Sunday February28,2021

বাংলাদেশে এত দ্রুত ঘটনার পর ঘটনা ঘটে বা ঘটানো হয় উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত ( অনেকের ধারণা ) । যাই হোক এত ঘটনা ভাবতেই অবাক হতে হয় । এমনকি এত ঘটে যে একটু সময়ের টানাটানি থাকলেই ঘটনার সাথে আপডেট থাকাই মুশকিল।  লেখা তো দুরের কথা । মাঝে মাঝে মনে হয় ফেইসবুকের জন্য রীতিমতো পায়- পেয়াদা রাখা প্রয়োজন আপডেট থাকার জন্য।
লিখতে চেয়েছিলাম কুষ্টিয়ার এসপি সাহেবের ভাইরাল হওয়া বক্তব্য নিয়ে এবং সাথে ৪২ জন নাগরিকদের  নির্বাচন কমিশনের বিষয়ে প্রেসিডেনট বরাবর আবেদন নিয়ে। লিখতে গিয়েই পত্রিকায় দেখলাম বিএনপির  মির্জা আব্বাস সাহেবের আরেক তীর্যক বক্তব্য । আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ করেনি যুদ্ধের গল্প শুনেছে মাত্র ।  এখন নিজেই বুঝতে পারছি না, কোন বিষয় নিয়ে আগে লেখা উচিত । আওয়ামী লীগের কাদের সাহেব আর বিএনপির রিজভি সাহেবতো রীতিমতো বাক্যবাণ নিয়ে সব বিষয়েই পত্র- পত্রিকা বা টিভির পর্দায় থাকেনই, সাথে পাশ থেকে তথ্যমন্ত্রী হাসান সাহেবের অতিবচন জাতিয় কথাও জনগণকে বিনি পয়সায় বেশ আনন্দ দেয় বলেই মনে হয় ।
যাকগে ভিডিওটির কথায় আসি। ভিডিওটি বেশ ভাইরাল এবং তারচেয়েও বেশি যা হচ্ছে তাহলো বর্তমানে হুজুরে আলেমগণের ওয়াজ বা ইউটিউবে করা প্রচার প্রচারণা এবং সেটা এসপি সাহেবকে বেশ ধুয়ে দেওয়াও হচ্ছে বটে ।  তবে লক্ষ্য করলে বেশ ইন্টারেস্টিং বিষয় দেখা যায় যে, যেহেতু পুলিশের লোক বলেছেন, হুজুরেরা বেশ সাবধানেই কথা বলছেন। আবার অনেক হুজুরেরা একটু আগ বাড়িয়েই বলছেন । যেহেতু কথা উঠেছে একটি সরকারি চেয়ার পার্সন থেকে, সুতরাং কথার পিঠে কথা উঠবেই, এটাই স্বাভাবিক। তবে আমাদের বড় সমস্যা হলো আমরা কথা বলি বটে তবে স্থান- কাল- পাত্র বিবেচনায় নেই না এবং জিহ্বায় আমাদের কোনো দাগ কাঁটাও পরে না ।
লক্ষ্য করুন, এসপি সাহেবের বক্তব্য হলো কিভাবে ওরা  টাকা পায়  বা কামায় বা তাদের কি করা হবে  ( ভিডিওটি সবার দেখা বলেই বিস্তারিত লিখলাম না ) । আবার উল্টোদিকে হুজুরদের বক্তব্য হলো, তুমি পুলিশ ঘুষ খাও, আবার তুমি বড় কথা বলো ? বেশ যুক্তিযুক্ত কথা বটে। তবে হুজুরেরা আবার ভুলে বসেন বেদাত/ শিরক শব্দগুলো । তা কিভাবে ?
লক্ষ্য করলে দেখবেন, সমাজের দূর্ণীতিবাজ বা দুই নাম্বার পথে রোজগার করা ধনীকশ্রেনীরা মসজিদ- মাদ্রাসা বা পীরের জন্য দুই হাতে টাকা ঢেলে দেন । এটা  আবার গ্রহণ করতে মসজিদ- মাদ্রাসা বা পীরের দরগার কোনো অসুবিধেই হয় না । এটা সরাসরি বেদাত – শিরক ( হাদিস ঘেটে দেখতে পারেন )। এই বেদাত- শিরক জেনে বুঝে করে এবং উল্টো দু’ হাত তুলে দোয়াদরুদ করে দেন, হে মাবুদ তুমি ওমুক- তমুক বান্দার দান খয়রাত কবুল করে নাও । তাকে এই দানের জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান দান কর- আমিন, ইত্যাদি ।
এই ধনীকশ্রেনী যে মসজিদ- মাদ্রাসা বা পীরের দরগায় দান করে মঞ্চের সামনের আসন দখল করেন, শুধু তাই নয় । এই ধনীকশ্রেনীরা রাজনীতিতেও । মানে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যেও দু’হাতে দান খয়রাত করে, দলগুলোর চাবিকাঠি নাড়াচাড়া করেন এবং সামনের কাতারেই অবস্থান করেন এবং বলাই বাহুল্য দেশে গণতন্ত্রের গ এর চর্চা নাই, এতে এই ধনীকশ্রেনীর বেশ লম্বা হাত নিশ্চিত আছে বলেই প্রতীয়মান হয় । তবে ফারাকটি হলো এখানে বেদাত- শিরকের বালাই নাই।
পুলিশ অফিসারের বিষয়ে দু’ শব্দ না বললে যথারীতি অন্যায় হবে বলেই মনে করি । পুলিশ বাহিনীর নানান কর্ম বা বচন নিয়ে অনেকবার লেখেছি । মনে আছে নিশ্চয়ই সবার , মাছের রাজা – দেশের রাজার কথা । পুরনো বলে সেটা আর তুলে আনছি না । প্রশ্ন হলো প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী কি এভাবে বা এ ভাষায় কথা বলতে পারেন ? উত্তর হলো সরাসরি না এবং এটা  রাষ্ট্রের আইনের লোক হয়ে সরাসরি আইনের বরখেলাপ । পুলিশ বাহিনীর জন্য এটাতো সরাসরি চরম অপমানের । পুলিশ জনগণের বন্ধু বলেই নয়, এটা পুলিশ আইনেরই সরাসরি বরখেলাপ।
দেশের সকল প্রতিষ্ঠান চলে জনগণের টাকায় । তবে এখানে আবার একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রাষ্ট্র পরিচালনাকারীরা বেশ সুন্দর করে বানিয়ে রেখেছেন । দেশের সাংসদরা একটি সম্মানিভাতা গ্রহণ করেন । আর সকল প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা সরাসরি বেতন নেন । দু’টাই কিন্তু জনগণের টাকায় । নামে কি আসে যায়।  বলছিলাম দেশের মাথা থেকে শুরু করে পেয়াদা পর্যন্ত সবাই কিন্তু জনগণের ঘামের টাকাতেই চলেন। সুতরাং দেশের জনগকে সম্মান করাটাই বাঞ্ছনীয় বটে ।
লেখার শেষে বলি, আমাদের দুটি কান এবং একটি মুখ বিধাতা দিয়েছেন। বিধাতার এখানে কি মনোবিজ্ঞান ছিলো, জানিনা । তবে সাধারণ মনোবিজ্ঞানে বোঝাই যায়, বেশি শোনা এবং কম বলা । তবে আমরা সেটার উল্টোরথেই হাঁটতে বেশি ভালোবাসি।  এই তাবৎ দুনিয়ায় যত বড় বড় রথি- মহারথি, বিদ্যান, দার্শনিক, জ্ঞানীগুণীজন ছিলেন, তাদের প্রায় সবার জীবনিতেই জীবনের ভুলের বা অপরিপক্কতার বিবরণ পাওয়া যায়।  তাদের  ভুলের কথা উল্লেখ করছি কারণ, মানুষ মাত্রই মুখ ফোঁসকে বা হঠাৎ ভ্যাবাচ্যাকায় পড়ে বা বোকার মতন দু’ চারটি শব্দ বের হতেই পারে ।
তবে আমাদের দেশের সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে রথি- মহারথিদের লক্ষণটি কিন্তু মোটেও তেমনটি নয় । মোটাদাগে সব কিছু কেমন জানি ইচ্ছাকৃত বা উদ্দেশ্যেমুলক থাকে। হোক সেটা ধর্ম বা রাজনীতি বা সমাজনীতে । লক্ষ্যণীয় যে, আমাদের হুজুরেরা যেমন হাজার বছরের বাংলার ইতিহাস- সংস্কৃতি- ঐতিহ্যেকে বৃদ্ধা অঙুলি প্রদর্শন করে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে বুড়িগঙ্গায় দিনে দশবার চুবায় বা সুযোগ বুঝে সরাসরি বঙ্গবন্ধু এবং রাষ্ট্রের আইন নিয়েও কটাক্ষ করতে কার্পণ্য করেন না । অথবা দেশের বড় ও জ্ঞানীজনদের নিয়ে বাজে মন্তব্য করা । অথবা ধর্ম নিয়ে কাফের- মূর্তাত বলা বা বিধাতার বিচার নিজেদের হাতেও তুলে নেওয়া, এমনকি সরাসরি বর্দোয়া বা হিংসা বিদ্বেষ ছড়াতেও বেশ পারদর্শী বটে । ঠিক উল্টোদকে ক্ষমতার জোরে জনগণের কর্মচারীদের হুমকি- ধামকি সেটাও সরাসরি সংবিধানের বরখেলাপ, শতভাগ।
সত্যি বলতে আমরা সবাই কেমন জানি অসহিষ্ণু, ধৈর্যহীন, অধীর, বেপরোয়া, সহনশক্তিহীন, অস্থির, উতলা, ধৈর্যচ্যুত হয়ে যাচ্ছি দিনকে দিন। এগুলো একটি রাষ্ট্রের সমাজে দেখা দিলে সেটা কোনো ভালো লক্ষণ মোটেও নয়। এগুলো সাধারণত রোগের লক্ষণ। বর্তমানে দেশের প্রায় সবার মাঝেই এমন লক্ষণ বিদ্যমান বলেই মনে হয়। সবার কল্যাণে রাষ্ট্র নিজেই না রোগী হয়ে যায়।
বুলবুল তালুকদার 
যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম