বিড়ম্বনা- ভাবুন, আবার ভাবুন, বারবার ভাবুন

এমন জীবন করিও তুমি গঠন, মরিয়া হাসিবে তুমি, কাঁদিবে ভূবন “

এটা আমার লেখা নয়, কেউ একজন ফেইসবুকে লিখেছিলেন । আমি এটাও জানিনা এটা উনার নিজের, না কোনো বিখ্যাত কারো লেখা । এখন আর খুঁজে পাচ্ছি না বলে নামটি দিতে পারছি না, দুঃখিত।  কথাটি আমার বেশ পছন্দ  হয়েছে । হ্যাঁ  মৃত্যুর পরে যদি আমার/ আপনার অভাব সমাজ বা দেশ অনুধাবনই না করে, তাহলে নিশ্চয়ই আমার / আপনার জীবন কর্মের মাঝে কিছু কমতি নিশ্চিত আছে ।

প্রথমেই সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী,আওয়ামী লীগের বিজ্ঞ ও প্রাক্তন নেতা মোহাম্মদ নাসিম সাহেবের পরলোকগততে উনার পরিবার পরিজনের প্রতি শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করছি। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি হৃদয়ের গহীন কোণ থেকে স্যালুট এবং পরকাল ওনার সুন্দর হোক সেই কামনা করি। আশা করি উনার পরিবার ও আত্মীয়স্বজন উনার মৃত্যুর শোক দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারবেন ।

লক্ষ্য করুন, গহর আলীর মতন একজন ভিক্ষুক ভিক্ষা করতে গিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি তালের বিচি জোগাড়  করত। অবশেষে রাজশাহীর নওগা মহাসড়কের দুই পাশে ১২০০ তালগাছ ( অনেক আগে ইত্যাদিতে এসেছিলো রির্পোট ) লাগিয়েছিলেন । আজকের দিনে জনমানুষেরা সেই পথ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে গরমে সেই সব তাল গাছের নিচে একটু ছাঁয়া পায় এবং একটু জিরিয়ে নিতে পারে, সাথে চমৎকার পরিবেশ। আমি নিশ্চিত সেই সব পথিকেরা বিশ্রাম নেবার সময় গহর আলীর কথা স্মরণ করে এবং নিশ্চয়ই মনের অজান্তেই গহর আলী নামটি মুখে নিয়ে একটু প্রার্থনা করে যায় । পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আমাদের বর্তমান সরকার জাতীয় পরিবেশ পুরস্কার প্রদান করেন ।  গহর আলী কোনো ভিআইপি ছিলেন না, একজন ভিখারী মাত্র।  তবে এই গহর আলী মৃত্যুর সময় নিশ্চয়ই শান্তি পেয়েছিলেন ( মনের হাসি বা সুখে ) এবং জনমানুষের ছিলো আফসোস, আহ্হা বেচারা গহর আলী বেঁচে থাকলে এই দেশ না হোক, অন্তত রাজশাহী সুবুজে ভরে যেতো নিশ্চয়ই ( এই আফসোসটাই ভূবনের কান্না  )। বলা যায় মানুষের মনে সেই গহর আলী আছেন নিশ্চিত  ভিআইপির স্থলে ।

দেশ এখন করোনাময়।  চারিদিকে মৃত্যুর মিছিল। গরিব বা সাধারণ জনমানুষের মৃত্যু আমাদের সমাজ বা রাজনীতিক অঙ্গনে তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না বা সাড়া জাগায় না, দুঃখজনক  । তবে ধনীকশ্রেনী বা প্রসিদ্ধ ব্যক্তিবর্গের মৃত্যু নিশ্চয়ই অনেক আলোচনা ও ভাববার অবকাশ জোগায় । আর যদি ভিআইপি বা ভিভিআইপি ব্যক্তিবর্গের অস্বাভাবিক বা সঠিক চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু হয়, তাহলে তো আলোচনার রসদ জোগাবেই, এটাই স্বাভাবিক বটে।  আমি বলছি না নাসিম সাহেবের ক্ষেত্রে এমন কিছু হয়েছে। তবে পত্রিকায় দেখেছি চার্টাট বিমানে সিঙ্গাপুর নেবার কথা, তাহলে চিকিৎসা নিয়ে জনমানুষের মনে প্রশ্ন চলে আসতেই পারে ।

প্রোপার চিকিৎসার কথা বললাম, কেননা স্বাভাবিক সময়ে আমাদের ভিআইপিরা সর্দি/ কাশির চিকিৎসাও যে বৈদেশে করাতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন । কেন ? এর দুটু কারণ হবে নিশ্চয়ই।  প্রথমত উনারা ভালো করেই জানেন আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা সমন্ধে।  দ্বিতীয়ত উনারা আছেন নিজেদের নিয়ে, দেশ গোল্লায় যাক, আগে আমি , আমার পরিবার, তারপরে ভিন্ন কিছু। মানে উনারা আছেন উনাদেরকেই নিয়ে, বেশ ।

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাসিম সাহেব পরলোকগত হয়েছেন করোনা কালে । ধরে নিন , উনি কখনোই স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন না, ছিলেন পাটমন্ত্রী/ বস্রমন্ত্রী/ মৎসহমন্ত্রী/ বনমন্ত্রী/ তথ্যমন্ত্রী কিংবা স্বাস্থ্যখাত বাদে ভিন্ন কোনো মন্ত্রী।  তাহলে কি এই করোনার সময় উনার মৃত্যুর পরে যা কথাবার্তা হচ্ছে বা  সমালোচনা হচ্ছে ? তা কি হতো ? ধারণা করেই বলা যায়, এমনভাবে হোতো না । তাহলে কেন এমন সমালোচনা ? তার মানে কি জনমানুষেরা সব কি বিকারগ্রস্ত হয়ে গেছে ? উত্তরটি হচ্ছে না । জনগণ বিকারগ্রস্ত হয়নি ।

এখানেই সেই ভিআইপি আর নন ভিআইপির সমস্যা। এখানেই জনমানুষের স্বাভাবিক চাহিদার সমস্যা।  এখানেই প্রাপ্যে অধিকারের সমস্যা। এখানেই ক্ষমতার চেয়ারের মূল্যায়নের সমস্যা । এখানেই যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশের মূল তত্বের সমস্যা।  এখানেই যুদ্ধে রক্ত দানের সমস্যা।  এত্ত সব সমস্যা যখন জড়িয়ে থাকে, ঠিক তেমন সময়েই জনমানুষের কিছু অস্বাভাবিক আচরণ সামনে চলে আসে, যা কিনা স্বাভাবিকতার মাঝেই অস্বাভাবিকতার প্রকাশ ঘটে । বিষয়টি মনোবিজ্ঞানের দিক দিয়ে অনেক অনেক গভীরের বিষয়।

ভিআইপিরা ভিআইপি সুযোগ সুবিধে পান, এটা নিয়ে জনমানুষের ভীষণ ক্ষোভ আছে, সেটার বহিঃপ্রকাশ বরাবরই দেখা যায়।  সত্যি বলতে বিশ্বের সব দেশেই ভিআইপিরা আলাদা সুযোগ সুবিধে পান, এটাই স্বাভাবিক।  আমি নিজেও এটার পক্ষে । ভিআইপিদের অবশ্যই অবশ্যই আলাদা মর্যাদা ( ক্যাটাগরি অনুযায়ী) দিতে হবে এবং দেওয়া উচিত । এটা রাষ্ট্রের দায়িত্বও বটে । সেখানে কোনো সংশয় থাকাটাই অনুচিত বলে মনে করি ।

তবে বুঝতে হবে, কখন এটা সম্ভব এবং বিনা প্রশ্নে সম্ভব।  বিশ্বের উন্নত দেশগলোতে ভিআইপিদের সুযোগ সুবিধে কিভাবে দেওয়া হয় ? খুব সহজ । ধরুণ স্বাস্থ্যখাতে কিভাবে হয় ? সেই সব দেশের সকল সরকারী হাসপাতালগুলোতে সাধারণ জনমানুষের শতভাগ চিকিৎসার নিশ্চয়তার ব্যবস্থা করা হয়, অতঃপর সেই সকল সরকারী হাসপাতালেই ভিআইপি ব্যবস্থা থাকে। যেখানে দেশের সকল ভিআইপিরা সেই সুযোগ পান । যদি কোনো ভিআইপির বিশেষ কোনো জটিলতার কারণে ভিন্নদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, সাধারণ জনমানুষের জন্য একি পরিস্থিতিতে সরকার  কি করবে? সেটার পরিষ্কার ব্যাখ্যা ও ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে । তুলনা করার জন্য কথাগুলো লিখছি না।  জনমানুষের মনে কেন ক্ষোভ জন্মায়, সেটাই পরিষ্কার করার জন্য কথাগুলো লিখছি ।

লক্ষ্য করুন, দেশের একজন বিশেষ কোনো ভিআইপির জন্য চার্টাট বিমান ভাড়া করে বৈদেশে পাঠানো হলো চিকিৎসার জন্য।  উনি ফিরে আসলেন সুস্থ হয়ে, আলহাম্মদুল্লিহা । উদাহরণ আমদের দেশেই অনেক আছে । কিন্তু সেই আলহাম্মদুল্লিহাতে কতটা সত্যিকারের আলহাম্মদুল্লিহা আছে ? সেটা একটি বড় প্রশ্ন বটে ।

উল্টোদিকে আমি/ আপনি/ আমাদের নিজেদের  সন্তান/মা/ বাবা/ ভাই/ বোন/ আত্মীয়স্বজন  বা নিজেকে নিয়ে হাসপাতালের বাথরুমের পাশে বারান্দায় কোনো মতন থেকে ( তাও যদি ভাগ্যে থাকে ) চিকিৎসা নিতে হয়, তাহলে সেই ভুক্তভোগীরা কি সেই ভিআইপির ( যিনি দেশের জন্য প্রয়োজনীয়, ধরে নিলাম) জন্য মন থেকে দোয়া করতে পারবে ? এত মহা মানব সম্ভবত বিশ্বে তেমনটা নাই ।

জনাব মোহাম্মদ নাসিম সাহেবের এই মূহূর্তে  পরলোকগততে সমস্যাটি সে কারণেই বেশি সামনে চলে এসেছে, কেননা তিনি ছিলেন দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যখাতের প্রধান । এখন দেশে চলছে  অস্বাভাবিকতা করোনার মহামারীতে । মানুষ চিকিৎসার জন্য হাহাকার করছে। অথচ কোনো সুযোগ পাচ্ছে না । প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল চলছেই এবং সূত্র বলে সামনেই আরো বাড়বে । শেষ অব্দি কোথায় গিয়ে ঠেকে, সেটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন বটে।

লক্ষণীয় যে, একজন মুক্তিযোদ্ধা নাসিম সাহেব। উনার পিতার দেশের জন্য  অবদানের ইতিহাস আমাদের সবার জানা । সামরিক সরকারের সময় নাসিম সাহেবের রাজপথের অবদানও আমাদের সবার জানা । একজন পিওর রাজনীতিক জন। অথচ উনার মৃত্যুর পরে কেন এমন হলো ? এটা সত্যি আমাদের রাজনীতিকরা ভাবতে পারেন, গভীর ভাবে এবং ভাবা উচিত। আজকে করোনার এমন কালো সময়ে নাসিম সাহেব চলে গেছেন বলেই কিছু অপ্রত্যাশিত, কিন্তু কঠিন বাস্তবতা সামনে চলে এসেছে। আগামীকাল আরেক কালো সময়ে ( অবশ্যই কামনা নয় ) ভিন্ন কেউ চলে যেতে পারেন । তখনও যে এমনটা হবে, এটাই মনে হয় নিশ্চিত। তারপরেও বলছি জনগণকে দোষারোপ করা সঠিক হবে না । জনগণ যেন এমন অস্বাভাবিক আচরণ না করতে পারে, সেটা আমাদের রাজনীতিক, আমাদের পরিচালনাকারিদের দায়িত্বের মধ্যেই পরে ।

সুতরাং করোনা থেকে শিক্ষা নিন । হোক সেটা ভিআইপিগন, রাজনীতিকজন কিংবা বিত্তবানজন । অনেক তো এই করোনাতে দেখা হলো, শেখা হলো, বুঝা গেলো । কি করতে পারলেন ? পরিস্থিতির কারণে উপরওয়ালাদের মৃত্যুর মিছিল কি থামাতে পেরেছেন ?

করোনাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে, নিজেদের শুদ্ধরিয়ে , জনগণকে পাশে নিয়ে চলুন। যেন আগামীতে ভিন্ন কোনো সম্মানিত নাসিম সাহেবের ভাগ্য এমনটা না ঘটে । লক্ষণীয় যে, মোহাম্মদ নাসিম সাহেবের যে অবদান দেশের জন্য আছে, সেগুলো যেন করোনার কালো থাবায় সব বানের জলে ভেসে গেলো ! এমনটি তো হবার কথা ছিলো না । ভাবুন, আবার ভাবুন, বারবার ভাবুন । আপনাদের ভাবনাতেই সুখ/ শান্তি/ সম্মান ও দেশের মান নিহিত রয়েছে।

[ বিঃ দ্রঃ মোহাম্মদ নাসিম সাহেবের পরলোকগততে ধর্মের বিড়ম্বনাও বেশ লক্ষ্য করা গেছে।  আরেক পর্বে ধর্ম বিড়ম্বনা নিয়ে লেখার ইচ্ছা রইলো।  ]

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম। 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: