Advertisements

আমার দেখা,জানা—পণ্ডীচেরী অরবিন্দ আশ্রম (পঞ্চম পর্ব )

শ্রী অরবিন্দ ছিলেন আদর্শ শিক্ষক। সেটাই ছিল তাঁর ধর্ম। তাঁর শিক্ষা দান এর পদ্ধতি ছিলো অভিনব।ছাএের বিবরণ থেকে জানা যায়,সাহিত্য, জ্ঞান, অধ্যাপনা,শিক্ষা দান, ছাএদের চৌম্বকের মত আকর্ষণ করতো।প্রথমে তিনি সমগ্র বিষয়টি বোঝাবার জন্য কযেকটি বক্তৃতা দিতেন।তারপর শুরু করতেন পুস্তক থেকে, পঠন— কঠিন শব্দের ব্যাখ্য ছাড়া, থামতেন না।পাঠ্য বিষয় এর, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নানা প্রসঙ্গ এনে পাঠ শেষ করতেন।

দিনক্ষণ জানা না থাকলেও শ্রী অরবিন্দ ঐ বছর, ভারতে প্রত্যাবর্তন এর পর বাংলায় আসেন, দেওঘর দাদার বাড়ীতে।পরিবারের সবাই তাঁকে পেয়ে আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠে।কিন্ত মা তাঁকে দেখে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। ‘এতো অরো নয়,অরো কত ছোট ছিল’। আচ্ছা দেখি তাঁর আঙ্গুলের কাঁটা দাগ আছে কিনা? কাঁটা দাগ না দেখে তিনি মানতে পারছিলেন না এ তাঁর পুএ অরো।পরিবারের সাথে বেশ ভালো সময় কেটেছিলো।
১৮৯৩ এর পর সুযোগ পেলে তিনি বাংলায় চলে আসতেন।১৯০১ সালে কলকাতায় এসে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন।পদস্ত রাজ কর্মচারী ভূপাল চন্দ্র বসুর কন্যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।অরবিন্দের ২৮ আর মৃণালীনির ১৪ বছর। মুণালিনী ছিলেন সুন্দরী, সুশিক্ষিতা।সম্পর্ক স্থাপন হয় শ্রীঅরবিন্দের এক বিজ্ঞাপন থেকে।ভূপাল চন্দ্রের বন্ধু অধ্যক্ষ বিজ্ঞাপন টা দেখেন এবং তাঁর চেষ্টায় সম্পর্ক স্থাপন হয়। শ্রী অরবিন্দ হিন্দু শ্রাস্থনুসারে বিবাহ সম্পন্ন করার প্রস্তাব রাখেন।এতে সমস্যা সৃষ্টি হয় তাঁকে বিদেশ গমনের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।পিতার মত তিনি এই সব অনুষ্ঠানে অসম্মত ছিলেন।পরে এক ব্রাহ্মণ পুরোহিতকে কিছু অর্থ দিয়ে সমাজ, শাস্ত্রের মুক রক্ষা করে বিবাহ সম্পন্ন হয় ।এই বিবাহে জগদীশ চন্দ্র বসু,লর্ড সিংহসহ কোলকাতার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিল।
বিবাহের পর নবপরিণীতা স্ত্রী সহ তিনি বরোদায় ফিরে আসেন।

এ সময়, শ্রী অরবিন্দের ছোট ভাই বারীন বরোদায় এসে যোগ দেয়।বারীন ছিলেন সাহসী উচ্ছল যুবক।দেওঘরে তিনি বিপ্লবী দলে যোগ দিয়েছিলেন।এখানে এসে, সেজদার উপযুক্ত শিষ্য হয়ে যায়।বরোদার লেফটেন্যান্ট মাধবােরাও এর সংগে সখ্যতা গড়ে, আগ্নেয়াস্ত্র প্রশিক্ষণ নেন।বারীনের প্রশিক্ষণ শেষ হলে, বিপ্লবী যতিন ব্যানার্জী কে সহায়তার জন্য তাঁকে বাংলায় পাঠানো হয়। ১৯০২ সালে কলেজের অবকাশ কালীন ছুটিতে অরবিন্দ কোলকাতায় আসেন।যতীন বারীন কে সঙ্গে করে মেদীনিপুর যান।সেখানো বিপ্লবী নেতা হেমচন্দ্রের সাথে তার দেখা হয়।পরে কোলকাতা ফেরার পর, যতীনের সহযোগীতায় শ্রী অরবিন্দের ব্যারিস্টার পি মিএের সাথে দেখা হয়।তিনি বিভিন্ন শরীর চর্চার ক্লাবের মাধ্যমে যুবকদের বৈপ্লবিক কাজে সম্পৃক্ত করছিলেন।তিনিও অরবিন্দের সাথে জড়িত হয়।অরবিন্দ তাঁকে এবং হেমচন্দ্র কে গীতা এবং তরবারি হাতে নিয়ে বিপ্লব এর গোপন মন্ত্রে দীক্ষা দেন, দেশ মাতৃকার মুক্তির জন্য প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হন। ঠিক হয় বাংলাকে ছয়টি ভাগে ভাগ করে ছয়টি বিপ্লবী কেন্দ্রে খোলা হবে। বিপ্লবী কেন্দ্র দেয়া হবে রাইফেল চালনা শিক্ষা।

এর আগে মহারাষ্ট্রের এক বিপ্লবী সংগঠন এর খোঁজ পান অরবিন্দ। এর নেতা উদয়পুর রাজ্যের এক রাজপুত যুবরাজ ঠাকুর রাম সিং, তাঁকে বোম্বাই শাখার সাথে যুক্ত করেন। রামসিং বিপ্লবী আন্দোলনে দেশীয় সৈন্যদের অনুপ্রাণিত করেন।শ্রী অরবিন্দ একবার মধ্যভারত পর্যটন করে, সৈন্যবাহিনীর কয়েকজন উচ্চপদ লোকের সাথে সাক্ষাৎ করেন।এ ভাবে পূর্ব পশ্চিমে ভারতের বিপ্লবী ভাবধারার সাথে যোগ সুএ গড়ে তোলেন। পি মিএ,ভগিনি নিবেদিতা,সি আর দাশ,সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর,এবং যতীনকে নিয়ে পাঁচ জনের কমিটি তৈরি করেন। যারা বাংলাদেশে বিপ্লবী ধারার কর্ম সঞ্চালন করবেন। পি মিএের অধীনে হাজার হাজার তরুন এই আন্দোলনে যোগ দিলেন।বেশ কিছু সরকারী কর্মচারী গোপনে তাদের সহযোগী হলো।১৯০৫ সালে বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলনে এক প্রচন্ড রুপ গতি পেলো।

১৯০৫ এর মার্চ মাসে তিনি বরোদা কলেজের অস্থায়ী অধ্যক্ষ হিসাবে কার্য ভার গ্রহন করেন।১৯০৬ পর্যন্ত এ পদে বহাল ছিল।ইতি মধ্যে বাংলায় অনেক কিছু ঘটে গেলো।দেশের লোকের মতামত উপেক্ষা করে শাসককুল ১৬ অক্টোবর বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করেন।বঙ্গ ভঙ্গের ফল হয়েছিলো সুদুর প্রসারী।শ্রী অরবিন্দ ঘটনাবলীর প্রতি নিবিড় যোগাযোগ রেখে চলছিল। তিনি ১৯০৫ সালে ডিসেম্বর মাসে কংগ্রেসের বারাণসী সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন, দেশের লোকের মনোভাব জানতে, এ সময় তিনি যোগ,বৈপ্লবিক কর্মধারা,রাজনীতি,অধ্যপনা,সাহিত্য নানাবিধ কর্মকান্ডে নিয়োজিত থাকেন।

১৯০৫ সালে আগস্ট মাসে মৃনালিণীকে এক পএে তিনি লেখেন,’ আমার তিনটি পাগলামি আছে।প্রথম পাগলামি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস ভগবান যে গুন,যে প্রতিভা, উচ্চ শিক্ষা, বিদ্যা,যে ধন দিয়েছেন সবই ভগবানেের।যাহা পরিবারের ভরণপোষণের লাগে আর যা নিতান্ত আবশ্যকীয়,তাহাই নিজের জন্য খরচ করিবার অধিকার,যাহা বাকি ভগবানকে ফেরত দেওয়া উচিৎ। আমি যদি নিজের জন্য, বিলাসের জন্য খরচ করি তবে আমি চোর। –দ্বিতীয় পাগলামি কোনমতে ভগবানের সাক্ষাৎ দর্শন লাভ করিতে হইবে। ইশ্বর যদি থাকেন তবে কোন না কোন ভাবে তাঁহার সাক্ষাৎ করিবার কোন না কোন পথ থাকিবে।সে পথ যতই দু্র্গম হোক, আমি সে পথে যাইবার দৃঢ় সংকল্প করিয়া বসিয়াছি। তৃতীয় পাগলামি এই যে লোক স্বদেশকে, একটা জড় পদার্থ,কতগুলো মাঠ ক্ষেত্র বন পর্বত নদী বলিয়া জানে।আমি স্বদেশকে মা বলিয়া জানি।ভক্তি করি পূজা করি।মার বুকে রাক্ষস বসিয়া রক্ত পানে উদ্যত,তাহা হইলে ছেলে কি করে?নিশ্চিন্তে আহার করিতে স্ত্রী-পুত্রের সঙ্গে আমোদ করিতে বসে,নাকি মাকে উদ্ধার করিতে দৌড়াইয়া যায়? আমি জানি এই পতিত জাতিতে উদ্ধার করার বল আমার আছে।শারীরিক বল নাই,তরবার,বা বন্দুক লইয়া যুদ্ধ করিতেছি না,জ্ঞানের বল।ক্ষএ তেজ,এক মাএ তেজ নহে, ব্রক্ষ্ম তেজওআছে, সেই তো জ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত।

১৯০৩ সালে সরকার সিদ্ধান্ত নিলেন বাংলাকে দুই ভাগে ভাগ করবেন।পশ্চিমবঙ্গ, বিহার,উড়িষ্যা নিয়ে হবে এক প্রদেশ,অন্যটি হবে পূর্ববঙ্গ আসাম কে নিয়ে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে মানুষ।শ্রী অরবিন্দ এ ঘটনা কে বর্ননা করেছেন–‘ এিশ বছর আগে বঙ্কিমচন্দ্র যখন বন্দেমাতরম সঙ্গীত রচনা করেন,অল্প সংখ্যক লোক সঙ্গীতটি শুনেছেন।দীর্ঘ বিভ্রান্তির পর জেগে উঠলো বাংলার মানুষ।সেই শুভ মুহূর্তে গীত হলো বন্দেমাতরম।দীক্ষান্তে জেগে উঠলো সমগ্র জাতি স্বদেশিকতায়।মাতৃ মন্দির প্রতিষ্ঠা না করে কারো শান্তি নেই।

সরকার পক্ষ বসে নেই।কঠোর হস্তে আন্দোলন দমন করার জন্য জনতার উপর ঝাপিয়ে পড়ল।সভা সমিতি নিষিদ্ধ। বন্দেমাতরম ধ্বনি রাজ দ্রোহিতার সামিল।বিদেশী বর্জনের আন্দোলনে বহু দেশ প্রেমী ছাএ শিক্ষক সরকারী কলেজে পাঠ ও অধ্যাপনা করতে অস্বীকৃতি জানালো, এ অবস্থায় স্বদেশী আন্দোলনের নেএীবৃন্দ বিকল্প ব্যাবস্থা অনুযায়ী জাতীয় ভাবধারায় অনুপ্রাণিত শিক্ষা দানের প্রয়োজন অনুভব করলেন।একটি জাতীয় মহাবিদ্যালয় স্থাপনের উদ্দেশ্য সুবোধচন্দ্র মল্লিক এক লক্ষ টাকা দান করার প্রতিশ্রুতি দিলেন।সুবোধ মল্লিক ছিলেন দেশ প্রেমিক এবং অর্থবান।তাঁর ভগ্নীপতির মাধ্যমে শ্রী অরবিন্দের সাথে তাঁর পরিচয় ঘটেছিলো।সুবোধ চন্দ্র অরবিন্দ কে জাতীয় মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ করা হবে, এই শর্তে অর্থ দান করেন।জাতীয় মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষর মাসিক বেতন নির্ধারিত হয় ১৫০ টাকা।বরোদায় অরবিন্দের বেতন ছিল ৭০০ টাকা।সে আমল অনুযায়ী বড় অঙ্ক।তিনি পরিবার বা নিজের কথা চিন্তা না করে তাঁর চারিএিক বৈশিষ্ট অনুযায়ী তা মেনে নেন।তাঁর এই ত্যাগ জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।

১৯০৮ সালের মে মাসে শ্রী অরবিন্দ কে অলিপুর বোমা হামলা মামলায় আটক করা হয়।ঐ সময় তাঁর লেখা পান্ডুলিপি পুলিশ বাজেয়াপ্ত করে।অরবিন্দের রাজদ্রোহের মামলায় সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্ট করেছিলো।তিনি ছিলেন নির্বিকার।আদালত চলাকালীন সময়ে রবীন্দ্রনাথ” কৃত নমস্কার “নামে একটি কবিতা লেখেন—
” অরবিন্দ,রবীন্দ্রের লহ নমস্কার।
হে বন্ধু,হে দেশ বন্ধু, স্বদেশ আত্মার
বাণীমূর্তি তুমি।তোমা লাগি নহে মান,
নহে ধন,নহে সুখ; কোন ক্ষুদ্র কৃপা,ভিক্ষা লাগি
বাড়াওনি আতুর অঞ্জলি। আছ জাগি
পরিপূর্ণতার তরে সর্ববাধাহীন—-
যার লাগি নরদেব চিররাএি দিন
তপোমগ্ন—-

ফেরদৌসি কাজী লিনু হক ।

 

Advertisements

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: