Advertisements

জনগণ সত্য জানতে চায়, হলুদ লাল নীল সবুজ খবর জানতে চায় না জনগণ

২৬ জুন ২০২০ তারিখ শুক্রবার বিকেলে Bangla Insider রির্পোট করলো ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসকদের এক মাসে থাকা খাওয়ার খরচ ২০ কোটি। শুধু খাবারের বিল সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা। এইসময় তাঁদের হোটেলের বিল এসেছে ১২ কোটি টাকা এবং খাবারের বিল এসেছে সাড়ে ৫ কোটি টাকা। খবরটি ভাইরাল হয়ে গেল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। নানান তীর্যক মন্তব্য। যদিও খবর হবার অনেকগুলো শর্তই পূরণ করেনা BANGLA INSIDER এর পোস্টটি। হোটেলের নাম নেই! কতজন ডাক্তার থেকেছে এবং খেয়েছে তার হিসেব নেই! বলা হয় চার তারকা হোটেলের বিল। চার তারকা হোটেলের নিশ্চয়ই ছাপানো, প্রকাশিত রুম ভাড়া, খাবারের দাম আছে! বিল তো ডাক্তার আর স্বাস্থ্যকর্মীরা করেন নাই। রিপোর্টে ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ, বিএমএ আর ডাক্তারদের কোনো বক্তব্য নেই। করোনা সংক্রমণের শুরুতেই চিকিৎসকরা যখন বাসায় থাকতে পারছিলেন না তখন তাঁদের হোটেলে রাখার কথা হয়। নীতিনির্ধারক পর্যায়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
এই ভাইরাল খবর দেখে ডাক্তারদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন তাদেরকে খাবার হিসেবে দেয়া হচ্ছে কলা-রুটি। প্রমাণস্বরূপ কেউ কেউ খাবারের ছবিও পোষ্ট করেছেন, কেউ অভিমানের সুরে ক্যাপশনে লিখেছেন কবিতা। সংসদেও বিষয়টি নিয়ে জোড়ালো আলোচনা হয়েছে।
সংসদে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডাক্তার, নার্সদের ২০ কোটি টাকা খাওয়ার খরচ অস্বাভাবিক বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি জানান, এতে যদি কোন অনিয়ম হয়ে থাকে তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। (সুত্র-ইত্তেফাক অনলাইন ডেস্ক২০:৪২, ২৯ জুন, ২০২০)। একই রিপোর্ট করে যুগান্তর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের সেবাদানকারী চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের এক মাসের খাবারের বিল ২০ কোটি টাকা কী করে হয়, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। (২৯ জুন ২০২০, ১৪:৪২:০৯ অনলাইন সংস্করণ)। এরপর ভাইরাল খবরটা টর্নেডোর গতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
৩০ জুন সংসদে ডাক্তারদের থাকা-খাওয়ার জন্য অস্বাভাবিক ব্যয়ের ব্যাখ্যা দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেলের যেটা আমি খবর নিলাম। ৫০টি হোটেল ভাড়া নেওয়া হয়েছে। ৩ হাজার ৭০০ লোক এক মাস থেকেছেন। হিসাব করে বের করেছি, ১ হাজার ১০০ টাকায় প্রতিটি কক্ষ ভাড়া হয়েছে। খাওয়ার খরচ যেটা বললেন, এটা ঠিক নয়। ৫০০ টাকা তিনটি মিলের জন্য। ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ ও ডিনার মিলে ৫০০ টাকা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সংসদে ছিলেন। (প্রথম আলো, ঢাকা ৩০ জুন ২০২০)। সংসদে মিথ্যা বলা কিংবা মিথ্যা তথ্য দেয়া অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায়, মূলত দুই মাসের খরচ বাবদ ২০ কোটি টাকা ব্যয় দেখিয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের পুরোটা এবং শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক ইনস্টিটিউটের ৬০টি বেডকে করোনা হাসপাতাল হিসেবে গত ১ মে থেকে চালু করে ঢামেক কর্তৃপক্ষ। এই হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ১৫২ জন চিকিৎসক, নার্স, অন্যান্য স্টাফ এবং আনসারসহ প্রায় দুই হাজার কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়। যেহেতু তাঁরা কোভিড-১৯ রোগীদের সেবায় নিয়োজিত, তাই তাদের বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে ডিউটি দেয়া হয়। প্রতি দল ৭ দিন কাজ করে ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টাইনে যায়। তারপর পরিবারের সঙ্গে এক সপ্তাহ কাটিয়ে আবার কাজে ফেরে। এই চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্টাফদের থাকা ও খাওয়ার জন্য ঢাকা মেডিকেল কর্তৃপক্ষ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ৩০টি হোটেল ভাড়া করে। তাদের যাতায়াতের জন্য ভাড়া করা হয় মাইক্রোবাস। চিকিৎসক, নার্সসহ অন্য স্টাফদের খাওয়া বাবদ জনপ্রতি প্রতিদিন ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
থাকা, খাওয়া ও যাতায়াত- এই তিন তিন খাতে মে ও জুন ২০২০ এই দুই মাসের জন্য ২০ কোটি টাকার বরাদ্দ দেবার জন্য ঢামেক কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠায়। প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ে। জানা গেছে, সেই প্রস্তাবটি গত সপ্তাহে অনুমোদন দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘কীভাবে এত টাকা খরচ হলো তার হিসাব বলছি। চিকিৎসক, নার্স, আয়া, আনসারসহ অন্যান্য স্টাফ মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার লোক কভিড-রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত। তাদের থাকা-খাওয়া ও যাতায়াতের জন্য আমরা ৩০টি হোটেল ভাড়া করেছি। গাড়ির ব্যবস্থা করেছি। আমরা এনএসআই এর মাধ্যমে হোটেলের সঙ্গে চুক্তি করেছি।’ তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকের প্রতিদিনের খাবারের জন্য ৫০০ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। (বাংলাদেশ প্রতিদিন ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২০) ।
চিকিৎসা কাজে নিয়োজিত একাধিক চিকিৎসক বলেছেন তাদের কাউকে রাখা হয়েছে রাজধানীর রিজেন্সি হোটেলে, কাউকে রাখা হয়েছে গুলশানের লেক শোর হোটেলে এবং কাউকে রাখা হয়েছে লা ভিঞ্চিতে। আর নার্স ও স্টাফদের রাখা হয়েছে নগরীর অন্যান্য হোটেলে। হোটেল ভাড়ার একটি চুক্তিপত্রের একটি পৃষ্ঠার ছবিও সামাজিক মাধ্যমে এসেছে। সেখানে দেখা যায় ডিসকাউন্টেড রেটে হোটেল ভাড়া করা হয়েছে!
এই খবর ছড়ানোর উদ্দেশ্য নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করছেন। কেউ কেউ বলছেন এটি উত্তেজনা সৃষ্টির অপচেষ্টা। এই অতিমারির সময়ে যা কাম্য নয়। করোনা যুদ্ধে আমাদের সম্মুখযোদ্ধা চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা এই খবরে খুবই বিব্রত হয়েছেন, দুঃখ পেয়েছেন, কেউ কেউ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাই দ্রুত জাতির সামনে পূর্ণ সত্য তুলে ধরাই নীতিনির্ধারকদের পবিত্র দায়িত্ব। যদি কোন দুর্নীতি হয়ে থাকে তার বিচার হোক আর যদি উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য খবর বানানো হয় তারও বিচার করতে হবে সরকারকে।
আবু আলম  শহীদ খান
সাবেক সচিব, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয় ।
Advertisements

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: