বি এল এফ থেকে জাসদ – অপু সারোয়ার

[  জাসদ রাজনীতির উৎপত্তি নিয়ে অপু সারোয়ার এর ধারাবাহিক লেখার
তিন পর্ব।  ]

বিএলএফের পিছনে ফেলে আসা দিন
বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ১৯৪৭ থেকেই ছাত্ররা প্রায় সকল রাজনৈতিক সংগ্রামে অন্য
যেকোন শ্রেণী-বা গোষ্ঠীর চেয়ে তুলনায় সক্রিয় ও অগ্রসর ভূমিকা পালন করে
আসছে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত এই প্রবণতা স্পষ্ট ভাবেই সাদা চোখে দেখা
যেত। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে বামপন্থী আন্দোলন, নান কিছিমের
অগণতান্ত্রিক সরকার বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা প্রধান ছিল। ছাত্রদের
কোন কোন অংশ ছাত্রত্ব শেষে শ্রমিক – কৃষক আন্দোলন কিংবা জাতীয়
রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছেন। এই সময়কালে ছাত্রদের রাজনীতিতে সক্রিয় ও
অগ্রসর ভূমিকা পালনের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে পড়াশুনার বাইরে অখন্ড
অবসর, পড়াশুনার সাথে যুক্ত থাকার করণে তথ্যের তুলনা মূলক সহজ লভ্যতা
অন্যতম কারণ। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ছাত্রবাস গুলি যে কোন ঘটনার
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে মিছিল মিটিং এ জনবল যোগানের প্রধান কেন্দ্র।
ছাত্ররা মূলত সেই সময়ের মধ্যবিত্ত বা উঠিত মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি ছিল।
শেখ মুজিবর রহমানের রাজনীতির বাহক ছাত্রদের মধ্যেও প্রধানতঃ দুইটি ধারা
ছিল। প্রধান ধারা ছিল স্বাধীনতা পন্থী – এই ধারার পরিচলনায় যুক্ত ছিলেন
সিরাজুল আলম খান ও আব্দুর রাজ্জাক দের মত ছাত্রত্ব শেষ হয়ে যাওয়া
নেতারা। অন্য ধারা স্বায়ত্ব শাসন পন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এই ধারা
ধাপে ধাপে স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন। এই অংশের পরিচালনায় ছিলেন শেখ
ফজলুল হক মনি। তিনি ও প্রথমোক্তদের মত ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরেও ছাত্র
রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। ভিন্নতা নিয়েও ছাত্রলীগের পতাকার নিচে সমবেত
হয়েছিল উভয় উপদল। এই দুই উপদলের মধ্যেও নানান স্রোত বিরাজিত ছিল।
১৯৭১ পরবর্তী এক যুগের রাজীনীতির নতুন দল -গ্ৰুপ এর উৎস মূল খোঁজ
করলে যুদ্ধ পূর্ব ছাত্রলীগের সাথে যুক্তদের দেখা মিলবে।
শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাকদের মত নেতারা
চিন্তায় অগ্রসর ছিলেন। ৬ দফা অন্দোলনের মধ্য দিয়ে শেখ কাছাকাছি চলে
আসেন। তৎকালীন সময়ের সারাদেশের সাথে দুর্বল যোগাযোগ ব্যাবস্থার মধ্যেও

দেশ ব্যাপী সম- চিন্তার ও পৃথক ভাবে রাজনৈতিক সিদ্বান্ত নিতে পারেন এমন
সংগঠন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন।
১৯৬৫ সনে পাক- ভারত যুদ্ধের পর আজকের বাংলাদেশ অঞ্চলে জাতীয়তাবাদের
নতুন বিকাশ ঘটতে শুরু করে। এই যুদ্ধ কালীন সময়ে পাকিস্তানের এই অংশ
সামরিক ভাবে পুরোপুরি অরক্ষিত ছিল। পাকিস্থান পশ্চিম অংশের নিরাপত্তা নিয়ে
উদ্বিগ্ন ছিল। ভৌগোলিক ভাবে অরক্ষিত সীমান্ত ও ১৯৪৭-১৯৬৫ সালের মধ্যে
বেড়ে উঠা নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে পর্যাপ্ত কর্ম সংস্থান ও সামরিক বেসামরিক
প্রশাসনে ঊর্দূভাষী দের আনুপাতিক প্রাধান্য ও বৈষম্য এই অঞ্চলে বাঙালী
জাতীয়তাবাদ বিকাশের নিয়ামক হয়ে উঠে। এই সময় কালে আওয়ামীলীগ
অপেক্ষাকৃত দুর্বল ছিল নানান ভাঙা গড়ার রাজনীতি চলছিল। তখন পাকিস্থানে
সামরিক শাসন চলছিল।
সাম্যবাদী আন্দোলনের বিভক্তি ও বিএলএফ এর উত্থান
আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট বিতর্কে কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপ ভেঙে যায়। এই সময়
চীন ও রাশিয়া পন্থী সংগঠন -ঘর গোছানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে থাকে। ১৯৬৬-
১৯৭১ এর মধ্যে চীন পন্থী কমিউনিস্ট পার্টি বেশ কিছু ভাঙ্গনের মধ্যে দিয়ে মূলত
এই দল গুলোর রাজনৈতিক কর্মকান্ড আঞ্চলিক ভিত্তিক হয়ে যায়। মোটা দাগে
তৎকালীন রাজশাহী বিভাগ ও খুলনা- যশোরের অঞ্চল বিশেষ পূর্ব বাংলার
কমিউনিস্ট পার্টি ( এম- এল ) নেতৃত্বের পরিচিত মুখ ছিল আব্দুল মতিন –
আলাউদ্দিন আহমদে ,টিপু বিশ্বাস। সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পূর্ব পাকিস্থান
কমিউনিস্ট পার্টি ( এম -এল ) নেতৃত্বে ছিলেন আব্দুল হক ও মোহাম্মদ
তোয়াহা। যশোর – খুলনা অঞ্চলে এই দলের প্রধান কাজ ছিল। ১৯৭১ সালের
যুদ্ধের সময় এই দল যুদ্ধকালীন অবস্থান নির্ধারণে দুই ভাগ হয়ে পরে। এই
বাইরে ছিল কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি, কমিউনিস্ট সংহতি
কেন্দ্র, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (হাতিয়ার গ্রুপ), কমিউনিস্ট কর্মী সংঘ ,
মাইতি গ্রুপ, ও পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি ।
১৯৭০ সালে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে প্রথমে পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন ও
১৯৭১ সালের জুন মাসে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি কালীন সময়ে যাত্রা শুরু
করলেও স্বাধীন বাংলদেশে তুলনামূলক ভাবে অপরাপর চীনপন্থী বামপন্থী দল গুলির
চেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। এর অন্যতম প্রধান কারণ সর্বহারা পার্টি সিরাজ
সিকদার এর নামে দলকে পরিচিত করার চেষ্টা চালায়। যা অন্য কোন বামপন্থী
দল করে নাই। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সর্বহারা পার্টি বাংলাদেশ অঞ্চলের জাতিগত
নিপীড়নকে সঠিক ভাবে মূল্যায়ণ করে সীমিত সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে যুদ্ধে অংশ

নিয়েছিল। যুদ্ধত্তোর কালে চীন পন্থী কমিউনিস্টদের যুদ্ধকালীন সময়ের ভূমিকাকে
ফুটিয়ে তোলার জন্য সর্বহারা পার্টি ও সিরাজ সিকদাদের নামকে সামনে আনার
চেষ্টা দেখা যায়।
দলের ভাঙ্গন প্রক্রিয়া সময় সাপেক্ষ ও যন্ত্রনা বিধুর। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত
চীন পন্থী বাম ঘরানা নতুন চিন্তার সংস্পর্শে খন্ড -বিখন্ড হয়ে জাতীয় ভাবে কোন
আন্দোলনকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা হারায়। এই পুরো সময়টা এই দল গুলো
নানান অস্থিস্ততা ও অন্ধ অনুকরণবাদ জনগণের আখাঙ্খার সাথে মিল রেখে
কর্মীসূচি প্রণয়নের অপারগতাকে সামনে নিয়ে আসে। বামপন্থীদের মধ্যে আদর্শ
তত্ত্বের ব্যবধান, দল উপদলের বিভাজন জাতীয় রাজনীতিতে ক্রমে প্রান্তিক অবস্থান
নিয়ে গেছে। এই রাজনৈতিক পটভূমি ছাত্র লীগ -আওয়ামীলীগ এর অনুকূলে কাজ
করে।
বিপরীত ভাবে, ছাত্রলীগ ১৯৬৩ সালের ভাঙ্গন জনিত সংকট দূরে ঠেলে সামনের
দিকে এগিয়ে আসতে সক্ষম হয়। ১৯৬৩ সালে প্রধানত নেতৃত্ব নিয়ে ছাত্রলীগ ভেঙে
যায়। ১৯৬৩ সালে ছাত্রলীগারে সম্মেলনকে কেন্দ্র করে শেখ ফজলুল হক মনি
ও সিরাজুল আলম খানের মধ্যে প্রধানতঃ নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। কাউন্সিলে
সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন সিরাজুল আলম খান । আর শেখ ফজলুল হক
মনি সমর্থিত প্রার্থী ছিলেন ফেরদৌস আহমেদ কোরাইশী । কাউন্সিলে সাধারণ
সম্পাদক হিসেবে সিরাজুল আলম খান নির্বাচিত হন। অনেকে মনে করেন সেই
থেকে মনি – সিরাজ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব শুরু। মনি – সিরাজের রাজনৈতিক ভিন্নতা
পরবর্তী বছর গুলোতে বাড়তে থাকে , ছাত্রলীগের মধ্যে এই মেরুকরণ দেশ ব্যাপী
ছড়িয়ে পড়ে। তবে এই নতুন মেরুকরণ কেন ভাবেই পদ-পদবীর বিষয় ছিল না।
মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় পাকিস্থান এর কেন্দ্রীয় শাসন থেকে বেরিয়ে আসার
রাজনৈতিক নীতি – কৌশল।
স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের যাত্রা
১৯৬২-৬৩ সনে সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ স্বাধীন
বাংলা বিপ্লবী পরিষদ নামে আধা গোপন আধা প্রকাশ্য সংগঠনের চিন্তার সূচনা
করেন তৎকালীন ছাত্রলীগের মধ্যে। এই ক্ষুদ্র সত্তা পরবর্তী কয়েক বছরে বিকশিত
হয়, ছাত্রলীগের মধ্যে উপদল গড়ে উঠে। সাধারণ ভাবে তৎকালীন ছাত্রলীগের
মধ্যে সিরাজ পন্থী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
সারাদেশ ব্যাপী ছাত্রলীগের মধ্যে এই ধারার শিকড় শক্ত জায়গার করে নিতে
পরবর্তী ৫/৬ বছর সময় নেয়।একই সংগঠনের মধ্যে আরেকটি সমান্তরাল সংগঠন

গড়ে তোলার কাজটি জটিল। সারাদেশে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ ছাত্রলীগকে
বিভক্ত না করেই নিজেদের পক্ষে কর্মী সমর্থকদের চেইন অফ কমান্ড গড়ে তুলতে
সক্ষম হয়।
১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ – পন্থীরা পূর্ব পাকিস্থান
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভা ‘স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ’-এর
প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ৪৫ সদস্যের মধ্যে ৩৬ জন এ প্রস্তাব সমর্থন করেন। ৯
জন সমর্থন করেননি। ১৯৬৩ সালে বাংলা বিপ্লবী পরিষদ – গঠনের পর এই
প্রথম বারের মত প্রকাশ্যে সংগঠনের মধ্যে সরাসরি ভাঙ্গনের প্রক্রিয়ায় না গিয়ে
নিজেদের চিন্তা দ্বারা সংগঠনকে প্রভাবান্বিত করার উদ্যোগ নেয়। স্বাধীন বাংলা
বিপ্লবী পরিষদ – পন্থীরা অতিদ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে ১৯৭০ সালের অবিভক্ত
পাকিস্তানের শেষ নিবাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশকে স্বাধীনতার বার্তা ছড়িয়ে
দেওয়ার। নিবার্চনী প্রচারণায় পদ যাত্রা খুব সহজ ছিল না। ভোট হারানো
শঙ্কায় বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামীলীগ নেতাদের সাথে এই ধারা মুখোমুখী অবস্থানে
দাঁড়ায়।
১৯৭০ সালের ৭ জুন ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত ছাত্রদের এক সামরিক
কুচকাওয়াজে শেখ মুজিবুর রহমানের অংশ গ্রহণের কথা ছিল। এই লক্ষ্যে ছাত্রদের
নিয়ে জয়বাংলা বাহিনী গঠন করা হয়। ছাত্রদের এই বাহিনীকে সামরিক
আচ্ছাদন দিতে একটি পতাকা তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এই পতাকার
নকশা ও নকশার পিছনের রাজনৈতিক ভাবনার পুরাটাই নিউক্লিয়াসপন্থীদের
উদ্যোগে পরিচালিত হয়েছিল। এই পতাকা ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে প্রথম জাতীয় পতাকা হিসেবে উত্তোলন করা হয়।
যুদ্ধকালীন সময়ে এই পতাকা যুদ্ধ পতাকা হিসেবে রণাঙ্গণে ও জনপদের অনুপ্রেরণা
হিসেবে কাজ করে। এই সময় স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ পন্থীরা ঢাকা সহ
বিভিন্ন এলাকায় সীমিত পরিসরে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স – বিএলএফ গঠন
করে। এই সংগঠকরা দাবী করেন এই ধারাবাহিকতায় যুদ্ধকালীন বিএলএফ এর
সৃষ্টি।
বিএলএফ এর ত্রিকাল
বিএলএফ এর কার্য কালকে তিন অংশে ভাগ করা যায়। ছাত্রলীগের স্বায়ত্ব শাসন
পন্থীদের আদর্শিক নেতা ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি আর স্বাধীনতা পন্থীদের
সিরাজুল আলম খান। এই দুই জন সম-সাময়িক ও ব্যাক্তিগত জীবনে বন্ধু
ছিলেন। ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরেও ছাত্র- যুবকদের পরিমণ্ডলেই পদচারণা ছিল এই
দুইজনের। এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তৎকালীন সময়ের আওয়ামীলীগ বা

অন্য কোন দল এই নেতাদের অগ্রসর চিন্তাকে ধারণ করতে অসমর্থ ছিল। এই
অসমর্থতার প্রধান কারণ ছিল সামাজিক ও শ্রেণীগত।
তৎকালীন সময়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ ও ন্যাপ দুই অংশের
নেতারা ছিলেন উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতিনিধি। এদের অনেকে সরাসরি
পাকিস্থান আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবর রহমান
পাকিস্থান আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। প্রসঙ্গ ক্রমে পাকিস্থান আন্দোলন ও
পাকিস্থান রাষ্ট্রের আচরণ পৃথক বিষয়। ছাত্রত্ব শেষে রাজনীতিতে টিকে থাকার
উপযুক্ত সংগঠন এর অভাব সেই সময় বিভিন্ন ধারার ছাত্রদের নতুন রাজনীতি ও
দলের খোঁজ করতে বাধ্য করেছিল। যেমন হয়েছিল ছাত্রলীগের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্ব
শাসন পন্থী নেতাদের ক্ষেত্রে।
কাজী জাফর, রাশেদ খান মেনন, সিরাজ সিকদার সম -সাময়িক ছাত্রনেতা
ছিলেন। তাঁরা যে দল কিংবা ধারার সাথে ছিলেন সেই সব ধারা তাদের চিন্তাকে
খুব একটা ধারণ করতে অসমর্থ ছিল । ১৯৬৯-১৯৭১ এর মধ্যে নতুন পথের
সন্ধানে নতুন দল জন্ম হয়েছিল এদের উদ্যোগে। বাংলাদেশ অঞ্চলে পাকিস্থানের
জাতিগত নিপীড়ণের বিরুদ্ধে মনি-সিরাজ, জাফর -মেনন, সিরাজ সিকদার
মৌলিকভাবে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন। পার্থক্য ছিল রণনীতি ও রণকৌশল ও
সাময়িক মিত্র নির্ধারণের।
বিএলএফের সফলতা পাওয়া যায়, ছাত্রলীগকে প্রধান জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে
গড়ে তোলার ক্ষেত্রে, যতদিন ছিল এই ধারা নিয়ন্ত্রিত। অসহযোগ আন্দোলন
চলাকালে তারা আন্দোলন, সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে পারলেও
স্থানীয় ছাত্রনেতাদের দেশের ভিতরে ধরে রাখতে সম্পূর্ণ ব্যার্থ হয়। এরা ভারতে
গিয়ে প্রশিক্ষণের ফাঁদে পড়ে সময় নষ্ট করে অন্তত চার মাস। এ সময়ে অন্য
ধারাগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা রাজনৈতিক ও
সামরিক মেরুকরেনে বিএলএফ পথ হারিয়ে ফেলে যুদ্ধের শুরুতেই। যুদ্ধের শেষের
দিকে বিএলএফ রাজনৈতিক পথ হারানো থেকে ঘুরে দাঁড়ানের প্রচেষ্টাতে বিএলএফ
এর নামকরণ করে মুজিব বাহিনী হিসাবে। বিএলএফ থেকে মুজিব বাহিনী নাম
করণ কোন তাৎপর্য বয়ে আনতে পারে নাই। এই নাম পরিবর্তনের পর যুদ্ধ
চলেছে মাত্র ৬/৭ সপ্তাহ।
মুজিব বাহিনী নামকরণ বিএলএফ এর জন্য অনেক সমালোচনা বয়ে আনে।
অনেকেই নানা কারণে মুজিব বাহিনী নামকরণকে সহজে নিতে পারেন না। কিন্তু
জিয়া বাহিনী (জেড ফোর্স) খালেদ বাহিনী (কে ফোর্স) শফিউল্লাহ বাহিনী (এস

ফোর্স) – ইত্যাদি ব্যাক্তি বিশেষের নাম নামকরণ নিয়ে কোন উম্মা দেখা যায়
না।
বিএলএফ – নিয়ন্ত্রিত -: ১৯৬২-৬৪ সাল থেকে ছাত্রলীগের মাঝে একটি ক্ষুদ্র উপদল
কাজ শুরু করে। কয়েক বছরের মধ্যে এই উপদল সুশৃঙ্খল শক্তিশালী উপদলে রূপান্তরিত
হয়। এই উপদলের আনুষ্ঠানিক নাম ছিল বাংলা বিপ্লবী পরিষদ কিন্তু এই নামে কখনোই
তেমন পরিচিতি পায়নি। সময়ের আবর্তে এই উপদল ছাত্রলীগের মধ্যে ও অপরাপর
সংগঠনের কাছে সিরাজ পন্থী গ্রুপ হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৬২ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত
রাজনৈতিক সংগ্রামের চড়াই -উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ এর
বিকাশ।
স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থান ছাত্রলীগের স্বাধীনতা পন্থীদের মিলন
কেন্দ্র। নানান মত- পথ ও শ্রেণীর সমাবেশ ঘটেছিল আধা প্ৰকাশ্য – আধা গোপন স্বাধীন
বাংলা বিপ্লবী পরিষদ- নিউক্লিয়াসের মধ্যে। প্রচলিত ধারার কোন সাংগঠনিক কাঠামো ছিল
না স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের। কেন্দ্রীয় কমান্ড এর নাম ছিল নিউক্লিয়াস । কেন্দ্রীয়
কমান্ড ছাড়া কোন সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে উঠেনি বা তোলা হয়নি স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী
পরিষদের ।
বিএলএফ এর সাংগঠনিক কাঠামো
স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ ছিল ৪/৫ জনের স্বনিয়ন্ত্রিত ' সেল' সাংগঠনিক কাঠামো। এই
কাঠামোতে ' সেল ' পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে সাংগঠনিক সক্রিয়তার গুরুত্ব দেওয়া হত।
বিচ্ছিন্ন সেল গঠনের কাজ অনেকটা উল্টো দিক থেকে পিরামিড গঠনের প্রচেষ্টা। উপরের
দিকে কেন্দ্রীয় কমান্ড । নিচের দিকে, সারাদেশে স্ব-নিয়ন্ত্রিত সেল। এই কাঠামোর অধীনে
সংগঠনের সাথে যুক্তদের মধ্যে প্রকাশ্যে পরিচয় , আলোচনায় সুযোগ সীমাবদ্ধতা টেনে দেয়।
স্বনিয়ন্ত্রিত সাংগঠনিক কাঠামো কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরী হয়,
নান মাত্রার গুরুবাদিতার ও উপদল- কোটারীর জন্ম নেয় সংগঠনে। এই সময়কালে
বিএলএফ সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফের নেতৃত্বে
পরিচালিত সময়।
স্বনিয়ন্ত্রিত সেলের প্রথম প্রকাশিত বড় ব্যর্থতা ১৯৭১ সালের যুদ্ধের দিনগুলোতে
জেলার নেতাদের এলাকায় ধরে রাখতে না পারা। এবং সারাদেশে এই ধারার
সংগঠকদের সকলকে যুদ্ধকালীন সময়ে সামরিক ও রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের জন্য
বিএলএফ পরিচালিত ক্যাম্পে সমবেত করতে না পারা।

বিএলএফ – ১৯৭০ -১৯৭১ : এই সময়ে শেখ ফজলুল হক মনি ও তোফায়েল
আহমদে এই ধারার সাথে যুক্ত হন। ছাত্রলীগের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্ব শাসন
পন্থীদের মিলন ঘটে। এই সময় কাজী আরেফ প্রধান নেতৃত্ব থেকে ছিটকে
পড়েন। শেখ মনির সাথে ঐক্যের প্রয়োজনে সিরাজ-রাজ্জাক বিএলএফ এর কমান্ড
থেকে কাজী আরিফকে পিছনের কাতারে ঠেলে দেন। যুদ্ধ কালীন সময় পর্যন্ত কাজী
আরেফ বিএলএফ এর কোন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে পারেন নি। যুদ্ধকালীন সময়ে
বিএলএফ এর গোয়েন্দা প্রধানের মত অলংকারিক পদে ছিলেন কাজী আরিফ
আহমদে। এই সময়কে আদি সংগঠনের সমাপ্তি ও নতুন যাত্রা শুরু। এই নতুন
যাত্রা সংগঠনের কাঠামো গত সীমাবদ্ধতা সামনে নিয়ে আসে। প্রতিষ্ঠাতাদের
একজন কে কেন্দ্রীয় কমান্ড থেকে কেন বাদ দেওয়া হলো তার ব্যাখ্যা কিংবা
কোন আলোচনায় আসেনি। সাংগঠনিক অগণতান্ত্রিকতা ও ব্যাক্তিনির্ভরতাকে সামনে
নিয়ে আসে। অনুমানিত হয়, শেখ মুজিবর রহমান এই ঐক্যের পিছনে ছিলেন।
শেখ মুজিবর রহমানের সাথে তাজউদ্দীন আহমদের উপস্থিততে যুদ্ধের কর্ম পদ্ধতি
ও ভারতের যোগাযোগের নিয়ে বহুল আলোচিত ঘটনা এই সময় কালের ।
তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী এই প্রক্রিয়া থেকে দূরে
থাকেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্বের সময় নূরে আলম সিদ্দিকী বিএলএফ এর সাথে
যোগ দেন নি। নূরে আলম সিদ্দিকী প্রবাসী সরকার এর পক্ষে দাঁড়ান যুদ্ধের দিন
গুলোতে।
ভারত প্রবাসের বিএলএফ এর রক্তক্ষরণ
ভারত প্রবাসের প্রথম দিনগুলিতে বিএলএফ এর আরেক দফা রক্তক্ষরণ হয়।
বিএলএফ – নিয়ন্ত্রিত -১৯৬৩-১৯৭০ কালের ভারতের সাথে যোগাযোগের জন্য
ডা: আবু হেনা দায়িত্ব পর্যাপ্ত ছিলেন। আবু হেনা ছাত্র জীবন থেকে ছাত্রলীগের
সাথে যুক্ত ছিলেন। ইতিহাসের কোন পর্যায়ে তিনি স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ
– নিউক্লিয়াস এর সাথে যুক্ত হন তার কোন সঠিক উল্লেখ নেই। ১৯৭০ সালের
নির্বাচেন আওয়ামীলীগের মনোনয়নে জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। প্রবাসী
সরকার ও বিএলএফ প্রশ্নে আবু হেনা তাজউদ্দীন আহমদে এর পক্ষে অবস্থান নেন।
যুদ্ধত্তোর কালে আবু হেনা তাজউদ্দীন আহমদে ও বিএলএফ উভয় শিবির থেকে
ছিটকে পড়েন।
ডা: আবু হেনা এর পক্ষ পরিবর্তন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ছাত্র বুদ্ধিজীবী
অবস্থায় একজন মানুষ নির্দ্বিধায় যতটুকু বৈপ্লবিক অবস্থান নিতে পারে , সামাজিক
অবস্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে এই দ্বিধাহীনতা অনেক অংশেই উবে যায়।
১৯৭২-১৯৭৫ পর্যন্ত ডা: আবু হেনা কোন রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন না।

তবে ১৯৭৫ সালে মোশতাক আহমেদ ডেমোক্রেটিক লীগ গঠন করলে এই দলের
সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকে হারিয়ে যান।
যুদ্ধত্তোর বিএলএফ বিভক্তি ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে ২১ জুলাই ১৯৭২। ১৯৭১
সালের ডিসেম্বর এর কোন এক সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে আহত অবস্থায় বিএলএফ
স্বাধীনতা পন্থীদের প্রভাব শালী নেতা স্বপন চৌধুরী হাসপাতাল থেকে গুম-খুনের
শিকার হন। স্বাধীনতা পন্থীরা এই গুম খুনের জন্য স্বায়ত্ব শাসন পন্থীদের দায়ী
করেন। আসলে কি ঘটেছিল সে সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য নেই। তবে এই
ঘটনাকে নতুন করে বিরোধ সূত্রপাতের মাইল ফলক হিসেবে দেখা হয়।
১৯৭২ সালে ২০ মে ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ এক প্যানেল দিতে ব্যর্থ
হয়। এই ব্যর্থতা ছাত্রলীগের পরাজয় নিশ্চিত করে। ঢাকার বাইরে এই বিভক্তির
ধারা ছড়িয়ে যায় অল্প সময়ের মধ্যে। মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আসা প্রধানতঃ ছাত্র
-যুবকদের সমতা ভিত্তিক রাজনৈতিক আকাংখার বিস্ফোরিত রূপ নেয় ছাত্রলীগের
ভাঙ্গনের মধ্যে দিয়ে ২১ জুলাই ১৯৭২। এক অংশ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র অপর অংশ
মুজিববাদের ধারণাকে সামনে নিয়ে আসে। উভয় অংশই শেখ মুজিবর রহমানকে
প্রধান অতিথি করেছিলেন।
শেখ মুজিবর রহমান সংখ্যায় কম অংশের সম্মেলনে উপস্থিত হওয়ার মধ্য দিয়ে
বিএলএফ ও ছাত্রলীগের বিভক্তিকে স্পষ্ট করেন। আক্ষরিক অর্থে বিভক্তির দিন
থেকেই ছাত্রলীগ (বৈ : স ) ও ছাত্রলীগ ( মুজিববাদী ) ঢাকা সহ সারাদেশে
হানাহানিতে জড়িয়ে পড়ে।সম্মেলনের প্রস্তুতি পর্বে ছাত্রলীগ (বৈ : স ) শেখ
মুজিবর রহমানকে সামনে রেখেই সারাদেশ থেকে নেতা কর্মীদেরকে সংগঠিত
করেছিলেন। এই অংশের সম্মেলনে শেখ মুজিবর রহমান আসবেন না এই বিষয়
আগে থেকে প্রচারিত হলে সম্মেলনে প্রতিনিধ জমায়েতে প্রভাব পড়ার সূমুহ সম্ভবনা
ছিল। যুদ্ধ পূর্ব কালে যেহেতু স্বাধীনতা পন্থীরা সংগঠনের মধ্যে সংখ্যা গরিষ্ঠ ছিল
এই ভাঙ্গনেও সংখ্যা গরিষ্টতা ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন এই অংশ।
ছাত্রলীগ (বৈ: স) এর উদ্যোক্তা ও নেতারা শেখ মুজিবর রহমান যে সম্মেলনে
আসছেন না সে কথা কখন জানতেন সে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তবে সম্মেলনের
বিশেষ অতিথি করা হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে গুম-খুনের শিকার হওয়া স্বপন
চৌধুরীর ভাইকে। বিশেষ অথিতি বিষয়টি প্রচার একদিকে সহনাভুতির রাজনীতির
চর্চা অন্য দিকে শেখ মুজিবর রহমানের অনুপস্থিতিতে কর্মীদের কিছু একটা নিয়ে
ব্যস্ত রাখার চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ছিল। শেষ পর্যন্ত স্বপন চৌধুরীর ভাই ছাত্রলীগ
(বৈ: স) এর সম্মেলনে আসেননি। বিএলএফ – স্বাধীনতা পন্থীরা স্বপন চৌধুরী

গুম খুনের ঘটনা রাজনৈতিক প্রচারের জন্য যত ব্যবহার করেছে কিন্ত ধারাবাহিক
ভাবে হত্যার তদন্ত ও বিচারের দাবীকে সামনে আনার চেষ্টা করে নাই।
রাজ্জাক ও সিরাজ মূখোমুখী
ছাত্রলীগ এর ভাঙ্গনের ফলে আব্দুর রাজ্জাক ও সিরাজুল আলম খান মূখোমুখী
দাঁড়িয়ে যান। ছাত্রলীগের ভাঙ্গন জুলাই '৭২ ও জাসদ সৃষ্টি অক্টোবর '৭২ জাসদের
ঘোষণার সমকালে আব্দুর রাজ্জাক এর ভূমিকা সম্পর্কে তেমন বিশেষ কিছু জানা
যায় না। জাসদ গঠনের পর আব্দুর রাজ্জাকের অবস্থান নিশ্চিত করেন।
আওয়ামীলীগ ও শেখ মুজিবর রহমানের রাজনীতির ধারাবাহিকতায় স্রোতে থেকে
যান আব্দুর রাজ্জাক। ১৯৬২ থেকে ১৯৭২ এই এক দশকের সিরাজ – রাজ্জাক
রাজনৈতিক মিত্রতার অবসান ঘটে।
আব্দুর রাজ্জাক নতুন রাজনৈতিক অবস্থানে ভিন্ন ভিন্ন সমস্যার মুখোমুখী দাঁড়িয়ে
যান। আব্দুর রাজ্জাকের জন্য সমস্যা ছিল আওয়ামীলীগের ছাত্র-যুবকদের মাঝে
নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। আব্দুর রাজ্জাকের সাথে যাদের ১৯৬৬-১৯৭১ পর্যন্ত
রাজনৈতিক চিন্তার ঐক্য ছিল তাদের অধিকাংশই ছাত্রলীগের বৈজ্ঞানিক
সমাজতন্ত্রীদের সাথে থেকে গেলেন। আব্দুর রাজ্জাকে রাজনৈতিক মিত্র খুঁজে ফিরতে
হল ছাত্র -যুবকদের সেই অংশের পূর্ববাংলার স্বায়ত্ব শাসন পন্থীদের মাঝে।
১৯৭২-১৯৭৫ সালের এই সময়কালে আব্দুর রাজ্জাকের রাজনৈতিক কর্মকান্ড, নতুন আত্ম
পরিচয়ের সংকট থেকে জেগে উঠা অস্থিরতার দেখা মেলে। ১৯৭৪ সালে আব্দুর রাজ্জাকের
নেতৃত্বে জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যালয় আগুন দেওয়ার ঘটনা সিরাজুল আলম খানদের থেকে
পুরোপুরি পৃথক সত্তা হিসেবে জানান দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখার অবকাশ রয়েছে।
নিউক্লিয়াস এর অন্যতম কান্ডারী আব্দুর রাজ্জাক এর সাথে মুজিববাদী ছাত্রলীগের মধ্যে
প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে শেখ মনির অংশের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। যুদ্ধ পূর্ব
ছাত্রলীগের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্ব শাসনপন্থীদের বিরোধের নতুন রূপ। একদিকে আব্দুর রাজ্জাক
উপদল অন্য দিকে শেখ মনি উপদল। এই উপদলীয়তার রক্তাক্ত রূপ ১৯৭৪ সালে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭ খুনের মধ্যে দিয়ে। আব্দুর রাজ্জাক উপদল এর হাতে শেখ মনি উপদলের খুন
হওয়ার ঘটনা।
যুদ্ধত্তোর বিএলএফ এর ভাঙ্গন
এই দুই উপদলের সম্পর্ক শুধু যুদ্ধকালীন সময় পর্যন্ত। দুই উপদলের ঐক্যের ব্যাপারে নিচের
স্তরের দিকে কোন আলোচনা হয়নি , ঐক্য আলোচনা যা হয়েছিল তা উপরের দিকেই
হয়েছিল। বলা চলে নেতা কর্মীরা নিজেদের পূর্বের অবস্থানে ফিরে গেল। শেখ ফজলুল হক

মনির নেতৃত্বে যুবলীগ গঠিত ১৯৭২ সালের সেপ্টম্বর মাসে। যুবলীগ গঠন ও ছাত্রলীগের
সম্মেলনে শেখ মুজিবর রহমান কর্তৃক প্রত্যাখিত হওয়া জাসদ গঠনের অনুঘটক হিসাবে
কাজ করেছে। দেশ ব্যাপী স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ – বিএলএফ এর সদস্যদের
রাজনৈতিক মঞ্চের প্রয়োজনীয়তাই জাসদ গঠনের পথ সৃষ্টি করে। ১৯৭১ সালের ছাত্রলীগের
কেন্দ্রীয় নেতাদের একাংশ 'মূল ' দল জাসদের দায়িত্ব প্রাপ্ত হলেন। কেউ ছাত্রলীগের থেকে
গেলেন দল গঠনের অংশ হিসেবে। জেলা – মহুকুমা পর্যায়ে একই নিয়মের পুনরাবৃত্তি
ঘটিয়ে জাসদের যাত্রা শুরু হলো ৩১ অক্টোবর ১৯৭২। যুদ্ধ কালীন সময়ে ভারতের
প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে বিএলএফ ৫১ জন প্রশিক্ষক ছিলেন । এর মধ্যে অন্তত ৪৫ জন
জাসদে গঠনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন । এই ভাবেই জাসদ থেকে বিএলএফ এর
পথ যাত্রা।

অপু সারোয়ার

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: