Monday March8,2021

একটি গানের কলির কথা মনে হলো, ” আমায় প্রশ্ন করে শত নীলধ্রূব তারা, আর কতকাল আমি রব দিশাহারা ” । জানি গানটির সাথে প্রেম / ভালোবাসা জড়িয়ে আছে। হ্যাঁ সেই প্রেম / ভালোবাসা থেকেই বলছি, আমাদের দেশে এত লোক অথচ একজন আন্না হাজারে কি তৈরি হতে পারলো না ? আফসোস।
বিশ্ব মিডিয়ায় এখন ভারতের কৃষক আন্দোলন দেখতে পাই । কৃষকদের দাবী কালো আইন বাতিল ( ইতিপূর্বে সেই আইন নিয়ে লিখেছি বলে আজকে বিস্তারিত কিছু লিখছি না ) । তবে আজকের পত্রিকার খবর ভারতের আন্না হাজারে কৃষকদের দাবীর পক্ষে জীবনের শেষ অনশনে বসবেন। কে এই আন্না হাজারে  ? সবাই নিশ্চয়ই জানেন, তারপরেও ছোট্ট করে বলি ।
একজন আশি বছরের উপরের বয়স্ক মারাঠি । তার প্রকৃত নাম কিসান বাবুরাও হাজারে । আন্না হাজারে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ড্রাইভার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সেই সময়ে স্বামী বিবেকানন্দ, মহাত্মা গান্ধী ও বিনোবা ভাবের গ্রন্থাবলি পাঠ করে দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯৯৭৫ সালে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করে। অতঃপর নিজ গ্রামে ফিরে আসেন এবং প্রথমেই গ্রামবাসীদের মদ্যপানের নেশা ছাড়াবার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। পরবর্তীতে গ্রামের পানি সংকট নিরসনের গ্রামবাসীদের স্বেচ্ছাশ্রমিকের কাজে উদ্বুদ্ধ  করেন এবং পাহাড়ে জলবিভাজিকা উন্নয়ন কল্পে ছোটছোট জলধারা, খাল এবং জল- সংশোধনাগার গড়ে তুলে পানির সমস্যার স্থায়ী সমাধান আনেন ।
তিনি একজন সর্বজন পরিচিত ভারতীয় সমাজ সংস্কারক।  ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের আহমেদনগর জেলার রালেগণ সিদ্দি গ্রামের উন্নয়ন কর্মের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।  তার প্রচেষ্টায় এই গ্রামটি ভারতে একটি আদর্শ গ্রামে পরিনত হয় । এই কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ভারত সরকার ১৯৯২ সালে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে । অতঃপর ভারত সহ বিশ্বের অনেক পুরস্কারে ভূষিত হন। সরকারি দূর্ণীতি রোধে ২০১১ সালে তার আমরন অনশনের কল্যাণেই ভারতে জন লোকপাল বিল আইনরূপে গ্রহণ করা হয় ।
হ্যাঁ ভারতীয় এই পরিচিত সমাজ সংস্কারক ভারতের কৃষক আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ভারত সরকারকে ২০২১ নতুন সালের জানুয়ারির শেষ দিন পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন কালো আইন সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করতে । ভারত সরকারের অনুরোধেই এই সময় দিয়েছে । নতুবা তিনি ফের এবং জীবনের শেষবারের অনশনে বসবেন। ভারত সরকার সহ সমগ্র ভারতবাসী বেশ অবগত আছেন যে, আন্না হাজারে যদি কোনো দাবী নিয়ে অনশনে বসেন, তা হবে বিশ্ব মিডিয়ার জন্য ষোলকলা এবং ভারত সরকারের জন্য গলায় ফাঁস । কেননা বিশ্ব বেশ অবগত আছে যে,  আন্না হাজারের অনশন মানেই ন্যায় ও সত্যের অনশন। সুতরাং সরকার নিশ্চয়ই চাইবে না আশির উপরের বয়সের আন্না কৃষকদের দাবীর পক্ষে অনশনে যাক ।
এবার ছোট্ট করে আমাদের দেশের কথা বলেই শেষ করবো । আমাদের দেশেও এমন সব অনশনের ইতিহাস অনেক আছে। তবে আজকাল আর সেই অনশনের কথা শোনা যায় না । শোনা যায় না কোনো একজন ন্যায়ের আবেদনে ( যে কোনো বিষয়ে) অনশন করছে। অবশ্য সেই ব্যক্তিত্ব সর্বজন স্বীকৃত মানুষের দেখা পাওয়া ভার । তাছাড়া বেশ কিছুদিন ( ইদানিং দেখা যাচ্ছে না ) আবার অনশনের নতুন প্যাটার্ন শুরু হয়েছিলো, প্রতিকী  অনশন।  সেই প্রতিকী অনশন যে কেবলি লোক দেখানো এবং হাসিরপাত্র ছিলো, সেটা মনে হয় আমাদের কঠিন রাজনীতিকরা অনুধাবন করেছেন । তা’না হলে নিশ্চয়ই সেটা প্রতিনিয়তই হতো । বলা যায় সেই প্রতিকী  অনশন ছিলো একদিনের নফল রোজা করার মতন।
শেষে বলি, আন্না হাজারে একদিনে হওয়া যায় না বা কেবলমাত্র পোষাকে হওয়া যায় না । আন্না হাজারে হতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও দৃঢ়মনোবল লাগে । তার চেয়েও বেশি শতভাগ দেশপ্রেম লাগে । জনমানুষদের ভালোবাসতে হয়, সমাজে কাজ করে প্রমাণ রাখতে হয়, মানুষের ভালোবাসায় ভূষিত হতে হয়। সর্বোপরি দেশকে ভালোবাসতে হয় । এত এত দূর্ণীতি, হত্যা, গুম, খুন, ধর্ষণ কত কিছুর কথা শুনি, রাজনীতিকরা বলেই যান। অথচ একটিরও প্রতিকারের পথ দেখাতে পারেন না । সরকার নির্বিকার, রাজনীতিকরা নির্বিকার এবং জনগণেরাও নির্বিকার। এ যেন সব অপকর্মের উৎসব চলছে। কেউ কোথাও উচ্চস্বর তুলে না, পাথর কঠিন হাত উঁচু করে না । আফসোস আমাদের একজন আন্না তৈরি হলো না ।
বুলবুল তালুকদার 
যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম