Thursday January21,2021

স্রেফ রক্তক্ষরণে মারা গেছে মেয়েটি, স্রেফ রক্তক্ষরণে । বলছিলাম ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল মাস্টারমাইন্ড ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী আনুশকাহ নূর আমিনের কথা। আরেক ইংলিশ মিডিয়াম ম্যাপললীফের ছাত্র দিহান একমাত্র আসামি। ধানমন্ডির আনোয়ার খান মর্ডান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন, যোনী ও পায়ুপথে হেমোরেজিক শক ও রক্তক্ষরণের কারণেই মেয়েটিকে ইহকাল ত্যাগ করতে হয়েছে। মর্মান্তিক এবং ভীষণ মর্মান্তিক।
দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বেশ সরব। চলছে নানান মুনিরের নানান ব্যাখ্যা, বিশ্লষণ। কেউ বলছেন দূর্ঘনা, কেউ বলছেন মেয়ে হয়ে গেছে কেনো?, কেউ বলছেন ঠিকই আছে এমন মেয়ের মরাই উচিত, কেউ বলছেন মিউচুয়াল সেক্স সুতরাং , ইত্যাদি ইত্যাদি।  এই সব মন্তব্য বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানান প্রচারের মুখ থামানো কখনোই সম্ভব নয় এবং ভিন্নজনের মতের বিপরীতে বলেও শেষ হবার নয়, যেহেতু এটা খোলা হাটবাজার। তবে ছোট্ট করে বললে বলতেই হয়, উপরে উল্লিখিত প্রত্যেকটি শব্দের সংজ্ঞায়ন সঠিকভাবে ব্যাখা করা আছে এবং যারা লিখছেন তারা একটু ঘেঁটে দেখলেই নিজেদের বিবেকের কাছে আঘাত প্রাপ্ত হবেন, অবশ্য যদি সেই মানবিক বোধটুকু সামান্য অবশিষ্ট থাকে , নতুবা নয় ।
বাংলাদেশের আইনে কোনটা ধর্ষণ, কোনটা নয় ? সেগুলো বিজ্ঞ আদালত আইন অনুযায়ী নিশ্চয়ই বিচার- বিশ্লষণ করবেন। তবে একথাও সত্যি যে, বাংলাদেশে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নবিরোধী কঠোর আইন থাকলেও, এ নিয়ে বেশ বিভ্রান্তি আছে। আইনের ব্যাখ্যায় যাবো না, কেউ চাইলেই সেগুলো যেকোনো সময় ঘেঁটে দেখলেই বিয়ষগুলো পরিষ্কার হবে। বিভ্রান্তিগুলো নানাবিদ এবং আইন সবগুলোকে এক পাল্লায় বিচার করে না এবং সঠিকও নয় । তবে মিউচুয়াল বা সম্মতি যে বিষয়টি এই মৃত্যুতে যারা মন্তব্য করছেন, সেখানে হোচট খেতেই হয় । তবে জেনে রাখা ভালো যে, বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যেও ধর্ষণ বা ম্যারিটাল রেপ বলে একটি বিষয় আইনগত ভাবেই আছে। তেমনটি আছে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ। তবে হ্যাঁ আইন অনুযায়ী সেগুলোর জন্য প্রমাণ সাপেক্ষে ভিন্ন ভিন্ন  সাজার ব্যবস্থা আইনেই গৃহীত আছে।
তবে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনটি ২০২০ সালের অক্টোবরে  সংসদে বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান যোগ করা হয়েছে । বাংলাদেশে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ, ধর্ষণজনিত কারণে মৃত্যুর শাস্তি প্রসঙ্গে আইনের ৯ (১) ধারা- উপধারা এতদিন পর্যন্ত সর্বোচ্চ শাস্তি ছিলো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবে ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর যদি মৃত্যু হয় বা গণধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর মৃত্যু হয় অথবা আহত হন, তাহলেই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বিধান ছিলো এবং সেই সঙ্গে উভয় ক্ষেত্রেই ন্যূনতম একলাখ টাকা অর্থ দণ্ডের বিধান ছিলো   মূলত সেই আইনকেই পরিবর্তন- পরিবর্ধন করে ধর্ষণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলেই মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবনের বিধান আনা হয়েছে এবং সাথে অর্থদণ্ডের বিধানও আছে। এই আইনের পরিবর্তন করে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হিসেবে বিধানে আনায় সপ্তম দেশ হলো বাংলাদেশ ।
আজকের দৈনিক পত্রিকার খবর, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনুশকাহ ময়নাতদন্ত হয়েছে। সেখানকার ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডাক্তার সোহেল মাহমুদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন , স্বাভাবিক পেনিস দ্বারা রেক্টম ও যৌনাঙ্গ ব্যবহার করলে এতটা ভয়াবহ পরিণতি হবার কথা নয় । শরীরের নিম্নাঙ্গে কোনো ‘ফরেন বডি সাইজ’ কিছু একটা ব্যবহার করা হয়েছে । এক কথায় সেখানে বিকৃত যৌনচার করা হয়েছে  তিনি আরও বলেল,  আমি আমার পোস্টমর্টেম জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, পেনিস ( পুরুষাঙ্গ ) দ্বারা এই ইনজুরি মোটেও সম্ভব নয় । ওটা পেনিসের বাইরে ভিন্ন কিছু ছিলো ।
এদিকে দিহানের মা এর ভাষ্য, উভয়ের বয়স কম, একজন নাবালিকা এবং আমার ছেলের বয়স ১৯ এর কাছাকাছি। আবেগের বসে উভয়ের শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিলো এবং অপরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছে। মা এর ভাষ্য, পরবর্তীতে যা হয়েছে তা নিতান্তই দুর্ঘটনা। অন্যদিকে স্পষ্টতই চরম বর্বরতা এবং বিভৎসতার প্রমাণ মিললো ময়নাতদন্তে। ব্রুটাল যৌনচার নিয়ে নেটিজনদের একটি সংঘবদ্ধ দল দিহানের পক্ষে নানান বয়ান দিয়েই চলছে। অনেকে আবার ধর্মের দোহাইয়ে কিশোরীর সব দোষ বলার প্রচেষ্টায়। এমনকি কিশোরীর পারিবারিক শিক্ষা, বন্ধুর বাসায়  গিয়ে ধর্মের অবহেলা, বিকৃত বচনের ছড়াছড়ি।  এই দলের কারা অন্তর্ভুক্ত, তা সমাজে একটু চোখ বুলালেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। তবে অন্তত একটি ভালো খবর যে, মাস্টার মাইন্ড স্কুলের সাধারণ শিক্ষার্থীরা সংঘবদ্ধ নেটিজেনদের সব অপপ্রচার ও গুজবের তীব্র নিন্দা এবং দিহানের কঠিন শাস্তি দাবিতে মানব্বন্ধন করেছে। অনেকের মনে থাকার কথা দিল্লির সেই আলোচিত ধর্ষণের কথা । চারজনের সাথে একজন ছিলো কিশোর দিল্লির সেই ধর্ষণের বর্বরতার প্রধান ধর্ষক। ডাক্তারদের ভাষ্য বা ময়নাতদন্তের রির্পোট দিল্লির নির্ভয়াকান্ডের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় ।
আমাদের দেশের সমাজে একটা হাল্কা মনোভাব বেশ লক্ষণীয় যে, গরিবেরা সন্তানদের বেশিরভাগই মাদ্রাসায় হুজুরে আলেমদের হাতে তুলে দিয়ে অসহায় মা/ বাবারা শতভাগ বিশ্বাসের উপর ভর করে সব ভুলে বসে থাকে। তাছাড়া বদ্ধমূল একটি ধারণা হলো, হুজুরে আলেমগণেরা কোরআন/ হাদিসে শিক্ষিত, সুতরাং সেখানে শিশু/ কিশোরেরা শতভাগ নিরাপদ । কিন্তু দেশের খবরের কাগজগুলোতে প্রতিনিয়তই আসছে বিভৎসহ সব ধর্ষণ আর বলাৎকারের খবর। তথাকথিত সেই সব হুজুরে আলেমদের দ্বারা । আবার উল্টোদিকে বিজ্ঞান শিক্ষার মাঝেও এর কম যায় না । ইংলিশ মিডিয়ামে আমার/ আপনার সন্তান পড়া মানেই সে ভেরি মাচ্ মর্ডান এবং ড্যামস্মার্ট এমনটি ভাববার পিতা/ মাতারও অভাব কম নয় । ধনীকশ্রেনীর সন্তানেরাই মূলত ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র/ ছাত্রী।  পরিবারের মূলস্তম্ভ পিতা/ মাতা তাদের সন্তানদের প্রতি কতটা দৃষ্টি রাখেন সেটা নতুন করে ভাববার নিশ্চয়ই সময় হয়েছে। আশা করি পিতা/ মাতারা বিষয়টি দ্বিতীয়বার ভেবে দেখবেন । শুধুমাত্র ইংলিশ মিডিয়ামে পড়লেই ড্যামস্মার্ট হয় না, পারিবারিক শিক্ষাটি অতিব প্রয়োজন জীবনের জন্য।
সত্যি বলতে এই সমাজটিকে বর্তমানে সর্বদিক থেকেই ঘুণে ধরা মনে হয় । মানুষ দিনকে দিন অসহনশীল ও রুক্ষ্ম মস্তিষ্কের হয়ে উঠছে। সামাজে পাড়া- পড়শী, পরিবার- পরিজনদের  মাঝে যে যোগাযোগ এবং সংবেদনশীলতা থাকা প্রয়োজন, সেটা বর্তমানে শূণ্যর কোঠায় বলেই প্রতীয়মান হয় । পরিবারের প্রয়োজনেই পূর্বের সেই অবস্থা বর্তমান পরিবারগুলোতে দেখতে পাওয়া ভার। প্রায় প্রত্যেকটি পরিবারের পিতা/ মাতা দু’জনকেই সংসারের টানে কর্মে ব্যস্ত হতেই হয় । তার মানে মোটেও এই নয় যে, সন্তানদের খোঁজ খবর রাখা সম্ভব নয়, এটা অবিশ্বাস্য।  যা অতিব প্রয়োজন হয়ে দেখা দিচ্ছে, সন্তানদের সাথে একটু বেশি সময় ব্যায় করা। সন্তানদের সাথে একটু বেশি কোঅপারেইশন করা।
পাশাপাশি এমন বর্বর ঘটনায় এটা বেশ পরিষ্কার যে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমল পরিবর্তন ভীষণ জরুরী হয়ে পরেছে। সমাজের সার্বিক অবস্থার বিবেচনায় অতি দ্রুত কিশোর- কিশোরীদের সুস্থ ধারার যৌনতার শিক্ষা স্কুল- কলেজের পাঠ্যবইয়ে আনাটা অতিব প্রয়োজন হয়ে পরেছে । আমাদের সমাজে সমস্যা হলো অভিভাবকরাও সন্তানদের সাথে এত জরুরি ও জীবনের প্রয়োজনীয় বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন না বা করতে সস্তিবোধ করেন না । মূলত আমাদের সমাজে এই বিষয়টিকে লুকিয়ে রাখা হয়, যা কিনা এমন সব বিভৎসহ ঘটনার জন্ম দেয় । এভাবে কিশোর- কিশোরীদের কাছে জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির সমন্ধে সামগ্রীকভাবে অনুধাবনীয় করে না তুললে, আজকে কলাবাগানের এই একটি ঘটনাই আগামীতে শেষ হবার নয় । মনে রাখা ভালো শিশু- কিশোরদের কাছে চেপে রাখা বিষয়টি বুমেরাং হয়ে দেখা দেয় । সুতরাং সমাজকে এই রক্তক্ষরণ থেকে বাঁচতে হলে, আমাদের কিশোর- কশোরীদের সঠিক শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করে সমাজের আগামীর রক্তক্ষরণ বন্ধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবী বলেই মনে করি
বুলবুল তালুকদার 
যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম