রাজনৈতিক ঘী

দুধে মাছি পড়লে আমরা দুধ ফেলে দেই, কিন্তু ঘীতে মাছি পড়লে, মাছি তুলে ফেলে দেই ! কারণটি কি ? দুধ তরল বলে কি ? দুধের দাম কম ? এবং ঘী এর ঘণত্ব বেশি বলে কি?  নাকি ঘী এর মূল্যেই আলাদা ?

বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডে যে দিকেই তাকান, দেখা যাবে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা দলগুলো এক প্রকার স্বৈরাচারী হয়ে উঠে । শত উদাহরণ দেওয়া যাবে । দলগুলোর ভিতর একনায়কতন্ত্রের একটা ভাব চলে আসে । আমি হনু কে রে, ভাব । এমনকি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেও যদি ক্ষমতায়ন হয়, তাদের মাঝেও সেরকমটি লক্ষণীয় হয় ।

ভাবুন তো, কেন বিশ্বের ভালো গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে দলে বা সরকারে দু’টার্মের বেশি একি ব্যক্তি বা  একজনকে ক্ষমতায় না থাকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় ? একেবারেই কি না ভেবে এমন ব্যবস্থা? না, তা মোটেও না । প্রথমত: একি চেয়ারে বেশি পোক্ত হলে মনস্তাত্ত্বিক ভাবেই একটা একরোখা ভাব আসার সমূহ সম্ভাবনা থাকবেই ( মনোবিজ্ঞান তাই বলে ) যেহেতু সবাই রক্ত- মাংসের মানুষ, তাই । দ্বিতীয়ত : নতুনত্বের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসবে ।

ইউরোপে একটি কথার প্রচলন আছে, “রোম যাবার শত রাস্তা আছে ” । সব রাস্তা ব্যবহার না করলে বুঝা মুশকিল কোন পথ  সত্যি কার্যকরী বা সহজ পৌঁছাতে। সব রাস্তায় রোম পৌঁছানো যাবে, তবে কণ্টকাকীর্ণ কোন পথে কম হবে, সেটাই যে মুখ্য।

রাজনৈতিক দলগুলোর লক্ষ্য সব সময়ের জন্যেই ক্ষমতা।  সেটা ঠিক আছে । ক্ষমতায় যেতে পারলেই না নিজেদের আদর্শ ও দর্শনের প্রয়োগ করে জনসেবা ( যা রাষ্ট্রের প্রধান কাজ ) করা সম্ভব।  তা’ছাড়া সত্যি সুযোগ কম । সেই সুযোগটি আমাদের দেশের রাজনৈতিক দরগুলোর মধ্যে হাতে গুনে দু’টি দলের আছে কেবল । বাঁকি দলগুলো তাদের নিজেদের দর্শনের কোনো বিস্তার ঘটাতে সক্ষম আজ অব্দি হয়নি এবং আগামীতেও সম্ভাবনার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে দেখা যাচ্ছে ।

এবার একটু গভীরভাবে ভাবুন তো । আমরা কথায় কথায় বলি, বিশ্বের ভালো গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে হাতে গুনে কয়েকটি দল থাকে । আমাদের দেশে তো হাজারে হাজারে দল। আসলে কি তাই ? আমাদের দেশে মূলত দু’টি দল । এই ক্ষেত্রে আমরা বিশ্বের সব দেশের চাইতেও ভালো অবস্থানে। অথচ মাত্র দু’টি দলের ক্ষমতায়নের সম্ভাবনা থাকা সত্যেও, আমরা গণতান্ত্রিক চর্চায় যেতে পারি না। যে যত কথাই বলুক আর করুক, ঘুরেফিরে এই দল দু’টিই ক্ষমতার আসিন হবে, আমাদের দেশে । তারপরেও আমরা পারি না ।

পরি না তো বটেই, উপরন্তু ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে একে অপরকে নিঃশেষ করে দিতে বেশি আগ্রহী।  কেননা একবার যদি একটি দলকে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তো আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রশ্ন থাকবে না, যেহেতু জনগণের কাছে ভিন্ন অপশন নেই, বেশ কেল্লা ফতে । সেই চেষ্টা কিন্তু দু’টো দলই বেশ করে করেছে এবং করছে । কেউ করেছে একেবারে বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে । আবার কেউ করছে রয়াল প্রডাক্টের ব্যবহারে তছনছ করে দিতে শিরদাঁড়া ভেঙে দিতে । এমন সব কর্মকাণ্ড কিন্তু ক্ষমতায় বসেই করা সম্ভব এবং করা হয় ( আমাদের দেশে ঘটেছেও তাই এবং ঘটছে )। ক্ষমতার দাম্ভিকতায় দলগুলো টেরই পায় না যে, ভিন্ন রাজনৈতিক দল নয়, বরং  প্রকারান্তরে জনগণই প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে যায় ।

লক্ষণীয় যে, এই দু’টো দলের সামনেই জনমানুষের রক্তের বিনিময়ে বারবার সুযোগ এসেছিলো গণতন্ত্রকে পাকাপোক্ত করার । কিন্তু না । রক্তের মূল্যায়ন না করে,  তাদের রাজনৈতিক দর্শনের মূল যে চাওয়া ক্ষমতা, সেটাকেই সর্ব প্রধান করে দেখেছে বারবার।  হোক সেটা যে পদ্ধতিতেই । ফলাফল আমরা সাধারণ জনমানুষেরা হয়েছি শত ভুক্তভোগী।  হোক সেটা সামরিক স্বৈরাচারের মাধ্যমে, কিংবা বেসামরিক স্বৈরাচারের মাধ্যমে।  স্বৈরাচারের হাত থেকে কিন্তু আমরা আজ অব্দি ছাড়া পাইনি এবং সম্ভাবনা দিনকে দিন ক্ষীণ হচ্ছে ।

কেন সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ হচ্ছে ? ওই যে প্রথমেই বলেছি, দুধ আর ঘী এর কথা । এই দু’টো দলই আমাদের জন্য  ঘী হয়ে আছে । আমরা দুধের মূল্যায়ন বুঝি না এবং করি না, এমনকি আমাদের সামনে কোনো দুধ নেইও বটে । আমারা সেই একি ভাবনায় ঘুরপাক খাই, যে লাউ সেই কদুই হবে, কেননা ক্ষমতায় গেলে দুধ না আবার ঘী হয়। সুতরাং রোম যাবার শত পথ আমরা ভাবি না এবং যে ঘী আমরা খাচ্ছি, সেখানে শত পোকামাকড় থাকুক, শত মাছি থাকুক, সে ঘীই আমরা হজম করবো । প্রয়োজনে এই ঘীর জন্য নিজেদের শরীরের তাজা রক্ত দেবো । জীবন বিনষ্ট করবো । ব্যক্তি স্বাধীনতা তো বটেই, সাথে সব স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা কে অনায়াসেই হরণ করতে দেবো । তবুও এই দুই ঘীই আমাদের চাই । অবশ্য চাই আর না চাই , এই দুই ঘীই আমাদের ভাগ্যে জুটে আছে যে । সুতরাং হজমশক্তি বাড়িয়ে যাও । অবশ্য আমাদের হজমশক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই ।

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: