা শহীদ মিনারটি উদ্বেধন করেন। তবে সরকারের পেটুয়া পুলিশবাহিনী ২৬ তারিখে তা গুড়িয়ে দেয়।

 

একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অন্যায়ভাবে ছাত্রদের হত্যা ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ হতে থাকে সারাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পত্র-পত্রিকা জুড়ে। আন্দোলন আর প্রতিবাদের দুর্বার বেগের মুখে নুরুল আমিন ২৫ ফেব্রুয়ারি বেতারের এক ভাষণে প্রাদেশিক পরিষদে বাংলা ভাষা বিষয়ক বিল পাশ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। ১৯৫৩ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরির লেখা গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ….’ গানটি ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা কলেজ প্রকাশিত স্মরণিকায় প্রথম মুদ্রিত হয়। পরে গানটিতে বর্তমানের সুর সংযোজন করেন আলতাফ মাহমুদ। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে মে মাসে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

 

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসঙ্ঘের সদস্য দেশগুলোতে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিয়নে বাংলাকে দ্বিতীয় সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সেদেশের জনগণ এখন বাংলাভাষা শিখছে। জাপান ও অস্ট্রেলিয়াতেও নির্মিত হয়েছে শহীদ মিনার। জাতিসংঘের অনেক সংস্থার কর্মকর্তাদের বাংলা ভাষা শেখা বাধ্যতামূলকভাবে হচ্ছে। বর্তমানে ইন্টারনেটের ভাষায় বাংলাকে অন্তর্ভূক্ত করার জন্য আন্তর্জাতিক পরিসরে জোর চেষ্টা চলছে।

লেখক – কলাম লেখক ।