বিজ্ঞানে  নোবেল পুরস্কার ২০২০

. কানন পুরকায়স্হ :২০২০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রজার    পেনরোজ (Roger Penrose),  জার্মানির ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ফিজিক্স এর পরিচালক এবং ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া অধ্যাপক  রাইনহার্ড গেনজেল (Reinhard Gengel)  এবং ইউনিভার্সিটি ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপক আন্দরিয়া গেজ (Andrea Ghez) । রাজকীয় সুইডিশ বিজ্ঞান একাডেমি তাদের প্রেস রিলিজে উল্লেখ করে যে ‘For the discovery that black hole  formation a robust prediction of the general theory of relativity’  এর জন্য  রজার পেনরোজ  10 মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা পুরস্কারের অর্ধেক পাবেন |  প্রেস রিলিজ আরো উল্লেখ করা হয় যে ‘for the discovery of a super massive compact object at the centre of our galaxy’  এর জন্য রাইনহার্ড গেনজেল এবং আন্দরিয়া গেজ  পুরস্কারের বাকি অর্ধেক অংশ অর্থাৎ 5 মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা সমানভাবে ভাগ করে নেবেন |  উল্লেখ্য পেনরোজ যুক্তরাজ্যের  কলচেষ্টার,   রাইনহার্ড জার্মানির হামবুর্গ  এবং আন্দরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জন্মগ্রহণ করেন |

১৭৮৩ সালে জন মিচেল  নামে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের  এক অধ্যাপক লন্ডনের রয়েল সোসাইটি থেকে প্রকাশিত ফিলোসফিক্যাল ট্রানজেকশন  এ এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন । এই গবেষণাপত্রে তিনি উল্লেখ করেন যে একটি তারকার যদি যথেষ্ট ভর এবং ঘনত্ব থাকে তাহলে তার মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র এত শক্তিশালী হবে যে আলো সেখান থেকে নির্গত হতে পারবে না | আলো  ওই তারকা পৃষ্ঠ থেকে  নির্গত না হতে পারলেও তাদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ অনুভব করা যাবে । এরকম অনেক তারকার অস্থিত্ব সম্পর্কে  মিচেল অনুধাবন করেছিলেন । এ সমস্ত বস্তুপিণ্ড কে  আমরা  কৃষ্ণ বিবর (Black hole)  বলি ।  পরবর্তীতে ফরাসি বিজ্ঞানী ল্যাপলাস তার ‘System of the World’   গ্রন্থে  তা উল্লেখ করেন ।

 

 ১৯১৫ সালে  আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব আবিষ্কারের পর  মহাকর্ষ কি করে আলো কে প্রভাবিত করে সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় ।  ভারতীয় বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর  ত্রিশের দশকে দেখান  যে একটি স্থিতিশীল শীতল তারার সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ভর কত হতে পারে এবং এই  ভরের চাইতে বেশী হলে তারকাটি   কীভাবে চুপসে কৃষ্ণবিবরে পরিণত হবে । তবে সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুযায়ী সেই   তারকার কি হবে সেটা ১৯৩৯ সালে প্রথম সমাধান করেন রবার্ট ওপেনহাইমার | তিনি গাণিতিকভাবে দেখান মহাকর্ষের কারণে একটি তারকার কিভাবে  পতন (collapse)  হতে পারে ।  তারপর দ্বিতীয়  বিশ্বযুদ্ধের কারণে এবং ওপেনহাইমার  এর  ম্যানহাটান প্রকল্পে নিয়োজিত হওয়ার ফলে কৃষ্ণবিবর নিয়ে গবেষণা বেশি দূর আগায়নি |  ষাটের দশকে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের প্রভাব নিয়ে ব্যাপক গবেষণা শুরু হয় |  ১৯৬৩ সালে মহাবিশ্বের সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল  বস্তুপিণ্ড  কোয়াসার (Quaser) আবিষ্কার হয় | এই বিকিরণ এর কারণ কোন বস্তু কণার কৃষ্ণবিবরে পতিত হওয়ার কারণ হিসেবে ধারণা করা হয় |  কিন্তু আইনস্টাইনের    সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব কে ব্যবহার করে কৃষ্ণবিবর সৃষ্টির ব্যাখ্যা প্রদান এবং স্থান-কালের অনন্যতাকে ব্যাখ্যা করা  কি সম্ভব ? এই কাজটি   জ্যামিতিক ভাবে পেনরোজ দেখান যাকে বলা হয় পেনরোজ ডায়াগ্রাম এবং পেনরোজ  তা গাণিতিক ভাবে ব্যাখ্যা করেন । পেনরোজর এই গবেষণা  ১৯৬৫ সালে  ‘Gravitational collapse and space time singularities’  শিরোনামে ফিজিক্যাল  রিভিউ লেটার্স এ প্রকাশিত হয় । একই বছরে  একই জার্নালের  পরবর্তী এক সংখ্যায়   স্টিফেন হকিং এর ‘Occurence of singularity in open universe’  প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ।

 

  গেনজেল এবং  গেজ পৃথকভাবে  আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রে অবস্থিত সাগিত্তারিয়াস -এ (Sagittarius A) অঞ্চলের সমস্ত উজ্জ্বল তারকা কে পর্যবেক্ষণ করেন ।  এর জন্য    গেনজেল VLT (very large Telescope)  ব্যবহার করে  চিলির  প্যারামাল পর্বত থেকে পর্যবেক্ষণ করেন ।  অপরদিকে আন্দরিয়া গেজ  হাওয়াই  পর্বত  এ অবস্থিত  কিক অবজারভেটরি থেকে ভিন্ন ধরনের শক্তিশালী দূরবীন যন্ত্র ব্যবহার করে আমাদের ছায়াপথ পর্যবেক্ষণ করেন | দুইদলের পর্যবেক্ষণ ফলাফলের মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া গেল । দেখা গেল  আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রে  যে কৃষ্ণবিবর রয়েছে  তা ৪ মিলিয়ন সৌর ভরের সমান এবং আকার আমাদের সৌরমণ্ডলের সমান ।  পেনরোজ দেখান  যে  কৃষ্ণবিবর সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের ফলাফল ।  অপরদিকে    গেনজেল এবং  গেজ পৃথকভাবে  কৃষ্ণবিবরের সন্ধান পান ।  এভাবেই  সৃষ্টির নতুন  রহস্য  পেনরোজ,  গেনজেল এবং  গেজ   এর গবেষণার  মাধ্যমে  উন্মোচিত হল ।

 

২০২০ সালের রসায়ন বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান জার্মানির ম্যাক্স প্লাঙ্ক  ইউনিট ফর দা সাইন্স অফ প্যাথোজেন  এর পরিচালক ইমানুয়েল শাঁপেনতিয়ে (Emmanulle Charpentier)  এবং  যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেনিফার দাওনা (Jennifer A Doudna)   রাজকীয় সুইডিশ বিজ্ঞান একাডেমী তাদের প্রেস রিলিজে উল্লেখ করে যে ‘for the development of a method for genome editing’  এর জন্য নোবেল পুরস্কারের ১০ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা  ইমানুয়েল শাঁপেনতিয়ে এবং জেনিফার দাওনা সমানভাবে ভাগ করে নেবেন উল্লেখ্য  শাঁপেনতিয়ে   ফ্রান্সে  এবং দাওনা যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে জন্মগ্রহণ করেন

 

 ২০১২ সালে শাঁপেনতিয়ে  এবং  দাওনা CRISPR/cas9  নামে  এক ধরনের জেনেটিক প্রযুক্তি আবিষ্কার করেন । এখানে CRISPR  হচ্ছে জিনের একটি অনুক্রম যার পুরো নাম Clustered regularly interspaced short palindromic repeats’  এবং cas9  হচ্ছে  ‘CRISPR associated’  একটি নির্দিষ্ট প্রোটিন ।  এই প্রযুক্তি অনেক সময় একটা  কাঁচির সাথে   তুলনা করা হয়, কারণ এর কাজ হচ্ছে জিনকে সম্পাদনা করা অনেকটা সম্পাদক কর্তৃক  কোন বাক্যকে  কেটে  সংশোধন করার মত ।   এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকরা কোন প্রাণীর ডিএনএ কে পরিবর্তন করতে পারেন ।  উদাহরণ স্বরূপ নিউজিল্যান্ডে সম্প্রতি এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে গরুর ডিএনএ পরিবর্তনের মাধ্যমে কালো গরুর চামড়া কে  ধূসরবর্ণে রূপান্তরিত করা হয়েছে । তার কারণ কালো গরুর চামড়া সূর্য থেকে অধিকমাত্রায় তাপ শোষণ করে । ফলে গরু ক্লান্ত অবস্থায় থাকে এবং এই অবস্থায় তাদের দুধ উৎপাদনের ক্ষমতা কমে যায় ।  তাই এই  জিন প্রযুক্তি  ব্যবহার করে কম তাপ শোষণকারি  ধূসর রংয়ের গরুর চামড়ায় রূপান্তর ঘটানো হয়েছে । বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সারাবিশ্বে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন গবাদি পশু চাপের সম্মুখীন | তাই এই প্রযুক্তি অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করবে ।  তাছাড়া নানা রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় ।

 

 ২০২০ সালে শারীরবৃত্ত  বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে  নোবেল পুরস্কার পান যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথের সিনিয়র ইনভেস্টিগেটর হারভে  জে অল্টার (Harvey J Alter),  কানাডার ইউ্নিভার্সিটি অফ  আলবার্টার অধ্যাপক মাইকেল  হোটন (Michael Houghton)  এবং  যুক্তরাষ্ট্রের রকফেলার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক চার্লস  এম রাইস (Charles M. Rice) ।   ক্যারোলিনস্কা  ইনস্টিটিউটের   নোবেল অ্যাসেম্বলি তাদের প্রেস রিলিজ  এ উল্লেখ করে যে ‘for the discovery of Hepatitis C virus’  এর জন্য অল্টার, হোটন এবং রাইস নোবেল পুরস্কার  সমানভাবে ভাগ করে নেবেন |  উল্লেখ্য অল্টার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে,  হোটন  যুক্তরাজ্যের ইংল্যান্ডে এবং রাইস যুক্তরাষ্ট্রের  সাক্রামেন্টোতে  জন্মগ্রহণ করেন ।

 

 ইতঃপূর্বে তীব্র প্রদাহ রোগের ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস-এ এবং হেপাটাইটিস-বি  ভাইরাস আবিষ্কার হয়েছিল । কিন্তু লক্ষ্য করা যায় অধিকাংশ রক্তবাহিত যকৃতের রোগ হেপাটাইটিস-এ  এবং হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস থেকে নয় ।   অল্টার,  হোটন এবং  রাইস হেপাটাইটিস-সি ভাইরাস আবিষ্কারের মাধ্যমে দেখান রক্তবাহিত দীর্ঘস্থায়ী  যকৃত প্রদাহ  এর অন্যতম কারণ এই ভাইরাস ।  এই ভাইরাস সনাক্ত করণের মাধ্যমে এই রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে ঔষধ তৈরি করা সম্ভব হয়েছে । এভাবেই চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নব দিগন্তের সূচনা করেছে  তাদের আবিষ্কার।এ বছরে   নোবেল পুরস্কার  স্বীকৃত গবেষণা মানবকল্যাণে  নানাভাবে   যে অবদান রাখবে তাতে কোন সন্দেহ নেই |

: কানন পুরকায়স্থ  যুক্তরাজ্যে কর্মরত বিজ্ঞান  পরিবেশ বিষয়ক উপদেষ্টা এবং অধ্যাপক

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: