মঞ্চের কবি – শামসুদ্দিন পেয়ারা

মঞ্চের কবি তিনি, মঞ্চ তাঁর একচ্ছত্র কাব্যজগৎ।

মঞ্চে দাঁড়িয়ে লিখতেন রাজনীতির অমর কবিতাসব

সমুদ্র উপড়ে তোলা সুনামির মতো

ডুবিয়ে ভাসিয়ে গড়িয়ে সাথে নিয়ে যেতেন সবাকে;

আবেগে থৈ থৈ করতো গাঙ্গেয় বদ্বীপের গ্রাম জনপদ।

 

এক লাইন দু’লাইন করে এক সর্গ দুই সর্গ

ক্রমান্বয়ে পাতা উল্টে যেতে থাকতো দ্রুত থেকে দ্রুততরো

কালবোশেখির ঘূর্ণীপাকের চেয়ে আরো দ্রুত বেগে।

 

যারা চুপচাপ ছিল তারা নড়ে বসতো

বৃদ্ধা মুখের থেকে ফেলে দিয়ে আধখাওয়া পান

মাটির আসন থেকে উঠে বসতো পায়ের পাতায়।

 

এ যে আমাদেরই কথা সব

আমাদের প্রাত্যহিক সুখ দুঃখ

সংসারের নানা অনটন

ইনি তো সে সব কথা বলছেন

মন দিয়া শোন সবে ভাই বন্ধু আত্মীয় স্বজন,

আমাদের বাঁচতে হলে লগি বৈঠা নিয়া নামতে হবে।

জঙ্গলের বাঘে কি শোনে পুঁথির বয়ান?

 

তরুনেরা স্লোগান ধরতো,

জাগো জাগো বাঙ্গালি জাগো

রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়

তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা।

 

দেশের মানুষ

তাঁর জালে ধরা পড়তো ঝাঁকবাঁধা ইলিশের ন্যায়।

তিনি ছিলেন রাজনীতির শ্রেষ্ঠ ঊর্ণনাভ।

 

শেফার মঁ ব্লঁ ক্রিস্টিয়ান ডিওর বা পার্কার নয়

একটিই কলম ছিল তাঁর

ঈশ্বর যেটিকে তাঁর কন্ঠস্বরে বসিয়েছিলেন;

পুরান ঢাকার কলরেডি বা তাহের এসে সাজিয়ে দিত

মুখের সামনে ঝকঝকে মাইক্রোফোন

একশোটা হর্ন প্রবল স্বরে বেজে উঠতো

“ভায়েরা আমার”।

 

তিনি তাঁর কবিতা লিখে উড়িয়ে দিতেন মাঠের বাতাসে

সে সব কবিতা সীলমোহরের মতো

মানুষের অন্তরের অবিনাশি পাথুরে পুস্তকে

স্হায়ীভাবে লেখা হয়ে যেতো।

 

তিনি তাঁর নিজস্ব ছন্দগুলো টেনে আনতেন

বাঙলার নদি ক্ষেত কাদামাটি ঋতুচক্র ঘেঁটে,

কৃষকের অবার শব্দভাণ্ডার বেছে লাঙল জোয়াল

মায়ের আঁচল ঢেঁকি হেঁশেল

বাবার বৈঠা কাছি সেঁউতি ও ধানের মরাই

পাল তোলা নাও আর নোঙরের ইস্পাত-নখর থেকে।

 

বাতাসে উঁচিয়ে ধরে ধবধবে কিঞ্চিত গুটানো আস্তিন

মঞ্চে এসে দাঁড়াতেন মঞ্চের রবীন্দ্রনাথ

যেন এক লক্ষ জুলিয়াস সীজার কথা বলছেন,

রূদ্ধশ্বাস মানুষেরা চেয়ে থাকতো তাঁর দিকে

প্রত্যেকের বুকের শব্দ শুনতে পেতো পাশের মানুষ।

সমুদ্র গর্জে উঠতো ঈশ্বরের নির্বাচিত সেই কন্ঠস্বরে।

 

তারপর ইতিহাস ভূগোল অর্থনীতি রাজনীতি

নৃবিদ্যা ধর্ম চারুকলা সাহিত্য ও সঙ্গীত মিলিয়ে

কী এক সম্মোহনী ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করতেন,

বাঙালিরা প্রস্তরমূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে যেতো।

মানুষের বুকের সেই পুঞ্জিভূত গাঢ় স্তব্ধতাই

বিধ্বংসী বারুদ হয়ে ১৯৭১-এ বিস্ফোরিত হয়।

শামসুদ্দিন পেয়ারা

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: