গ্রন্থ সমালোচনা: যে জীবন জনতার কমরেড আ ফ ম মাহবুবুল হক স্মারকগ্রন্থ

111.PNG

মাহবুবুল হকের রাজনীতি ও এনজিও লর্ড মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন

স্মরণিকায় মাহবুবুল হক স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন, আরবান বাংলাদেশ এনজিও প্রধান। আরবান অনেক গুলো ‘উন্নযন’ মূলক কাজ করে, তাদের অন্যতম হচ্ছে ক্ষুদ্র ঋণ। (arban.org.uk/about-arban-bangladesh)। এই আলোচনার ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক নয়, কামাল উদ্দিন এর স্ত্রী খুশী কবীর ‘ নিজেরা করি ‘ নামে আরেকটি ক্ষুদ্র ঋণ বিনিয়োগকারী এনজিও প্রধান।

নিন্মবিত্ত মানুষদের বুঝানো হয়ে থাকে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বের আসতে একটু সাহস আর ক্ষুদ্রঋণ এর সুযোগই যথেষ্ট। ক্ষুদ্রঋণ নেওয়ার পরেও যদি কেউ দারিদ্র্যে থেকে বের হয়ে আসতে বার্থ হন , তবে এর দায়ভার শুধু তাদেরই। দারিদ্র বিমোচনের স্লোগান দিয়ে সামাজিক সচেতনা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ ও বিনা খরচে চিকিৎসা সহায়তার মত বিভিন্ন লোভনীয় কর্মসূচির আওয়াজ তুলে এনজিওরা নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষগুলো আকৃষ্ট করে ক্ষুদ্র ঋণের চক্রে জড়িয়ে ফেলে। ক্ষুদ্র ঋণদাতারা সামজিকভাবে স্বীকৃত ,তাদেরকে সমাজ সেবার জন্য এক ধরনের মুকুট পরিয়ে রাখা হয়। এভাবেই দিনে দিনে ক্ষুদ্রঋণ হয়ে উঠেছে গরিবের কাছ থেকে ধন, সম্পদ আনার একটি সামাজিকভাবে গৃহীত পদ্ধতি।

ক্ষুদ্রঋণের সুদ বিভিন্ন হিসাবে এবং সংস্থা ও ক্ষেত্র ভেদে গড়ে শতকরা ২০ থেকে ৪০ ভাগ। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ঋণের বিপ্লব বহু মানুষকে স্বনির্ভর করেছে বলে দাবি করা হয়। গ্রামে ক্ষুদ্র ঋণসহ দারিদ্র্য বিমোচনের এতসব কর্মসূচি চলবার পরও গ্রাম থেকে শহরে কাজের খোঁজে, বাঁচার চেষ্টায় অবিরাম মানুষের প্রবাহ চলমান। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ঋণের দায় মেটাতে কিডনি বিক্রির মত ঘটনা গোটা চলছে। ক্ষুদ্র ঋণের দায় মেটাতে কিডনি বিক্রির মত চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিলেনা এমন ৩৩ জনের কথা উল্লেখ করে বিবিসি- বাংলা বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ( বিবিসি – বাংলা ২৮, অক্টোবর ২০১৩ ) ।

বাংলাদেশের অধিকাংশ বামপন্থি দল এনজিওদের ক্ষুদ্র ঋণের চড়া সুদ ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল বা আছে। প্রধানত এনজিওদের প্রভাব ও প্রচারণার কারণে এনজিও বিরোধী – ক্ষুদ্র ঋণ বিরোধী সংবাদ সচারাচর বাংলাদেশের গণ মাধ্যমে আসতে পারে না। বাংলাদেশের যে অঞ্চলকে উত্তর বঙ্গ বলা হয়, পুরানো দিনের বৃহত্তর রাজশাহী বিভাগ। এই অঞ্চলগুলো তুলনামূলক ভাবে অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া অঞ্চল। এই অঞ্চল গুলোতে ক্ষুদ্র ঋণের শোষণ মহামারী রূপ নিয়েছে। ঋণের দায়ে আত্মহত্যা, কিডনি বিক্রি, ঘরের চাল খুলে নিয়ে নেওয়া মত হাজার ঘটনা অতীতে ও বর্তমানে ঘটে চলছে। মাহবুবুল হকের নেতৃত্বে বগুড়া -গাইবান্দা – কুড়িগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে বাসদ গ্রামীণ প্রান্তিক মানুষদের মধ্যে সাংগঠনিক ভাবে সক্রিয় ছিল। বাসদের ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে সক্রিয়তা এনজিওদের মুখোমুখী দাঁড় করিয়েছিল বাসদকে। নানা কিছিমের নিপীড়ণের শিকার হয়েছিল বাসদের কর্মীরা। অপরাপর বামপন্থী দলগুলো দেশের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুদ্র ঋণের চড়া সুদ ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার।

শ্রমজীবী মুক্তি আন্দোলন নেতা ঝিনাইদহের মীর ইলিয়াস হোসেন দীলিপ ১৯৯৫ সালে ‘গ্রামীণব্যাংক মহাজনী শোষনের অভিনব হাতিয়ার’ নামে পুস্তিকা লিখেন। পুস্তিকাটি ক্ষুদ্র ঋণের নানা বিষয় তুলে ধরেছেন। অতিরিক্ত সুদ, ঋণের জালে আটকা পড়ার কাহিনী, মালিক হয়েও সদস্যদের কোনো লভ্যাংশ না পাওয়ার বিষয়গুলি বস্তুনিষ্টভাবে আলোচিত হয়েছে এই পুস্তিকাতে । বিভিন্ন অর্থনীতিবিদদের গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে মূল্যায়ন, ঝিনাইদহের রামচন্দ্রপুরে গ্রামীণব্যাংকের একটি কেন্দ্রের উপর গবেষণা চালিয়ে তথ্য সারণির মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণের নেতিবাচক বিষয়গুলি তুলে ধরেন। ২০০০ সালের ১৫ জানুয়ারি কে বা কাহারা মীর ইলিয়াস হোসেন দীলিপকে গুলি করে হত্যা করে।

‘ ভাগ্য ক্রমে ‘ ক্ষুদ্র ঋণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে মাহবুবুল হক হত্যার শিকার হন নি, বেঁচেছিলেন। মীর ইলিয়াস হোসেন এর খুন হওয়ার ক্ষুদ্ ঋণ এর বিরুদ্ধে কথা বলার বিপদকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। মাহবুবুল হকের সাথে যারা একই সামন্তরালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ক্ষুদ্র ঋণের শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল তাদের কাছে এর এনজিও লর্ড মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন এর স্মৃতি তর্পন স্বস্তির বিষয় নয়।

মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন এর লেখা অতিকথন ও ইতিহাস বিকৃতি স্পষ্ট। কামাল উদ্দিন লিখছেন ১ লা মার্চ ১৯৭১ সনে হোটেল পূর্বাণীতে আওয়ামীলীগের কার্যকরী পরিষদের মিটিং চলাকালে মাহবুবুল হকের নেতৃত্বে ছাত্র মিছিল ‘ লাখো ‘ জনতার সামনে “সশস্র সংগ্রাম” ” ঢাকা না পিন্ডি, ঢাকা ঢাকা ” “মস্কো না ঢাকা, ঢাকা, ঢাকা ” ” পিকিং না ঢাকা, ঢাকা , ঢাকা “। কামাল উদ্দিন এর ভাষায় এই স্লোগান গুলোই পরবর্তীতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারকে সহায়ক ভূমিকা পালন করে করেছে।

ঘটনার প্রথম অংশ সঠিক , তৎকালীন সময়ে ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াস পন্থীরা হোটেল পূর্বাণীর সামনে বিক্ষোভ করেছিল , মাহবুবুল হক সেই বিক্ষোভ মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন। যে অংশটি সঠিক নয় সেটা হচ্ছে এই মিছিল কোন ভাবেই ২০০-৩০০ জন ছাত্ররের বেশি ছিল না। তৎকালীন সময়ে ” ঢাকা না পিন্ডি , ঢাকা ঢাকা ” স্লোগান বহুল উচ্চারিত স্লোগান ছিল। মস্কো ও পিকিং এর বিরুদ্ধে স্লোগান সেই সময়ের জন্য অপ্রাসঙ্গিক ছিল। ” ঢাকা না পিন্ডি , ঢাকা ঢাকা ” স্লোগানের কথা অনেকেই বিভিন্ন লেখায় -বই পুস্তকে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু মস্কো -পিকিং বিরোধী স্লোগানের কথা কেউ উল্লেখ করেনি। আর এই সব স্লোগানের ভিত্তিতে শেখ মুজিবের পররাষ্ট্র নীতি নিধারিত হওয়ার দাবী প্রলাপ মাত্র। কামাল উদ্দিনের লেখা পড়ে মনে হয় যেকোন কারণেই ‘ মাহবুব কাল্ট ‘ বা মিথ তৈরির ভিত্তি স্থাপনের চেষ্টা চালানো হয়েছে। লেখাটি গ্রাম বাংলার প্রবাদ ‘অতি ভক্তি অসাধুর লক্ষণ !’ কে স্মরণ করিয়ে দেয়।

666

অপু সারোয়ার

লেখক পরিচিতি  :১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল – বাসদ রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন অপু সারোয়ার ।  ১৯৮৬ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত বাসদ সর্মথিত  ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য , দপ্তর সম্পাদক ও সহ – সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র বিজ্ঞান এর ছাত্র ছিলেন।  জেনেরাল এরশাদ সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের সময় বিভিন্ন দফায় আড়াই বছর কারাগারে ছিলেন।  ১৯৯০ এর দশককে জাপান থেকে প্রকাশিত বাংলা মাসিক বাংলার মুখ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।  রাজনৈতিক  বিষয় নিয়ে লেখালেখির সাথে যুক্ত।  প্রকাশিত বই  মার্কসবাদীরা যে উত্তরাধিকার পরিত্যাগ করবে।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: