Thursday March4,2021

 সে একা অনেকক্ষণ ধরে ট্রেনের একটা কামরায়। গাড়িতে বসে বসেই ঘুমাচ্ছিল। ভাবছিল, জুড়ছিল, ভাঙ্গছিল, চোখ মেলছিল আবার বুজে আসছিল আপনিই।তার বুকে মাথায় অহরহ যন্ত্রণা, চোখে জ্বালা, মন অস্হির।কাশিটা বেড়েছে। চোখ বুজে রেখেও সে ঘুমাতে পারে না। এইমাত্র আরেকজন এসে বসে মুখোমুখি আসনে। একেবারে পরিচিত গায়ের গন্ধ অকস্মাৎ । স্নায়ুর মধ্যে বিস্ফোরণ । অনেক সময় আশ্চর্য রকমের অস্বাভাবিক ব্যাপারগুলো স্বাভাবিক হয় দাঁড়ায়। যেভাবে সক্কলে চলন্ত গাড়িতে অপরিচিত সহযাত্রী একজন আরেকজনকে দেখে, তাকায়। সেইভাবে শান্ত চোখে সে দেখে। অল্প আলোর নীচে টকটকা গোলাপী ফর্সা সুন্দর মুখখানিতে কিছু বয়সের আঁচড়। ভারী মিষ্টি দেখতে আজও। ঝটকা লেগে সে নড়েচড়ে উঠলো। দ্বিতীয় শ্রেণীর কুপে। নামে দ্বিতীয় শ্রেণী। কিন্তু অধিকাংশ বগির কাঠের সীট আছে উপরের গদি নেই। মাথার উপরের পাখা ঘুরেনা। এখানে যা ঢিমে আলো। পাশের বগিতে বুঝি আলো নেই, অন্ধকার । বাথরুম অপরিস্কার নোংরা, কখনও পরিমাণ মতো জল আসেনা। বসতে না বসতেই নবাগতা কথা শুরু করে । —-আজ গাড়ির গতি বড় দ্রুত। একটু হলেই ফেল মেরেছিলাম আর কী? —-গাড়ির গতি ঠিক আছে। আমাদের সময়টা এখন এমনই দ্রুত গতির। অনভ্যাস বশত: ঘড়ির কাঁটা সঠিক দেখতে ভুল করার। —–হু, তা হতে পারে। বয়স একেবারে ফেলনা না। উত্তর এলো অস্ফুট। —-তা হতে পারে নয়, তাই হয়েছে। অনেক দিনের সখ্যতা যেন এরকম একসাথে হেসে উঠে দুজনে। মুখ দুটো পরিস্কার দেখায় না। দুই বুড়ো বুড়ি। দুজনেরি বয়স ভারির দিকে।চোখে পুরো লেন্সের চশমা। দূর পথের যাত্রায় সহযাত্রীর সাথে ভাব জমিয়ে পূর্ব পরিচিত ঢঙে কথা শুরু করে। —–এই লাইনে এতো ভিড়ভাট্টা থাকে। গ্যেটে বাত, কোমর পিঠে ব্যথা নিয়ে প্রায়ই প্যাসেঞ্জারি করি। অধিকাংশ সময় বসার জায়গা পাইনা। বয়স্কা আর মহিলা বলে লোক সমীহ করে সীট ছেড়ে দেয়। কিন্তু আজকের মতো এতো ফাঁকা হয় না। —–হ্যাঁ । তার উপরে সুন্দরী হলো তো কথাই নেই। তুমি এই বয়সেও তেমন আছো। তোমাকে দেখে খুব ভালো লাগলো। কেমন আছো? —–এতোবড় ট্রেন। গোটা পঞ্চাশেক লোক হবে বোধহয় কিংবা তারো কম। ঐদিকে বোধহয় কোনো গন্ডগোল,,,,,, —–আজকাল লকআউট, ধর্মঘট নিত্য নতুন ঘটনা নয়। পিকেটিং, ধরপাকড় জোর দেখলাম পিছনে । ——তাই ভাবছিলাম পেট পুরে হাজার যাত্রী নিয়ে চলে। হঠাৎ এমন পেটখালি কেন ট্রেনের ? ——-তুমি আছো কেমন, ভালো আছো? ——আর থাকা। না থাকার চাইতে অনেক বেশী টিকে যাচ্ছি। ও মশাই হঠাৎ এইসব কথা জিজ্ঞেস করছেন, আপনিই বা কে? ——হাতে সময় আছে, দীর্ঘ অবসর। তুমি সর্বাঙ্গে সুন্দরী সহযাত্রী। সমস্ত মানুষ থেকে আলাদা। শীতের মধ্যেও মন বেপরোয়া রোমাঞ হয়ে যায়। ——- ট্রেনে কতকক্ষণ? আর কিছুক্ষণ আছেন নিশ্চয়ই? ——-মিনিট ত্রিশ ধরে চলছি । অনেক দূরের পথে যাবো , তা ধরো ঠিক ঠিক চব্বিশ ঘণ্টার রাস্তা। গন্তব্য শেষ স্টেশন। তোমার ? ——-আমিও আপনার পথের পথিক। শেষের স্টেশনে নাববো। একা একা লম্বা ভ্রমণ, পাক্কা চব্বিশ ঘণ্টা। কতক্ষণ মুখ বুজে থাকা যায়? কি করা যায় বলুন তো? ——- একা ভ্রমণের মধ্যে আনন্দ লুকানো আছে। একটুক্ষণ একাই যারা চলেছেন তারাই বলবেন কথাটা। ——- উহূহূ মোটেও তা না। আমি বাপু কথা না বলে থাকতে পারিনে। —— সে তুমি বরাবরই। আমার কথা শুনতে আপত্তি নেই বরং ভালোই লাগছে। বুকের মধ্যে মৃত্যু। একেক দিন একেক রকম সাধ হয় । অনেক কাল মুক্ত খোলাতে বসে গল্প করা হয়না । ——- যাক বাঁচালেন। আপনি তবে রাগী কিংবা রাশভারি নন? আশাকরি আমাদের সময় ভালোই কাটবে । ——- তবে তুমি,,,,,তুমি,,,এবং তুমি। আমার নাম,,,,,,, ——- না বাবা না। আমি ফট করে অল্প পরিচিত কাউকে তুমি বা নাম ধরে বলতে পারি না। আমরা একই পথে যাচ্ছি। আপনি কয়েক স্টেশন আগে উঠেছেন আমি পরে এইযা। আপাততঃ নাম জেনে কথা খরচার দরকার নেই। সে মনেমনে ভাবে, তুমি আজও আমায় নাম ধরে ডাকতে পারলে না। ——কিন্তু আমি যে বলছি ? ——- সেটা আপনার দয়া কৃপা, বুঝ এইসব। তাছাড়া অনুমান, আমার বয়স কিছু কমই হবে। ——- দয়া কৃপা এসব ছাড়াও কথা বলা যায় শ্রুতি । ——- আপনি দেখি আমার নাম জানেন। ম্যাজিক না কী? ——- তোমার স্যুটকেসের গায়ে পরিষ্কার হাতে নামটা লেখা রয়েছে। অমনি মনে হলো,নাম শ্রুতি হবে । আন্দাজে ঢিল ছোড়া। আজকে আমার দিন ভালো । ——- আপনার শরীর খারাপ। লক্ষ্য করছি খুব কাঁশছেন? এভাবের শরীর নিয়ে এতো দূরের পথে, এতো ঘন্টার জার্নি । একলা বেরুলেন যে, ঠিক হয় নাই। ——- কী করবো? অনেক দিন বুকে ব্যথা। ——- ডাক্তার করান না কেন? ——- এ ব্যথা উপশমের কাজ না। ——- বিয়ে করেননি? ——- প্রথম ভালোবাসা ভোরের ফোটা প্রথম ফুলের মতো। রৌদ্র ওঠার আগেই ঝরে পড়ে। একজনকে মনে ধরেছিল, ভালোবেসে ছিলাম। তারপরে আর সময় পাইনি। —— গ্রেট। গল্পের প্লট খুঁজে পাওয়া গেল। জীবন একটা নদী। প্রেম নদীর নৌকা। আর জোয়ার যৌবন। যৌবনে জীবন নদীতে নৌকা বাইনি এমন লোক কম আছে। আসুন যেতে যেতে গল্পটা করা যাক। সময়টা ভালো কাটলো। —— সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় এসে পড়েছ তুমি । কী বিষয়? —— আপনার অতীত। আমাদের প্রত্যেকের নেপথ্যে একটা অতীত থাকে। একদিন যখন বয়স কম ছিল। আপনার সেইসব শ্রেষ্ঠ দিন, যুবক জীবনের ভালোবাসার গল্প ? —— কথাটা সত্যি সেইদিন নয়, আজকে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন । কে প্রথম তুমি ? ——- আমার সেইসব দিনের কথা এখন আর মনে করিনা। বোকা গবেটরা প্রেমে পড়ে। আমাদের যুগে ঐসব ভাবাই যায় না। আর মেয়েদের মুখে প্রকাশ,,,, ক্ষমা করবেন। বিরাট অপারগতা । তার ‘চে আপনার কথা শোনান। ——- অন্ধকার রাত কেউ কাছে রাখতে চায় না। তোমার দুহাত ভর্তি অঢেল দয়া । ——- ওকে বিয়ে করলেন না? ওকি আপনাকে ভালোবাসতো না? ——- ও ভালো বাসতো কিনা জানি না। তবে আমি ভালোবাসি। প্রত্যাখ্যাত হবার ভয় ছিল। —— -ওহো এক তরফা। ——- দু’ তরফার সুযোগ কোথায়? ও আমার ভালোবাসা জানলোই না। —— এরকম ভালোবাসা হয়? —— হয়তো । আর আমার সেটা ।