করোনাযুদ্ধের দিনগুলো (নয়)

এক অচেনা, অদৃশ্য শত্রুর কবলে পড়ে পৃথিবীর দৃশ্যপট পরিবর্তন হয়ে গেছে । আমেরিকার ইতিহাসেও বেশ ঘটনা বহুল। মার্চ ১৫ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুরো শিক্ষা বর্ষ, স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বন্ধ ছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীদের বাসা থেকে ভাচুর্য়াল বা অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে সেটা পুষিয়ে নেয়া হয়। বর্ষ শেষে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামারে গ্র্যাজেুয়েশনের আনুষ্ঠানিকতার আমেজের ভাব থাকে। বন্ধু-বান্ধব আত্মীয় স্বজন, শুভাকাঙ্কীসহ অনেকেই প্রিয়জনদের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে উৎসাহ দিয়ে থাকেন। কিন্তু এই প্রথম বারের মতো শিক্ষার্থীরা এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হলো। যদিও এটা ভাচুর্য়ালি করা হয়েছে । কিন্তু লকডাউনের মধ্যে হোটেল ডাইনিং এবং রেস্টুরেন্টের ইনডোর বন্ধ থাকার কারণে পারিবারিক পাটিও হয় নাই। যেটা এবারের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত জীবনে মনে থাকবে। এখন সেপ্টেম্বরে স্কুল খোলার ব্যাপারে আগস্টের দিতীয় সপ্তাহে গভর্নরের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। তবে যতটুকু অনুমান করা যাচ্ছে, স্কুলগুলো খুলে দেওয়া হবে, কিন্তু আগের মতো নয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে কোন শিক্ষার্থী সপ্তাহে তিন দিন ক্লাস করবেন, তিনি পরের সপ্তাহে দুই দিন ক্লাস নিবেন। এভাবে তিন এবং দুই দিনের ক্লাসের মধ্যে দিয়ে শুরু হওয়ার পরিকল্পনা আছে। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তার দিক বিবেচনার করে যদি কোন অভিভাবক বাচ্চাকে স্কুলে দিতে অপরাগ বা (নিরাপত্তাবোধ) না করেন, তবে তার জন্য বাসা থেকে ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। এই ধরনের একটি সিদ্ধান্তের ব্যাপারে মোটামুটি অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষানুরাগী, মেয়র, এবং গভর্নর অফিস একমত হয়েছেন। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হতে পারে।
একশত পনরো বছরের নিউইয়র্কের Subway (Train) ইতিহাসে এই প্রথম বারের মতো রাত একটা থেকে ভোর পাচটা পর্যন্ত পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য বন্ধ থাকে। নিউইয়র্কের MTA (Metropolitan Transport Authority) বাস, ট্রেনগুলো সাধারণত ২৪/৭ চালু থাকে। শুধু তাই নয়, সকল যাত্রীদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে বিনামূল্যে মাস্ক, গ্লাভস, হ্যান্ড সেনিটাইজারের ব্যবস্থা রেখেছে। ট্রেনের ভিতরে যাতে গাদাগাদি না করেন সে জন্য দূরত্ব বজায় রাখার ব্যাপারে প্রতিনিয়ত মাইকিং করা হচ্ছে।
নিউইয়র্ক সিটির পক্ষ থেকে মুসলিমদের হালাল ফুডসহ প্রতিদিন এক লক্ষ লোকের জন্য খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। যাতে এই দুর্যোগের সময়ে কেউ অভূক্ত না থাকেন। ২১ জুলাই পর্যন্ত মেয়রের অফিসের হিসাব মতো নিউইয়র্কবাসীর মধ্যে একশত মিলিয়ন খাবারের পেকেট সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়াও কমিউনিটির বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে এবং মুলধারার রাজনীতিবিদ, নির্বাচিত বিভিন্ন সদস্যরাও স্ব স্ব উদ্দ্যোগে খাবারসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষার সামগ্রী বিতরণ করেন। নিউইয়র্ক সিটির সুবিধার মধ্যে ছিল পাকিং সাসপেন্ড। কারণ এখানে প্রত্যেক পরিবারেরই গাড়ি আছে এবং সবাই রাস্তায় পার্ক করেন।
সময় মতো মিটারে পয়সা না দিলে বা গাড়ি না সরালে পার্কিং টিকেট বাবত জরিমানা গুনতে হয়। এ থেকে মেয়র নগরবাসীদের রেহাই দিয়ে ছিলেন। এই দুর্যোগে যাদের ইনকাম আগের চেয়ে কমেছে, তাদের ঘর ভাড়া বাবত স্টেটের পক্ষ থেকে আর্থিক সাহায্য করা হচ্ছে। শুধু তাই নয় ভাড়াটিয়ারা বাড়ির মালিকের সাথে আলাপ করে তিন মাস পর্যন্ত ভাড়া স্থগিত করে পরবর্তীতে কিস্তিতে পরিশোধ করার বিষয়েও ঘোষণা দেয়া হয়। একইভাবে বাড়ির মালিকরা ব্যাংকের সাথে আলাপ করে তিন মাস পর্যন্ত মর্টগেইজ স্থগিত করে পরবর্তী কিস্তির মাধ্যমে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করতে পারবেন। যাতে ভাড়াটিয়া বা বাড়ির মালিক উভয়ের জন্যই সুবিধা হয়।
চধহফবসরপ টাইমে লক্ষ, লক্ষ মানুষ বেকার। সবাই বেকার ভাতার জন্য আবেদন করেছেন। দেশের জনগণের সাহাযার্থে ফেডারেল সরকারও বসে নাই। বেকার ভাতার সাথে প্রতি সপ্তাহে ৬০০ ডলার করে অতিরিক্ত পাচ্ছেন। যা এ জুলাই মাসে শেষ হবে। কিন্তু বেকার ভাতা ৩৯ সপ্তাহ পর্যন্ত চলবে। শুধু তাই নয় ফেডারেল সরকারের পক্ষ থেকে যারা Tax File করেছেন আটার বছরের উর্ধ্বে সবাই জন প্রতি ১২০০ ডলার, আঠারো বছরের নিচের সন্তানদের জন্য ৫০০ ডলার, ছাত্রদের জন্য Student Stimulus সহ সরকারের পক্ষ থেকে চেক দেওয়া হয়েছে।
নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, কানেকটিকাছাড়া আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তাই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনে হয় অনেকটা বাস্তবের কাছাকাছি এসেছেন, শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে তাই আনুষ্ঠানিকভাবে ২১ জুলাই প্রেস কনফারেন্স করে মাস্ক পরার কথা সবাইকে বলেছেন। পাশাপাশি কংগ্রেস ও সিনেটে দেশের সার্বিক দিক বিবেচনা করে আরেকটি স্টিমুলাস চেকের মাধ্যমে জনগণকে আর্থিক সহায়তার কথা ভাবছেন। এদিকে গত পাঁচ/ছয় মাসে ব্যবসায়ীরা অসম্ভব ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং বড়ো ব্যাবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য SBA লোন সহ বিভিন্ন ধরনের লোন, প্রণোদনা ইত্যাদি বিভিন্ন নামে সাহায্য সহায়তার মাধ্যমে ব্যবসাকে চাঙ্গা করে চাকরি সুযোগ বৃদ্ধি করার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। কিন্তু আমাদের সুচতুর প্রেসিডেন্ট অনেকে বর্ণ বিদ্বেষী এবং ইমিগ্র্যান্ট বিরোধী কথা বলেন। এ সুযোগে তিনি আমেরিকার নাগরিকদের চাকরির সুরক্ষার দোহাই দিয়ে H.1B. ভিসাসহ সকল প্রকার ভিসা ইস্যু ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করেছেন এবং তা কবে নাগাদ শুরু হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। অর্থাৎ এটা সহজেই অনুমেয় নভেম্বরের নির্বাচনের পর এটার ভাগ্য নির্ধারিত হবে। শুধু তাই নয় তিনি আদেশ দিয়েছিলেন বিদেশি ছাত্র যারা অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছেন সবাই যার যার দেশে চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের নামীদামি বেশ কিছুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান মামলা করে কোর্টের আদেশের মাধ্যমে স্থগিত করেন। আমেরিকার জনগণ এবং বিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা দেশ এবং মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ। আমরা যারা তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতি করি আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। আমরা শিখেছিলাম নেতার চেয়ে দেশ বড়, দেশের চেয়ে বড়ো হলো জনগণ।
জনগন হলো সার্বভৌম দেশের মালিক। দাস প্রথা, বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনসহ দীর্ঘ প্রায় আড়াইশো বছরের রক্ত পিচ্চিল পথ বেয়ে আমেরিকা তার ইতিহাস ঐতিহ্য দেশপ্রেম, আইনের শাসন ইত্যাদি ভিত্তির উপর দাঁড়াচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
বন্ধু-বান্ধব শুভাকাঙ্কীদের মতো পরিবারের স্বজনরাও আমার করোনা আক্রান্তের খবরে ছিলেন উদ্বিগ্ন। পিয়ার উদ্দিন, ফারুক উদ্দিন এবং মইন উদ্দিন দেশে বিদেশে সকল ভাই-বোন পরিবারসহ তারা ছদকা খয়রাত মিলাদ দোয়া, মাহফিল ইত্যাদির মাধ্যমে করুনাময়ের কাছে প্রার্থনা করেন। তাছাড়াও খালেদ ভাই, রিনা, জিল্লুর রহমান সাহেব তাদের পরিবার সকল আত্বীয়য়-স্বজনসহ আমার রোগ মুক্তির জন্য দোয়া করেন। সম্মিলিত দোয়া ও আশির্বাদে আল্লাহর মেহেরবানী সম্মুখযোদ্ধাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে রোগমুক্ত হয়ে বাসায় আসি। -আগামী সংখ্যায় সমাপ্ত।

26195622_143370233029778_6765122721416600831_n
লেখক: বাংলাদেশে স্বৈরচার বিরোধী আন্দোলনের তুখোড় ছাত্রনেতা ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.