Tuesday March2,2021

ডকট্রিন অফ নেসেসিটি (Doctrine of necessity) প্রয়োজনীয় মতবাদ বা প্রয়োজনীয়তার মতবাদ এমন একটি শব্দ বা বাক্য যা প্রশাসনিক কর্তৃত্বের দ্বারা অসাধারণ ক্রিয়াকলাপগুলি, যেগুলি আদেশ পুনরুদ্ধার বা মৌলিক সাংবিধানিক নীতিগুলি সমর্থন করার জন্য ডিজাইন বা সাজানো হয়, তার ভিত্তিতে বর্ণনা করার জন্য ব্যবহৃত শব্দ বা বাক্যটি এমন কোনও পদক্ষেপকে সাধারণত লঙ্ঘন হিসাবেও গণ্য হবে বলে মনে করা হয়, প্রতিষ্ঠিত নিয়মাবলী বা কনভেনশনগুলিতে। এটিতে কোনও ব্যক্তিগত ব্যক্তির কোনও শাস্তি ছাড়াই আইন লঙ্ঘন করার ক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত হয়, যেখানে আইনের লঙ্ঘন আরও খারাপ ক্ষতি রোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ছিলো বলে ধরে নেওয়া হয় বা সহজ বাংলায় সব যায়েজ বা আরো সহজ বাংলায় সাত খুন মাপ ।।
প্রথমেই একটু ব্যক্তিগত বিষয় বলতেই হচ্ছে, আমি রাতে যখন বাসায় ফিরি, ঠিক তখন দেশে তৃতীয় মাত্রা শুরু হয় । ল্যাপটপে তৃতীয় মাত্রা চালু করেই নিজস্ব ভিন্ন কাজগুলোতে মনোযোগী হই । তাই গত তিনদিন ধরে তৃতীয় মাত্রায় আশি দশকের ছাত্রনেতাদের দেখলাম বক্তব্য দিতে বা আলোচনা করতে ( ফাঁকে ফাঁকে কিছুটা শোনা হয়েছে)। গতকাল রাতে আসলেন জাতীয় পার্টির তিনজন ( দু’জন সাবেক) । একজন শেখ শহীদ ( এরশাদের মন্ত্রী ছিলেন, শিক্ষা) কাজী ফিরোজ রশীদ ( এরশাদের মন্ত্রী, কি মন্ত্রী মনে নেই ) এবং সেই সময়ের জাতীয় পার্টির আন্তর্জাতিক সম্পাদক ( যদি ভুল না করে থাকি ) ডক্টর সীনহা আবু সাঈদ। শেখ শহীদ সরাসরি শেখ পরিবারের সদস্য এবং মুক্তিযোদ্ধা এবং কাজী ফিরোজ রশীদ উনিও মুক্তিযোদ্ধা ।
লক্ষণীয় যে, সাবেক ছাত্রনেতাদের কেউ একজন একটি কথা বলে গেছেন, তা হলো, এরশাদ এখন কবরে শুয়ে হাসছেন। কারণ এরশাদ যে স্বৈরাচার ছিলেন তা নাকি ভুলেই গেছেন বর্তমানের সিভিল স্বৈরাচারের কল্যাণে । অনেকেই আজকাল বলেন এরশাদ যে দূর্ণীতিবাজ ছিলো, সেটা মানুষকে বিশ্বাস করানো মুশকিল। কারণ বর্তমানের দূর্ণীতির সামনে এরশাদ ছিলেন শিশু । অর্থাৎ বলাই বাহুল্য যে, এরশাদের দল এরশাদকে নিয়ে গর্ব করতেই পারেন , যখন তুলোনায় চলে আসে, চরম দুঃখজনক । এটা যে তথাকথিত ( তথাকথিত বলতে বাধ্য হলাম) গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য কতটা লজ্জার, সেটা কোনো শব্দ দিয়েই লেখা সম্ভব নয় ।
তবে রাজনৈতিক নেতাদের ভাগ্য ভালো যে, এরশাদ কতবড় প্রেমিক পুরুষ ছিলেন, কেউ চাইলেও সেই রেকর্ডটি ভাঙতে পারবেন না বলেই মনে হয় । এই একটি পয়েন্টেই এরশাদ এখন অব্দি সর্বোচ্চতেই আছেন এবং থাকবেন নিশ্চয়ই। কেননা কিছু রেকর্ড ভাঙা সম্ভবত সম্ভব হয় না ।
তিনদিন সাবেক ছাত্রনেতাদের অনেক বচন শুনলাম। আত্মসমালোচনা কিছুটা যে ছিলো না, তা বলা যাবে না । তবে বাস্তব সমালোচনার থেকে বহু দুরেই ছিলো । কঠিন সত্য হলো, সেই সময়ের তুখোড় ছাত্রনেতারা পরবর্তীতে ক্ষমতার লোভে বেশিরভাগই নিজেদেরকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন । কেউ কেউ এমপি হবার প্রতিযোগিতায় নেমে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সফলতার সমগ্র বিষয়কেই বিসর্জন দিয়েছিলেন। ফলাফল শেষ অব্দি চল্লিল লিটার দুধে এক ফোটা চণা দিয়ে সমগ্র দুধকে খাওয়ার অযোগ্য করে তুলেছিলেন । এরশাদ আমলের সারে নয় বছরের অনাচার, অত্যাচার, অবিচার, খুন- খারাপি, ছাত্র/তরুণদের রক্ত সব ধুলিসাৎ হয়েছে। মোদ্দা কথা, ছাত্র/ তরুনদের রক্ত দিয়ে হলি খেলা হয়েছিলো এবং রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি ঘাম ও রক্তের সাথে বেইমানি করেছিলো ।
লক্ষণীয় বিষয় যে, এই সাবেক ছাত্রনেতারা সহ তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো স্বাধীনতার পরপর দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল জাসদকে নিয়ে যখন সমালোচনা বা পর্যালোচনায় বক্তৃতাবাজী করেন, তখন উনারা বিশ হাজার তরুণ/যুবকদের রক্তের সাথে বেঈমানির কথা বেশ উচ্চস্বরে বলেন এবং যা সঠিক । অথচ এরশাদ আমল দেশের দ্বিতীয়ফেইচ বা ধারা ( স্বাধীনতা পরবর্তী) আন্দোলন থেকে কেউ এক বিন্দু শিক্ষা গ্রহণ করেননি । লক্ষ্য করুন, বিষয়টি কিন্তু বেশ বড় প্রশ্নের জন্ম দেয় । এরশাদ কি কেবলমাত্র গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য একটি কাঠামো ছিলো মাত্র? তা না হলে কেন সেই কাঙ্খিত গণতন্ত্র দেশে বজায় রইলো না ?  অবশ্য শুধু দ্বিতীয় কেন তৃতীয়ফেইস বা ক্ষেত্র এক এগারো থেকেই বা তথাকথিত রাজনৈতিক দল বা নেতারা কি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন ? সেই প্রশ্নটিও এখনও জ্বলজ্বলে ।
এ তো গেলো ছাত্রনেতাদের বলা ভাষ্য নিয়ে বলতে গিয়ে বলা । গতকাল যে তিনজন সাবেক ও বর্তমান জাতীয় পার্টির নেতারা এসেছিলেন, তাদের বক্তব্য শুনে সাধারণ জনমানুষেরা লজ্জায় বা হেসেই হৃদক্রিয়া যন্ত্রের ফেইলোরের ঝুঁকিতে পড়তে পারতেন । কেননা সঞ্চালকের প্রশ্নের উত্তরে ডকট্রিন অফ নেসেসিটির থিওরি শুনিয়ে বললেন, কেন তারা সেই সময়ে এরশাদের দলে যোগদান করেছিলেন । সামরিক জান্তারা তো বিসমিল্লা বলে চলে আসেন। আর উনারা নাকি দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে এরশাদের হাতকে শক্তিশালী করার প্রয়াশেই যোগদান করেছিলেন । এমন কি বর্তমানের রাজনীতির হালচাল বিবেচনায় নিয়ে সেই আমলের বিএনপি আর বর্তমানের আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ দোষারোপ করে, নিজেদের আপন রাজনীতি করে গেলেন। বিষয়টি কেমন ? বিএনপি যেহেতু ৮৬ তে নির্বাচনে আসেনি, সেই কারণেই সেই সময়ে পল্লিবন্ধু এরশাদ দেশের গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত সঠিকভাবে করতে সক্ষম হননি । আর বর্তমানে আওয়ামী লীগ উন্নয়ন আগে গণতন্ত্র পরে যে থিওরি চালু করেছে, সেটার কড়া সমালোচনা করে সুযোগ বুঝে  কোপ বসিয়ে, এরশাদ সর্ব সাকুল্যে ভালো, সেটাই শুনিয়ে গেলেন। এরশাদের রাজনীতি ছিলো উন্নয়ন আর গণতন্ত্রের  সমান্তরাল রেল লাইন । যা কিনা জাতীর বিরাট সৌভাগ্য ছিলো । এমনকি এই জাতীর সকলের উচিত এরশাদের বন্দনা করা । এরশাদ তো কবরে হাসতেছে, অন্যদিকে নুর হোসেন, বসুনিয়ারা কবরে নিশ্চয়ই কাঁদতেছে। হায় রে রাজনীতি। বুঝুন এবার ডকট্রিন অফ নেসেসিটির সঠিক ব্যবহারের নমুনা ।
ডকট্রিন অফ নেসেসিটির সূত্রে দেশের সমসাময়িক ভাষ্কর্য আর মূর্তি নিয়ে ছোট্ট করে বলেই শেষ করবো । ৭১ এ যারা এই বঙ্গভূমি বা ইসলাম ধর্মের প্রয়োজনে ডকট্রিন অফ নেসেসিটির কোনো সূত্র খুঁজে পাননি । ৭১ এ এত রক্তের মাঝেও যারা ডকট্রিন অফ নেসেসিটির প্রয়োজনীতা অনুভব করেননি, আজ তারাই এই স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু প্রেমে আর শান্তির ধর্ম ইসলাম রক্ষার্থে ডকট্রিন অফ নেসেসিটির সূত্রে বঙ্গভূমিকে হুকুম দেবার আস্পর্ধা দেখায় । আপন স্বার্থে ডকট্রিন অফ নেসেসিটি আজকে সবার মুখে অষ্টধাতুর তাবিজে রূপান্তরিত হয়েছে । এই তাবিজটি কে বা কারা ভাঙবে ?
বুলবুল তালুকদার 
যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম