Advertisements

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ গড়ে ওঠার পটভূমি

জাসদ গড়ে ওঠার পটভূমি,
শিবদাস ঘোষের কাছে শিক্ষণীয় দিক,
বাসদের বিশেষীকরণ

১৯৬০ এর দশকের শেষ দিকে বামপন্থী আন্দোলন একদিকে যেমন সাংগঠনিক বিভক্তিতে দুর্বল হয়ে পড়ছিল, তেমনি রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা (বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রশ্নকে কেন্দ্র করে) দিতে ব্যর্থ হয়ে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল, সেই সময় জাতীয় বুর্জোয়া দল আওয়ামীলীগ এর অভ্যন্তরে একটি র্য্ডিক্যাল ধারা জন্মলাভ করে। এই ধারাটি আওয়ামীলীগ এর ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্রলীগ’-এর একটা বড় অংশের মাঝে সাংগঠনিক ও আদর্শিক প্রভাব বিস্তার লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। এর নেতৃত্বে ছিলেন ১৯৬২ সালে ছাত্রলীগ এর সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল আলম খান। তারা ১৯৭০ সালে সংগঠনের মধ্যে স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ’এর প্রস্তাব পাশ করাতে পেরেছিল। লরেন্স লিফশুলৎস তাঁর ‘অসমাপ্ত বিপ্লব, তাহেরের শেষ কথা’ বইতে লিখেন, “স্বাধীন বাংলা পরিষদ বা নিউক্লিয়াসের মূল থিসিস ছিল, ইতিহাসের এই ক্রান্তিকালে বাঙালি জাতির সামনে জাতিগত প্রশ্নই বড়। পশ্চিম পাকস্তান পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্র বিবেচনা করে, মাও সেতুং এর দ্বন্দ্ব অনুযায়ী এ মুহুর্তে বাঙালি জাতির প্রধান দ্বন্দ্ব পশ্চিম পাকিস্তানের শোষক গোষ্ঠীর সাথে। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ এক জাতিগত রূপ নিয়েছে। সুতরাং সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন বাঙালি জাতির স্বাধীনতা তথা স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। সচেতনভাবে নিউক্লিয়াস গঠন করলেও এ সংগঠনের নেতারা ছাত্রলীগ ও আওয়ামীলীগের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য অর্জনের নীতিতে বিশ্বাসী ছিল। তারা মনে করতো যেহেতু বঙ্গবন্ধু ও তার দল সায়ত্ত্বশাসনের আন্দোলনে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত তাই তারা আওয়ামীলীগের সাথে থাকা উচিত বলে মনে করতো। তবে তারা সে সাথে একথাও বিশ্বাস করতো যে, আওয়ামীলীগ বিপ্লবী দল নয়, তাদের দ্বারা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো বিপ্লবী কর্মকান্ড পরিচালনা করা সম্ভব নয়। সুতরাং এক সময় এ দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে তাদের স্বাধীন অবস্থান ও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল গঠন করতে হবে।” [পৃষ্ঠা-৮৭] ‘শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামল’ বইতে ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ লিখেছেন, “এ বিষয়ে সিরাজুল আলম খানের বক্তব্য ছিল, আমরা এ বিষয়ে সচেতন ছিলাম যে, এমন এক সময় আসবে যখন হয়তো শেখ মুজিবকে পরিত্যাগ করে তাদের একটি নতুন রাজনৈতিক ধারা রচনা করতে হবে।” [পৃষ্ঠা-৩০৫] ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তান সরকার বেশ কিছু সামরিক ও অসামরিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের স্বার্থবিরোধী ষড়যন্ত্র মামলা রুজু করে। কয়েকদিনের মধ্যেই, তাদের সাথে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম এক নম্বর আসামী হিসাবে অন্তর্ভূক্ত হয় এবং মামলাটির নামকরণ হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। ১৯৬৮ সালের ৬ ডিসেম্বর পল্টন ময়দানের জনসভায় মাওলানা ভাসানী ‘স্বাধীন পূর্ব বাংলার’ কথা বলেন। ১৯৬৮ সালের ১ ডিসেম্বরে স্বাধীনতার আহ্বান সম্বলিত সিরাজ শিকদারের শ্রমিক সংগঠন, পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের থিসিস প্রকাশ করে। [বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র পটভূমি-দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা:৩৭৭ -৩৮৪] বামপন্থী ছাত্রসংগঠনসমূহ ৬ দফাকে শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির দাবীর অর্থে সীমাবদ্ধ মনে করতো বিধায় ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের আগে অনেক আলাপ-আলোচনার প্রেক্ষিতে ৬ দফার সাথে আরও ৫টি দাবী যুক্ত করে ১১ দফা দাবী প্রণয়ন করেন। ৪টি ছাত্র সংগঠন ও ডাকসু নেতাদের নিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে ওঠে। ছাত্র গণআন্দোলন সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী আগরতলা মামলার অন্যতম আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হককে ঢাকা ক্যান্টনম্যান্টে হত্যা করা হয়। এতে আন্দোলন আরও তীব্রতা লাভ করে। ২২ ফেব্রুয়ারী আগরতলা মামলার আসামীরা মুক্তিলাভ করে। শেখ মুজিব জেল থেকে বেরিয়ে এসে ১১ দফার প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। [পাকিস্তান অবজার্ভার, ২৩ ফেব্রুয়ারী,১৯৬৯] ১৯৬৯ সালের ২০ মার্চ বামপন্থী ছাত্রনেতা আসাদুর রহমান (আসাদ) পুলিশের গুলিতে নিহত হন। ২৪ মার্চ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আইয়ুবী শাসনের অবসান ঘটে। ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয় জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ১৬২ আসনের মধ্যে আওয়ামীলীগ ১৬০ আসনে জয়লাভ করে। এর আগেই ১৯৭০ সালের ১২ আগষ্ট ছাত্রলীগ স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রস্তাব পাশ করেছিল ৫৫/৭ ভোটের ব্যবধানে। ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত বৈঠক অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা (সবুজ জমিনের উপর বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা) উত্তোলিত হয়। ৩রা মার্চ ছাত্রলীগ আয়োজিত জনসভার প্রস্তাবলীর ৩ নং প্রস্তাবে বলা হয়, “এই সভা পাকিস্তানী উপনিবেশবাদের কবল হইতে মুক্ত হইয়া স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, শোষণহীন সমাজব্যবস্থা কায়েমের জন্য সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও নির্ভেজাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিয়া স্বাধীন বাংলাদেশে কৃষক শ্রমিক রাজ কায়েমের শপথ গ্রহন করিতেছে।” একই জনসভায় পঠিত ইশতেহারে স্বাধীন ও সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’ গঠনের মাধ্যমে তিনটি লক্ষ্য অর্জনের ২ নং এ বলা হয়, “অঞ্চলে অঞ্চলে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বৈষম্য নিরসনকল্পে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চালু করে কৃষক শ্রমিক রাজ কায়েম করতে হবে।” ২৫ মার্চ’৭১ পরবর্তী যে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হয় তাতে ৩টি বাহিনী অর্থাৎ বাঙালী আর্মি, বিডিআর ও পুলিশ সমন্বয়ে মুক্তি ফৌজ (এম এফ), সর্বস্তরের সিভিলিয়ান মানুষ যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনে আগ্রহী তাদের নিয়ে এফ এফ (ফ্রিডম ফাইটার), এবং ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের নিয়ে বি এল এফ (বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট) ছিল। এই বি এল এফ এর মধ্যে যুদ্ধের শেষ দিকে এসে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী ও মুজিববাদী এই সূক্ষ্ম বিভাজন রেখা তৈরি হয়। স্বাধীনতাত্তোর কালে এ বিতর্ক প্রকাশ্য রূপ নেয়। একদিকে সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ অন্যদিকে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। ছাত্রলীগের দুই অংশের সম্মেলনেই শেখ মুজিবের নাম প্রধান অতিথি হিসাবে থাকলেও শেখ মুজিব পল্টন বাদ দিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুজিববাদী অংশের সম্মেলনে যোগ দেন। জুলাই মাসেই ছাত্রলীগ বিভক্ত হয়ে যায়। একই আদর্শগত বিতর্কে আওয়ামীলীগের কৃষক ও শ্রমিক সংগঠন, জাতীয় কৃষক লীগ ও জাতীয় শ্রমিক লীগ ১৯৭২ সালের মে-জুন মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে বিভক্ত হয়ে যায়। ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠিত হয়। “আমরা লড়ছি সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষে” স্লোগান দিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ যাত্রা শুরু করার পর ১৯৭৩ সালের ৩০ জুন ‘বার্ষিক কার্যবিবরনী ১৯৭২-৭৩’ সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে বলা হয়, “বাংলাদেশের রাজনীতির Structural পর্যায়ের আন্দোলনে আমরা সামাজিক বিপ্লবের ডাক দিয়েছি। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র বাস্তবায়নের মাধ্যমে শ্রেণীহীন শোষণহীন সমাজ ও কৃষকরাজ শ্রমিক রাজ কায়েম করাই আমাদের লক্ষ্য। কি পরিস্থিতি ও কি পরিবেশের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মত একটি ছাত্র সংগঠনের পক্ষ হতে সামাজিক বিপ্লবের ডাক দেয়া হয়েছিল তা আমাদের গত সম্মেলনে এবং গত এক বছরে সংগঠনের প্রচার পুস্তিকার মাধ্যমে আমরা ছাত্র সমাজ ও দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছি।” পরিশেষে বলা হয়, “…বিপ্লবের প্রয়োজনে সংগঠনগত দিক থেকে আমাদের আজকের অবস্থান সত্যিকারের বিপ্লবী পার্টি বা বিপ্লব সাধনের মুহুর্ত থেকে অনেক দূরে হলেও আমাদের বাস্তব পদক্ষেপ, সুচিন্তিত কর্মসূচী এবং বিপ্লবী তত্ত্বের অনুধাবন ও তার প্রয়োগের মাধ্যমেই আমরা আমাদের শেষ লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবো এ নিশ্চিত ভরসা আমরা অবশ্যই করবো। আমাদের চলার পথের বাধাকে আমরা আমাদের সংগঠনগত সাহস, তৎপরতা, কলাকৌশল ও বিশ্বের মেহনতী মানুষের মুক্তির সনদ মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্বের ভিত্তিতে অবশ্যই সরিয়ে দিতে সক্ষম হবো।” জাতীয় সমাতান্ত্রিক দল-জাসদ এর ১৯৭৩ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রকাশিত ঘোষণা পত্রে বলা হয়, “সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে কৃষক-শ্রমিক সর্বহারা জনতা, মেহনতী মধ্যবিত্ত ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী এবং যুবশক্তির মধ্য হতে গড়ে ওঠা নতুন নেতৃত্বের অধিকারী কৃষক-শ্রমিক মেহনতী মানুষের সত্যিকারের প্রতিনিধিদের উপরে রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা অর্পণ এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মাধ্যমে শ্রেণীহীন-শোষণহীন কৃষক শ্রমিক রাজ প্রতিষ্ঠা করা তথা সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।…জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সহায়তায় এদেশে সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দ্বারা শ্রমিকরাজ তথা সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবেই।” ছাত্রলীগ এবং পরবর্তীকালে জাসদ এর কৃষকরাজ শ্রমিকরাজ প্রতিষ্ঠার ঘোষণায় সমাজতন্ত্র তথা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রসঙ্গটি থাকার কারণে ১৯৭২ সালের আগষ্ট মাসে সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বে পরিচালিত পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, “সর্বহারার একনায়কত্ব ব্যতীত সমাজতন্ত্র হচ্ছে জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতা ও ফ্যাসিবাদ। আপনারা মার্কসবাদ মানেন, মার্কসবাদ শিক্ষা দেয় যে, জাতীয় ও গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালনা করতে হয়। পূর্ব বাংলায় কি জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছে?… আপনারা গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার পরিবর্তে সমাজতন্ত্রের কথা বলে জনগণকে তাদের বর্তমানের প্রকৃত শত্রু ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দালালদের আড়াল করছেন। ইহা প্রকৃতপক্ষে শত্রুর তাবেদারী ব্যতীত আর কিছুই নয়। … জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালনা করতে হবে।” [সিরাজ শিকদার রচনা সংগ্রহ, পৃষ্ঠা-৩৪৯-৩৫১] এ সময়কালে জাসদের সাথে কমরেড মুবিনুল হায়দার চৌধুরী কিংবা এসইউসিআই এর সংযোগ ঘটেনি। সঙ্গত কারনেই জাসদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের লাইন নির্ধারণে এসইউসিআই বা কমরেড শিবদাস ঘোষের সাথে পরামর্শের ভিত্তিতে হওয়ার কথা নয়। কমরেড মুবিনুল হায়দার চৌধুরীও তার বক্তব্যে বলেছেন সিরাজুল আলম খানের সাথে মোটরসাইকেলে এক সঙ্গে যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে দেয়ালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের পোস্টার তার নজরে পড়ে এবং তিনি জনাব খানকে বলেন, “আপনারা তো একটা দল করে ফেলেছেন যার নাম জার্মানীর নাৎসি পার্টির নামের সাথে মিল রয়েছে।” জাসদ ৬ সংখ্যা সাম্যবাদ পুস্তিকা প্রকাশ করেছিল। ১৯৭৬ সালের ২৭ জানুয়ারি ৪র্থ সংখ্যা সাম্যবাদে লেখা ছিল, “বিপ্লবী হতে হলে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাও সে তুং এর চিন্তাধারাকে পরিব্যপ্ত করতে হবে জীবনের সর্বক্ষেত্রব্যাপী- অর্থাৎ ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সমাজ জীবন, সাংস্কৃতিক জীবন ও রাজনৈতিক জীবনের সম্পূর্ণটাই বিপ্লবী পরিধির আওতাভুক্ত হবে। ‘ব্যক্তিগত’ বলে কথিত সবকিছুকে সমর্পণ করতে হবে পার্টির কাছে। এক কথায় ব্যক্তিগত জীবনের স্থলে গ্রহণ করতে হবে পার্টি জীবন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় ‘ব্যক্তি জীবন’ ত্যাগ করে ‘পার্টি জীবন’ গ্রহণ করতে আমরা মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়েছি। ব্যর্থ হয়েছি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাও সে তুং এর চিন্তাধারাকে জীবনের সর্বক্ষেত্র পরিব্যপ্ত করে দিতে।” [সাম্যবাদ বিপ্লবীদের মুখপত্র, ৪র্থ সংখ্যা, পৃষ্ঠা-২৪]। অথচ ১৯৭৪ সালে যে খসড়া থিসিসটি প্রণীত হয়েছিল তার মুখবন্ধে বলা হয়, “১৯৭৪ সালের ২৭ জুন তারিখে বাংলাদেশের ‘সমভাবাপন্ন একটি বিপ্লবী গোষ্ঠীর দীর্ঘ গবেষণা, আলোচনা ও সমবেত প্রচেষ্টা’র ভিত্তিতে ‘শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের আসন্ন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সমাধা’ করার উদ্দেশ্যে যে খসড়া থিসিস হাজির করা হয়েছিল-এটা তারই পরিমার্জিত রূপ।… এই পরিমার্জিত খসড়া থিসিস ২৮ জানুয়ারি ১৯৭৬ তারিখে ঢাকায় অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি বৈঠক কর্তৃক পর্যালোচিত ও অনুমোদিত হয়।” থিসিসে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিস্থিতি তুলে ধরে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশল ব্যাখ্যা করা হয়। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন শোধনবাদ দ্বারা আক্রান্ত হলেও সমাজতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর বৈশিষ্ট্যটুকু পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি এবং চীনকে ‘বিশ্ব বিপ্লবের প্রাণকেন্দ্র ও বিপ্লবী প্রেরণার উৎস’ হিসাবে বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বর্তমান যুগের ৪ টি দ্বন্দ্বের উল্লেখ রয়েছে। সোভিয়েত পার্টিকে লেখা ১৪ জুনের চিঠিতে চীনের বক্তব্যের উল্লেখ করে বলা হয়, “…অপরদিকে (সর্বহারা শ্রেণীর দলগুলির) বাস্তব থেকে অগ্রসর হওয়া, জনগণের সাথে ঘনিষ্ঠ সংযোগ রক্ষা করে চলা, গণআন্দোলনের অভিজ্ঞতাগুলোকে ক্রমাগত সন্নিবেশিত করা এবং স্বাধীনভাবে নিজ নিজ দেশের পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ (বিপ্লবের) নীতি এবং কৌশল নির্ধারণ করা এবং প্রয়োগ করা অবশ্য প্রয়োজন। যদি কেউ এরূপ করতে ব্যর্থ হয়, যদি কেউ অপর কোন দেশের কমিউনিস্ট পার্টির নীতি ও কৌশল যান্ত্রিকভাবে ‘কপি’ করে, অপরের কাছে অন্ধভাবে আত্মসমর্পণ করে, অথবা, অপর কোন দেশের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মসূচী এবং প্রস্তাবগুলি কোনরূপ বিশ্লেষণ ছাড়াই নিজের দেশের বিপ্লবের লাইন হিসাবে গ্রহন করে, তাহলে সে ‘ডগম্যাটিজমের’ দোষে দুষ্ট হতে বাধ্য।” [পৃষ্ঠা-১৭, খসড়া থিসিস] এ বক্তব্য যদি এসইউসিআই এর হয় তাহলে কিভাবে তারা জাসদের জন্য রণনীতি, রণকৌশল ঠিক করে দিতে পারেন! তারা আলাপ-আলোচনা করে তাদের অভিজ্ঞতার বিনিময় করতে পারেন। ততটুকুই তারা করেছেন। ১৯৭৬ সালের ১লা এপ্রিল সাম্যবাদ পঞ্চম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এতে সর্বহারা শ্রেণীর পার্টি- ‘সাম্যবাদী পার্টি গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি’ শিরোনামে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীতে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টি প্রসঙ্গে বলা হয়, “সর্বহারা শ্রেণীর পার্টি- ‘সাম্যবাদী পার্টি’ গড়ে তোলার সাধনা একটি কঠিন সাধনা। মার্কসবাদে বিশ্বাসী গুটি কয়েক ব্যক্তি ঘরে বসে বা মনগড়াভাবে কোন ‘সাম্যবাদী পার্টি’ গড়ে তুলতে পারে না। ‘সাম্যবাদী পার্টি’ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন একটি প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি-এর জন্য প্রয়োজন বিপ্লবী আন্দোলন। এই বিপ্লবী আন্দোলন হচ্ছে একটি সর্বব্যাপক আন্দোলন। মার্কসবাদী জীবন দর্শন এবং দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর ভিত্তিতে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলোকে সংগঠিত করার মধ্য দিয়ে জীবনের সর্বক্ষেত্রকে ব্যপ্ত করে একটি জ্ঞানের পরিধি সৃষ্টি করা, যার মাধ্যমেই একটি সঠিক ‘সাম্যবাদী পার্টি’ গড়ে উঠবে।” এইভাবে ঐ পুস্তকের অনেকটাই আমরা সর্বহারা শ্রেণীর দল গঠনের সমস্যা প্রসঙ্গে বইতে তুলে ধরেছি। জাসদেও সেই সময় বিতর্ক ছিল যে শিবদাস ঘোষের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ বা উপস্থাপন কি লেনিনবাদী পার্টি গঠনের নীতিমালার বাইরে কিছু? এটা কি শিবদাসবাদ? তার জবাবেই জাসদের পুস্তিকায়ও শিবদাস ঘোষের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে তার নাম উল্লেখ করা হয়নি এ কারণে যে শিবদাস ঘোষও লেনিনকে উদ্ধৃত করেই তার ব্যাখ্যা রেখেছিলেন।
শিবদাস ঘোষের কাছে শিক্ষণীয় কিছু দিক

১. শিবদাস ঘোষ ভারতবর্ষে বিপ্লবী দল গড়ে তোলার সংগ্রাম করতে গিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান সাহিত্য দর্শনের বিভিন্ন শাখা এবং জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিষয়াদির উপর যেভাবে নজর রেখেছিলেন, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন (এখানে তার সমস্ত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের যথার্থতা বা কার্যকারিতা আলোচনা হচ্ছে না) তা থেকে আমরা অনুপ্রেরণা লাভ করেছি। ২. একটা জটিল তত্ত্বগত বিষয়কে প্রাঞ্জল ও সহজবোধ্য করে উপস্থাপন করার দক্ষতা শিক্ষনীয়।
৩. জাসদ তার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের রণনীতি নির্ধারণ করার পরও শিবদাস ঘোষ যেভাবে লেনিনের এপ্রিল থিসিস কে ব্যাখ্যা করে ভারতবর্ষে বিপ্লবের রণনীতি রণকৌশল নির্ধারণ করেছেন তা জাসদ এবং পরবর্তীতে আমাদের রাজনৈতিক লাইনকে পরিপুষ্ট করতে সহায়তা করেছিল।
৪. শরৎ সাহিত্য মূল্যায়ন থেকে শরৎ সাহিত্যকে বোধে-বিস্তারে উপলব্ধি করা সহজ হয়েছে।
৫. সংস্কৃতির উপর গুরুত্বারোপ থেকেও শিক্ষনীয় রয়েছে।
৬. ভারতের বামপন্থী দলগুলোর সম্পর্কে বিশ্লেষণ ও ধারণা লাভ এবং আমাদের দেশেও বামপন্থী দল বিচার করার ক্ষেত্রে শিবদাস ঘোষের ব্যাখ্যা থেকে শিক্ষা।

আমাদের বিশেষীকরণ ও ভারতবর্ষের আন্দোলন থেকে পৃথক

১. দল ও ফ্রন্টের গঠন প্রক্রিয়া, কাঠামোগত বিন্যাস, নামকরণ ইত্যাদি
২. ১৯৮১ (দল গঠনের ১ বছর) সালে জে:ওসমানীকে নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
৩. ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন
৪. ১৯৮৩ সালে দলের অভ্যন্তরে শোধনবাদ বিরোধী আন্দোলন
৫. ১৯৮৪ সালে সামরিক শাসনামলে উপজেলা নির্বাচন প্রতিরোধ ও বর্জন
৬. বুর্জোয়া দলের সাথে ১৫ দলীয় জোটবদ্ধ আন্দোলন (সামরিক শাসন বিরোধী)
৭. ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন , ৫ দল (বাম) গঠন
৮. ১৯৮৮ সালে সর্বদলীয় ভাবে নির্বাচন বর্জন, গণঅভ্যুত্থানের পরিবেশ তৈরি
৯. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বদলে স্বৈরাচার উৎখাতে আন্দোলনকারী জোটসমূহের সরকার প্রস্তাব
১০. বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠন (১৯৯৪)
১১. ১১ দল গঠন (১৯৯৮)
১২. তেল-গ্যাস রক্ষা আন্দোলন ও জাতীয় কমিটি গঠন
১৩. ১৯৯২ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে মৌলবাদ যুদ্ধাপরাধী বিরোধী গণআদালত আন্দোলন
১৪. ব্লাসফেমী আইন প্রণয়ন বিরোধী আন্দোলন
১৫. দ্বি-দলীয় বৃত্তের বাইরে বামবিকল্প শক্তি গড়ার আন্দোলন
১৬. শিক্ষা সম্মেলন শিক্ষা আন্দোলন, শিক্ষা সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গী
১৭. অপসংস্কৃতি বিরোধী আন্দোলন
১৮. টিপাই বাঁধ, আন্তঃনদী সংযোদ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী আন্দোলন
১৯. পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী স্বার্থ রক্ষা ও নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন
২০. গণমুক্তি আন্দোলন, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, সিপিবি-বাসদ ঐক্য গঠন
২১. যুদ্ধাপরাধী-মৌলবাদবিরোধী গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষে অবস্থান
২২. নারায়নগঞ্জে শ্রমিক অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া
২৩. আদর্শগত ও তাত্ত্বিক বিষয়ে নিজস্ব সংযোজন বা বিশেষীকরণ ৪০ পয়েন্টের জবাবে বলা আছে।

জাসদের অভ্যন্তরে মতাদর্শগত সংগ্রাম

১. জাসদ, ছাত্রলীগ, কৃষকলীগ, শ্রমিকলীগ-কোনটাই বিপ্লবী সংগঠন নয়। এগুলি গণসংগঠন এবং এই গণসংগঠনসমূহের দ্বারা পরিচালিত গণসংগ্রাম ও বিপ্লবী সংগ্রামের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসা পরীক্ষিত কর্মীদের নিয়ে বিপ্লবী দল হবে।- এই ধারণার বিরোধীতা (১৯৭৩) এবং দল গড়ার প্রক্রিয়ার আলোচনা শুরু করা। কমরেড মুবিনুল হায়দার চৌধুরীর মাধ্যমে প্রাপ্ত এসইউসিআই এর বইপত্র সহায়তা করেছে।
২. গণআন্দোলনে এবং পেটিবুর্জোয়া রাজনীতি থেকে বিপ্লবী সংগ্রামে উত্তরণের জন্য ‘ছেদ ঘটানো’র যান্ত্রিক তত্ত্বের বিরোধীতা। জনগণের সামনে বিপ্লবী দল একটা আর কর্মীদের সামনে আরেকটা এবং গোপনীয়তার নামে চক্রান্তমূলক পন্থায় কথিত ‘মূল বিপ্লবী শক্তি’ নির্মানের বিরোধীতা। (১৯৭৩)
৩. ১৯৭৪ সালের ১৫ মার্চ সরকারের প্রতি আলটিমেটাম পরবর্তী রিলিফ কমিটির ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও কারখানা প্রশাসকদের ঘেরাও কর্মসূচীকে কেন্দ্রে রেখে কালো আইনের উন্মোচন ও সাধারণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সুনির্দিষ্ট করা প্রশ্নে তার বিপরীত হঠকারী কার্যক্রমের (১৭ মার্চ ১৯৭৪ সালে সরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও, গুলি ও ৪০ জন নিহত) মাধ্যমে দলকে গণসম্পৃক্ত করার বদলে গণবিচ্ছিন্ন করার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহন।
৪. মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ সরকার বিরোধী ঐক্যফ্রন্ট গঠনের প্রস্তাব ও কার্যকর করার উদ্যোগ গ্রহন।
৫. ৭ নভেম্বর সিপাহী অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে জাসদের দলীয় পরিকল্পনা কর্মপন্থা ও পরবর্তী কার্যক্রম এর ত্রুটি চিহ্নিত করে অবস্থান গহন। ভারতীয় হাই কমিশনার সমর সেনকে হাইজ্যাক করে বন্দী কর্ণেল তাহের, জলিল, রব সহ নেতাদের মুক্তি চেষ্টার আত্মঘাতি পদক্ষেপ এর সমালোচনা। (কারাগার)
৬. গণবাহিনী (১৯৭৪ এর শুরুতে) গঠন (অপরিকল্পিত, বিধ্বস্ত গণবিচ্ছিন্ন সাংগঠনিক অবস্থা থেকে ঘুরে দাড়ানোর তাৎক্ষণিক স্বতঃস্ফুর্ত উদ্যোগ) এর অসঙ্গতি তুলে ধরা। (জাসদের রাজনীতি তথা রণনীতি রণকৌশলের সাথে অসংলগ্ন)
৭. ‘গ্রাম সরকার’ (জিয়া সরকারের সময়) ও গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার (বুর্জোয়াদের সাথে বিভিন্ন মাত্রায় আপোষ সমঝোতায় সরকারে অংশগ্রহন) বিরোধিতা ও ব্যাপক বিতর্ক তোলা। (১৯৭৯)
৮. খুলনা জেল হত্যাকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ আন্তোলনে আওয়ামীলীগ সহ ১০ দলীয় (পরে ৯ দলীয়) ঐক্য বিরোধী অবস্থান। কারণ, ক্ষমতাসীন বিএনপি ও ক্ষমতাবহির্ভূত আওয়ামী-বাকশালী শক্তির বাইরে বাম গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য প্রচেষ্টা ছিল করণীয়।
৯. দল গঠনের নতুন উদ্যোগ গ্রহন। অমিমাংসেয় আদর্শিক বিরোধ নিয়ে জাসদ এর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ।

চক্রান্তের পথে বিপ্লবী মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

পার্টিতে মতভিন্নতাকে কেন্দ্র করে যে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল তাকে সুনির্দিষ্ট করার জন্য কমরেড মুবিনুল হায়দার চৌধুরী ৪০ টি পয়েন্ট কেন্দ্রীয় কমিটিতে পেশ করলেন। ২১ মার্চ তার জবাব কমরেডদের কাছে সার্কুলারসহ প্রেরণ করা হলো ২৯ মার্চ থেকে ১লা এপ্রিল পর্যন্ত সমন্বয়ক, আহ্বায়ক সদস্য সচিবদের বৈঠকে আলোচনার জন্য। কিন্তু তার আগেই ‘খসড়া’ টাইটেল দিয়ে নয় পৃষ্ঠার একটি দলিল গোপনে বিভিন্ন সাংগঠনিক এলাকার ‘বাছাই’ করা লোকদের কাছে বিলি করা হলো। বক্তব্যের ঢং এ লেখাটি তৈরি থাকলেও বক্তার নাম ছিল না। শেষ অংশে লেখা ছিল, “উপরোক্ত আলোচনায় যা দেখা গেল তার বাইরেও মার্কসবাদের আরো নানা ক্ষেত্রে শিবদাস ঘোষ এর অবদান আছে যা সময়ের অভাবে আনা গেলনা। কিন্তু বিশ্বাস থেকে গেল নিশ্চয়ই আজ হোক কাল হোক অনুসন্ধিৎসু মার্কসবাদীরা তা সামনে নিয়ে আসবেন। প্রশ্নও থেকে গেল আমরা কি সমস্ত রকমের পশ্চাদপদ ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং উগ্র জাতীয়তা থেকে মুক্ত হয়ে মুক্তবুদ্ধি চর্চার মাধ্যমে প্রকৃত সত্যের দুয়ারে পৌঁছাতে পারবো? এ প্রশ্নের উত্তর দেবার দায়িত্ব সময়ের হাতে ছেড়ে দিয়ে আপাতত শেষ করছি।(চলবে)” পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির অগোচরে নির্দিষ্ট কিছু চেনা মুখ ছাড়া সকল কমরেডদের কাছে গোপন করে এ ধরণের উপদলীয় চক্রান্ত কখনও সত্যের সন্ধান দিতে পারেনা। তারপর পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে পাঠানো হলো সার্কুলার। তারও পাল্টা একটা ‘পার্টি সার্কুলার প্রসঙ্গে’ নাম দিয়ে একই কাজ করা হলো একই কায়দায়। ৪ পৃষ্ঠার এই দলিলটি ছিল পার্টি সার্কুলারকে ‘কাউন্টার’ করে লেখা। অথচ পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে তা জানতে পারেনি। তারপর ‘খসড়া’ টাইটেলে ‘মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও কমরেড শিবদাস ঘোষ’ এই শিরোনামে বুক ফর্মেটে ১৫ পৃষ্ঠার একটি লেখা একই কায়দায় বিলি হয়েছে। এই তিনটি ‘গোপন’ দলিলের বাইরে আরও কিছু বিলি হয়েছে কিনা তা আমরা জানতে পারিনি। এর দু একটি দলিল কারা বিলি করেছে তার সাক্ষাৎ নমুনা কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে রয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় তা তোলা হয়েছিল। সদস্যরা কেউ দায় স্বীকার করেননি। এসব দলিলে লেখা বক্তব্যের কিছু ৪০ পয়েন্টের আলোচনায় এসেছে। বাকীগুলো পরবর্তীতে দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
‘মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও শিবদাস ঘোষ’ শিরোনামের দলিলে পার্টি সাধারণ সম্পাদকের ভারতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্য কোট করে বুঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে একসময় তিনি শিবদাস ঘোষকে যেভাবে মূল্যায়ন করেছেন বর্তমানে তার থেকে সরে এসেছেন। অর্থাৎ শিবদাস ঘোষের অথরিটিকে অস্বীকার করে চলেছেন। এ প্রসঙ্গে গণদাবী: ১০ মে ১৯৯৮ সংখ্যায় এসইউসিআই-এর ৫০ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে পাঠানো শুভেচ্ছা বার্তা, গণদাবী: ১ জানুয়ারি ১৯৯৮ তে ছাপা বিভিন্ন দেশের পার্টির আমন্ত্রিত নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে ঘাটশিলায় শিবদাস ঘোষের ভাস্কর্যের আবরণ উন্মোচন অনুষ্ঠানের জনসমাবেশে (১৩ নভেম্বর ১৯৯৭)র বক্তব্য, নভেম্বর বিপ্লবের ৮০ তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ২০ নভেম্বর কলকাতায় মহাজাতি সদনের জনসমাবেশের বক্তব্য, ২০১১ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি: অতীত ও বর্তমান এর উপর কলকাতায় আলোচনার অংশ বিশেষ ইত্যাদি।

যেমন, “স্মরণ করছি সেই মহান বিপ্লবীকে, যিনি মার্কস-এঙ্গেলসের শিক্ষাকে যুগোপযোগী বৈজ্ঞানিক চেতনার স্তরে তুলে ভারতবর্ষের মাটিতে বৈরী পরিবেশে আজীবন দুঃসাধ্য প্রয়োগ সাধনা করেছিলেন। … স্ট্যালিনের হাতে গড়া সমাজতন্ত্রের অভাবনীয় বিপুল বিশাল শক্তির অন্তরালেও কিভাবে শোধনবাদের বিনাশী শক্তির বীজ উপ্ত হয়ে সমাজতন্ত্রের সমস্ত বিজয় এবং সাফল্যকে নস্যাৎ করে দিতে পারে – ৫০ এর দশকেই কমরেড ঘোষ তার স্বরূপ চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। …ব্যক্তিবাদকে পরাস্ত করা এবং ব্যক্তিসত্ত্বাকে সামাজিক সত্ত্বার মাঝে বিলীন করার সর্বব্যাপক সংগ্রামের রূপরেখাও তিনি উপস্থিত করেছিলেন। আমরা আমাদের দেশে বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তুলতে গিয়ে কমরেড শিবদাস ঘোষের এই মহামূল্যবান শিক্ষার যথার্থতা ও গুরুত্ব অনুধাবন করেছি। বিশ্বসাম্যবাদী আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব ব্যাপক বলে আমরা মনে করি।…নিখুঁত দ্বন্দ্বমূলক বিচারপদ্ধতি এবং তীক্ষ সুদূরপ্রসারী পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ ক্ষমতাবলে তিনি বিশ্বসাম্যবাদী আন্দোলনের আদর্শগত নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট স্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। …মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্ট্যালিন ও মাও সে তুঙ এর বিপ্লবী শিক্ষার পাশাপাশি কমরেড শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারাকে আমাদেরা দেশ বাংলাদেশের বিশেষ বাস্তবতায় প্রয়োগ করতে গিয়ে আমাদের মনে হয়েছে, অনন্য সাধারণ এই মহান বিপ্লবীর চিন্তাদর্শ বিশ্বসাম্যবাদী আন্দোলনের সামনে উপস্থিত থাকা প্রয়োজন। সেই প্রয়াস থেকে এসইউসিআই পার্টির এই আয়োজনকে আমি অভিনন্দিত করছি এবং তার সাথে সংহতি প্রকাশ করছি।…আপনাদের সৌভাগ্য যে, এসইউসিআই-এর প্রতিষ্ঠাতা এ যুগের অন্যতম মার্কসবাদী দার্শনিক কমরেড শিবাদাস ঘোষ সংশোধনবাদের আদর্শিক-সাংস্কৃতিক-ব্যবহারিক উৎসমূলের সন্ধান, সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবী দলের নৈতিকতা, পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী অবক্ষয়ের কালে ব্যক্তিবাদের সমস্যা, এমনকি সমাজতান্ত্রিক সমাজে ব্যক্তিবাদের সমস্যা এবং তাকে মোকাবেলার উপায়সহ বহু দিক থেকে বিপ্লবী সংগ্রামে যে সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন, নভেম্বর বিপ্লবের শিক্ষার পাশাপাশি তাকে অব্যাহতভাবে এগিয়ে নিতে পারলে ভারতবর্ষে বিপ্লবের সম্ভাবনাকে আপনারা অবশ্যই বাস্তবে রূপ দিতে পারবেন, এ আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।… কমরেড শিবদাস ঘোষের যে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, সেটার মধ্য দিয়ে সামগ্রিকতায় একটা দিক নির্দেশনা আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে আসে সেটা জাসদ গ্রহন করে। …যখন শিবদাস ঘোষের বইপত্র পড়ি তখন মনে হয়েছিল এরকম একটা বিষয় তো চেয়েছিলাম।…লেনিনীয় নীতির উপর দাড়িয়ে এবং শিক্ষা নিয়ে শিবদাস ঘোষ যে কথা বলেছিন, আসুন সেটা নিয়ে তর্ক করি।…” এ বক্তব্যগুলিকে স্থান কাল প্রেক্ষিত থেকে বিচ্ছিন্ন করে মূল বিতর্কের বিষয়কে ধামাচাপা দিয়ে দল এবং নেতৃত্বকে খাটো করার কৌশল যদি না হবে তাহলে দলের কাছে প্রকাশ না করে এবং যার বক্তব্য তার কাছে একটি বারের জন্যও জানতে না চেয়ে গোপনে প্রচার চালানো কেন? এখানে বলা দরকার যে, আমরা শিবদাস ঘোষকে বিশিষ্ট মার্কসবাদী চিন্তাবিদ মনে করেছি এবং এখনও করি। এসইউসিআই পার্টিকে কিছু ভুল ভ্রান্তি সত্ত্বেও একটি সঠিক বিপ্লবী দল মনে করি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাম্যবাদী আন্দোলনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নিয়ে এসইউসিআই’র আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনা করা প্রয়োজন বিশেষ করে ঘাটশিলায় ভাস্কর্য উন্মোচন অনুষ্ঠানে বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। জাসদ গঠনের পর শিবদাস ঘোষের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এতই প্রাঞ্জল ও সহজবোধ্য ছিল যে তা আমাদের আকর্ষণ করেছিল সেই স্বীকৃতি দিয়েছি। পার্টি সাধারণ সম্পাদকও এ মত পোষন করেন যে, সতর্কতার অভাব ও মার্কসবাদী সাহিত্যের উপর ব্যাপক জানাশোনা ও চর্চার ঘাটতির কারণে এবং শিবদাস ঘোষের আলোচনায় রেফারেন্স না থাকার কারণে প্রতিটি বক্তব্যই তাঁর নিজের বলে মনে হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে বিবেচনা থেকেও স্বীকৃতিমূলক বক্তব্য মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এখন যখন বিতর্ক এসেছে আমরা খোঁজ করতে গিয়ে দেখি যেগুলিকে শিবদাস ঘোষের মৌলিক সৃষ্টি মনে করা হতো তা বাস্তবে মার্কসবাদী নেতৃত্বের বক্তব্যের সম্প্রসারণ। আমরা যদি ৪০ পয়েন্টের উপর শিবদাস ঘোষকে বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের নেতা ঘোষণা করতাম তাহলে তাকে অসম্মান করা হতো এবং আমাদের অজ্ঞতাও প্রকাশ পেত। আমরা মনে করি শিবদাস ঘোষের চিন্তা ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের গুরুত্ব খাটো হয়ে যায়না যদি তার সীমাবদ্ধতা বর্তমান সময়ের নিরিখে উদ্ঘাটিত করে আরও এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। আমরা সে চেষ্টাই করছি। নইলে অন্ধত্বের চোরাগলিতে আমরাও আটকা পড়ে যাব যেমনি করে বিগত দিনে চীনপন্থী, মস্কোপন্থীদের দশা হয়েছিল। আজ সকল বিপ্লবীদের গোঁড়ামীপূর্ণ (Dogmatic attitude) মনোভাব পরিহার করে সঠিক দ্বন্দ্বমূলক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সত্যকে পাথেয় করে এগিয়ে যেতে হবে, বাংলাদেশের শোষিত জনগণের স্বপ্ন, মুক্তিকামী মানুষের আকাঙ্খা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করতে হবে।   সূত্র : পতিবাদ মঞ্চ

Unbenannt

জাসদের অভ্যন্তরে মতাদর্শগত সংগ্রাম এবং চক্রান্তের পথে বিপ্লবী মত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা প্রসঙ্গে /

// বাসদ -খালেকুজ্জামানান

Advertisements

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: