Friday March5,2021

এতটা আতঙ্ক আর এতো আকাঙ্ক্ষা সারা পৃথিবীতে সাম্প্রতিক সময়ে আর দেখা যায়নি। মানুষ আতঙ্কিত হয়েছে করোনা মহামারির ভয়াবহতায় আর আকাঙ্ক্ষা করেছে কখন ভরসা টিকা আসবে। যে কারণে এত সব কিছু সেই মুকুট আকৃতির ভাইরাসটিকে নভেল করোনা ভাইরাস বলে অভিহিত করা হয়েছিল প্রথমে। তারপর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভাইরাস-ঘটিত রোগের নামকরণ করে করোনাভাইরাস ডিজিজ ২০১৯ যা কোভিড – ১৯ হিসেবে এখন পরিচিত। এই শতকের এক ভয়ংকর বিপদের নাম করোনা। কিন্তু পরিস্থিতি যত ভয়ংকর হোক না কেন মানুষ হার মানে না।

‘মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কিন্তু হার মেনে নেয় না।’ আরনেস্ট হেমিংওয়ের এই বিখ্যাত উক্তি শুধু একটি আপ্তবাক্য নয়, এ হচ্ছে মানবজাতির সংগ্রামী ইতিহাসের নির্যাস। করোনা মহামারিতে আবারও তা প্রমাণিত হতে যাচ্ছে। এ যাবৎকাল যত ধরণনর সংক্রামক রোগের কথা মানুষ জেনেছে করোনা সংক্রমণ তার মধ্যে ভয়াবহতম। এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা, এত ঘন ঘন রূপ পরিবর্তন করতে পারা, ফুসফুসসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো আক্রমণ করে মালটিঅর্গান ফেইলর করে দিয়ে মৃত্যু ঘটানোর কারণে করোনা প্রাণঘাতী মহামারি হিসেবে ভয় ও সমীহ আদায় করে নিয়েছে মানুষের কাছ থেকে। মানুষ স্বেচ্ছাবন্দিত্ব গ্রহণ করে বাঁচতে চেয়েছে, তারপরেও লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা। ফলে বিশ্বব্যাপী আতঙ্কিত মানুষের মতো বাংলাদেশের মানুষ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের খবর শুনে আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষায় আছে।

দেশে ৩৫ লাখ ডোজ করোনার ভ্যাকসিন আসবে, এর মধ্যে ২০ লাখ ডোজ শুভেচ্ছা হিসেবে। এরপর প্রতি ডোজ ৫ ডলার দামের ৩ কোটি ডোজ আসবে আগামী ৬ মাসে। এর বাইরে বেক্সিমকো ১৩ ডলার দামে আনবে ১০ লাখ ডোজ। সম্ভবত বিভিন্ন দেশ থেকে আরও ভ্যাকসিন আসবে। অতীতের মহামারির মতো করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারে ৭/৮ বছর সময় লাগেনি।

এক বছরের মধ্যেই করোনা থেকে বাঁচবার বিজ্ঞানসম্মত পথ আবিষ্কার হয়েছে। ভ্যাকসিন বা টিকা দিয়ে শরীরের প্রতিরোধ-ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলে করোনা প্রতিরোধ করা যাবে। মানুষ তাই আশায় বুক বাঁধছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্নও উঠছে যে, এটা কেমন করে পাওয়া যাবে, বিনামুল্যে না বহুমুল্যে? শুরুতে কেউ কেউ ধর্মের নামে বলতে চেয়েছে করোনা মুসলমানদের হবে না, বিধর্মীদের শায়েস্তা করার জন্য করোনা এসেছে, অন্যদিকে কেউ কেউ বলেছেন গো মূত্র করোনা ঠেকাবে, আবার করোনা প্রাকৃতিক না মনুষ্যসৃষ্ট এ বিতর্কও চলেছে জোরেশোরে। কিন্তু বিজ্ঞানের যুক্তিতে সব পথ মিলে গেল এক মোহনায়। করোনা ভাইরাস-ঘটিত রোগ, এর কারণ জানা গেছে, কারণ দূর করবার পথ বের করার জন্য দেশে দেশে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছিলেন। তাদের দেশ এবং ভাষা আলাদা, গায়ের রং এবং ধর্ম পরিচয়ও আলাদা কিন্তু বিজ্ঞান তাদেরকে এক মোহনায় মিলিয়ে দিল। তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই। মানুষকে বাঁচাতে মানুষের প্রতি দায় অনুভব করে বিজ্ঞানকে হাতিয়ার করে সাধনা করতে হবে। সে সাধনার ফল মানবজাতি পেতে যাচ্ছে টিকা বা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মাধ্যমে।

করোনা মহামারি যখন মহামারি হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি, সেই সময় থেকে সতর্ক থাকার কথা বলেছেন বিজ্ঞানীরা। এক বছরে ২১৮টি দেশে প্রায় ১০ কোটি মানুষকে সংক্রমিত করে ২০ লাখ মানুষের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে করোনা যেমন তার ভয়ংকর রূপের প্রমাণ দিয়েছে, তেমনি পুঁজিবাদের দুর্বলতাও উন্মোচন করে দিয়েছে সে বহুদিক থেকে। পুঁজিবাদ শুধু শ্রম শোষণ করে না, কৃত্রিম চাহিদায় মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

পুঁজিবাদ শেখায় নিজে বাঁচ। যোগ্যতা থাকলে তোমাকে ঠেকায় কে? টাকা রোজগারের যোগ্যতা হলো সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। পাগলের মতো টাকা রোজগার কর, মাতালের মতো ফুর্তি কর। জীবনকে উপভোগ কর। যে এসব করতে পারে না তার জীবন ব্যর্থ। বুড়ো হয়েছে তো তাকে বাতিল করে দাও। করোনায় ইউরোপ আমেরিকায় তাই বেশি মারা গেলেন অসহায় বুড়োরা, যারা যৌবনে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছিলেন। বেকার হয়ে গেল যুবকেরা আর অনিশ্চিত হয়ে পড়লো শিশুদের ভবিষ্যৎ। করোনা দেখালো একা একা বাঁচা যায় না। মহাশূন্যে স্যাটেলাইট পাঠানো, সর্বাধুনিক মডেলের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, গাড়ি দরকার কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার সর্বাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, উন্নত ওষুধ, হাসপাতাল।

বাণিজ্যিক হাসপাতাল ব্যবসা বুঝে কিন্তু সামাজিক দায় গ্রহণ করে না। তাই দরকার মানবিক ডাক্তার আর সামাজিক হাসপাতাল। দরকার সামাজিক সুরক্ষা। অত্যাধুনিক মডেলের মোবাইল না হলেও বছরের পর বছর বেঁচে থাকা যাবে কিন্তু খাদ্য না হলে এক সপ্তাহ বাঁচা কঠিন। সবাইকে বাসায় থাকতে বললেও করোনাকালে ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিক খাদ্য, বিদ্যুৎ, পানি, ওষুধ, বস্ত্র উৎপাদনে নিয়োজিত না থাকলে, পরিবহণ ও বিপণনে যুক্ত না থাকলে মানুষের নিরাপদে বাসায় থাকা অসম্ভব হয়ে পড়তো সে কথা যেন আমরা ভুলে না যাই।

করোনা ভ্যাকসিন তো আসছে। গবেষণা এবং উৎপাদনে টাকা দিয়েছে কারা? ভ্যাকসিন তৈরির টাকা দেয়ার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে সরকারগুলোই দিচ্ছে সবচেয়ে বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২৯ ডিসেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে করোনার ২৩২টি টিকা নিয়ে কাজ চলছে। চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার আগে ৬টি ধাপে টিকার পরীক্ষা করতে হয়। ৬০টি টিকা বিভিন্ন দেশে মানবদেহে পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপে আছে। এদের মধ্যে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড, যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার ও মডারনা, রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি, চীনের সিনোভ্যাক ও সিনোফার্মের টিকা নিয়ে বেশি আলোচনা চলছে। এই টিকা আবিষ্কার ও উৎপাদনে সরকারগুলো দিয়েছে ৬৫০ কোটি পাউন্ড, অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো দিয়েছে ১৫০ কোটি পাউন্ড আর কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করেছে ২৬০ কোটি পাউন্ড। অথচ কত বিশাল বিশাল কোম্পানি ও কর্পোরেট হাউস বিশ্বব্যাপী কত কিছু নিয়েই না ব্যবসা করছে ! মানুষের বিপদে তাদের ভূমিকা তেমন দেখা গেল না।

অন্যদিকে টিকা কেনার ক্ষেত্রেও ধনী দেশগুলো একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করেছে। পিপলস ভ্যাকসিন এলায়েন্স নামের একটি জোট হিসেব করে দেখিয়েছে যে, ধনী দেশগুলোর জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৪ শতাংশ। অথচ তাঁরা কিনেছে মোট চাহিদার ৫৩ শতাংশ টিকা। যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা ৩৩ কোটি, তারা কিনেছে একশ’ কোটি টিকা। যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যা সাড়ে ছয় কোটি, তারা কিনছে ৩৫ কোটি ৭০ লাখ, ভারত কিনছে একশ’ ৫০ কোটি, জাপানের জনসংখ্যা ১৩ কোটি, টিকা কিনছে ২৯ কোটি, কানাডার লোক সংখ্যা সাড়ে ৪ কোটি, ৩৬ কোটি ডোজ টিকা কিনছে তারা। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন মিলে কিনছে ১৬০ কোটি ডোজ। এ পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নিয়ে অসম নীতির কারণে বিশ্ব একটি ‘বিপর্যয়কর নৈতিক ব্যর্থতা’র মুখে দাঁড়িয়েছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

ডব্লিউএইচওর মহাসচিব টেড্রোস আধানম গেব্রিয়াসিস সোমবার এই সতর্কতার কথা উচ্চারণ করেন। তিনি জানান, বিশ্বের ৪৯টি ধনী দেশে ইতোমধ্যে ৩৯ মিলিয়ন ডোজের বেশি করোনার টিকা দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে, একটি গরিব দেশে মাত্র ২৫ ডোজ টিকা দেয়া হয়েছে। ২৫ মিলিয়ন নয়, ২৫ হাজারও নয়, মাত্র ২৫টি। ডব্লিউএইচওর মহাসচিব বলেন, করোনার ঝুঁকিতে থাকা গরিব দেশের নাগরিকদের আগে ধনী দেশগুলোর কম বয়সী ও স্বাস্থ্যবান লোকজনের টিকা পাওয়াটা মোটেই নৈতিক নয়। গেব্রিয়াসিস বলেন, তাকে রূঢ়ভাবে বলতে হচ্ছে যে, বিশ্ব এক বিপর্যয়কর নৈতিক ব্যর্থতার মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর এই ব্যর্থতার মূল্য বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোয় জীবন ও জীবিকা দিয়ে দিতে হবে।

বাংলাদেশের অবস্থাও এরকম। ১৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশে ৩/ ৪ কোটি ভ্যাকসিন আনলে তা চাহিদা মেটাবে না বরং টিকা ব্যবসায়ীদের মুনাফার সুযোগ বাড়বে। প্রতি মানুষের ২ ডোজ করে টিকা প্রয়োজন হলে ৩৩ কোটি ডোজ টিকা লাগবে। ব্যবসায়ীর হাতে টিকা আমদানির দায়িত্ব না দিয়ে সরকারিভাবে আমদানি করলে সিরাম ইন্সটিটিউটের টিকার দাম লাগতো একশ’ কোটি ডলার বা ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে পরিবহণ, সংরক্ষণ, টিকাদানের খরচ যুক্ত হলে ১২ হাজার কোটি টাকায় সকলকেই টিকা দেয়া সম্ভব। সরকার এই টাকার ব্যবস্থা করলে জনগণ বিনামূল্যে টিকা পেতে পারত।

বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আছে ফলে টাকার অভাব হবে না। কিন্তু ব্যবসায়ীদেরকে টিকা বাণিজ্যের সুযোগ করে দিলে, ‘টাকা ছাড়া টিকা নাই’ এই নীতি কার্যকর হবে। করোনার প্রথম ঢেউয়ের অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। টিকার ক্ষেত্রেও সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

ভ্যাকসিন সঠিকভাবে সংরক্ষণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যথাযথভাবে সংরক্ষণের অভাবে সারা বিশ্বে প্রায় ৫০ শতাংশ ভ্যাকসিন নষ্ট হয়ে যায় বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে। এই বিষয় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভ্যাকসিন পাবার ক্ষেত্রে কারা গুরুত্ব পাবেন সেটাও বিবেচনা করতে হবে। টাকার অভাবে টেস্ট করানোর অনাগ্রহ শ্রমজীবী মানুষের ছিল, টিকার ক্ষেত্রেও তা হবে। দেশের কমপক্ষে ৬০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় না আনলে করোনা ঝুঁকির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। ফলে যে শ্রমিক কৃষক অর্থনীতির চালিকাশক্তি তারা যেন অতীতের মতো উপেক্ষিত না হয়, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে যেন বহুগুণ দামে ভ্যাকসিন বিক্রি না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এবং বিনামূল্যে টিকা সরবরাহের সক্ষমতা দেশের আছে। প্রয়োজন দায়িত্বপূর্ণ মনোভাব ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা।

লেখক:    রাজেকুজ্জামান রতন  রাজনীতিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ।