আজারবাইজান ও আর্মেনিয়াঃকেন এই যুদ্ধ

অ্যাডভোকেট আনসার খান :প্রায় দেড় লাখ জনঅধ্যুষিত নাগর্ণো-কারাবাখ অঞ্চলের ওপর দখলদারিত্ব অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে দুটি প্রতিবেশী দেশ,- আজারবাইজান এবং আর্মেনিয়ার মধ্যে তীব্র যুদ্ধ চলছে।

        প্রায় তিন দশক ধরে চলমান সীমান্ত বিরোধ কেন্দ্র করে ইতোপূর্বে বার কয়েক সীমান্ত সংঘর্ষ ও যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশ উভয় দেশের সীমান্ত সংকট সমাধানের জন্য মধ্যস্হতা করলেও সমস্যার স্হায়ী সমাধান হয়নি বিধায় দেশ দুটির মধ্যে মাঝেমধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ হতে দেখা গেছে, যদিও বড় ধরণের কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি।
         তবে বর্তমানে চলমান যুদ্ধ হঠাৎ করেই শুরু হয়েছে এবং পার্শ্ববর্তী আন্জ্ঞলিক শক্তিসম্পন্ন রাশিয়া, তুরস্ক এবং ইরান সহ কয়েকটি দেশ     যুদ্বরত দেশ দুটির পক্ষে সমর্থনে এগিয়ে আসার কারণে এই যুদ্ধ আন্জ্ঞলিক যুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে বলে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
         আন্তর্জাতিক মহল মনে করে,দক্ষিণ ককেশাস অন্ঙলের বিভিন্ন স্তরে উপরোক্ত দেশগুলো প্রচুর বিনিয়োগ করেছে।এই বিনিয়োগের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে এমনটা বিনিয়োগকারী দেশগুলো সহজে মেনে নেবে না।ওই দেশগুলো তখন কোনো না কোনোভাবে চলমান এই যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কাজেই যুদ্ধটি শেষ না হলে,-“একটি আন্জ্ঞলিক বৃহত্তর যুদ্ধে পরিণত হওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে”-বলেছেন শান্তি সংস্হার কনসিলিটি রিসোর্সের ককেশাস প্রোগ্রামের পরিচালক লরেন্স ব্রোয়ার্স।
           ব্রোয়ার্সের মতে,আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার এই সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম সামরিক প্রবণ অন্জ্ঞল হওয়ায় শংকা থেকেই যায়।
         এছাড়া, ভূ-রাজনীতি ও ভূ-কৌশলগত কারণেও ওই অন্জ্ঞল আন্তর্জাতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ,গ্যাস ও তেল পাইপলাইনগুলো ওই অন্জ্ঞল দিয়ে গিয়েছে।বিশেষকরে,ওই পাইপলাইনগুলোর মাধ্যমে রাশিয়া, তুরস্ক ও অন্যান্য দেশসমূহে তেল-গ্যাস সরবরাহ করা হয়ে থাকে। আজারবাইজানও তেল সমৃদ্ধ দেশ এবং দেশটি প্রতিদিন প্রায় আট লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে,যা তুরস্ক, রাশিয়া সহ বিভিন্ন দেশে ওই পাইপলাইন দিয়ে সরবরাহ করা হয়।
            এই পাইপলাইনগুলোর মধ্যে প্রধানত বাকু-তিলিসি-সিহান তেল পাইপলাইন, ওয়েস্টার্ন রুট এক্সপোর্ট রেল তেল পাইপলাইন, ট্রান্স আনাতোলিয়া গ্যাস পাইপলাইন এবং দক্ষিণ ককেশাস গ্যাস পাইপলাইন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
        বৃহত্তর দক্ষিণ ককেশাস আজারবাইজান থেকে তুরস্ক এবং ইউরোপ ও অন্যান্য বিশ্ববাজারে গ্যাস ও তেল সরবরাহের ধমনী হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে।আজারবাইজান এককভাবে ইউরোপের দেশগুলোর প্রায় পাঁচ শতাংশ গ্যাস ও তেলের চাহিদা সরবরাহ করে থাকে।  কাজেই, যুদ্ধ স্হায়ী হলে তেল-গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার শংকা রয়েছে বিধায় অনেক দেশ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্হ হতে পারে বলে মনে করা হয়।তাই নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থের সুরক্ষার অজুহাতে ওই শক্তিগুলোও  যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
         আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যে সীমান্ত সংকটের মূল উৎস হলো, নাগর্ণো-কারাবাখ।এটি একটি সুন্দর উঁচ অন্জ্ঞল, এর নামটির আক্ষরিক অর্থ, “পাহাড়ি কৃষ্ণ উদ্যান।”
          এই নাগর্ণো-কারাবাখ অন্জ্ঞলের ১৭০০ মাইল ভূমির দাবি ও অধিকার নিয়েই দেশ দুটির মধ্যে তিন দশক ধরে বিরোধ চলে আসছে।
          আজারবাইজান দাবি করে আসছে, নাগর্ণো-কারাবাখ অন্জ্ঞলের প্রায় ২০% ভূমি বিগত তিন দশক ধরে জবরদখল করে রেখেছে প্রতিবেশী দেশ আর্মেনিয়া।
          “হারানো এই ভূমি পূনরুদ্বার করার জন্য চলমান এই যুদ্ধ,”- বলছে আজারবাইজান। অন্যদিকে,”নিজেদের ভূখণ্ড বিদেশী আগ্রাসন থেকে রক্ষার জন্য লড়াই করছে আর্মেনিয়ান বাহিনী”-, দাবি আর্মেনীয় সরকারের।
         আর্মেনিয়া কর্তৃক দখলীয় ভূমির মধ্যে উত্তর কারাবাখ অন্জ্ঞলে শুশা,খানকেন্ডি,খোজালী,আসগরান,আখদারা এবং হদ্রুত শহরগুলো অন্তর্ভুক্ত আছে।এছাড়াও আর্মেনিয়ার দখলে আজারবাইজানের আরও সাতটি অন্জ্ঞল রয়েছে। এগুলো হলো,-লাচিন,কলাবাজার, আগদম,ফুজুলি,জাব্রাইল,কুবাডলি এবং জাঙ্গিলাল সহ উচ্চতর কারাবাখ অন্জ্ঞলকে ঘিরে থাকা জেলাগুলো।
         আজারবাইজান সীমান্তের অভ্যন্তরে পাহাড়ি ল্যান্ডলক্ড অন্জ্ঞল নাগর্ণো-কারাবাখ তৎকালীন সৌভিয়েত ইউনিয়নের গঠনের আগে থেকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
         নাগর্ণো-কারাবাখ আন্তর্জাতিক ভাবে আজারবাইজানের ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃত। তবে বেশিরভাগ আর্মেনিয়ান জনগোষ্ঠীর বসতি হলো এই অন্জ্ঞল। বিশেষকরে, ১৯৩৩ সালে যখন সোভিয়েত সরকার নাগর্ণো-কারাবাখ স্বায়ত্তশাসিত অন্জ্ঞল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলো, তখন ওই অন্জ্ঞলের মোট জনসংখ্যার ৯৯% ছিলো আদিবাসী আর্মেনিয়ান। এই আদিবাসী আর্মেনিয়ান জনগোষ্ঠীই এক শতাব্দীরও বেশী সময় ধরে আজারবাইজানের শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম করে আসছে। আর্মেনিয়া স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আদিবাসী আর্মেনিয়ানদের সমর্থনে সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে আজারবাইজানের বিরুদ্ধে।
        আলোচ্য নাগর্ণো-কারাবাখ অন্জ্ঞলটি ১৮১৩ সালে রাশিয়া নিজেদের ভূখণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিলো এবং ১৯৩৩ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকার ওই অন্জ্ঞলকে স্বায়ত্তশাসিত ওব্লাস্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলো এবং তখন থেকেই এই অন্জ্ঞলে বিচ্ছিন্নতাবাদী ধারার ভিত্তি স্হাপিত হয়েছিলো।
         ১৯৮০র দশকের গোড়ার দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বলতার সূযোগ কাজে লাগিয়ে নাগর্ণো-কারাবাখ স্বায়ত্তশাসিত ওব্লাস্টকে আর্মেনিয়ার অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ওই অন্জ্ঞলে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে আর্মেনিয়া।
          আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান আপার-কারাবাখ দ্বন্দ্ব আজারবাইজানের ঐতিহাসিক ভূমিতে আর্মেনিয়ানদের উম্মুক্ত আন্জ্ঞলিক দাবির পাশাপাশি ১৯৮৮ সালে জাতিগত উস্কানি ও সহিংসতা দিয়ে শুরু হয়েছিলো। এসময়কাল থেকে পরবর্তী ১৯৮৯ অবধি সময় পর্যন্ত আর্মেনিয়া প্রায় আড়াই লাখেরও বেশী আজারবাইজানীকে তাদের ঐতিহাসিক ভূমি থেকে বহিষ্কার করেছিলো এবং পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের ২৬ নভেম্বর আজারবাইজানীয় প্রজাতন্ত্রের সুপ্রীম সোভিয়েত নাগর্ণো-কারাবাখ স্বায়ত্তশাসিত ওব্লাস্ট বিলুপ্তির বিষয়ে আইন প্রণয়ন করেছিলো।
        ১৯৮৮ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি পিপলস ডেপুটিজের নাগর্ণো-কারাবাখ স্বায়ত্তশাসিত ওব্লাস্ট সোভিয়েতের অধিবেশনে এ অন্জ্ঞলের আর্মেনিয়ান সদস্যরা নাগর্ণো-কারাবাখ অন্জ্ঞলকে আর্মেনিয়ার সাথে সংযুক্ত করার জন্য একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলো, যা অবৈধ বলে অভিহিত করে আজারবাইজানীরা প্রত্যাখ্যান করে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলো।
        ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রেক্ষিতে আর্মেনিয়ার সমর্থনে স্বায়ত্তশাসিত নাগর্ণো-কারাবাখ অন্জ্ঞলটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসে।তবে,এই স্বাধীনতার বিষয়টি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি।আজারবাইজান স্বাধীনতার ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে। এমনকি, আর্মেনিয়াও স্বাধীনতার ঘোষণার স্বীকৃত দেয়নি।কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়।এ যুদ্ধে প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলো এবং আর্মেনিয়া আজারবাইজানের ২০ শতাংশ ভূমি দখল করে নিয়েছিলো।
       ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ পরপর চারটি প্রস্তাব,অর্থ্যা ৮২২,৮৫৩,৮৭৪ এবং ৮৮৪ গ্রহণের মাধ্যমে আর্মেনিয়াকে আজারবাইজানের দখলকৃত ভূমি থেকে সেনা প্রত্যাহারের আহবান জানায়,যা প্রত্যাখ্যান করে আর্মেনিয়া।
       ১৯৮০র দশকের সময় থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সময়কালে নাগর্ণো-কারাবাখ অন্জ্ঞলকে কেন্দ্র করে দেশ দুটির মধ্যে যুদ্ধ ও সীমান্ত সংঘর্ষ হয়েছে বার কয়েক।এতে প্রাণহানি হয়েছে এবং বাস্তচ্যুত হয়েছে এক মিলিয়নেরও অধিক মানুষ।
      উভয় দেশের মধ্যে ১৯৯১ সালে সংঘটিত যুদ্ধ থামানোর জন্য ইউরোপের মিনস্ক গ্রুপ,ফ্রান্স, রাশিয়া চেষ্টা করেছিলো এবং অবশেষে রাশিয়ার মধ্যস্হতায় ১৯৯৪ সালের মে মাসে উভয় দেশের মধ্যে যুদ্ধ বিরতি হয়েছিলো। তবে যুদ্ধ বিরতি পর্যবেক্ষণে বা প্রয়োগ ও কার্যকর করার জন্য শক্তিশালী আন্তর্জাতিক উপস্হিতি কখনো ছিলো না বিধায় সীমান্ত সংঘর্ষ মাঝেমধ্যে অব্যাহত ছিলো।তাছাড়া, যুদ্ধ বিরতি চুক্তি হলেও স্হায়ী শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি এখনও অবধি।
       কোনো শান্তি চুক্তির মাধ্যমে উভয় দেশের সীমান্ত সংকটের সমাধান না হওয়ার কারণে প্রায় তিন দশক পরে উভয় দেশ আবারও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে,যা আন্জ্ঞলিক যুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
       ওই অন্জ্ঞলে স্হায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তাই জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের জোরালো ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী।
লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: