সিডিও সনদ ও নারীর ক্ষমতায়নের বাংলাদেশ

সভ্যতার শুরু থেকেই নারী সামাজিক বৈষম্যের শিকার। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় এটি প্রকট রূপ ধারণ করে। কিন্তু উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বুঝতে পারে, সমাজের এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। তখন থেকেই নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপের গুরুত্ব দেখা দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘ গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক দলিল The Convension on the Elimination of All Forms of Discrimination against Women বা নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ। ১৯৮৪ সালের ৬ নভেম্বর বাংলাদেশ সিডও সনদে স্বাক্ষর করে। স্বাক্ষরকালে সনদের কয়েকটি ধারা সংরক্ষণ করা হয়। এগুলো হলো ধারা ২: নীতি নির্ধারণী; ধারা ১৩ (ক): পারিবারিক সুবিধার ক্ষেত্রে সমতা-সংক্রান্ত; ধারা ১৬ (১) (গ): বিয়ে ও বিয়ে বিচ্ছেদের দায়িত্ব সংক্রান্ত; ধারা ১৬ (১) (চ): সন্তানের অভিভাবকত্ব, দেখভাল এবং শিশু দত্তক নেওয়ার সমান অধিকার ও দায়িত্ব। সিডও সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে স্বাক্ষরকারী সদস্য দেশগুলোকে প্রতি চার বছর পরপর সিডও বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন জাতিসংঘের সিডও কমিটির কাছে জমা দিতে হয়। এ প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় সিডও কমিটি ২০১৬ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের ৬৫তম সিডও অধিবেশনে বাংলাদেশের অষ্টম বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে। ৫৬টি মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় প্ল্যাটফর্ম সিটিজেন্স ইনিশিয়েটিভস অন সিডও, বাংলাদেশ (সিআইসি-বিডি) বাংলাদেশে সিডও সনদ পূর্ণ অনুমোদন ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করছে। ৬৫তম সিডও অধিবেশন শেষে সিডও কমিটির দেওয়া অভিমতের সুপারিশ অনুযায়ী রাষ্ট্রপক্ষ পরবর্তী চার বছরে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করবে তা ৯ম জাতীয় প্রতিবেদন হিসেবে জমা দেবে।
chobi
৫৬তম সিডও অধিবেশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কতটুকু এগিয়েছে তার প্রতিফলন ঘটবে ৯ম জাতীয় প্রতিবেদনে। এ কথা সত্য যে, নারী শিক্ষায় সরকারের নানামুখী উদ্যোগের কারণে সমাজে নারীর অবস্থানের পরিবর্তন ঘটেছে। নারী শিক্ষায় বিশেষ পদক্ষেপের কারণে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারী এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা না করে সিডও’র আলোকে মূল্যায়ন করতে হবে। বিশ্লেষণ করতে হবে সিডও সনদের আলোকে নারীর এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো কী এবং তার দূর করার জন্য রাষ্ট্র কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বা করা প্রয়োজন ছিল। ১৯৮৪ সালের ৬ নভেম্বর বাংলাদেশ সিডও সনদে স্বাক্ষর করে। স্বাক্ষরকালে সনদের কয়েকটি ধারা সংরক্ষণ করা হয়। এগুলো হলো ধারা ২: নীতি নির্ধারণী; ধারা ১৩ (ক): পারিবারিক সুবিধার ক্ষেত্রে সমতা-সংক্রান্ত; ধারা ১৬ (১) (গ): বিয়ে ও বিয়ে বিচ্ছেদের দায়িত্ব-সংক্রান্ত; ধারা ১৬ (১) (চ): সন্তানের অভিভাবকত্ব, দেখভাল এবং শিশু দত্তক নেওয়ার সমান অধিকার ও দায়িত্ব। মুসলিম পারিবারিক আইন মূলত শরিয়াহ আইনের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত। এ আইনের সঙ্গে সিডও সনদেও কোনো কোনো ধারায় দ্বান্দ্বিকতা রয়েছে। ওইসব শরিয়াহ আইন পরিবর্তন করা কঠিন। বাংলাদেশের দ্বিতীয় সাময়িক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হিন্দু পারিবারিক আইনও পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এখানেও জটিল ধর্মীয় বিষয় জড়িত রয়েছে। তারপরও সরকার ১৯৯৬ সালে সিডও সনদের ধারা ১৩ (ক) এবং ১৬ (১) (চ) থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করে। তবে সনদের ধারা-২ ও ধারা ১৬ (১) (গ)-এর ওপর সংরক্ষণ বহাল রেখেছে।
বাংলাদেশে সিডও কার্যক্রম পরিচালিত হয় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। প্রতি চার বছর অন্তর নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য দূরীকরণে সরকারের উদ্যোগ নিয়ে স্বাক্ষরকারী প্রতিটি দেশকে প্রতিবেদন দাখিল করতে হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ষষ্ঠ ও ৭ম প্রতিবেদন একসঙ্গে দাখিল করে। এ বছরে জানুয়ারি মাসে জেনেভায় অনুষ্ঠিত ৪৮তম জাতিসংঘ-সিডও সেশনে সরকারি প্রতিবেদন ও ছায়া প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে। এ পর্যালোচনার থেকে সিডও কমিটি বাংলাদেশ সরকারকে সমাপনী পর্যবেক্ষণ জানায় এবং দুই বছরের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন দাখিলের অনুরোধ করে। সিডও কমিটির সুপারিশের আলোকে সনদের ধারা ২ এবং ১৬ (১) (ঙ)-র ওপর থেকে সংরক্ষণ তুলে নেওয়ার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য সরকার একটি আইন কমিশন গঠন করে। এ কমিশন সংরক্ষণ তুলে নেওয়ার বিষয়ে অন্যান্য মুসলিম প্রধান দেশগুলোর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সুপারিশ প্রদান করে। কমিশন ইতিবাচক সুপারিশ প্রদান করলেও এখন পর্যন্ত সংরক্ষণ তুলে নেওয়ার কোনো পদক্ষেপ দৃৃশ্যমান নয়। তবে সরকার নারী উন্নয়ন নীতি, ২০১১ পাস করেছে। অন্যদিকে সরকার ঘোষণা করেছে, শরিয়াহ আইনের বিপরীতে যায় এমন কোনো কাজ করা হবে না; যা মূলত নারী উন্নয়ন নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ২০১১ সালে সংবিধানের ১৫শ’ সংশোধনী গৃহীত হয়। সংবিধানের ২৮ (২) ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রের সব স্তরে এবং জনপরিসরে নারী-পুরুষের সমঅধিকারের বিষয়ে নিশ্চয়তা প্রদান করা হলেও ব্যক্তিজীবনের বিষয়গুলো পারিবারিক আদালত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলে অসমতার বিধান বহাল রয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার বিষয়ে কিছু আইন করে নারীদের অংশগ্রহণের পথ সহজ করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট বিয়ে নিবন্ধনের জন্য বৈষম্যমূলক ১৬০০ ও ১৬০১ ফরমের পরিবর্তন এনেছে। একইসঙ্গে নাগরিক আইন সংশোধিত হয়েছে এবং বাল্যবিবাহ দূরীকরণ আইন, ২০১৪ পাস হয়েছে। এ বিষয়গুলো সিডও সনদকে এগিয়ে নিতে অনেকখানি সহায়ক হচ্ছে। অন্যদিকে সরকার ধর্ষিত নারীর ছবি প্রকাশের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ প্রণয়ন করেছে। এছাড়া জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালায় নারীকে উৎপাদনশীল ভূমিকায় দেখানোর সুপারিশ করা হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১০-এর সঙ্গে সম্পূরকভাবে কাজ করার জন্য পারিবারিক সহিংসতা রীতি প্রণয়ন ও অনুমোদন করা হয়েছে।
আমাদের গ্রামীণ জীবনে অপ্রাতিষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার মাধ্যমেই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়গুলোর বিচার করা হয়। ধর্মীয় নেতারা যেসব ফতোয়া ব্যবহার করেন, তা নারীর বিরুদ্ধে যায়। ফতোয়ার মাধ্যমে কোনো শাস্তি দেওয়া নিষিদ্ধ করা হলেও ফতোয়া দেওয়ার বিধান বন্ধ করা হয়নি। এটি সিডও সনদ বাস্তবায়নের একটি প্রতিবন্ধকতা। সিডও কমিটির সমাপনী পর্যবেক্ষণে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছিল। সংসদ এ বিষয়ে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন চালু করে ২০১০ সালে। আইনটি কার্যকর করার জন্য রীতি পদ্ধতি ২০১৩ সালে অনুমোদিত হয়েছে। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য জাতীয় পরিকল্পনা (২০১৩-২০২৫) অনুমোদিত হয়েছে। হিন্দু বিবাহ রেজিস্ট্রেশন (ঐচ্ছিক) আইন ২০১২ অনুমোদিত হয়েছে। হাইকোর্ট ২০১৩ সালের অক্টোবরে ধর্ষণ পরীক্ষণের জন্য আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌননিপীড়নের ঘটনা ঘটলে সালিশ কমিটি ও নালিশ বক্স বানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভাগীয় পর্যায়ে আটটি ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার এবং ৬০টি ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেল চালু করেছে। কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম তৈরি করা হয়েছে যেখানে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অধীনে একটি নারী অনুসন্ধান বিভাগ খোলা হয়েছে। ২০১১ সালে কেবল নারী ও শিশু নির্যাতন আইন ২০০০-এর অধীনের কেসগুলোকে বিচার করার জন্য এ অনুসন্ধান বিভাগ কাজ করবে। সরকার নারীর প্রতি সহিংসতা পরিমাপের জন্য জাতীয় পর্যায়ের একটি জরিপ পরিচালনা করে এবং ২০১৩ সালে প্রতিবেদন জমা দেয়। এ প্রতিবেদনে জাতিসংঘ পরিসংখ্যান কমিশন গৃহীত নারীর প্রতি সহিংসতার ৯টি সূচক বিশ্লেষণ করা হয়। নারী পাচার ও যৌন হয়রানি নিরোধের লক্ষ্যে একটি নতুন জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০১২-২০১৪) গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া ২০১২ সালে মানব পাচার রোধ ও দমন আইন অনুমোদিত হয়েছে। মানব পাচার রোধে সার্বিক কাজ করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও এমন কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকার জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা, ২০১১ প্রণয়ন করেছে। এ নীতিমালায় রাজনৈতিক দলকে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধি রাখা এবং নির্বাচনে অধিকতর নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার আইনে ৩৩ শতাংশ নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনে ভোটের ব্যবস্থা এবং উপজেলা পরিষদ আইন, ২০০৯ দুজন ভাইস-চেয়ারম্যান পদের একটি নারীর জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। সংবিধান সংশোধন করে ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন সংখ্যা ৫০টি করা হয়েছে। সনদের ধারা-৯ অনুযায়ী নাগরিকতা আইন পরিবর্তনের সুপাশি করা হয়। সরকার ২০০৯ সালে নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫১ সংশোধন করে। ফলে এখন কোনো বাংলাদেশি নারী বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করলে সন্তানকে বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয় দিতে পারবে, কিন্তু স্বামীকে নয়। সকল কন্যা শিশু ও নারীকে শিক্ষার সকল পর্যায়ে অংশগ্রহণের শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে শূন্য সহিংষ্ণুতা নীতি গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছিল। এ লক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০১০ সিলেবাস ও পাঠ্যক্রমে যে কোনো ধরনের জেন্ডার অসম বিষয় সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং মাধ্যমিক পর্যন্ত স্কুল পাঠ্যবই বিনা বেতনে সরবরাহের বিধান করা হয়েছে।
সুপারিশ ছিল জেন্ডারবান্ধব দারিদ্র্য নিরসন কর্মসূচি জোরদার করা, জমিতে নারীর অধিকার খর্ব করে এমন বৈষম্যমূলক আইন সংশোধন করা এবং নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নের বাধা দুরীভূত করা। নারী উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের শিল্পনীতি-২০১০ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ শতাংশ সুদে ব্যাংকঋণ দেওয়ার এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কোলেটারাল-মুক্ত ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। সুপারিশ ছিল সুবিধাবঞ্চিত নারীদের ওপর বিচ্ছিন্ন উপাত্তকে সমন্বিত করে বহুমাত্রিক বৈষম্য দূর করার পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করা। এ বিষয়ে সরকার কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা জালের আওতায় সরকার বয়স্ক নারীদের জন্য মাসিক ৫০০ টাকা ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতাভোগীর সংখ্যা ১২ লাখ ৬৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১৪ লাখ করা হয়েছে। দরিদ্র মা’র মাতৃত্বকালীন ভাতা মাসে ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০০ টাকা এবং ভাতার মেয়াদ দুই বছর থেকে বাড়িয়ে তিন বছর করা হয়েছে। একইসঙ্গে ভাতাভোগকারীর সংখ্যা ছয় লাখ থেকে বাড়িয়ে সাত লাখ করা হয়েছে। বুকের দুধদানকারী কর্মজীবী মায়েদের সহায়তার আওতায় মাসিক ভাতা ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০০ টাকা এবং ভাতার মেয়াদ দুই বছর থেকে বাড়িয়ে তিন বছর করা হয়েছে। একইসঙ্গে ভাতাভোগীর সংখ্যা দুই লাখ থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ ৫০ হাজার করা হয়েছে। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা এবং জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় শারীরিক প্রতিবন্ধী নারীদের ব্যাপারে বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণের কথা বলা হলেও এখনও পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে বাংলাদেশ সরকার Persons with Disabilities Rights and Protection Act২০১৩’ চালু করেছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় একটি জাতীয় প্রতিবন্ধী কমপ্লেক্স তৈরি করেছে এবং প্রতিবন্ধী নারী চাকরিজীবীদের জন্য একটি মহিলা হোস্টেল চালু করেছে। যৌনকর্মীদের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও HIV/AIDS আক্রান্ত নারীদের মানবাধিকার সংরক্ষিত নয়। তবে ঐওঠ/অওউঝ আক্রান্ত নারীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সুপারিশ ছিল নারী ও পুরুষের জন্য সমতা নিশ্চিত করতে অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন এবং বাল্যবিয়ে বন্ধ করার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ। ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে হাইকোর্ট থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, বিয়ে রেজিস্ট্রি করার সময় জš§নিবন্ধনপত্র দেখাতে হবে। বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন ২০১৩-এর অধীনে বাল্যবিয়ে দেওয়ার অপরাধে পিতামাতাকে দুই বছর জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০১২ সালে মন্ত্রিপরিষদ হিন্দু বিবাহ রেজিস্ট্রেশন আইন অনুমোদন করেছে, যদিও ঐচ্ছিক।
দেখা যাচ্ছে, জাতিসংঘ সিডও কমিটির সমাপনী সুপারিশের বিপরীতে বাংলাদেশ সরকার ইতিবাচক পথেই এগিয়েছে। সিডও সনদের ধারা-২-এর ওপর থেকে সংরক্ষণ তুলে নেওয়ার পাশাপাশি সংবিধানের ২৮ (২) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে ব্যক্তিগত পরিসরেও নারী-পুরুষের জন্য সমআইন করতে হবে। সংরক্ষণ ব্যতিরেকে যে অন্যান্য বৈষম্যমূলক আইন ও রীতিপদ্ধতির ব্যাপারে জাতিসংঘ সিডও কমিটির সমাপনী সুপারিশ এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের উদ্যোগ, সেসব বিষয়ে অধিকতর ইতিবাচক অবস্থান নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। যেমন নারীর প্রতি গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রচার ও প্রসার অব্যাহত রাখা। এ বিষয়ে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে সকল মুদ্রণ ও সম্প্রচার মাধ্যমের জন্য নীতিমালা দিয়ে রাখা প্রয়োজন। গণমাধ্যমে নিয়োজিত সকল পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে যে, নারীর প্রতি বৈষম্য প্রতিরোধে কী প্রকাশ করা যাবে এবং কী করা যাবে না। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আরও যা করা যেতে পারে তা হলো, ফতোয়া বন্ধ করা। ফতোয়ার মাধ্যমে শাস্তি প্রদান করা না গেলেও ফতোয়া ব্যবস্থাটি চালু থাকাই নারীর জন্য যথেষ্ট ক্ষতিকর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও কর্মক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে অভিযোগ কমিটি এবং অভিযোগ বাক্স তৈরি নিশ্চিত করতে হবে। বিয়ে, বিয়ে-বিচ্ছেদ, অভিভাবকত্ব, দত্তক এবং উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করে ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড সকল ধর্মাবলম্বীর জন্য চালু করতে হবে। তাহলেই সিডও সনদ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
কাজী সালমা সুলতানা ,
লেখক এবং  গণমাধ্যম কর্মী ।
 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: