Saturday March6,2021

গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান

সবাই মিলা মুর্শিদি গাইতাম

আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম

  • মরমি বাউল শিল্পী শাহ্ আব্দুল করিমের বিখ্যাত গান।

গানটির সত্যতা নিয়ে হয়ত অনেক কথা বলা যাবে। তবে গানটির একটি মর্মার্থ আছে, মনের একটা আদান- প্রদান আছে, আছে ভালোবাসা। গানটি সেই সাক্ষ্য দেয়, এই বাংলায় অভাব- অনটন থাকলেও, একের প্রতি অপরের একটা মনোনের টান, ভালোবাসা, সুখ- দুঃখে পাশে থাকা কিংবা একে অপরের খোঁজ- খবর রাখা এই বিষয়গুলো এই সমাজে এক সময় ছিলো। যা বর্তমানে সত্যি কম বা অনেক অভাব অথবা নেই বললেই চলে ।

শহরের ইট- পাথর বা কংক্রিটের চার দেয়ালে বন্দি জীবনে সমাজ বলতে যা বুঝায়, সেটার ভীষণ অভাব। এমনকি আজকাল গ্রাম- গঞ্জ শহরের রূপ লাভ করছে, সেটার ভালো দিক অবশ্যই আছে তবে পাশাপাশি শহরের যে জীবন চাহিদা, সেগুলোর আবির্ভাব  অতিমাত্রায় হচ্ছে, ফলাফল গাও-গ্রামের যে আলাদা একটি চরিত্র ছিলো, সেগুলো দিনকে দিন ধ্বংস হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয় । গ্রাম উন্নয়ন হবে এবং প্রয়োজন।  সেটা ঠিক আছে। তবে উন্নয়নের সাথে গ্রামঅঞ্চলগুলো তার আপন মহিমা যেভাবে ক্ষতিসাধন হচ্ছে, সেটার ফল ভবিষ্যতের জন্য খুব বেশি সুখের হবে না বলেই ধারণা করি ।

উপরে এত কথা বলার মূল কারণটি ভিন্ন।  আমরা এমন একটি দেশ,  যে দেশটি ছোট্ট ভূমিতে ১৮ বা ২০ কোটি লোক বসবাস করি । এমন জনবসতি ও হাজারো সমস্যায় ভরপুর দেশটি পরিচালনা করা চাট্টিখানি কথা নয় । তাবৎ বিশ্বের বড় বড় নেতা বা রাষ্ট্রপ্রধানদের এনে এই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিন,  চ্যালেঞ্জ করে বলা যাবে,  সেই সব বিখ্যাত- প্রখ্যাত নেতা বা রাষ্ট্রপ্রধানরা অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই হয় আত্মহত্যা করবে অথবা শতভাগ পাগল বা উলঙ্গ হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরা শুরু করবে। কথাটি হালকা  মনে হলেও সত্যি বলতে হালকা  নয়,  এমনটিই শতভাগ হবার কথা ।

ছোট্ট এই দেশে করোনার এই মহামারী যতটা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে ,  ঠিক ততটা ক্ষতি সাধন হয়েছে বলাটা সঠিক হবে না। আমাদের দেশের ধুলো- বালি- বায়ুদূষণ ইত্যাদি ইত্যাদি থেকে অবশ্যই আমাদের শরীরের ক্রসরেসিস্ট্যান্টের মাত্রাটি আনেক অনেক বেশি । পাশাপাশি খাদ্য ভেজাল বা ফর্মালিন আমাদের শরীরের রন্ধে রন্ধে। এই সব নানাবিধ কারণে আমাদের জীবনমান এমনিতেই জড়সড়।  তবে সবকিছু বাদ দিয়েও বলতেই হয় তুলনামূলক আমরা করোনায় খারাপ নেই । করোনা টেস্ট কি পরিমাণ হয়েছে বা হয়নি,  সেইসব পরিসংখ্যানে না গিয়েও বলতেই হবে করোনা টিকার ব্যবস্থা হওয়াটাই বর্তমানে বেশি জরুরি বা অতি প্রয়োজনীয়।

এই প্রয়োজনীয় বিষয়টির ব্যবস্থা হয়েছে এবং সেটা নিয়েই চলছে একপ্রকার তামাশা বা হেলাফেলা বা আরো সরাসরি বললে বলতেই হয় রাজনীতি। একটি কমন গল্প আছে না, ভালো ছাত্র হলেও ভালো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে না,  ভর্তি হলেও পাশ করতে পারবে না, পাশ করলেও চাকরি পাবে না,  চাকরি পেলেও বেতন পাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি।  ঠিক সেই গল্পের মতন শুরু হয়েছে টিকা নিয়ে।  টিকা আসবে না, টিকা আসলেও দাম বেশি,  দাম বেশি হলেও রক্ষণাবক্ষেণ করতে পারবে না,  রক্ষণাবক্ষেণ হলেও প্রশাসনের অব্যবস্থাপনার কল্যাণে সময় মতন টিকার কার্যক্রম শুরু হবে না ইত্যাদি ইত্যাদি।

অতঃপর টিকা আসলো । এমনকি প্রথম চালানটিই উপহার হিসেবে এলো। বেশ শুরু হয়ে গেলো নতুন সমস্যা।  টিকা ভারত বিনি পয়সায় ( মাগ্না ) দিয়েছে। মানে ভারতের উদ্দেশ্যে ভালো না । এই টিকা বিশ্বাসযোগ্য টিকা না । নিশ্চয়ই এতে ঘাপলা আছে। টিকাকে বিশ্বাসযোগ্য করতে আগে ওমুকে টিকা দাও,  তমুককে টিকা নিতে বলো । বেশ ইন্টারেস্টিং বটে। লক্ষণীয় যে, এতদিন টিকা আসেনি চলছিলো মুখের যুদ্ধ, কে বা কাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত । শত শত প্রশ্ন ছিলো । সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করা হবে । জনমানুষের এই দেশে কোনো কিছুতেই অধিকার নাই,  সরকার টিকা নিয়েও দূর্ণীতি করবে, নিজেদের লোকদের টিকার ব্যবস্থা করবে ইত্যাদি ইত্যাদি।  এখন উল্টো রথের প্রতিযোগিতায়।  টিকা না নেওয়ার প্রতিযোগিতা । টিকা নেবো তবে, আগে তুমি নিজে নিয়ে প্রমাণ কর, তুমি বাঁচো কিনা ?  এই একটি উদাহরণ দিয়ে একবার গভীরভাবে ভাবুন তো, এই দেশটি পরিচালনা করা কি সহজ কথা ?  তাই বলছিলাম এই দেশ চালাতে বড় বড় রাষ্ট্রপ্রধানরাও পাগল হতে বাধ্য হবে।

লেখার শুরুতেই মরমী  বাউল আব্দুল করিমের গানের কথা লিখেছিলাম।  কারণটি বেশ স্পষ্ট কেন সেই গানের কথা বলা । লক্ষণীয় যে,  এই উপমহাদেশে বেশিরভাগ জনমানুষেরাই অতিমাত্রায়  সন্দেহপ্রবণ,  হিংসা- বিদ্বেষ বা অপরের মন্দ করতে বেশ আগ্রহী।  এটা কোনো জরিপ থেকে বলছি না,  একটি ধারণা থেকেই বলছি। তবে উদহারণ অনেক আছে। আবার এই উপমহাদেশের জনমানুষেরাই লড়াই সংগ্রামের চরিত্র বহন করে বলেই এক সময় ব্রিটিশদের সক্ষম হয়েছিলো । আবার এই উপমহাদেশের জনমানুষেরাই নম নম বা দালালি করায় বেশ পারদর্শী বটে। এক মীর জাফরই তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। বাংলাদেশ ভৌগলিক ভাবে এই উপমহাদেশের এবং সেই সবগুলো চরিত্রের সম অধিকারী  অবশ্যই।

এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড পরিচালিত হয় রাজনীতির মাধ্যমে।  অবশ্যই এটা মঙ্গলজনক। বিনা রাজনীতিতে সব কিছুই অচল। তবে প্রশ্ন হলো সেই রাজনীতিটি কি হওয়া প্রয়োজন ?  সেখানেই আমরা বিশেষ করে আমাদের দেশের জনমানুষেরা বেশ পিছিয়েই আছি বলে মনে হয় । একটি উন্নতমানের রাজনীতি এবং যুদ্ধ করে আমারা স্বাধীন হয়েছি বটে,  তবে এই যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশে আজ অব্দি আমরা ভালো রাজনীতির চর্চা করতে পারিনি বা শিখিনি । ফলাফল হলো, যেখানে আমাদের রাজনীতির কোনো প্রয়োজন নেই,  সেখানেও আমরা আমাদের অজান্তেই বা অতি উৎসাহীত হয়ে রাজনীতি করে বসি। শোনা যায় এই রাজনীতি বা অপরাজনীতিটি এখন শহর- জেলা- উপজেলা,  গাও- গ্রাম থেকে শুরু করে পরিবারের মধ্যেও চর্চা হয় ।

আমাদের দেশে রাজনীতির নামে অপরাজনীতিটির প্রকট বা প্রভাব এতটাই বেশি যে,  এখন ধর্মের নামেও চলে রাজনীতি।  এমনকি ধর্মকে পাশ কাটিয়ে ধর্মের সিঁড়ি বেয়ে ক্ষমতায় আসীন হতে খেলাফতের নামে ক্ষমতার চেয়ারের স্বপ্নে তাকবিরে সামিল হই । ফলাফল ধর্ম চর্চা যতটা না প্রথম সারির হবার কথা,  সেটা থেকে যোজন যোজন দুরে ছুটে গিয়ে রাজনীতির ময়দানে মশগুল থাকতে ভালোবাসি। এই ধর্মের নামের রাজনীতি আর অপরাজনীতির কল্যাণেই দিনকে দিন আমরা হারাতে বসেছি আমাদের গ্রাম বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস,  ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি । লক্ষ্য করলে দেখা যায়,  অতিমাত্রায় এই রাজনীতির নামে অপরাজনীতি গাও- গ্রামের হাট- বাজারে ছড়িয়ে পরায়,  বাউল করিমের গানের পংক্তিগুলো দিনকে দিন হারাতে বসেছে।

এই রাজনীতির নামে অপরাজনীতিটি করোনার টিকার ক্ষেত্রেও বেশ লক্ষণীয় হচ্ছে। টিকার রাজনীতি এখনও পরিষ্কার বলার সময় আসেনি বটে,  তবে কথাবার্তা,  বচনে এবং আভাসে বেশ পরিষ্কার বটে। আমাদের লক্ষ্য রাখা উচিত করোনার টিকাটি একটি মানবিক বিষয়।  মানবিক বিষয়ে রাজনীতিকে যত দুরে রাখা যাবে ততই আমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে। এক সময়  না এক সময় সকলকেই এই টিকার আওতায় আসতে হবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে এবং এর বিকল্প নেই । সুতরাং মানবিক এই বিষয়টিকে নিয়ে পত্র- পত্রিকা সহ সকল প্রচার মাধ্যমেই সতর্কতা অবলম্বন করা হবে মানবিক দায়িত্ব।  দু’ কলম লিখে বা মুখে ভাসন- বক্তৃতায় এমন কিছু করা উচিত হবে না ( সকলের ক্ষেত্রেই ), যা থেকে একপ্রকার প্যানিক বা ভয়ের রাজ্যে তৈরি  হয় । সেটা হবে জাতি  হিসেবে আমাদের আত্মহত্যার সামিল। সুতরাং প্যানিক তৈরি করে জাতীকে কেউ বিপদের মধ্যে ঠেলে দিবেন না । বি- পজিটিভ। আসুন সবাই পজিটিভলি করোনাকে ধীরে ধীরে নেগেটিভ করে ফেলি । বাউল করিমের গানের মতন আগে কি সুন্দর দিন ফিরে নাই পাই,  অন্তত মানবিক হই,  দেশ ও দশের স্বার্থে।

 

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম।