Advertisements

সরকার আছে শাঁখের করাতের নিচে

উভয় দিক থেকেই বিপদ বা ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই এই প্রবাদের মূল বক্তব্য অর্থাৎ ভাবধারার অর্থ উভয় সঙ্কট।  শাঁখ মূলত সমুদ্রজাত শঙ্খ । সেই বহুকাল পূর্ব থেকেই শঙ্খবনিক বা শাঁখারিগণ শাঁখ থেকে পন্য ( চুড়ি/ অলঙ্কার/ বালা, ইত্যাদি) তৈরীতে বিশেষ ধরণের করাত ব্যবহার করে। যা কিনা সাধারণ করাতের উল্টো চরিত্র বহন করে। যাওয়া/ আসায় দুবারই কাটে । অর্থাৎ যেই দিকেই যাওয়া না কেন, বিপদ হবেই ।

গত সপ্তাহে করোনার এই ভয়াবহতায় কোরবানি নিয়ে নিজস্ব মত লিখেছিলাম।  সেই লেখাতে সরাসরি বলার চেষ্টা ছিলো কোরবানি প্রয়োজনের তাগিদে এবার বন্ধ রাখুন । কারণটি সেই লেখাতে স্পষ্ট বলা ছিলো বলেই আর এখানে চর্বিতচর্বণ করলাম না। সেই লেখাকেই ভিত্তি করেই আজকের লেখায় ভিন্ন কিছু একান্তই নিজস্ব মতামত কলমে তুলে আনার প্রয়াস মাত্র।

প্রথমেই বলে নেই  সরকারকে কেন বললাম শাঁখের করাতের মাঝে আছে । লক্ষ্য করুন, সরকার সীমিত আকারে কোরবানির পশুর হাটের অনুমতি দিয়েছে। যদিও সীমিত আকারের কোনো সংজ্ঞায়ন বা বালাই আমাদের দেশে নেই  বা রাখা সম্ভব হয় না। ঘন জনবসতিপূর্ণ দেশ বলে কথা । এখানে এও বলা প্রয়োজন যে, আমরা সরকারকে কখনো কখনো সমালোচনার সম্মুখীন করি ( আমি নিজেও তাদের একজন ) মুক্ত মত প্রকাশের অধিকার বলে । অবশ্য দেশে মুক্ত মত প্রকাশ, কতটুকু চর্চা করা সম্ভব সেটা ভিন্ন ও বড় আলোচনা এবং আজকের বিষয়বস্তুও সেটা নয় । তবে একথাও সত্য সরকারকে ১৮ কোটি জনতার সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হয় বৃহৎ পরিসরে, পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক দিকটি তো আছেই ।

ধরে নিন সরকার এবার করোনার সংক্রমণ থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করতে, কোরবানি করা বন্ধ ঘোষণা করলো । তাহলে কি হতে পারতো ? যেহেতু আমরা বেশিরভাগ মুসলমানের দেশ, এর প্রতিক্রিয়ায় সরকারকে নানান আবেগি সমালোচনার সম্মুখীন শতভাগ হতে হতোই এবং ধারণা করি সামাল দেওয়াও সরকারের জন্য বড় বিপদের হতো । আমরা কথায় বলি, আমরা বাঙালিরা আবার একটু বেশিই আবেগি । আর সেখানে ধর্মের ক্ষেত্রে তো কথাই নাই । যদিও আমরা ধর্মে বাণী শুনতে বা চর্চা করতে ইচ্ছুক বা অভ্যস্ত মোটেও নই । আমরা ধর্ম চর্চাও করি আবার পাশাপাশি অপকর্ম করার ক্ষেত্রেও বেশ পারদর্শী।  একটি উদহারণ দিলেই পরিষ্কার হবে। যেমন : যে টাকায় আমরা কোরবানি করি, সেটা কতটুকু সৎ পথে উপার্জিত, সেই প্রশ্ন নিজেকে করি না । তবে কোরবানি ঠিকই দেই । কোরবানির মূল উদ্দেশ্য কায়েম হলো কি হলো না, সেটার ধার ধারি না । কোরবানি দিয়েছি, দেট্স্ অল ।

বলছিলাম সরকারকে মানুষের অর্থনৈতিক বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয় । দেশে কোরবানিকে উপলক্ষ করে শত শত কৃষকরা গরু/ ছাগল লালন পালন করে ।  হাজারো কৃষক কোরবানিতে গরু/ ছাগল বিক্রি করে হয়তো ঋণের টাকা শোধাবে, মেয়ে/ ছেলের বিয়ে দিবে কিংবা ঘরের ফুটো চালা ঠিক করবে । সরকার কোরবানি করার কথা বন্ধ ঘোষণা করলে সেই কৃষকদের হতো করোনার চেয়েও বড় বিপদ । সুতরাং দেশের অর্থনৈতিক চাকা চালু রাখত সরকারকে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই হয় । তাই লেখার শুরুতেই বলছিলাম, সরকার আছে শাঁখের করাতের নিচে। দিলেও বিপদ আবার না দিলেও বিপদ ।

তবে হ্যাঁ সরকারকে যে কাজটি মোটামুটি শক্ত হাতে করতেই হবে ( দেশের জনগণের সার্থেই ) সীমিত আকারের প্রতি সত্যি বিশেষ নজর রাখা । হাটবাজারে যত গরু উঠে উঠুক, সেটাকে সীমিত না করে বরং খরিদ্দারদের প্রতি নজর রাখা। যেমন : স্বাস্থ্যবিধির সকল নিয়ম মানতে বাধ্য করা এবং গরু কেনার জন্য দলবদ্ধ  ভাবে হাটে কাউকেই অনুমতি না দেওয়া। দুইজনের বেশি কাউকেই হাটে জটলা করতে না দেওয়া।  একই গরুর জন্য দশজনের এক সাথে জটলা করে দামাদামি না করা । তাছাড়া হাটের প্রবেশ পথে পশু ডাক্তারদের সাথে মানুষের ডাক্তারদের নিয়োজিত করা । ভলান্টিয়ার বা সেবক রেখে, তাদের দ্বারা হাটে আগতদের অন্তত শারীরিক তাপমাত্রা পরীক্ষা করা এবং সামান্যতম সর্দি/ কাশি থাকলে তাদের কোনোভাবেই হাটে প্রবেশ না করতে দেওয়া। আরো অনেক কিছুই করা প্রয়োজন এবং আমি নিশ্চিত সরকার সেগুলো ইতিমধ্যেই ভালো জানেন । আমার বলার উদ্দেশ্যে বেশ পরিষ্কার, কর্মে যেন অবহেলা না হয় এবং পাশাপাশি কাউকেই যেন অযথা হয়রানির শিকারও হতে না হয় । কাজটি শতভাগ সঠিকভাবে সরকারকে করতেই হবে । তাহলে ভবিষ্যতে সরকারের কর্ম কম হবে, নতুবা সব জনগণকে সাথে নিয়েই মহা বিপদ চলে আসবে। যা কিনা সরকারের পক্ষে সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে যাবে।

আসুন একটু দেখে নেই আমরা সাধারণ জনগণ কি করে সরকারকে সহযোগিতা করতে পারি । ভেরি সিম্পল। নিজে/ পরিবার এবং সমাজের সার্থেই যতটা সম্ভব এবার কোরবানি করা থেকে প্রথমত বিরত থাকার চেষ্টা করি । ভাগে কোরবানি দেওয়া হতে পারে বড় বিপদ । পূর্বেই আলোচনা সাপেক্ষে ভাগিদারদের সাথে জটলা কমানোর চেষ্টা করুন । প্রয়োজনে ছাগল বেশি করে কোরবানি করুন এবং এককভাবে কাজটি করার চেষ্টা করুন । কেননা গরু এককভাবে কোরবানি করা সম্ভব হয় না । শিশুদেরকে এবার কোরবানির স্থলে যেতে বিরত রাখুন । আরো অনেকভাবেই নিজেদেরকে মোটামুটি রক্ষা রাখা সম্ভব হবে, সব বিষয়কেই বিবেচনায় নিন এবং সর্বোপরি নিরাপদ থেকে কোরবানি করুন।

আমরা ডিজিটাল বলে গর্ব করি এবং বেশ অনেক কিছুই ডিজিটাল পদ্ধতিতে চলে এসেছে। সম্ভব হলে হাটবাজারে না গিয়ে ঘরে বসেই ডিজিটাল পদ্ধতিতে পশু কেনার চেষ্টা বেশি করে করুন। কোরবানির এখনও অনেকদিন বাঁকি আছে। এলাকা/ মহল্লার যুবক/ যুবতি/ তরুণ/ তরুণীরা এবার কোরবানিতে এগিয়ে আসতে পারেন । আপনারা এলাকায় গ্রুপ করে ফেইসবুক/ টুইটার/ অনলাইন ব্যবহার করে মানুষের বাড়িতে পশু পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে পারেন। তবে আপনাদের সর্বোচ্চ লক্ষ্য রাখতে হবে, কারো বিনা সংস্পর্শে কাজগুলো করার। আপনারাও পড়াশোনার ফাঁকে কিছুটা আয় রোজগার  করার সুযোগ তৈরি করতে পারেন । যা কিনা বর্তমানে করোনার হাত থেকে জনগণকে কিছুটা মুক্ত রাখতে সহায়তা করবে এবং আপনারাও জীবন- জীবিকা সমন্ধে বেশ কিছুটা শিখতে পারবেন ।

লেখার শেষে বলছি, নিশ্চয়ই এমন অনেক ছোটোখাটো বিষয় অনেকের মনে ধরতে পারে, যা করলে আমরা কোরবানিও দিতে পারবো, কৃষকও বাঁচবে এবং করোনাও আমাদের ক্ষতি করতে পারবে না, যদি এমন কিছু বলার থাকে দ্রুত সেগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খোলাখুলি বলুন।  নিশ্চয়ই সেগুলো জনমানুষের কাজে লাগতে পারে ।

আর একটি কথা সরকারের প্রতি, দেশে এবার কোনো অবস্থাতেই যেন ভারতের গরুর আমদানি বা চোরাকারবারির মাধ্যমে না আসতে পারে । ধারণা করি, এবার সচেতনতার কারণেই অনেকে কোরবানি থেকে বিরত থাকবে । আমি নিজেও আমার পরিবারের প্রতি একই পরামর্শ দেবো । তবে যতটুকু কোরবানি হয়, তা যেন দেশীয় গরু/ ছাগলেই হয় । তাতে করে এই ভয়াবহতার মাঝেও দেশের অর্থনীতির চাকা চালু থাকতে সহায়ক হবে । আসন্ন কোরবানিতে সবাই সুস্থ ও  নিরাপদ থাকুন ।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম 

Advertisements

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: