গণহত্যা ’৭১ চড়াইহাট গণহত্যা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তার দোসররা যে গণহত্যা চালিয়েছিল, তা ইতিহাসে বিরল। মাত্র ৯ মাসে ৩০ লাখ মানুষ পৃথিবীর কোনো দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এত মানুষ জীবন দেয়নি। শুধু তাই নয়, হত্যার সঙ্গে নির্যাতন করা হয়েছে ছয় লাখেরও বেশি নারীকে। এছাড়া নিপীড়িত হয়েছে অসংখ্য মানুষ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ-দেশীয় দোসররা কত ঘরবাড়ি ভস্মীভূত করেছিল তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কত যে নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তারও হিসাব পাওয়া কঠিন ছিল। এসব হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশই ঘটেছে রাজাকার, আলবদর, আলসামসদের সহায়তায়। এক রাষ্ট্রের নাগরিক হলেও পাকিস্তানিদের পক্ষে সম্ভব ছিল না দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটানো। এমনি একটি নারকীয় গণহত্যা ঘটে ১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর। এই দিনে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায় কাজের কথা বলে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয় শতাধিক নিরীহ জনতাকে। দিনাজপুরের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম ঘটনা চড়ারহাট গণহত্যা। ১৯৭১ সালের ৯ অক্টোবর বিরামপুর উপজেলার আলতাদীঘি নামক স্থানে গরুর গাড়িতে করে কয়েকজন খান সেনা বিরামপুর ক্যাম্পে যাওয়ার সময় মুক্তিযোদ্ধারা অতর্কিত হামলা করে সাত খান সেনাকে হত্যা করেন। খান সেনাদের সঙ্গে দুজন রাজাকারও ছিল। ওই রাজাকাররা খান সেনাদের হত্যা করার খবর বিরামপুর ক্যাম্পে জানায়। খবর পেয়ে ক্যাম্প কমান্ডার একজন মেজর প্রতিশোধ নিতে হিংস্র হয়ে ওঠে। সে তার ফোর্সদের নিয়ে ৯ অক্টোবর রাতেই পুটিমারা ইউনিয়নের চড়ারহাট (প্রাণকৃষ্ণপুর) ও আন্দোলগ্রাম (সারাইপাড়া) ঘেরাও করে। ১০ অক্টোবর ভোর রাতে নবাবগঞ্জের পুটিমারা ইউনিয়নের চড়ারহাট প্রাণকৃষ্ণপুরে পুরুষদের একত্র করে গ্রামের পূর্বদিকের শেষ প্রান্তে একটি ব্রিজতলায় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। পাক সেনাদের গুলিবর্ষণ থেকে চড়ারহাট গ্রামের আট ব্যক্তি সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। বেঁচে থাকলেও তারা পাক সেনাদের ছোড়া গুলির আঘাতের ক্ষত আর স্বজন হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছেন। আন্দোলগ্রামেও পাক সেনারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুরুষদের গুলি করে হত্যা করে। সেদিনের ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া বাবা ও ভাইকে হারানো গুলিবিদ্ধ মোজাম্মেল হক বলেন, সেদিন তিনি ভোরে ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদে যান। মসজিদে ১০-১২ জন নামাজ পড়ছিলেন। নামাজ শেষে গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি মো. মফিজ উদ্দিনসহ অনেকেই খবর দেন, পাক সেনারা ডাকছে। ভাঙা সেতু নির্মাণ করতে মাটি কাটতে হবে। পাক সেনাদের কথা শুনেই বুকটা কেঁপে ওঠে। কিন্তু মুরব্বিদের আশ্বাসে আশ্বস্ত হয়ে সবাই গ্রামের পূর্বদিকে একটি মাঠে যান। গিয়ে দেখেন, সেখানে গ্রামের প্রায় সব পুরুষ মানুষকে একত্র করা হয়েছে। এরপর পাক সেনারা নির্বিচারে ব্রাশফায়ার করে। এতে দুজন মহিলাসহ ১৫৭ জন শহীদ হন। তিনি নিজেও গুলিবিদ্ধ হন। শহীদদের সবার লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ৯৩ জন শহীদের লাশ শনাক্ত করা হয়েছিল। ওই সময় এক কবরে একাধিক শহীদের লাশ দাফন করা হয়েছিল। দেশ স্বাধীনের ৪০ বছর পার হওয়ার পর ২০১১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডার ফোরাম ও মুক্তিযোদ্ধা অজিত রায় এর উদ্যোগে চড়ারহাটে নিহত শহীদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত করা হয়। স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির ভিত্তিপ্রস্তরের উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আ আ স ম আরেফিন সিদ্দিক। এমন অসংখ্য গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে। সেসব প্রাণের বিনিময়েই আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা।
কাজী সালমা সুলতানা: গণমাধ্যমকর্মী । কৃতজ্ঞতা: ১৯৭১ গণহত্যা ও নির্যাতন আর্কাইভ ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ট্রাস্ট

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: