ধর্ষন মহামারী রোধে চাই দৃষ্টান্তমুলক সাজা–কাজী সালমা সুলতানা

দেরীতে হলেও সামাজিক ব্যাধী ধর্ষন নির্যাতন ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে বিক্ষোভ হচ্ছে । সারা বিশ্ব যখন করোনা মহামারীতে আক্রান্ত তখন বাংলাদেশ করোনার সাথে ধর্ষনের মহামারীতে আক্রান্ত । সাম্প্রতিক সময়ে গত সেপ্টেম্বর মাসের শুরুর দিকে বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নে এক নারীকে (৩৭) বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। দুবৃত্তরা এ ঘটনার ভিডিও চিত্র ধারণ করেন। পরে তাকে সামাজিক ভাবে হেয় করতে সেই ভিডিও তারাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে গত ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া তরুণীকে তুলে নিয়ে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। বরগুনার তালতলীতে পঞ্চম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে মুখ বেঁধে বৃদ্ধ দোকানি আব্দুস সোবাহান (৬৫) ধর্ষণ করেছে! বেগমগঞ্জের ঘটনার প্রেক্ষাপটে নারী ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা এবং বীভৎস নির্যাতনের বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী ধর্ষন বিরোধী প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি জেলাতে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন সহ সকল শ্রেনী পেশার মানুষ এই প্রতিবাদে অংশগ্রহন করছে।

বাংলাদেশের মেয়েরা যখন সর্বক্ষেত্রে শিক্ষা দিক্ষা কর্মদক্ষতা যোগ্যতা দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেসময় প্রতিদিন ৭/৮ টি ধর্ষণের ঘটনা উদ্বেগজনক । পত্রিকার পাতায় ইদানিং সময়ের কিছু শিরোনাম- চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে চাচা গ্রেফতার, নেত্রকোনায় গৃহবধূকে গণধর্ষণের চেষ্টা, বাসের ভেতর নারীকে ধর্ষণ, খুলনায় গৃহবধূকে ধর্ষণের পর ভিডিও ইন্টারনেটে, ,কাপ্তাইয়ে রাতের আধারে এক আদিবাসী মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে ধর্ষণ , রংপুরে এক সন্তানের জননীকে ধর্ষণ, অটোরিকশা চালকের সহযোগিতায় তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ, চেতনানাশক খাইয়ে ১৫ দিন ছাত্রকে বলাৎকার, মাদ্রাসাশিক্ষক আটক, ছাত্রীকে ধর্ষণ, জানাজানি হতেই পালালেন মাদ্রাসার সুপার। পাঁচ সন্তানের জননীকে শ্রমিক লীগ নেতার ধর্ষণ !

সম্প্রতি বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, গত ৯ মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯৭৫ জন নারী। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০৮ জন নারী। এছাড়া ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৪৩ জন হতভাগা নারী। আর আত্মহত্যা করেছেন ১২ জন নারী। বেসরকারি সংস্থা নারীপক্ষ ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ছয়টি জেলায় ধর্ষণের মামলা পর্যবেক্ষণ করেছে। এ সময়ে ৪৩৭২টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। কিন্তু সাজা হয়েছে মাত্র পাঁচজনের। অন্যদিকে শিশু ধর্ষনের হার প্রাপ্ত বয়স্কদের চেয়ে ৩ গুন বেশি। পুলিশের দেয়া তথ্যে দেখা যায়- গত বছর ৫ হাজার ৪০০ নারী এবং ৮১৫টি শিশু ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হয়। পুলিশের হিসাবে, গত বছর ধর্ষণের পর ১২ শিশু এবং ২৬ জন নারী মারা যান। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সারা দেশে ধর্ষণের ঘটনা আগের চেয়ে দ্বিগুণ বেড়েছে। গত বছর সারা দেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার ১ হাজার ৪১৩ নারী ও শিশু। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে ২০১৯ সালে শিশু ধর্ষণ বেড়েছে তিনগুণ। এতে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৯০২ জন শিশু। এছাড়া হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে ২৮০ জন শিশুকে। এর মধ্যে নিহত হয়েছে ২৬৬ জন শিশু।

সমাজের সুধীজন থেকে সকল শ্রেণির মানুষই এমন ঘৃণ্য অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলছে। মানুষের মধ্যে নীতি নৈতিকতার মারাত্মক স্খলন ঘটেছে। কোন প্রকার গবেষণা ছাড়া শুধু সংবাদের বিবরণ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, নিরক্ষর সাধারণ নি¤েœাবিত্ত দিনমজুর থেকে শুরু করে পরিবারের স্বজন থেকে, মসজিদেও ইমাম, মাদ্রাসার শিক্ষক, ড্রাইভার এমন কি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও এই অপরাধের সাথে জড়িত। আতঙ্কের বিষয় হলো- যারা সমাজকে শিক্ষিত করার দায়িত্ব নিয়েছেন, যারা মানুষের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করার দায়িত্ব নিয়েছেন, তাদের মধ্যে এমন অপরাধ মানসিকতা আতঙ্কিত হওয়ার বিষয়। এভাবে একটা সুস্থ সমাজ চলতে পাওে না । সমাধানের দিক নির্দেশনা পেতেই হবে। একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ঘটে। দুঃখজনক ঘটনা ঘটবে, প্রতিবাদ হবে, অপরাধী গ্রেফতার হবে, প্রতিবাদ থেমে যায় । অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সমাজটাই ব্যাধিতে আক্রান্ত। একবছরের শিশু থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধ এমনকি মৃত নারীও ধর্ষনের শিকার হচ্ছে। ধর্ষণের অপরাধ আড়াল করতে ধর্ষিতাকে মেরে ফেলাও হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিদিন গড়ে সারাদেশে অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। এ পরিসংখ্যান নিশ্চয়ই থানায় অভিযোগের ভিত্তিতে প্রণীত। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সলিশ কেন্দ্র (আসক)’র হিসাব মতে একটি ধর্ষণের মামলা দায়ের করার জন্য প্রথমেই একজন ভুক্তভুগীকে যেতে হয় থানায়। সেখানে গিয়ে তাঁকে নানা প্রশ্নবানের শিকার হতে হয়ে। তারপর তদন্ত প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতার মুখামুখি হতে হয় তাকে। এরপর আদালতে গড়ায় মামলাটি। আদালতের এজলাসেও ভুক্তভুগীকে নানা আপত্তিকর প্রশ্ন করার কথা শুনা যায়। এ ছাড়াও রয়েছে মামলার দীর্ঘসূত্রিতা। একজন ভুক্তভুগী এতসব ঝামেলা পোহানোর মানসিক শক্তি রাখেন কি না সেটিও বিবেচনার বিষয়। এ কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিশেষত দরিদ্র পরিবারের ভুক্তভোগীরা আপোষরফা করেন বেশিরভাগে ক্ষেত্রে। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় সহজেই।

একটি সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, প্রতি চারটি ধর্ষণের একটি হচ্ছে গণধর্ষণ। ধর্ষণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না বাক্ বা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীরাও। ধর্ষণ শেষে নির্মম নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাও ঘটছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে চরম নৈতিক অবক্ষয়, মোবাইল ফোনে পর্ন ছবির সহজলভ্যতা, মাদকের বিস্তার, ধর্ষণসংশ্লিষ্ট আইনের সীমাবদ্ধতা, বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং সর্বোপরি বিচারহীনতা। পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বিচারের জন্য ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের দেড় লক্ষাধিক মামলা ঝুলে আছে। এসব মামলার বিচার চলছে ঢিমেতালে। বছরে নিষ্পত্তি হচ্ছে মাত্র ৩.৬৬ শতাংশ মামলা। আর সাজা পাচ্ছে হাজারে মাত্র সাড়ে চারজন। আইনের ত্রুটি, পুলিশি তদন্তে ত্রুটি এবং অবহেলা, ফরেনসিক টেস্টের সীমাবদ্ধতা, প্রভাবশালীদের চাপ এবং সামাজিক কারণে এ রকম হচ্ছে বলে মনে করে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে এবং দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধানের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশের সরকার অতি কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে। চীনে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ড। ইরানে সাধারণত ধর্ষককে জনসমক্ষে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে অথবা গুলি করে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। আফগানিস্তানে ধর্ষণের শাস্তি রায়ের চার দিনের মধ্যে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। উত্তর কোরিয়ায় ধর্ষককে ফায়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। সৌদি আরবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে রায় ঘোষণার পর জনসমক্ষে শিরশ্ছেদ করে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের সাজা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড। মিসরে ধর্ষককে বরাবরই যেকোনো জনাকীর্ণ এলাকায় জনসমক্ষে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।

বাংলাদেশের বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় হতাশ হয়ে ভিকটিম কিংবা তার পরিবার মামলা চালাতে অপারগ হয় কিংবা হতাশ হয়ে লড়াই থেকে সরে পড়ে। সৃষ্টি হয় বিচারহীনতার সংস্কৃতি। বিচারহীনতার কারণেই অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে। কোন কোন দেশে আইনও ধর্ষককে সহায়তা করে সাজা থেকে বেঁচে যেতে বিশেষ করে সমাজ যদি পুরুষতান্ত্রিক হয়। বাংলাদেশে তেমনই এক সাক্ষ্য ধারা ১৫৫ (৪), যার উপর নির্ভর করে ধর্ষণ কেসের আসামীরা ধর্ষিতাকে দুশ্চরিত্রা/চরিত্রাহীনা প্রমাণ করতে পায়তারা কষে। ধারাটি এমন, কোন লোক যখন বলাৎকার কিংবা শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগে আদালতে সোপর্দ হয় তখন দেখানো যেতে পারে যে অভিযোগকারীনি সাধারণভাবে একজন দুশ্চরিত্র সম্পন্ন রমণী।’ এ কারণে ধর্ষণের মত জঘন্য অপরাধ সমাজে বাড়ছে বলে অনেকেই মনে করেন। আর যদি কোন মামলা চূড়ান্ত বিচার পর্যন্ত গড়ায় সে ক্ষেত্রেও স্বাক্ষীর ব্যবস্থা করা এবং নিয়মিত হাজিরাসহ নানা প্রতিবন্ধকতার মুখামুখি হতে হয় ভুক্তভোগীকে। এর এসবের ফাঁকফোকর গলিয়ে বেশরিভাগে ক্ষেত্রে অপরাধী ছাড়া পেয়ে যায়। ধর্ষণ যে একবার শুরু করে সে ধর্ষণকর্ম চালিয়েই যায় । সেখানে আইনই যদি বাঁচার পথ করে দেয় তাহলে দেশ ভুক্তভোগীতে ছেয়ে যেতে সময় লাগে না। সমাজ পরিণত হয় ধর্ষকের সমাজে। ধর্ষণে ধর্ষিতার চরিত্র বিশ্লেষণ করে সাজা এড়াবার উপায় আইনের দূর্বলতা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই দরকার ছিলো আইনের সংশোধনের।

আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আজ ধর্ষনের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনমন্ত্রীসভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ।নতুন আইন পাস হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই আইন কার্যকর করতে হবে । সমাজের সার্বিক অগ্রগতিতে নারীর অংশগ্রহণের পথ সুগম রাখতে নারী নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করতে হবে। তাই আইনের কঠোর প্রয়োগের সাথে সাথে দেশকে সামাজিক সন্ত্রাস থেকে রক্ষা করতে হলে দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলনও গড়ে তুলতে হবে।তবেই যদি মানুষের মধ্যে নীতিবোধ নৈতিকতা জাগ্রত করা যায়।
কাজী সালমা সুলতানা , গণমাধ্যম কর্মী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: