Tuesday March2,2021

 

কোন বছরই তো এক বছরের বেশি থাকে না। সেই নিয়ম মেনে দু’হাজার বিশ চলে গেল। কিন্তু রেখে গেল কিছু স্মৃতি। স্মৃতি কখনো বেদনার, কখনো আনন্দের কখনো বা অপমানের। অবস্থানের কারণে মনোভাব সবার একরকম হয়না। যে হারায় আর যে পায়, যে নেয় আর যে দিতে বাধ্য হয়, তাদের স্মৃতি তো একইরকম অনুভুতির জন্ম দেবে না। অতীতের সাফল্য বা ব্যর্থতা দুটোই নাকি শিক্ষা দেয়। সে শিক্ষা নিয়ে মানুষ বর্তমানে কাজ করে আর ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যায়। সদ্য অতীত দু’হাজার বিশ তেমন কোন শিক্ষা কি রেখে গেল আমাদের জন্য? কি শিক্ষা নেব আমরা দু’হাজার বিশ সালের অভিজ্ঞতা থেকে যা আমাদেরকে সহায়তা করবে দু’হাজার একুশ কিংবা তার পরের বছরগুলোর সমস্যা মোকাবিলা করতে? করোনা মহামারী বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যেমন ঝাকি দিয়েছে, তেমনি বাংলাদেশকেও তা মোকাবিলা করতে হয়েছে। এই ঝাকি বা ধাক্কা যেটাই বলি না কেন, তা আমাদের দুর্বলতার দিক উন্মোচন করে দিয়েছে বেশ ভালোভাবেই। দু’হাজার বিশের প্রথম থেকেই করোনার ভয়ংকর আক্রমণের কথা শোনা গেলেও বাংলাদেশে তা শুরু হয়েছে মার্চ মাসের ৮ তারিখে প্রথম রোগী শনাক্তের মাধ্যমে। তারপর থেকে করোনার বিষে জর্জরিত হয়ে দু’হাজার বিশ সাল পার করলো দেশবাসী। প্রত্যক্ষ করলো বিপন্নদশা আর বহন করতে হলো বেদনাময় স্মৃতি।

সর্বব্যাপক সমস্যা আর বিপুল সম্ভাবনাপুর্ণ দেশের নাম বাংলাদেশ। জনসংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর ৮ম এবং আয়তনে ৯৪তম দেশ বাংলাদেশ। বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ৪১। ধারণা করা হচ্ছে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অবস্থান হবে ৩৪। এর পাঁচ বছর পর ২০৩০ সালে বাংলাদেশ হবে ২৮তম বৃহৎ অর্থনীতি। ২০৩৫ সালে ঢুকবে প্রথম ২৫টি দেশের তালিকায়। সাড়ে ১৬ কোটি মানুষ, ১০ কোটি ৯১ লাখ ভোটার আর ৬ কোটি ৩৫ লাখ শ্রমশক্তি আছে এদেশে। দেশের জিডিপি প্রায় ২৮ লক্ষ কোটি টাকা অর্থাৎ প্রায় ৩৩৫ বিলিয়ন ডলার। সে হিসেবে মাথাপিছু আয় ২০৪৬ ডলারের বেশি। অন্য আরেকটি হিসেবে ২০২০ সালে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৩৯ ডলার। এটি পিপিপি বা পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি হিসাবে নিয়ে করা। জাতিসংঘের সদস্য ১৯৩টি দেশের মধ্যে মাত্র ১২ দেশের জনসংখ্যা বাংলাদেশের ভোটার সংখ্যার চাইতে বেশি। কর্মক্ষম জনশক্তির দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীতে সপ্তম বৃহত্তম দেশ। দেশের অর্থনীতি প্রধান চারটি খুঁটির উপর দাড়িয়ে আছে: কৃষি, প্রবাসী, গার্মেন্টস এবং ক্ষুদ্র পুঁজির অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত।

দেশের ১ কোটি ২২ লাখ মানুষ পৃথিবীর ১৬৯টি দেশে কাজ করে যাদেরকে আমরা প্রবাসী শ্রমিক বলি। এই করোনাকালেও তারা ২০ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছে। যাদের কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে বলে সরকার অর্থনৈতিকভাবে স্বস্তিতে আছে। বিশ্বের তৈরি কাপড় রপ্তানি খাতে বাংলাদেশ এখন তৃতীয়। দীর্ঘদিন ধরে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছিল, কিছুদিন আগে ভিয়েতনাম দ্বিতীয় অবস্থানে চলে এসেছে। দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোষাক খাত থেকে। প্রায় ৩৫ লাখ শ্রমিক যুক্ত আছে তৈরি পোষাকখাতে। কৃষি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান খাত। কর্মশক্তির ৪০ শতাংশের বেশি প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ মানুষ যুক্ত আছে এই খাতে। দেশের শ্রমশক্তির বিপুল অংশ যুক্ত আছে স্বল্প পুঁজির অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যা দেশের অর্থনীতিতে ৫০ শতাংশের বেশি অবদান রাখে। নিজ উদ্যোগে কাজের ক্ষেত্র তৈরি করে কর্মসংস্হান ও অর্থনৈতিকগতি বাড়াতে এ খাতের ভূমিকা অপরিসীম। ২০২০ সালে কৃষি ছাড়া বাকি তিনটি খুঁটি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে।

করোনার আঘাতে দৃশ্যমান হয়েছে স্বাস্থ্যখাতের বেহাল দশা। সরকারী স্বাস্থ্যখাতে অবহেলা, অব্যবস্থাপনা, অপচয় ( যাকে সোজা কথায় দুর্নীতি বলা হয়) আর বেসরকারী অর্থাৎ বাণিজ্যিকখাতে চরম মুনাফা লিপ্সা মানুষের অসহায়ত্বকে প্রকট করে তুলেছে। স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ উন্নত দেশগুলোর সাথে তুলনা করার তো প্রশ্নই ওঠে না, বরং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। জিডিপি বৃদ্ধি নিয়ে গর্ব করা হলেও জিডিপির ১ শতাংশের কম এবং বাজেটের ৫ শতাংশের কম বরাদ্দ করে সাধারণ মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা যে করা যায় না তা দেশের মানুষ হাড়েহাড়ে বুঝেছে। এর সাথে যুক্ত আছে দুর্নীতির ভয়াবহতা। বরাদ্দের বিরাট অংশ চলে যায় দুর্নীতির ছিদ্রপথে। যার কিছুটা চিকিৎসা সামগ্রী, যন্ত্রপাতি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী (মাস্ক, পিপিই, গ্লাভস) এমনকি চেয়ার, পর্দা কেনাকাটার নামে দৃশ্যমান হয়েছে। ফলে হাসপাতালের রুগ্নদশায় রোগীরা চিকিৎসা পাবে কতটুকু তা নিয়ে সংশয় স্থায়ী হয়েছে।

রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত বলে পরিচিত গার্মেন্টস খাত ৪০ বছর রাষ্ট্রীয় সকল সহযোগিতা নিয়েও সবল ভিত্তিতে দাঁড়ালো না কেন এ প্রশ্ন জোরেশোরে উঠেছে ২০২০ বছরে। পৃথিবীর সর্বনিম্ন মজুরী দিয়ে কাজ করিয়ে গার্মেন্টস মালিকদের যে বিপুল বিত্তবৈভব তা কারো নজর এড়ায় নি। কিন্তু সংকটের সময় শ্রমিকদেরকে সহায়তার জন্য হাত না বাড়িয়ে সরকারী প্রণোদনা পেতে সবার আগে হাত বাড়ানোর তৎপরতা সবার নজরে পড়েছে। অসহায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের সাধারণ ছুটি দিয়ে গ্রামে পাঠানো আর কারখানা খোলার নামে ডেকে এনে আবার ফেরত পাঠানোর যে নিষ্ঠুর তামাশা হয়েছিল তা ভোলা যাবে না বহুদিন। শ্রমিক ছাঁটাই, মজুরি কমানো, সময় মতো মজুরি না দেয়া, কাজের চাপ ও কর্মসময় বাড়ানো ব্যাপকভাবে বেড়েছে করোনাকালে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রকৃত আয় কমেছে, দুর্দশা বেড়েছে আর অধিকার কমেছে এই করোনাকালে।

কৃষি বাঁচিয়ে রেখেছে বাংলাদেশকে, কিন্তু কৃষক বঞ্চিত হয়েছে সমস্ত দিক থেকে। এমনিতেই কৃষিতে ভর্তুকি বেশ কয়েক বছর থেকে তেমন বাড়ছিল না, কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম কৃষকরা পায় না সেকথা সবাই জানে। করোনাকালে কৃষির জন্য প্রণোদনা ঘোষিত হলেও খোদ কৃষক তার নাগাল পায়নি। সরকারী ব্যবস্থাপনার ঘাটতি আর ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের কারণে ধান, আলু, সবজি, মাছ, মুরগী সব ক্ষেত্রে গ্রামের উৎপাদক কৃষক বঞ্চিত নায্য মূল্য থেকে আর শহুরে ভোক্তা বাধ্য হয় অধিক দামে কিনতে। পিয়াজ, আলুর পর এখন চালের ক্ষেত্রে তা দেখছে জনগণ। আমনের ভরা মৌসুমে এমন দামে চাল মানুষ আগে কিনে খায় নি। একদিকে ৫৫ লাখ টন বেশি উৎপাদন হয়েছে বলে বলা হচ্ছে, অন্যদিকে ২০ লাখ টন চাল আমদানির ব্যবস্থা হচ্ছে। কোনটা সত্য তা নিয়ে বিতর্ক করে লাভ নেই। নির্জলা সত্য এই যে মোটা চাল এখন ৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে যারা দেশে এসেছিলেন বা কাজ হারিয়েছেন তাদের দুর্দশা চরমে। তাদের অনেকেই এখন কী করবে এই চিন্তায় পাগল হয়ে যাওয়ার উপক্রম। তাদের পুনর্বাসনের, নতুন কর্মসংস্থানের বিষয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া দরকার। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কাজ করতে যাওয়ার ক্ষেত্রে অভিবাসন খরচ পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ। ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল তাদের প্রবাসী শ্রমিকদের অভিবাসন খরচ কমানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সব রকমের পদক্ষেপ নিয়ে থাকে, কিন্তু বাংলাদেশে তা ছেড়ে দেয়া হয়েছে রিক্রুটিং এজেন্সির হাতে। ফলে সবচেয়ে বেশি খরচ করে বিদেশে গিয়ে খরচ তুলতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে বাংলাদেশের শ্রমিকরা। অমানবিক পরিশ্রম, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বিশ্রাম আর পুষ্টির অভাব, দুশ্চিন্তা শুধু জীবনীশক্তি নয়, জীবনও কেড়ে নিচ্ছে প্রবাসী শ্রমিকদের। সৌদি আরবে করোনায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যুবরণ করেছে বাংলাদেশের শ্রমিকরা। এতো দুর্দশা সত্ত্বেও প্রিয়জনের জন্য করোনাকালে এযাবতকালের সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স পাঠিয়েছে প্রবাসীরা। দেশ তাদের জন্য কী করবে?

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কয়েক কোটি শ্রমিকের জীবন এখন কঠিন সংকটে। করোনা মহামারি তাদের জীবন কেড়ে না নিলেও জীবিকাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে। রাষ্ট্র তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেনি, তারা নিজেদের মতো করে কাজ সৃষ্টি করে নিয়েছিলেন। করোনা তাদেরকে বেকার করে দিয়েছে। এই বেকারের মিছিলে যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রীয় ২৫টি পাটকল ও ৬টি চিনিকল, এগুলো বন্ধ করার ফলে কর্মহীন শ্রমিকেরা। করোনার আঘাতের চাইতে কর্মহীনতার আঘাত তাদের জীবনকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে।

বিগত ২০২০ সালে সবচেয়ে বড় আরেকটি আঘাত এসেছে শিক্ষা ব্যবস্থার উপর। একটা বছরের পুরোটাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। শিশু হারালো শৈশবের আনন্দ, কিশোর তার কৈশোরের উচ্ছলতা আর যুবক নিমজ্জিত হলো বিষণ্ণতায়। এদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে মানসিক সহায়তাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা ভাবতে হবে। সাথে সাথে শিক্ষকদের বড় অংশ যারা বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন তাদের দুর্দশা এখন চরমে।

অপরদিকে, করোনার আঘাত সত্ত্বেও ২০২০ সালে কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি থামেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী এপ্রিল মে জুনে কোটিপতি বেড়েছে ৩৪১২ জন। এখন এই সংখ্যা নিশ্চয়ই আরো বেড়েছে। কোটিপতি বৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং জিডিপি বৃদ্ধির যে হিসাব আমরা দেখছি তা বৈষম্যকে বহুগুনে বাড়িয়ে তুলেছে।

২০২০ সালে সবাইকে ঘরে নিরাপদে থাকতে বলা হলেও সবাইকে নিরাপদে রাখতে কৃষক কাজ করেছে মাঠে, শ্রমিক কাজ করেছে কারখানায়। পরিবহন শ্রমিক সড়ক নৌপথে পণ্য পরিবহন করেছে, প্রবাসীরা বিদেশে। ফলে অর্থনীতির চাকা কিছুটা সচল ছিল। কিন্তু তাদের জীবনের চাকা ঠিকমত চলেছে কি?

প্রাকৃতিক মহামারী আর মনুষ্যসৃষ্ট দুর্ভোগে ২০২০ তো গেল। সে কি কিছু শিক্ষা রেখে গেল না? দুর্নীতি, লুটপাট, শ্রমশোষণ বন্ধ হয়ে জবাবদিহিতার গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হলে দেশের মানুষ যে ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারবে সে সম্ভাবনাও তো দেখিয়ে গেল ২০২০ সাল।

রাজেকুজ্জামান রতন , বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ।