Tuesday March2,2021

অ্যাডভোকেট আনসার খান : এটি ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, মুসলিমবিশ্ব একসময় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শক্তি হিসেবে বিশ্বব্যবস্হায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো, এমনকি, গোটা পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি ভূ-খণ্ডের ওপর শাসন ও প্রভূত্ব করেছিলো।অবশ্য পরবর্তীতে মুসলমানরা বিশ্বব্যবস্হায় ক্ষমতাহীন হতে থাকে এবং বর্তমান বিশ্বব্যবস্হায় সম্পুর্ণভাবে গুরুত্বহীন অবস্হায় পড়েছে,বিশ্বপরিমন্ডলে মুসলমান জনগোষ্ঠী ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কোনোই ভূমিকা পালন করতে পারছে না।

অথচ বিশ্বব্যবস্হায় নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর প্রায় সবকটি উপাদানই মুসলিমবিশ্বের রয়েছে বলে মনে করা হয়।উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে যে,জনসংখ্যা,মুসলিম রাষ্ট্রের সংখ্যা,মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ভৌগোলিক অবস্হান,অর্থনৈতিক সামর্থ্য,ভূ-রাজনীতি ও ভূ-কৌশলগত অবস্হান, ভূ-অর্থনীতি তথা তেল-গ্যাসের প্রাচুর্যতা-যা শিল্পায়ন ও প্রতিরক্ষা শিল্প উৎপাদনের পরিচালিকা শক্তি,- এই জ্বালানী শক্তির ওপর মুসলিমবিশ্বের কয়েকটা দেশের রয়েছে একাধিপত্য। তেল-গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব অচল হয়ে পড়তে পারে।মুসলিমবিশ্ব মূল্যবান এ প্রাকৃতিক সম্পদ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মুসলিমবিশ্বের আধিপত্য ও প্রভাব বৃদ্ধির জন্য কাজে লাগাতে পারে। আন্তর্জাতিক নৌরুটের ওপর রয়েছে মুসলিম বিশ্বের প্রভাব বিস্তারকারী সুবিধা,রয়েছে সামরিক সক্ষমতা,আছে আন্তর্জাতিক সংস্হাসমূহ,রয়েছে ঐতিহ্যগত আদর্শ ইত্যাদি।এসব দিকগুলো বিবেচনায় বিশ্বব্যবস্হায় নীতিনির্ধারণে ও নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে মুসলিমরাষ্ট্রগুলোর বিশেষ ভূমিকা পালন করার সূযোগ রয়েছে।

মুসলিমবিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর অবস্হান পৃথিবীর মধ্যভাগে অবস্হিত,যা বিশ্বের ‘হিট বেল্ট ‘খ্যাত সাউথ-ইস্ট এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া থেকে নর্থ-ইস্ট আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত,-বিরাট ওই ভূ-খণ্ডে বিশ্বের প্রায় ৫৭-মুসলিম রাষ্ট্রের অবস্হান।

বিশ্বের মোট ৭.৮ বিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্যে এক-চতুর্থাংশ জনসংখ্যা ইসলাম ধর্মের অনুসারী।খ্রিস্ট ধর্ম অনুসারীদের পরেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মানুসারী হলো ইসলাম ধর্মের। উল্লেখ্য,বিশ্বে খ্রিস্ট ধর্মানুসারী লোক সংখ্যা হলো,-২.১৬৮-বিলিয়ন বা ৩১.৪ শতাংশ। সারা বিশ্বের ৫৭- মুসলিম রাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রায় দু-শতাধিক রাষ্ট্রে ১.৯ বিলিয়ন বা ২৩.২- শতাংশ মুসলমান মানুষের বসতি রয়েছে।এর মধ্যে ৬০-শতাংশ এশিয়ায়, ২০-শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকায় এবং সাব-সাহারান আফ্রিকায় ১৫-শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠী বসবাস করে।অন্যদিকে, ৩.৪-শতাংশ মুসলমান ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের দেশগুলোতে বসবাস করে।(সূত্র:ওয়ার্ল্ডোমিটার)।

ভূ-কৌশলগত দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,মুসলিমবিশ্বের তিনটি মূখ্য অঞ্চল সাউথ-ইস্ট এশিয়া,মধ্যপ্রাচ্য এবং নর্থ আফ্রিকা জুড়ে বিশ্বের জলপথের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট, চ্যানেল এবং স্ট্রেইট,অর্থাৎ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবর্তী মালাক্কা প্রণালী,মধ্য-পূর্বাঞ্চলিয় মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যভাগ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে হরমুজ প্রণালী এবং বাব-আল-মানদেব ও সুয়েজ খাল প্রবাহিত হয়েছে মুসলিম প্রধান নর্থ-ইস্ট এবং হর্ণ অব আফ্রিকা অঞ্চল জুড়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ দার্দানেলিশ ও বসফরাস প্রণালীও মুসলিমবিশ্বের সাথে সংযুক্ত এবং এগুলো আন্তর্জাতিক ট্রান্সপোর্টেশন,আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বানিজ্য,দ্রব্যাদি পরিবহণের জন্য,বিশেষকরে, তরলীকৃত তেল,গ্যাস ও ক্রুডওয়েল এবং সমরাস্ত্র বিশ্বের নানান দেশে আমদানি-রফতানির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হিসেবে কৌশলগত কারণেই গুরুত্বপূর্ণ কারণে এসকল জলপথগুলো নিয়ণ্ত্রণ করা বৃহৎ রাষ্ট্রুগুলোর জন্য অপরিহার্য এবং এগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা, দ্বন্দ্ব ও সংঘাত ঘটতেও দেখা গেছে অতীতে এবং এখনো অব্যাহত আছে।প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সময়কালে এবং এমনকি,উপসাগরীয় যুদ্ধকালীন সময়েও সৈন্য ও যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সমরাস্ত্র সরবরাহ করতে এসব জলপথগুলোর কয়েকটা ব্যবহার করা হয়েছে।তাই বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাব ও আধিপত্য স্হাপনের ক্ষেত্রে ওই জলপথগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অতীব জরুরি বলে মনে করেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকগণ।

তাছাড়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আরব উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বরাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্যও অপরিহার্য হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে সূদুর অতীতকাল থেকে।অর্থাৎ এটি বলা সঙ্গত হবে যে,-“কন্ট্রোলিং মেরিন রুটস হ্যাজ প্লেইড এ ভাইটাল রুল ইন গেইনিং এ ডমিন্যান্ট পজিশন ইন গ্লোবাল সিস্টেমস উইথইন লং সাইকেলস অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স।” ১৯৪৫-সালে সমাপ্ত হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে বিশ্বরাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ ও বিশ্বের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হওয়ার প্রেক্ষিতে উপসাগরীয় অঞ্চলসহ গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোর ওপর প্রভাব ও আধিপত্য স্হাপনের জন্য ওই রাষ্ট্র দু’টি অব্যাহত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক কার্যক্রমে লিপ্ত হয়েছিলো। যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের ভাইটাল স্বার্থ রয়েছে বলে সর্বদা মনে করে থাকে।১৯৮০-সালে প্রদত্ত এক বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার বলেছিলেন,-“এন এটেম্পট বাই এনি আউটসাইড ফোর্স টু গেইন কন্ট্রোল অব দ্য পার্সিয়ান গালফ রিজিওন উইল বি রিগার্ডেড এজ এন এসাল্ট অন দ্য ভাইটাল ইন্টারেস্টস অব দ্য ইউ,এস,এ, এন্ড সাস এন এসাল্ট উইল বি রিপিল্ড বাই এনি মিনস নেসেসারী, ইনক্লুডিং মিলিটারি ফোর্স।”

তেল-গ্যাসের প্রাচুর্যতার জন্যও উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নজর বিশ্বশক্তিগুলোর।পরিসংখ্যান অনুযায়ী,বিশ্বে তেল-গ্যাসের মোট মজুতের ৬০-শতাংশ মজুত রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে। উল্লেখ্য,বিশ্বের অন্যতম পরিচালিকা শক্তি হলো তেল-গ্যাস।বিশ্বের তেল-গ্যাসের চাহিদার অধিকাংশ রফতানি ও সরবরাহ হয়ে থাকে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিমবিশ্বের দেশগুলো থেকে।১৩-সদস্যের তেল-গ্যাস রফতানিকারী আন্তর্জাতিক সংস্হা-‘ওপেক’ বিশ্বের মোট ৪০-শতাংশ তেল উৎপাদন ও রফতানি করে থাকে এবং সংস্থার দু’টি সদস্য দেশ,ভেনেজুয়েলা ও ইকুয়েডর ব্যতীত অন্য সব সদস্য রাষ্ট্রগুলো মুসলিম রাষ্ট্র। বিশ্বের প্রমাণিত তেল-গ্যাসের রিজার্ভের ৮০-শতাংশই ওপেকভূক্ত দেশগুলোতে রিজার্ভ রয়েছে বলে পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়।কাজেই তেল-গ্যাস উৎপাদনকারী মুসলিমরাষ্ট্রগুলো মুসলিমবিশ্বের স্বার্থে এসব প্রাকৃতিক সম্পদ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্বব্যবস্হায় স্হান করে নিতে পারে।কিন্তু মুসলিমরাষ্ট্রগুলো সেটি করতে পারেনি নিজেদের নানাবিধ দূর্বলতার কারণে।

এছাড়া,মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল হলো ইসলাম ধর্মের উৎপত্তিস্হল ও কেন্দ্র এবং ওই অঞ্চল থেকেই পরবর্তীতে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিলো ইসলাম ধর্ম।আর প্রতিবছর সৌদিআরবে ইসলাম ধর্মের মানুষের বৃহৎ হজ্জ জমায়েত অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে,যেখানে প্রায় তিন মিলিয়ন লোকের সমাবেশ ঘটে।বিরাট ওই সমাবেশ ইসলাম ধর্মের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। কেননা,সারা বিশ্বের সুন্নি ও শিয়া মুসলমান তাদের মধ্যেকার ভেদাভেদ ভূলে একসাথে হজ্জ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে থাকেন।

মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে গঠিত,-“ইসলামিক সম্মেলন সংস্হা বা ওআইসি”জাতিসংঘের পরেই বিশ্বের বৃহত্তম একটি আন্তর্জাতিক সংস্হা,যার সদস্য সংখ্যা ৫৭ এবং আরব রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে আছে,-“আরব লীগ।”

সামরিক সক্ষমতার দিক থেকেও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তুরস্ক,ইরান,পাকিস্তান,মিসর ও ইন্দোনেশিয়া আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন এবং পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন রাষ্ট্র।

উপরোক্ত উপাদানসমূহ ইসলামিবিশ্বের জন্য দু’টি পাওয়ার রিসোর্স অর্থাৎ ‘হার্ড পাওয়ার ও সফ্ট পাওয়ার’গঠন করেছে বলে মনে করেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকগণ। হার্ড পাওয়ার ও সফ্ট পাওয়ার ক্ষমতার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বৃহৎ শক্তির সক্ষমতার প্রকাশ।

মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর বিশ্বশক্তি হওয়ার বা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ও নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখার মতো এতোসব সুবিধা ও উপাদান থাকাসত্বেও মুসলিম রাষ্ট্রগুলো অবহেলিত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ও বিশ্ব পরিমণ্ডলের নীতিনির্ধারণে।এজন্য একাধিক কারণ চিহ্নিত হলেও মুসলিমবিশ্বের মধ্যে তীব্র অনৈক্য, পারস্পরিক সন্দেহপ্রবণতা এবং বিশ্বাসহীনতাকেই দায়ি করা হয়।

লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।