শিশু নোহার মৃত্যু: বাবার দাবি আত্মহত্যা, মা বলছেন হত্যা

বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ৩য় শ্রেণির শিশু শিক্ষার্থী নুশরাত জাহান নোহার রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। নোহার বাবার দাবি, নোহা আত্মহত্যা করেছে। তবে মায়ের অভিযোগ পিতা ও তার সৎ মা নোহাকে হত্যার পরে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিচ্ছে। মেয়ে হত্যার বিচার দাবি করেছেন তিনি। 

শিশু নুশরাত জাহান নোহাকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তবে তিন দিনেও ওই শিক্ষককে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

বরিশাল পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম শুক্রবার রাতে নোহার বাবা সুমন মিয়ার সাথে দেখা করেছেন।  এসময় সুমন মিয়া পুলিশ সুপারের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচার দাবি করেন।

বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন জানান, শনিবার বিকেলে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির জরুরি সভা ডেকে মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষক সুমন পাইককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ওই সভায় পরিচালনা কমিটির ১৪ সদস্যর মধ্যে ১১ জন উপস্থিত ছিলেন।

তিনি আরও বলেন, শিশু শিক্ষার্থী নোহা পরিবার সদস্যদের দ্বারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। কারণ হিসেবে তিনি নোহা’র নামে তার দাদা জমি লিখে দিতে চেয়েছিলেন। সম্পত্তি হাতছাড়া হবার আশংকায় পরিবারের সদস্যরা তাকে হত্যা করতে পারে। তিনি নোহা হত্যার সুষ্ঠ বিচার দাবি করেন।

শিশু শিক্ষার্থী নোহার গর্ভধারিণী মা তানিয়া বেগম সাংবাদিকদের কাছে অভিযাগ করে বলেন, নোহার বাবা সুমন মিয়া বর্তমানে চার নম্বর স্ত্রী নিয়ে সংসার করছেন। তিনি নিজেও বর্তমানে ঢাকায় সংসার করছেন। নোহা ওই পরিবারের সৎ মা ঝুমুর বেগমের কাছে ছিল শত্রু।

তানিয়ার অভিযোগ, তার মেয়ে নোহাকে তার সতীন ঝুমুর বেগম ও স্বামী সুমন মিয়া হত্যার পরে লাশ ঝুলিয়ে রেখেছে। নোহার মৃত্যুর খবর পেয়ে বুধবার রাতেই নোহার মা তানিয়া বেগম ঢাকা থেকে এলাকায় ছুটে আসেন। ওই দিন ও শনিবার বিকেলে তিনি সাংবাদিকদের কাছে তার মেয়ে নোহাকে স্বামী ও সতীন পরস্পর যোগশাযশে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে অপপ্রচার করায় তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার দাবি করেন।

তানিয়া বেগম বলেন, আদালতের মাধ্যমে নোহাকে তার বাবার জিম্মায় প্রদান করা হয়। নোহার মৃত্যুর দুই দিন আগে তার দাদা তাকে (তানিয়াকে) ফোনে জানিয়েছিলেন যে, তার নাতির জন্য তিনি সম্পত্তি লিখে দেবেন, যাতে ভবিষ্যতে নোহার কোনো কষ্ট না হয়। ওই সম্পত্তি লিখে দেয়ার কথাই নোহার মৃত্যুর জন্য কাল হয়ে দাড়িয়েছে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তানিয়া বলেন, শিক্ষকতো ঘটনার দিন শুধু নোহাকেই মারধর করেনি, অন্যদেরও মেরেছে। তবে নোহা কেন আত্মহত্যা করবে? তিনি অতটুকু মেয়ে কিভাবে ওড়না ও গামছা জোড়া লাগিয়ে গলায় ফাঁস দিতে পারে? সম্পত্তি বেহাত হবার আশংকায় নোহার মৃত্যুর পিছনে সৎ মা ও তার সাবেক স্বামী জড়িত। দ্রুত পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট প্রদানের মাধ্যমে মামলাটি সিআইডি বা ডিবিতে হস্তান্তরের দাবি জানান তিনি।

এ দিকে মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষক শফিকুল ইসলাম সুমন পাইককে বাঁচাতে সাতলা ইউপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন পাইক তার লোকজন নিয়ে নোহার বাবাসহ বাড়ির লোকজনের সাথে দেখা করে বিষয়টি আপোষ মিমাংসার প্রস্তাব দেন। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে চেয়ারম্যান ও তার লোকজন দ্রুত এলাকা ত্যাগ করেন।

এ ব্যাপারে সাতলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন পাইক মোবাইল ফোনে আপোষ মিমাংসার কথা অস্বীকার করে বলেন, তারা নোহার শোকার্ত পরিবারকে সমবেদনা জানাতে গিয়েছিলেন।

বাগধা ইউনিয়নের খাজুরিয়া গ্রামে প্রতিষ্ঠিত দারুল ফালাহ প্রি-ক্যাডেট একাডেমী দীর্ঘদিন বন্ধের পর গত ৫ সেপ্টেম্বর (শনিবার) স্কুলের মাসিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তিন দিন পরে ওই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয় বুধবার (৯ই সেপ্টেম্বর) দুপুরে। প্রকাশিত ফলাফলে স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী নুশরাত জাহান নোহা ৩০ মার্ক পেয়ে অকৃতকার্য হওয়ায় স্কুলের শিক্ষক শফিকুল ইসলাম সুমন পাইক শিক্ষার্থী নোহাকে ক্লাশ রুমে বেত্রাঘাত করে গালাগালি করেন।

আগৈলঝাড়া থানার ওসি মো. আফজাল হোসেন জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। আসামিকে ধরতে অভিযান চালানো হচ্ছে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: