চীন কেন তিস্তায় ব্যস্ত? চীন কি স্থল পথে ভারতকে ঘিরে ফেলতে চায়?

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ পার্লামেণ্টে গৃহীত ও রাজা কর্তৃক অনুমোদিত আইন ‘Independence of India Act 1947’ অনুসারে ব্রিটিশ-ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান ও ভারত নামের যে-দু’টো ডোমিনিনের সৃষ্টি হয়েছিলো যথাক্রমে ১৪ই ও ১৫ই অগাস্টে, সে-দু’টো পরবর্তীতে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় রিপাবলিক হিসেবে বিকশিত হলেও, উভয়টি ভৌগোলিকভাবে সমস্যাগ্রস্ত থেকে যায়।
পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয় এর পূর্বাংশের সাথে পশ্চিমাংশের মধ্যে হাজার মাইলের ভৌগলিক দূরত্ব এবং মাঝখানে বিশাল ভারত রাষ্ট্র রেখে। অর্থাৎ, পাকিস্তানের পশ্চিমাংশের সাথে পূর্বাংশের প্রয়োজনীয় ভৌগোলিক নিরবিচ্ছিন্নতার ক্ষেত্রে মধ্যবর্তী ভারত ছিলো একটি বড়ো বাধা।
ভারত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে, দৃশ্যতঃ ভৌগোলিক নিরবিচ্ছিন্নতা থাকলেও তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে উত্তর-পশ্চিম ভারতের সাথে উত্তর-পূর্ব ভারতের মধ্যবর্তী স্থানে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে পূর্ববাংলা তথা আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের অবস্থানের ফলে। ভারতের মূল-ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্ব ভারত সংযুক্ত রয়েছে ২০০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এবং সঙ্কীর্ণতম স্থানে মাত্র ১৭ কিলোমিটার প্রস্থের একটি করিডোর দিয়ে। এ-করিডোরটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ এবং অনানুষ্ঠানিক নাম ‘চিকিন নেক’ (মুরগীর গলা)।
শিলিগুড়ি করিডোরকে ‘চিকিন নেক’ বলা হয় এর উত্তরে নেপাল ও দক্ষিণে বাংলাদেশ থাকায়, মুরগীর গলার মতো চেপে ধরা মাত্র ভারতের উত্তর-পূর্বাংশ সম্পূর্ণরূপে মূল-ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মতো নাজুকতার কারণে। শিলিগুড়ি করিডোর হচ্ছে পশ্চিম-বাংলার অংশ, যার মধ্য দিয়ে উত্তরে নেপাল ও দক্ষিণে বাংলাদেশ রেখে যেতে হয় রাজ্যটির দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুর দুয়ার ও কোচবিহার জেলায় এবং বাংলা অতিক্রম করে অরুণাচল, আসাম, মেঘালয়, নাগাল্যাণ্ড, মনিপুর, মিজোরাম, ত্রিপুরা ও সিকিম রাজ্যে। অর্থাৎ, বৃহত্তর বাংলার ভূমি ব্যবহার করা ছাড়া ভারতের উত্তর-পশ্চিম-দক্ষিণ থেকে কারও পক্ষে ঐ ৮টি রাজ্যে ও স্বাধীন ভূটানে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব।
ভারতের সমস্যা হচ্ছে, উপরে বর্ণিত ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে বাংলার পূর্বখণ্ড তথা বাংলাদেশের স্বাধীন ও সার্বভৌম অবস্থান, যার কারণে দেশটি উত্তর দিক থেকে চীনের শৃগাল-দৃষ্টির নীচে একটি ভীত মুরগীর সর্বদা সন্ত্রস্ত থাকে। আর, এই সন্ত্রস্ততা ভারতের জন্যে দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে। চীনের সাথে কখনও কোনো যুদ্ধ বাঁধলে, ভারতের এই শিলিগুড়ি করিডোর রূপতঃ গ্রীক পৌরাণিক কাহিনীর হতভাগ্য বীর এ্যাকিলিসের হীল বা পায়ের গোড়ালির মতো ঘাতক-তীরের লক্ষ্য হিসেবে ভারত-সাম্রাজ্যের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরীয় দেশসমূহে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সামরিক মহড়া চীনকে ঘিরে ফেলার মতো প্রত্যক্ষিত হচ্ছে বলে চীনারা তাদের দক্ষিণ ও পূর্ব সাগরেই সামরিক শক্তিবৃদ্ধি করেনি, বরং আরব সাগর, ভারত মহাসগর ও বঙ্গোপসাগর যেনো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে না পারে, এ-প্রত্যাশায় দেশটি পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বার্মা ও বাংলাদেশের সাথে নৌ-সামরিক শক্তিবৃদ্ধিতেও তৎপর হয়েছে। চীনের আশঙ্কা, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতও চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন বলয়ে যোগ দিতে পারে। তাই, ভারতকে স্থলপথে সামরিকভাবে নাজুক করার লক্ষ্যে হিমালয়ান দেশ নেপাল ও ভূটানকে ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছে।
চীনের কাছে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও বার্মা হচ্ছে ভারতের বিরুদ্ধে জলযুদ্ধ ও স্থলযুদ্ধে সুবিধা পাওয়ার মতো দেশ। তবে, এই তিন দেশের মধ্যে ভারতের বিরুদ্ধে চীনের যুদ্ধে বাংলাদেশ হবে কৌশলগতভাবে সবচেয়ে সুবিধাজনক দেশ, একই সাথে জলযুদ্ধে দক্ষিণের বঙ্গোপসাগর এবং স্থলযুদ্ধে শিলিগুড়ি করিডোর সংলগ্ন বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে।
চীন যদি ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরের দক্ষিণে বাংলাদেশ ও উত্তরে নেপালে অবস্থান নিয়ে ‘চিকিন নেক’ চেপে ধরে তিব্বত ও ভূটান থেকে আক্রমণ করে, ভারতের জন্যে তা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থানরত ভারতীয় শসস্ত্র-বাহিনীর 3 Corps, 4 Corps ও 33 Coprs-এর ৯টি ডিভিশনে আন্দাজিত ১ লক্ষ ৬০ হাজার থেকে ২ লক্ষ সেনা থাকা সত্ত্বেও শিলিগুড়ি করিডোর বন্ধ হয়ে গেলে পশ্চিম-বঙ্গের ৫টি জেলা ও ৮টি রাজ্য ভারতের মূল-ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
ভারত এতোকাল পর্যন্ত বাংলাদেশকে তার সেবায় নিয়োজিত একটি ভূখণ্ড হিসেবে পেয়ে অভ্যস্ত ও নিশ্চিন্ত হয়ে গিয়েছিলো। বিশেষকরে, জনসমর্থনহীন আওয়ামী লীগ ভারতীয় সমর্থনে গত দ্বিতীয় দফায় ভৌটার বিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর দলটি ভারতকে যে সুবিধাদি দিয়েছে, তা দলটির শীর্ষনেত্রী ও প্রধামনমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষায়, “সারা জীবন মনে রাখার” মতো বলে, ভারত হয়তো ধরেই নিয়েছিলো এমন পাওয়া তারা পেতেই থাকবে।
কিন্তু বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বুঝে চীন যখন বাংলাদেশকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়ে বিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে শুরু করলো, বাংলাদেশ তথা শেখ হাসিনাও বুঝলেন, ভারতের ওপর নির্ভরতা এবং ভারতের অধীনতামূলক মিত্রতা মেনে চলাই তাঁর একমাত্র ভাগ্যলিখন নয়।
ভারতের সাথে অর্ধশতাধিক নদীর অভিন্নতার করার কারণে, ভাটির নদীমাতৃক বাংলাদেশ উজানের ভারতের দয়ায় পানি পাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা চেয়ে বার-বার প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পরও ভারতের বার-বার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ফলে হতাশ বাংলাদেশ শেষপর্যন্ত চীনের সাহায্য নিতে বাধ্য হয়েছে। আর, চীনও চাচ্ছিলো ঠিক তাই।
তিস্তানদী সিকিম থেকে ভারতের উত্তরবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশ বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে প্রবেশ করেছে। এখন, চীনের আর্থিক ও প্রকৌশলিক সহযোগিতায় বাংলাদেশ তিস্তানদীকে বাংলাদেশের জন্যে নজিরবিহীনভাবে একটি নতুন ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসবে বলে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
তিস্তানদীর ব্যবস্থাপনায় প্রকল্প অনুসারে, নদীর দু’পারে এম্ব্যাংকমেণ্টের মাধ্যমে প্রস্থে ১ কিলোমিটারে সঙ্কুচিত ও তলদেশ গভীর করা হবে; দু’পাশের পর্যাপ্ত সংখ্যক রিজার্ভার গড়ে তোলা হবে বর্ষায় পানি ধরে রেখে শীতে-গ্রীষ্মে নদীতে ছাড়ার জন্যে; নদীর প্রস্থ হ্রাস করার কারণে যে-ভুমি উদ্ধারিত হবে, তা ব্যবহার করে নতুন টাউনশিপ ও ইকোনমিক জৌন গড়ে তোলা হবে। এর ফলে উত্তরবঙ্গের প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশে পরিবর্তন আসবে এবং অর্থনৈতিক সক্রিয়তা বৃদ্ধি পাবে।
বলাই বাহুল্য, উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের রূপকার হিসেবে চীন সেখানে তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তাগত ‘এক্সক্লুসিভ জৌন’ও গড়ে তুলতে চাইবে। এর অর্থ হচ্ছে, সেখান থেকে ভারতকে এবং বিশেষকরে শিলিগুড়ি করিডোরকে সম্পূর্ণ নজরদারিতে রাখতে সক্ষম হবে চীন। আর, এ-বিষয়টি ভারতের কখনও কাম্য হতে পারে না।
ভারত আসলে বাংলাদেশের কাছে কী চায়? ২০১৩ সালের ২০ শে ফেব্রয়ারীতে প্রকাশিত একটি এখায় আমি লিখেছিলামঃ “আন্তার্জাতিক-সম্পর্ক ও যুদ্ধতত্ত্ব অনুসারে, উপরে উল্লেখিত বিশ্ব-পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কাছে ভারতের কাম্য হতে পারে ৫টি বিষয়ঃ
(১) বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের চীন-সীমান্ত পর্যন্ত সামরিক ও রসদ পরিভ্রমণের উপযোগী অবকাঠামো,
(২) ভারতীয় শান্তি ও যুদ্ধকালীন অর্থনীতির পরিপূরক স্থানীয় অর্থনীতি,
(৩) ভারতের কাছে স্বচ্ছ ও সহযোগী বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
(৪) ভারত-বান্ধব সরকার এবং
(৫) ভারত-মৈত্রীর সাংস্কৃতিক পরিবেশ।”
এখন দেখা যাচ্ছে, ভারতের চাওয়া ও পাওয়ার বিপরীতে বাংলাদেশে এখন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে সম্ভাব্য যুদ্ধে চীনকে রোখার জন্যে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে চীন-সিমান্তে ভারতীয় সেনা-সঞ্চালন তো দূরের কথা, বরং চীনই বাংলাদেশের ভেতর থেকে ভারতে রোখার ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এটি আসলে, ভারতের জন্যে একটি দুঃস্বপ্নের মতো পরিস্থিতি।
বস্তুতঃ বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বৌর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী জ্যোতি প্রসাদ ঘোষ আন্তর্জাতিক সংবাদ-মাধ্যমকে তিস্তা প্রকল্পর যাত্রা এ-বছরের ডিসেম্বরেই শুরু হচ্ছে বলে জানানোর পর ভারতের টনক নড়ে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর বিদেশমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর ও বিদেশ-সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলার সাথে জরুরি বৈঠক করে, জরুরি ভিত্তিতে শেষোক্ত ব্যক্তিটিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠান বিশেষ-বার্তা দিয়ে।
যদিও পেশাদার কূটনীতিক শ্রিংলা বাংলাদেশ সফর-শেষে দিল্লি ফিরে গিয়ে বলেছেন যে, আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে এবং তিনি ‘হ্যাপী’ আছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি কী করতে পেরেছেন, তা সময়েই বলে দেবে। তবে, তিনি যে বাংলাদেশ ভারতীয় ভ্যাকসিনের অগ্রাধিকার পাওয়ার সংবাদের প্রেক্ষাপটে ‘ভ্যাকসিন ডিপ্লোম্যাসি’ নাম দিয়ে বাংলাদেশ সফর করলেন, তার মাত্র ৯ দিন পর গত ২৭শে অগাস্ট ভারতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, বাংলাদেশ চীনের ভ্যাকসিনের অগ্রাধিকারই শুধু পাবে না, ১লক্ষ ভ্যাকসিন বিনামূল্যেও পাবে বলে চীনকে তৃতীয় ট্র্যায়ালের জন্যে অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ।
উপরের সংবাদ থেকে বুঝা যায়, বাংলাদেশ ‘ফলপ্রসূ’ বাংলাদেশ-সফরকারী হর্ষবর্ধন শ্রিংলার হর্ষ (হাসি) আসলে বিষাদের (কান্নার) বিশেষ রূপ মাত্র! আসলে, হয়, কূটনীতিতে এমনও হয় যে, কখনও কখনও সাংঘাতিক চপেটাঘাত খেয়েও তা নীরবে হজম করে মুখে হাসি ধরে রাখতে হয়। এটি পেশাদার কূটনীতিকের প্রশিক্ষণের অংশ। তাই, শ্রিংলার কথাকে শাব্দিক অর্থে গ্রহণ করার কোনো কারণ নেই।
যাহোক, যে-প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেখানেই শেষ করতে চাই। বলেছিলাম, পাকিস্তান যেমনটি ছিলো অবাস্তব আকৃতির, ভারতও ততোটুকু না হলেও যথেষ্ট মাত্রায় অবাস্তব আকৃতিরই বটে। বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাধীন বাংলাদেশকে মাঝে রেখে মূল ভারতের পক্ষে একটি করিডোর দিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো ধরে রাখা শেষপর্যন্ত সম্ভব নাও হতে পারে।
ভারতের স্বাভাবিক প্রবণতা হতে পারে, বাংলাদেশকেও শেষপর্যন্ত গ্রাস করে তার ভৌগোলিক নিরবিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাংলাদেশের প্রায় ১৮ কোটির জনসংখ্যা এবং উত্তরে-পশ্চিমে ভারতের অভ্যন্তর আরও ৮-১০ কোটি বাঙালীর অবস্থান ও বাঙালী চেতনা ভারতীয় স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের ক্ষেত্র একটি হিমালয় পর্ব্বতের মতো এক অনতিক্রম্য বাধা।
মাসুদ রানা, লন্ডন ইউকে ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: