Tuesday March9,2021

পরের ধনে পোদ্দারি বলে বাংলায় একটি প্রবাদ আছে। মূলত বিশ্ব পরিমণ্ডলে সকল দেশের সরকারই  জনগণের ঘাম আর রক্তের আর্জনে পোদ্দারি বা বাহাদুরি করে । যদিও বিশ্বের দু’ চারটি পরাশক্তির দেশ ভিন্ দেশের ধনেও পোদ্দারি করে অস্ত্রের জোরে। সেটা আবার বিশ্বের আরেক রাজনীতি বা অপরাজনীতি ।  সেই অপরাজনীতি থেকে কমশক্তির দেশগুলো বের হয়ে আসতে পারে না বলে, ব্যবহারিক অর্থেই ব্যবহারিত হয়। মহাসত্য হলো কমশক্তির দেশগুলো উপায়হীন নানান কারণে ।
লক্ষণীয় যে, ভারত জুড়ে কৃষি সংস্কার আইন বাতিলের দাবিতে কৃষক আন্দোলন প্রয়োজনের খাতিরেই তুঙ্গে, কাটেনি অচলাবস্থা।  খবরে প্রকাশ শনিবার দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কৃষকদের বৈঠকে কোন ফল না হওয়ায় আগামী বুধবার ফের বৈঠকে বসবে। কৃষকদের স্পষ্ট ভাষ্য, ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের হাত ধরে আসা কৃষি সংস্কার আইনগুলো তাদের জীবন – জীবিকাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিবে । বিতর্কিত এই কৃষি সংস্কার আইনগুলো বাতিলের দাবিতেই ভারতের রাজধানী দিল্লির প্রান্তে অবস্থান নিয়েছে দেশটির হাজারে হাজারে কৃষক। বর্তমানে কৃষকদের আন্দোলনের মুখে মহাহড়কের যান চলাচলও বন্ধ রয়েছে । কৃষকদের বেশ পরিষ্কার দাবি, সরকারকে আইনগুলো বাতিল করতে হইবে, বেশ । উল্লেখ্য যে, ১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারত। অথচ এর অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা এই কৃষি খাতের সাথে জড়িত।  এমনকি ভারতের ২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির ১৫ % কৃষির উপরে নির্ভরশীল।
ভারতের কৃষক আন্দোলন নিয়ে প্রতিদিনই ভারত সহ বিশ্বের অনেক দেশের জাতিয় পত্রিকাতেই খবরাখবর আসছে। শুক্রবার বিজেপির প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর জন্মদিন ছিলো । সেই উপলক্ষ্যে ফাগওয়ারার একটি হোটেলে জড়ো হয়েছিলেন বিজেপির কিছু রাজনৈতিক নেতা । সেই সময়ে হোটেলের সামনে বিজেপি নেতাদের ঘিরে কৃষকরা বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন ভারতীয় কিসান ইউনিয়ন ( দোয়াব ) এর কর্মিরা । কৃষক বিক্ষোভের আঁচ সহ্য করতে না পেরে, শেষঅব্দি বিজেপির নেতারা পুলিশি প্রহরায় হোটেলের পিছন দরজা দিয়ে পালাতে বাধ্য হন । লক্ষ্য করুন, একদিকে টেবিলে সমাধান হচ্ছে না এবং অন্যদিকে ক্ষমতাসীন নেতাদের পালাতে হচ্ছে পিছন দরজা দিয়ে। আন্দোলনের তেজস্বিতায় এটা স্পষ্ট  হয় যে, কৃষকরা তাদের জীবন- জীবিকার কারণেই তাদের ভাষ্যের কালো আইন শতভাগ বাতিল না করে কোনো কিছুই মানবে না বা তাদের পক্ষে মানা সম্ভব নয়। সুতরাং সামনে দেখার বিষয় বিজেপি সরকার কিভাবে এই আন্দোলনকে স্তিমিত করে ? বল প্রয়োগ না সমঝোতা  ?
কেন বল প্রয়োগ বা সমঝোতার কথা বলছি । বিজেপি সরকার বল প্রয়োগেই বেশি বিশ্বাস করে । সাম্প্রতিককালের ভারত শাসিত কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ করেছিলো প্রচণ্ড বল প্রয়োগে। ৩৭০ ধারা বল প্রয়োগ করে বিলোপের মধ্যে দিয়ে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেওয়া ভারত সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে জেলা উন্নয়ন পরিষদে ( ডিডিসি ) ভোটের মাঠে নেমেছিলো গুপকার জোট । ফলাফল সেই বিরোধীতার পক্ষেই মত দিয়েছেন বেশিরভাগ ভোটার । ভারতীয় পত্রিকার খবর কাশ্মীরের ২০ টি জেলার ১৩ টিতেই জয়ী হয়েছে গুপকার । কাশ্মীরে বিজেপি এবং কংগ্রেস এই দুই দলকে বাদ দিয়ে গুপকার জোট এবং এই জোট একাই জিতেছে ১০০ বেশি আসনে । অন্যদিকে বিজেপি ৭৪ আসন পায় । একক দল হিসেবে বিজেপি এখনও বৃহৎ দল থাকলেও এই ফলাফলে বিজেপির মাথায় বাজ পড়ার অবস্থা হয়েছে । জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের পর এটাই ছিলো প্রথম ভোট । কাশ্মীরে প্রথম ভোটেই বিজেপি ধরাশায়ী।
বিজেপি সরকার একক পরিসরে ভারত সরকারে ক্ষমতায়ন হবার পর পরই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল অনুমোদন দেয় এবং কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার করে নেয় বল প্রয়োগে ।  এই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়েও সমগ্র ভারত সহ বিশেষ করে ভারতে আসাম অঞ্চলে নানান বিক্ষোভ ও ক্ষোভের তৈরি হয়েই আছে। বর্তমানে চলছে কৃষকদের নিয়ে কালো আইনের প্রয়াশ । কাস্মীরের ভোটের ফলাফল দেখে কোনা জরিপ ছাড়াই বলা যায়, আগামীর জাতিয় নির্বাচনে বিজেপি সরকারকে এই সব কিছুর খেসারত দিতেই হবে। কেননা ভারত এখন পর্যন্ত বিশ্বের বিশাল গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবেই পরিচিত। গণতান্ত্রিক দেশে বল প্রয়োগ মানেই সরকারের নড়বড়ে অবস্থার জানান দেয়। বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ যুক্তরাজ্য।  তাদের অধিনেই রয়েছে স্কটল্যান্ড।  গত বছর স্কটল্যান্ড বৃটিশদের সাথে থাকবে কি থাকবে না ? এই প্রশ্নে গণতান্ত্রিক চর্চায় কোনো বল প্রয়োগ না করে সাংবিধানিক পদ্ধতিতে জনমত পরীক্ষার জন্য ভোটের বন্দবস্ত করে। ভোটের ফলাফল এক সাথে থাকার পক্ষেই রায় আসে এবং তার চর্চা এখনও চলছে। এটাকেই বলে দল মত নির্বিশেষে গণতন্ত্রের সঠিক চর্চা।  যেহেতু একটি রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণ।
ভারতের আবার মনের খায়েস আছে চীনের সাথে টেক্কা দিয়ে বিশ্বে ক্ষমতাশালী দেশে রূপান্তর হবার । বর্তমানে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথেও তেমন মধুর সম্পর্ক দেখা পাওয়া ভার । জ্বলন্ত উদহারণ নেপাল/ শ্রীলঙ্কা।  পাকিস্তানতো তাদের চিরশত্রু। মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক যতটা অধীর আছে, তারচেয়েও চীনের সাথে মিয়ানমারের বেশি দহরম মহরম সম্পর্ক।  বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্ব বা স্বামী/স্ত্রী যে সম্পর্কই থাকুক, বাংলাদেশের জনগণের মনোভাব ভারত সরকার কতটা অনুভব করতে পারে ? সেটা মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন বটে । সেই সূত্রে বলাই বাহুল্য বিশ্বে মহাশক্তিধর হওয়া বহুদূর, এমনকি এশিয়া অঞ্চলেই শক্তি না  হিমশীতল হয়ে যায়।  সেটা হবে এই অঞ্চলের জন্য আফসোসের । এতবড় গণতান্ত্রিক দেশ বলে পরিচিত ভারত অথচ প্রশ্ন করাই যায় ভারত কি সর্বক্ষেত্রেই গণতন্ত্রের চর্চা করে ?  নাকি কেবলমাত্র ক্ষমতার রদবদলের ? বাংলাদেশে সেই সামান্য গণতান্ত্রিক চর্চাও চলছে কিনা ? নাকি, পুরো গণতন্ত্রই চাঁদের দেশে বেড়াতে গেছে , জনগণই ভালো বলতে পারবে। গণতন্ত্র চর্চায় শেষ অব্দি চাঁদকেই না মাটিতে নামিয়ে আনতে হয়, সময় নিজেই উত্তর দিবে নিশ্চয়ই।
বুলবুল তালুকদার 
যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম