Thursday January28,2021

111.PNG

 

এক সাহসী জীবনের প্রতিচ্ছবি: ‘প্রাসঙ্গিগতকা’ হারিয়ে ফেলা মাহবুবুল হকের রাজনীতি

333.PNG

বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন । ১৯৬৩-৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভিপি ও ৬৪-৬৭ সালে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি দায়িত্ব পালন করেন। বেশ কয়েকবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের দুই দফা মন্ত্রী ছিলেন।

মাহবুবুল হককে নিয়ে রাশেদ খান মেনন রাজনৈতিক উপলব্ধি লিখেছেন ‘ মাহবুববুল হক: এক সাহসী জীবনের প্রতিচ্ছবি ‘ (পৃষ্টা – ৫৬-৫৮) । মেননের বিশ্লেষণের গতানুগতিক প্রশংসা বা স্মৃতিচারণ পরিহার করে রাজনৈতিক প্রবণতার সমালোচনাকে সামনে নিয়ে এসেছেন।

দূর অতীতে, রাশেদ খান মেনন তৎকালীন পূর্ব বাংলার ছাত্র গণ আন্দোলনের আপোষহীন নেতা ছিলেন। ছাত্র আন্দোলন থেকে মেননরা ন্যাপ কে ভার করে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৭০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানের জনসভায় ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’ কায়েমের ঘোষণা দিলে ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার মেননের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। তার অনুপস্থিতিতে সামরিক আদালতে ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও সম্পত্তির ষাট ভাগ বাজেয়াপ্তের দণ্ডাদেশ প্রদান করা হয়।

মাহবুবুল হকের মত হত্যা প্রচেষ্টার শিকার হন রাশেদ খান মেনন। ১৯৯২ সালের ১৭ আগস্ট তিনি ওয়ার্কার্স পার্টি কার্যালয়ের সামনে গুলিবিদ্ধ হন। প্রথমে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল এবং পরে লন্ডনে কিংস কলেজ হাসপাতালে দু’বার অস্ত্রোপচারের পর মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসেন রাশেদ খান মেনন।

যুদ্ধত্তোর বাংলাদেশে মাহবুবুল হক ছাত্র গণ আন্দোলনের আপোষহীন নেতা ছিলেন। জাসদের অভ্যান্তরে মাহবুবুল হকরা একটি বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। উভয় উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা ও অসফলতা কে আড়াল করার কোন সুযোগ নেই। মেনন ও মাহবুবুল হকের মৌলিক পার্থক্যের জায়গাটা হচ্ছে মাহবুবুল হক সাংগঠনিক ভাবে বিদ্ধস্থ হয়েছেন কিন্তু লাল পতাকা আঁকড়ে ছিলেন জীবনের শেষ কর্ম দিবস পর্যন্ত।

কিন্তু রাশেদ খান মেননরা জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামল ১৯৭৬ সালে শাসক শ্রেণীর সহযোগিতায় হাত বাড়িয়েছিলেন। কাজী জাফর- রনো – মেননদের জেনারেল জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক মাখামাখির বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় হায়দার আকবর খান রনোর ‘ শতাব্দী পেরিয়ে’ ( )বইয়ে । সামরিক শাসনের সমান্তরালে মেননদের পথ চলা নিয়ে কোন বিতর্কের অবকাশ নেই, কারণ এই মাখামাখির অন্যতম ‘নায়ক ‘ হায়দার আকবর খান রনো নিজেদের ভূমিকা লিপি বদ্ধ করেছেন ‘শতাব্দী পেরিয়ে’ বইয়ে । হায়দার আকবর খান রনোর আত্মজীবনীতে জেনারেল জিয়াউর রহমানের সাথে রাজনৈতিক অভিসারের ইতিকথার পাশাপাশি স্থান পেয়েছে জাতীয় রাজনীতি থেকে কমিউনিস্ট আন্দোলন, ব্যক্তিজীবন থেকে সমাজজীবন, বড় বড় রাজনৈতিক ঘটনা।

জনাব মেনন লিখেছেন নব্বই [ ১৯৯০ ] উত্তরকালে পাঁচ দল , বামফ্রন্ট এগার দলের কর্মসূচী প্রণয়ন বিভিন্ন আন্দোলনের পদক্ষেপ প্রণয়নের ক্ষেত্রে মাহবুবুল হককে তার নিজেস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দূরে সরানো যেত না। শেষ পর্যন্ত এগার দল থেকে ক্রমেই নিজেকে তাঁর দলকে প্রত্যাহার করে নিতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত একেবারেই বেরিয়ে যান। তাঁর এই একা পথ চলার সময় তিনি অবশ্য সমচিন্তার কাউকে কাউকে পেয়েছিলেন। কিন্তু সে সব কিছু দানা বাধেনি। বস্তুত শেষের দিকে মাহবুবুল হক প্রায় একাই হয়ে পড়েন। তার দল প্রাসঙ্গিগতকা হারিয়ে ফেলে।

জনাব মেনন এর এই পর্যবেক্ষণের মধ্যে সততা রয়েছে। তবে যে কথা মেনন সাহেব বেমালুম চেপে গেছেন শুধু মাহবুবুল হক এক নন পুরো বামপন্থী আন্দোলন বাংলাদেশে পথ হারিয়েছে। এই পথ হারাদের কারো কারো স্থান হয়েছে ক্ষমতাসীনদের কাতারে।

এগারো দল থেকে মাহবুবুল হক ও বাসদ [ নয় ইশতেহার ] নিজেদেরকে সরিয়ে নেওয়া প্রসঙ্গে বাসদের বক্তব্য যখন বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের সভায় ইস্যু ভিত্তিক ১১ দল গঠনের বক্তব্য আসলো তখন আমরা তাকে সঠিক মনে করিনি। তার পরেও সংখাগরিষ্টের মতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা একত্রে কাজ করে আসছিলাম।  কিন্তু যখন বাম গনণতান্ত্রিক ফ্রন্ট , বাম দল সহ বৃহত্তর পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ে তোলার চাইতে শাসক শ্রেণীর কোন না কোন অংশ তাদের সহযোগীদের সাথে এক্যের উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে , বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টকে প্রায় নিষ্ক্রিয় করে ইস্যু ভিত্তিক জোটকে বারবার কর্মসূচী দিয়ে প্রধান জোটে রূপান্তরিত করতে চাচ্ছে এবং জোটের কোন না কোন দল  আলাদা ভাবে ঐক্য মঞ্চ গড়ে তোলার আহ্ববান কোন কোন দল ভারতে পাইপ লাইনে গ্যাস রপ্তানি চট্টগ্রাম বন্দরের জায়গায় আন্তর্জাতিক প্রাইভেট কন্টেইনার নির্মাণের বক্তব্য সমর্থন করলো, তখন ধারাবাহিক আন্তঃদল জোট সংগ্রামের পরিণতিতে ১১ দল থেকে আমাদের দলকে আমরা প্রত্যাহার করে নিলাম। ” (২)

মেনন শুরু করেছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমানদের দিকে হাত বাড়ানোর মধ্যে দিয়ে। মেননদের ‘বিপ্লবী মনন’ ও জেনারেল জিয়ার উর্দির মনন মেলেনি। দলের অর্ধেক জেনারেল জিয়ার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার কাছে খুইয়ে রনো- মেননরা নতুন করে ‘ কমিউনিস্ট’ দল খুলে বসলেন। ১৯৮২- থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত মেননতন্ত্রকে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে দেখা গেছে। ১৯৯০ পরবর্তী সময়ে মেননরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির কাছাকাছি আসতে এগারো দল গঠন করে। এই এগারো দল পররবর্তীতে আওয়ামী লীগকে নিয়ে ১৪ দল জোট গঠন করে। এই ১৪ দলীয় জোট রাশেদ খান মেননকে তিনবার এমপি ও মন্ত্রী হতে সহায়তা করে।

মেননের স্বীকারোক্তিতে মাহবুবুল হক পাঁচ দল [ ওয়ার্কার্স পার্টি, সমাজবাদী দল , বাসদ [ গণ ইশতেহার ] জাসদ ও বাসদ [ ভ্যানগার্ড ] কে এগারো দলে রূপান্তরিত করার বিরোধিতা করে একা হয়ে পড়ে এই জোট ত্যাগ করেন । ধনিক শ্রেণীর দল গুলোর সাথে একই সামান্তরালে কিংবা একই ছাতার নিচে কাজ করতে অস্বীকৃতি মাহবুবুল হক ও বাসদ [ গণ ইশতেহার ] রাজনৈতিক দোদুল্যমানতা কাটানোর পদক্ষেপ হিসাবে দেখার সুযোগ রয়েছে।

ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতা বহির্ভুত শ্রেণীর দল গুলোর সাথে একই ছাতার নিচে সমবেত হয়ে রাজনৈতিক সংগ্রাম, শ্রমিক – কৃষক মেহনতি মানুষের দাবিগুলোকে সামনে আনা ও শ্রমিক শ্রেণির নিজস্ব রাজনীতির স্বতন্ত্র টিকিয়ে রাখার প্রধান প্রতিবন্ধক। এই বিচারে এগারো দল ছেড়ে একা চলার মাহবুবুল হকের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন কর্মীদের কাছে সমালোচনা পূর্বক শিক্ষণীয়। এগার দলে দলে থাকা না থাকা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতার মূল্য হিসাবে বাসদ [ গণ ইশতেহার গ্রূপ ] কে গুনতে হয়েছে ,দলের অনেক নেতা কর্মী খসে পড়ার মধ্যে দিয়ে , ছোট হয়ে আসে বাসদ [ গণ ইশতেহার গ্রূপ ]।

এগার দলীয় জোটের অংশ ছিল – সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, গণ ফোরাম, বাসদ (মাহবুব) সমাজবাদী দল, বাসদ (খালেক) গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, গণ আজাদী লীগ, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাপ।

মাহবুবুল হক ‘ প্রাসাঙ্গিকতার ‘ হারিয়ে ফেলার ঝুঁকি নিয়ে এগার দল ছাড়ার পর অনেক দিন পর্যন্ত সিপিবি , বাসদ [ খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া ] এই জোটের সাথে ছিলেন। এরপরে নীরবে এই জোট ছাড়েন। সিপিবি , বাসদ [ খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া ] এর জোট ত্যাগ করার বিষয়ে কোন বক্তব্য হাজির করেননি। এখনই হচ্ছে মাহবুবুল হকের সাথে অনেকের পার্থক্য। সিদ্ধান্তে ভুল ছিল তা সরবে স্বীকার করেই নতুন করে পথ চলার চেষ্টা করেছেন মাহবুবুল হক।

বাংলাদেশের বামপন্থীরা জাতির সামনে কোনো সুস্পষ্ট লক্ষ্য এবং তা অর্জনের জন্যে সহজসাধ্য কোনো কর্মসূচি হাজির করতে পারেনি। বামপন্থীদের এই রাজনৈতিক অস্পষ্টতার ও ধনিক শ্রেণীর দলগুলোর লেজুড়বৃত্তির কারণে, মানুষ কখনও দেশ শাসনের প্রশ্নে বামপন্থীদের বিবেচনার মধ্যে আনে না।

এগারো দল থেকে বেরিয়ে আসা যে কোন ব্যাক্তিগত মান অভিমানের বিষয় ছিল না তা স্পষ্ট হয়ে ঐক্য লিফলেটের বক্তব্য থেকে ” ভারতীয় আধিপত্যবাদের ভারতীয় জাতীয় মহাপানি প্রকল্পের মাধ্যমে আমাদের এক তৃতীয়াংশ পানি প্রত্যাহারের ফলে আমাদের ভাতে পানিতে মারার , পরিবেশ, জীব – প্রাণ বৈচিত্র ধ্বংস করার দখলদারী কর্মকান্ড সহ আমাদের শিল্প, কৃষি, সেবামূলক খাত ধ্বংস করে আমাদেরকে দোকানদারের অর্থনীতিতে (shopkeepers Economy ) রূপান্তর করার দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনাকে রুখতে হলে এ অঞ্চলের প্রগতিশীল শক্তিগুলোকে নিয়ে দেশের ভিতরে বামপন্থীদের একরোখা একই গড়ে তুলতে হবে। “( ৩)

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা কালীন সময়ে মাহবুবল হকরা  বি এলএফ এর অধীনে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার অধীনে যুদ্ধ বিদ্যায় প্রশিক্ষত হন।  ভারতীয় প্রশিক্ষকরা প্রশিক্ষণকালীন সময়ে কমিউনিস্ট চিন্তা ভাবনার বিরুদ্ধে নানান বিষোদ্গার করে প্রশিক্ষণরতদের সম-সমাজ গঠনের চিন্তা থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করেছিলেন।  হয়তো আশা করেছিলেন এই যুবকরা ভারতীয় স্বার্থের প্রতি নমনীয় হবে।  কিন্তু বিএলএফ এর বড় অংশ প্রথম থেকেই ভারতীয় বিস্তারবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন।  বি এলএফ এর বড় অংশ জাসদ গঠন করে যুদ্ধ পরবর্তী কালীন সময়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক  ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী চিন্তা প্রসারের রাজনীতি বহন করেছে।  একই ধারার বহমানতায় মাহবুবুল হকরা  ২০০৩ এর শেষ প্রান্তে এসেও ভারতীয় বিস্তারবাদের নানান মুখী প্রচেষ্টার সাথে আপোষ না করে এগার দল ছেড়ে ছিলেন।

তথ্য সূত্র

১. শতাব্দী পেরিয়ে – হায়দার আকবর খান রনো, তরফদার প্রকাশনী, পঞ্চম সংস্করণ, প্রকাশ কাল ২০১২, ঢাকা।

২. শ্রমিক কৃষক -ছাত্র – নারী, শ্রমজীবী -পেশাজীবীদের  ভিত্তিতে বাম গণতান্ত্রিক শক্তির নেতৃত্বে সর্বস্তরের জনগণের মুক্তির সংগ্রাম গড়ে তুলুন – বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল -বাসদ এর লিফলেট, ১১ ডিসেম্বর ২০০৩। ঢাকা।

৩. পূর্বোক্ত

666

অপু সারোয়ার

লেখক পরিচিতি  :১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল – বাসদ রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন অপু সারোয়ার ।  ১৯৮৬ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত বাসদ সর্মথিত  ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য , দপ্তর সম্পাদক ও সহ – সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র বিজ্ঞান এর ছাত্র ছিলেন।  জেনেরাল এরশাদ সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের সময় বিভিন্ন দফায় আড়াই বছর কারাগারে ছিলেন।  ১৯৯০ এর দশককে জাপান থেকে প্রকাশিত বাংলা মাসিক বাংলার মুখ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।  রাজনৈতিক  বিষয় নিয়ে লেখালেখির সাথে যুক্ত।  প্রকাশিত বই  মার্কসবাদীরা যে উত্তরাধিকার পরিত্যাগ করবে।