আমার দেখা, জানা—পণ্ডীচেরী অরবিন্দ আশ্রম( ষষ্ঠ পর্ব )

শ্রী অরবিন্দের কারা জীবন শুরু হয় ৫ই মে, পরের বছর ৬ই মে তিনি মুক্ত হন।অরবিন্দ উল্লেখ করেছেন “১লা মে আমার জীবন অঙ্কের শেষ পাতা।সম্মুখে এক বৎসর কারা বাস,এ সময় মানুষের জীবনের সঙ্গে যত সম্পর্ক বন্ধন ছিল সব ছিন্ন হইবে। এক বৎসর পশুর মতো পিঞ্জরাবদ্ধ থাকিতে হইবে।আবার যখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করিব, সেখানে সেই পুরাতন অরবিন্দ নয়,নতুন একটি মানুষ,নতুন একটি চরিএ,নতুন বুদ্ধি,নতুন মন প্রাণ,নতুন কর্মভার লইয়া অালিপুর আশ্রম হইতে বাহির হইব।

ইতিমধ্যে অরবিন্দ সহ বহু বিপ্লবী আটকের সংবাদ দেশবাসী প্রত্যক্ষ করে।মুজফঃপুর বোমার ঘটনায় দুজন যুবক বন্দী হয়। প্রফুল্য চাকী গ্রেফতার এড়াতে নিজকে গুলি করে। অন্য জন ক্ষুদিরাম। আদালত অভিযুক্ত করে ক্ষুদিরাম এর ফাঁসি কার্যকর করে।ক্ষুদিরাম শহীদ হিসাবে আমাদের অন্তরের অন্তস্থলে আজও বিদ্যমান।
১৭ মে ১৯০৮ সালে ২৪ পরগনার জেলা মেজিস্ট্রেট মিঃ বার্লির আদালতে অলিপুর বোমা হামলার মামালা শুরু হয়। ৩৯ জনকে অভিযুক্ত করে বিচার কার্য শুরু হয়।বিচার কার্য শুরু হলে, আদালতে এক নাটকীয় ঘটনার অবতারণ হয়।একজন অভিযুক্ত বন্দী নরেন গোঁসাই রাজ সাক্ষী হতে রাজি হয়।বিনিময়ে তার মুক্তি।গোসাইকে আলাদা করে,ইউরোপীয় মহল্লায় পাঠানো হয়।এতো কিছু করে শেষ রক্ষা হয়নি।কানাই লাল দও,সত্যনাদ্রনাথ বোস দুই বিপ্লবী স্থির করলো, গোসাইকে এর মুল্য দিতে হবে।তাঁরাও রাজ সাক্ষী হতে চায়, কর্তৃপক্ষ কে জানালো। ৩১ আগস্ট সকালে তাঁদের কে নগেন এর সাথে জেল ডিসপেনসারিতে সাক্ষাৎ এর ব্যবস্থা করা হলো।কথাবার্তার এক পর্যায়ে গুলির শব্দ— কারারক্ষী বাহিনী দেখে গোঁসাই ছুটে পালাচ্ছে, পিছনে কানাই আর সত্যন।গোঁসাই আহত হয়ে পথের ধারে ড্রেনে পড়ে যায়।কানাই, সত্যন কে কারারক্ষী বন্দী করে।এক বিপ্লবী গোপনে রিভলবার জেল খানায় পৌঁছে দিয়েছিলো।কানাই সত্যন আত্মপক্ষ সমর্থন করতে রাজি না হওয়ায় তাঁদের ফাঁসিতে ঝুলানো হয়।গোঁসাই এর মৃত্যু মামালার উপর প্রভাব পড়ে।সে এমন সব বিবৃতি দিয়েছিলো,যা অরবিন্দের বিরুদ্ধে ছিল।কিন্তু তার মৃত্যুতে বিবৃতি সাক্ষ্য হিসাবে পেশ করা গেলো না।কারণ আসামী পক্ষ তাকে কাঠ গড়ায় জেরা করার সুযোগ নেই।তার বিবৃতি আইনের চোখে বাতিল বলে গন্য হল।
শ্রী অরবিন্দ খালাস পেলেন।

অরবিন্দ গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতি নিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে এলেন, সম্পূণ নতুন মানুষ হিসাবে।ছাড়া পাওয়ার পর পুলিশ অরবিন্দের গতির উপর নজর রাখছিলো। অরবিন্দ কে গোপনে পন্ডিচেরী পাঠাবার সিদ্ধান্ত হলো।

পন্ডিচেরী প্রস্থানের পর শ্রী অরবিন্দ সমস্ত রাজনৈতিক কার্যকলাপের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।অরবিন্দের ভাষায়, স্বদেশী আন্দোলনের বহু বর্ষ পূর্বে বরদায় তাঁর ইশ্বর অন্বেষা শুরু হয়েছিলো।অন্তরের আদেশ তাঁকে পন্ডিচেরি নিয়ে আসে।ক্রমে সাধনার অগ্রগতির সাথে সাথে তাঁর সাধন পন্ডিচেরীর সমৃদ্ধ ঘটতে থাকে,সিদ্ধি স্থল হিসাবে।শ্রী অরবিন্দ পন্ডিচেরীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন নিজের চেতনালোকে।অনুসন্ধানে জানা যায়— পন্ডিচেরীর ঐতিহ্যে সু প্রাচীন।এক সময় “বেদপুরী নামে” এ জনপদ বৈদিক শাস্ত্রঅধ্যায়নে মহান কেন্দ্র হিসাবে গণ্য হত।কথিত আছে ঋশি অগস্ত্য দক্ষিণ ভারত এসেছিলো বৈদিক আর্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির শিক্ষা দানে।

পন্ডিচেরী আগমনের পর শ্রী অরবিন্দ ছিলেন সম্পূর্ণ রুপে যোগস্থ,সাধনা মগ্ন।অন্তর- আত্মার নির্দেশে পরিচালনায় তিনি সম্পূর্ণ নতুন পথে অজ্ঞাত, অধ্যাত্ম পাড়ি জমিয়েছিলেন। তিনি এক চিঠিতে লিখেছিলেন ” আমি জড়ের স্তরে আধ্যাত্মিকতা নামিয়ে আনার চেষ্টায় ব্রতী আছি,আমি মানুষের মধ্যে পরিবর্তন ঘটাতে সচেষ্ট,যাতে তার মধ্যে অন্ধকার ঘুচে যায়।পায় আলোর সন্ধান, মন বুদ্ধি জগতে আনে পরিবর্তন।আমার যোগের মাধ্যমে সকল প্রকার ভ্রান্তি, ব্যর্থতা দূর হবে।তা না হলে পৃথিবীর রুপান্তরের কাজ সম্পূর্ণ হবে না।আমি এ কাজে ব্রতী যা কঠিন কষ্ট সাধ্য।তারই উপর শুরু হয়েছে ভিওি স্থাপনা–সৌধ নির্মানের কর্মধারা।তিনি ব্যক্তিগত মুক্তির কথা বলেননি, বা শান্তির স্বর্গে পলায়ন এর কথা বলেননি,তিনি বলেছেন পৃথিবীকে পরিবর্তনের কথা।পরবর্তীতে তিনি ‘সাবিত্রী ‘তে লিখেছিলেন—-

“Escape, however high, redeems not life,
Life that is left behind on a fallen earth.
Escape cannot uplift the abandoned race
Or bring to it victory and the reign of God
A greater power must come,a larger light ”

( পলায়ন যত উর্ধে হোক,করে নাকো মুক্ত জীবনেরে,
যে জীবন ধরায় ধূলায় পড়ে রয় ;
হতমান জাতির উত্থান নয় পলায়নে,
নাহি জয়, স্বর্গ রাজ্য লাভ।
এক সুমহান শক্তির আবির্ভাব হবে
উজ্জ্বলতর আলোক মাঝারে।)

ফেরদৌসি কাজী লিনু হক ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: