করোনাযুদ্ধের দিনগুলো (তিন)

শাহাব উদ্দীন: Manhatton, 68 Street York Avenue, York Presbyterian hospital এ আসাটা আমার একটি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ ওই সময়ে নিউইয়র্কের কুইন্সের হাসপাতালগুলোর বেহাল অবস্থা। সে তুলনায় এ হাসপাতালে একটু ভীড় কম। এই হাসপাতালের নিকটেই পৃথিবীর বিখ্যাত ক্যান্সার ইনস্টিটিউট Memorial Sloane Kettering যেখানে জর্ডানের বাদশা, সৌদির বাদশা, বলিউড তারকা ঋষিকাপুরসহ পৃথিবীর বিখ্যাত লোকজন চিকিৎসা নিয়েছেন। পাশেই Well Cornel Hospital আমেরিকার নামি-দামি চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি আলোচিত নাম। তার কাছেই Hospital For Special Surgery. Orthopedic এবং আত্রটিক্স এর জন্য বিশ্ববিখ্যাত একটি হাসপাতাল। এখানেও পৃথিবীর নামি দামি লোকজন চিকিৎসা নিয়েছেন এবং দুই ব্লকের মধ্যেই Rockefeller Universit যেখানে PhD. প্রোগ্রামসহ উচ্চতর গবেষণা ধর্মী কাজের জন্য বিখ্যাত।
New York Presbyterian hospital থেকে FDR. Drive North র দিকে তাকালে সারি সারি New Jersey গামি গাড়ির বহর Gorg Washington Bridge এর দিকে যাচ্ছে। আর অপর দিকে FDR. South ডাউন টাউন ওয়াল ট্রেড সেন্টারের দিকে যাচ্ছে। বিশ্বের রাজধানী বলে খ্যাত নিউইয়র্ক সিটির Manhattan শহরটি হাডসন রিভার ঘিরে একটি আইল্যান্ড। পূর্বদিকে তাকালে Hudson River, রুজভেল্ট আইল্যান্ডে Astoria, Long Island City, যেখানে আমার দীর্ঘ ২৭ বৎসরের বসবাস।
অত্যন্ত চমৎকার সুন্দর পরিপাষ্কিক অবস্থা।
২৮ মার্চ শনিবার । দুপুর ১২ টার দিকে হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে এসে ছেলেকে বিদায় দেই। সাথে সাথে Security Gard আমাকে নিয়ে Reception নিলে নাম ঠিকানা, ইন্সুইরেন্সসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই নার্স আমার শ্বাস কষ্ট দেখে একটি বেড এবং Oxyzen এর ব্যবস্থা করে। তারপর পর আমি একটু শান্তি পাই। নতুবা এতক্ষণে মনে হয়েছিল দম বন্ধ হয়ে মারা যাচ্ছি।
এরপর শুরু হলো প্রেসার, ডায়েবিটিস এবং নাকের ভিতর দিয়ে লম্বা কাটির মতো ঢুকিয়ে একটি কৌটার মধ্যে ঢুকিয়ে দিলো, আমি জিজ্ঞেস করি এটা কি? নার্স বললো এটা করোনা টেস্টিং এর জন্য ল্যাবে যাবে। হঠাৎ দেখি একটু বড় মেশিন আমার সামনে হাজির বুক এক্সরের জন্য এবং ছোট ছোট মেশিন নাকে মুখে লাগানো হলো। এরি মাঝে আমার তন্দ্রার মতো আসে কিন্তু যা কিছু হচ্ছে আমি যেন বুঝতে পারছি না। একটু পর পর নার্স এসে জিজ্ঞেস করে Are You Okay Mr. Uddin? আর আমি হাত
নাড়ি। এরমধ্যে রাত দশ /এগারটা হবে, প্রচন্ড ক্ষুধা অনুভব হলে নার্সকে জিজ্ঞেস করি কিছু খাবার আছে কি-না? একটু ঘোরাঘুরি করে একটি ছোট্ট Sandwich এনে দিল। আমি একটি কামড় দিয়ে আর মন চায়নি। ফেলে দেবার জন্য নার্সকে দিলে সে চাপাচাপি করে আরও কিছু খাওয়ার জন্য কিন্তু আমি মোটেই খাওয়ার কোন গন্ধই নিতে পারছি না। আমার এই সিমটম দুই দিন আগেই শুরু হয়েছিল। তখন সে বুঝতে পেরেছে আমি COVID-19 রোগী। নার্স জুলি বলে দেখ, তুই যখন খাবার কথা বলেছিস তখন কিছুই না পেয়ে আমার রাতের Sandwich টা তোকে দিলাম। খেতে পারলি না, বলে ঝধহফরিপয ফেলে দিলো।
আমি জিজ্ঞেস করলাম কেন আমার জন্য খাবার নেই? সে বললো সকাল থেকে শুরু হবে। আমি জুলির ব্যবহারে মুগ্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পরপর গলা শুকিয়ে যায়, তখন এসে Oxygen খুলে মুখটা ফ্রি করে পানি খাওয়ায়। আনুমানিক রাত তিন টার দিকে আমাকে লিফটে North 14 তলার উপরে একটি ‘আইসোলেসন’ রুমে নিয়ে যায়। সেখানে দুই জন ধরে আমাকে এক বেড থেকে অন্য বেডে নিয়ে যায়। তখন সেখানের নার্স এসে আমাকে দেখাশোনা শুরু করে। পরদিন ২৯ মার্চ, রোববার সকালে মাথার চুল থেকে জুতা পর্যন্ত ঢাকা, Dr. Lucken এর নেতৃত্বে Dr.Lee. Dr. Fischer সহ ছয়জন ডাক্তারের গ্রুপ এসে তাদের পরিচয় দিয়ে আমার সাথে বিস্তারিত আলাপ করে, তারা বললো আমার করোনা হয়েছে , এর ফলে ফুসফুসের কয়েক জায়গায় ক্ষতসহ শরীরের অন্যান্য অংশেও সামান্য ব্যাঘাত হয়েছে, তারা সবকিছু ব্যাখ্যা করে। আমি কিছটা ভয় পেয়ে যাই। এরপর আশার বাণী শোনালো, যথা সময়েই এসেছি, আরও আগে আসলে ভালো হতো। কারণ করোনা সাথে নিউমোনিয়াসহ একঝাঁক ভাইরাস নিয়ে ভিতরে ঢুকে সব দিকে ছড়িয়ে দেয় এবং অতি দ্রুত রোগীর সব অরগ্যান নস্ট করে ফেলে। ফলে ডায়েবিটিস প্রেসারসহ সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। এটা আমি রাত্রেই বুঝতে পারছি ডায়েবিটিস ৪০০ উপরে হয়ে যায়। ইনসুলিন ডাবল করে দিয়েও নার্স সামলাতে পারছে না। এ রকম আমার কোন দিন হয়নি। বুঝতে পারলাম করোনা শরীরের অস্বাভাবিকভাবে সব ওলট-পালট করে দিয়েছে। তবে ডাক্তাররা ভরসা দিলো সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, একটু সময় লাগবে। আমাকে যে গাইড লাইন দিলো, তা হলো Oxygen , প্রেসার, ডায়েবিটিস, হার্টবিট, ইত্যাদি মেশিনের মাধ্যমে মনিটরিং করে করোনার সাথের যে উপসর্গগুলো যেমন কাশি, জ্বর, ব্যথা, বমিটিং সর্দি ইত্যাদির জন্য আমাদের রেগুলার ঔষধ সেবনের সাথে একটু বাদামী বর্ণের একটা ট্যবলেট দিয়ে বললো এটা করোনার জন্য। পরে নার্স ওষুধগুলো খাওয়াতে শুরু করেন। সাথে ব্লাড থিনারের জন্য ইঞ্জেকশন এবং ইনসুলিন দেওয়া শুরু করে দেয়। যাতে মনিটরিং’র সাথে ঔষধগুলো সমান তালে কাজ করে।
কিন্তু ডাক্তাররা বেশি গুরুত্ব দিলো ভিটামিনযুক্ত খাওয়া দাওয়ার উপর। বললো শরীরের উইমিন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে রোগকে পরাস্ত করে বাঁচতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। কারণ আমরা জানি তখনও করোনার কোন ঔষধ বের হয়নি। খাওয়া-দাওয়া না করলে শরীর দুর্বল থাকে এবং যাদের শরীরে রোগ আছে সেখানেই করোনার আক্রমণটা প্রকট হয় এবং রোগীদের দুর্ঘটনা ঘটে। সে যায়গায় আমি খুব দুর্বল ছিলাম। দুই দিন পর্যন্ত কিছুই খেতে পারিনি। প্রতিদিন এসে ডাক্তার নার্সরা বুঝতে থাকে, রুচি বাড়ার জন্য ঔষধও দেয় কিন্তু কাজ হচ্ছে না, ডাক্তারাও চিন্তিত। আমিও আতংঙ্কিত এবং শংঙ্কিত। কারণ এই সময়টা নিউইয়র্কের জন্য সবচেয়ে খারাপ সময় ছিল।
মার্চের ২৩ তারিখ থেকে মধ্যে এপ্রিল, এই সময় টা ছিল নিউইয়র্ক মৃত্যুপুরি। এই সময়ে হারালাম বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি আমাদের প্রিয় কামাল ভাইকে, ব্রঙ্কস বিজনেস এসোসিয়েশন সভাপতি আলহাজ্ব গিয়াসউদ্দিন, বিএনপি নেতা আজাদ বাকের, হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সম্পাদক বিদ্যুৎ দাশ ( তিনি অবশ্যই এপ্রিলের মাঝামাঝিতে মারা গেছেন), সাংবাদিক স্বপন হাই, জ্যাকসন হাইটস মসজিদের মুয়াজ্জিন, আইটি বিশেষজ্ঞ মির্জা হুদা, ডা. মো. ইফতেখার উদ্দিন, ডা. রেজা চৌধুরী, সাবেক সাংসদ সিরাজুল ইসলাম, আমাদের সিলেট সদরের শাহাদাত মজুমদার ভাইয়ের স্ত্রী নুসরাত ভাবী, পুলিশ সার্জন্ট জিয়াউল আহসানসহ ৩৭ জন অফিসার ও শত শত ভাই বোনদের। আমি তাদের আত্মার শান্তি কামনা করছি। ( আগামী সপ্তাহে পড়–ন, মানুষের ভালোবাসা ও বাস্তবতা।)

26195622_143370233029778_6765122721416600831_n-2

শাহাব উদ্দীন

ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের ছাত্রনেতা।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: