এরা কারা, ওরা কারা, আর কত ?

এক যুগ ধরে ক্ষমতায় থেকেও যখন জাস্টিফাই করার মানসিকতার লক্ষণ দেখা যায়, স্বীকার করুন আর না করুন, বুঝতে হবে মারাত্মক দূর্বলতা আছে । সেই দূর্বলতাকে আর ঢেকে রাখাও সম্ভব হয় না, স্বাভাবিক কারণেই । লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সাধারণ কোনো কথায় কেউ যখন কোনো যুক্তিতে পারছে না তখন তর্কে জড়াবে । চিৎকার চেঁচামেচি করবে । আবার অনেকে আগ বাড়িয়ে হুমকি/ ধামকি দেবে । এগুলো আমার কথা না, মনোবিজ্ঞানের কথা । মনোবিজ্ঞান আরো বলে নিজের দোষ ঢাকতে অন্যের দোষকে সামনে দাঁড় করিয়ে, সেটাকেই মূল বিষয় বানিয়ে ফেলাটা একপ্রকার প্রতিরোধ বা রক্ষা কবচ করাটাও একটি স্বাভাবিক মানসিক পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া ।  কারণটিও স্বাভাবিক, মানুষ মাত্রই সাধারণ মানুষ।  হাতেগোনা খুব কম জনেই মহান মানুষ হয় । আর আমাদের মতন দক্ষিণ এশিয়াভিত্তিক রাষ্ট্রের শাসনকর্তারা কতটা মহান, সেটা তো বেশ পরিষ্কার  । যেহেতু মহান আমরা কম সংখ্যক বা একেবারেই ক্ষীণ, তাই জাস্টিফাই করাটাও স্বাভাবিকতার মধ্যেই পরে । এই জাস্টিফাই করার জন্য ঘটনাক্রমে স্বাভাবিক কারণেই একটু সময় ক্ষেপণ হয়।

 

এবার এই সময়ক্ষেপণটি একটু লক্ষ্য করুন। ধর্ষণের কাহিনী নিয়ে গত দু’দিন যাবৎ চলছে কিছুটা প্রতিবাদ।  আমি জেনে বুঝেই বলছি, কিছুটা । কেননা ধর্ষণের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ হবার কথা সমাজে তার তেমন লক্ষণ নেই বলেই মনে হচ্ছে ( এটা অবশ্য আমার ব্যক্তিমত ) । জাস্টিফাইয়ের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণটি তাহলে কোথায়? গত দু’তিনদিন ধর্ষণের বিরুদ্ধে যেসকল প্রতিবাদ ডিজিটালের কল্যাণে ফেইসবুকে পাওয়া গেলো, তার বিপরীতে দু’দিন পর থেকে শুরু হলো উল্টোরথ। যা এখন আবার ফেইসবুকে ভরে গেছে । নানান পোস্টার, ফেস্টুন আর ছবি দিয়ে।  এরা কারা ? ওরা কারা ? ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্ন রেখে ।

 

ছবিগুলো কেমন ছবি ? কোন মেয়ে সিগারেট টানছে, কোন মেয়ে নেচে নেচে প্রতিবাদ করছে, কোন মেয়ে কি লেখা পোস্টার হাতে তুলে নিয়েছে ? ইত্যাদি ইত্যাদি। এরকম দু’চারটি ছবি দিয়ে কি সব দুষ্টচক্র এটা প্রমাণ করতে চান ? তাহলে বলতেই হয় বোকার স্বর্গে আছেন । আবার অনেকেই সেইসব লেখা পোস্টার যে এডিট করা পোস্টার তার প্রমাণে নামতে বাধ্য হচ্ছে । রি- পোস্ট করে তাদের বলতে হচ্ছে, ফেইক ফেইক ।

 

ঠিক এমনটি সব ক্ষেত্রেই ঘটে । বুয়েটে আবরারকে হিংস্রতার সাথে হত্যা করা হয়েছিলো, গত একবছর পূর্বেই । সেই সময়েও জাস্টিফাই অনেককেই করতে দেখেছি, বুয়েটের সনি হত্যাকে সামনে এনে । সনি ছাত্রদলের দুই গ্রুপের গোলাগুলিতেই হত্যা হয়েছিলো, যা ছিলো জঘন্য থেকে জঘন্যতম এবং রিয়েল ক্রসফায়ার। সনিকে ওরা হত্যা করতে আসেনি, সেই সময়ের ছাত্রদলের জঘন্য কর্মের ফল ছিলো সনি হত্যা।  সমস্যা হলো জাস্টিফাই করতে গিয়ে রাতভর হিংস্রতার সাথে তীলে তীলে হত্যাকে  সনি হত্যার সাথে মিলিয়ে ফেলা । স্বীকার করুন আর নাই করুন, দু’টোর মধ্যে পার্থক্য অবশ্যই ছিলো । এই পার্থক্যটি জাস্টিফাইয়ে ক্ষেত্রে বেমালুম ভুলে বসে। এখানে একটু পরিষ্কার বলে রাখি, কেউ দয়া করে ভাববেন না আমি সনি হত্যাকে মামুলিভাবে নিচ্ছি। ঘৃণা আন্তরের গহীন কোণ থেকেই ছাত্র দলের প্রতি ছিলো এবং আছে । কেননা ছাত্র দলের অস্রবাজি নিজের চোখে দেখেছি আশির দশকে। আমি শুধু জাস্টিফাইয়ে কথা বলছি ।

 

এবারের ধর্ষণের যতটুকু প্রতিবাদ হচ্ছে, শুরু হলো ইয়াসমিনকে সামনে আনা । ইয়াসমিনের ঘটনা স্বয়ং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা ঘটেছিলো । সেই পুলিশদের ফাঁসিও হয়েছিলো । জাস্টিফাইয়ের কল্যাণে ইয়াসমিন এখন সামনে চলে এসেছে। এখানেও একটি পার্থক্য রয়েগেছে, যারা জাস্টিফাই করছেন তারা বলছেন না বা সামনে আনছেন না যে, সেই  ইয়াসমিনের ঘটনায় বিএনপি / জামাত সরকারকে সাড়েতিন বছরের মাথায় ক্ষমতা থেকে সরে যেতৈ হয়েছিলো ।

 

উপরে মাত্র দু’টো ঘটনা বললাম। এমন শত বলা যাবে জাস্টিফাই নিয়ে।  এই জাস্টিফাই বড় দুই দলই করতে বেশ দক্ষ । এবার ভাবুন তো, ধর্ষণের প্রতিবাদে কেন সরকারের প্রশ্ন আসবে না ? ইয়াসমিনের ক্ষেত্রে যদি সরকার চলেযেতে বাধ্য হয়, তাহলে কেন এই ঘটনার ক্ষেত্রে আন্দোলনে সরকারের নাম আসবে না ? কেননা এই ধর্ষণগুলোর পিছনে সরাসরি রাজনৈতিক শক্তির বলয় জড়িত । এটা কি কেউ অস্বীকার করতে পারবেন ? যেহেতু রাজনীতি জড়িয়ে আছে, প্রতিবাদে তো নাম আসবেই , তাই নয় কি ?

 

হ্যাঁ, সুযোগ নিচ্ছে বা নিবে কোনো দল, এটাও কি স্বাভাবিক নয় ? সুযোগটা আপনারা তৈরি করে দিয়েছেন, তাহলে তো সুযোগ নিবেই । মনে পরে না, ইয়াসমিনের ক্ষেত্রেও আপনারা সমানভাবেই সুযোগ নিয়ে সরকারের পতন ঘটিয়েছিলেন বা সরকার যেতে বাধ্য হয়েছিলো । সেই সময়ে তো এক ইয়াসমিনের ঘটনা সামনে এসেছিলো। বর্তমানে তো প্রায় প্রতিদিন সামনে আসছে । কি বলবেন তাহলে ?

 

জাস্টিফাই করবেন সেটা ঠিক আছে। কে না করে বা করা ছাড়া উপায় থাকে না ? তাই বলে এখন কেউ সুযোগ খুঁজলেই তারা সব দুষ্টচক্র, তা কেন হবে ? কেননা আপনারা নিজেরাই তো সেই উদাহরণ তৈরি করে রেখেছেন । তাই বলিছি, জাস্টিফাই করেন ভালো কথা, তার চেয়েও আগে সমাধান করুন। যত দ্রুত সমাধান করতে পারবেন ততই মঙ্গল, তখন আর জাস্টিফাইয়ের প্রয়োজনীয়তা থাকবে না, আর জাস্টিফাইয়ের পথ খুঁজতে হবে না । আবার দয়া করে বলবেন না, ধরেছি , বিচার হবে । যা করার সরকারের লম্বা হাত ব্যবহার করে দ্রুত করুন এবং সামনে যেন না ঘটে, সেই দিকে শক্তিশালী নজর দিন । জনমানুষের ধৈর্যেরও তো একটা সীমা আছে, তাই নয় কি ? আর একটি কথা বেশি করে জাস্টিফাই করা মানেই নিজেদের দূর্বলতাকেই বেশি করে প্রকাশ করা মাত্র।

 

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম 

 

 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: