Advertisements

মুক্তিযুদ্ধের ‘বীর প্রতীক’ বিদেশি বন্ধু ওডারল্যান্ড

১৯৭১ সাল। বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধে সমগ্র দেশের মানুষ যুদ্ধে লিপ্ত। পাকিস্তানিদের শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার ছাত্র যুব কৃষক শ্রমিক জনতা রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। মৃত্যু ভয় তাদের ছিল না মোটেই। স্বাধীনতার এই যুদ্ধ চলেছে দীর্ঘ ৯ মাস। পাক-হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছে সশস্ত্র প্রতিরোধ। দেশের এই মুক্তির যুদ্ধে আমরা অনেক বিদেশি মানুষকেও সঙ্গী হিসেবে পাশে পেয়েছি। যারা এই দেশের মানুষ না হয়েও আমাদের এই দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা অনুভব করেছিলেন। আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাদের পাশে পেয়েছিলাম এরকম কিছু স্মরণীয় সুহৃদকে যারা দেশ কালের সীমা অতিক্রম করে আমাদের সেই মহাক্রান্তিকালে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, বাড়িয়ে দিয়েছিলেন সাহায্যের হাত।
তাদের কেউ কেউ কূটনীতিক হিসেবে, কেউ স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে, কেউ সাংবাদিক হিসেবে আবার কেউ কেউ লড়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সম্মুখ সমরে। বাঙালিদের ওপরে পাক-হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের হাত থেকে বাঙালি জাতিকে বাঁচাতে তারাও এগিয়ে এসেছিলেন গভীর মমতায়। সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়ে অসামান্য বীরত্ব দেখিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তার নাম ডব্লিউ এএস ওডারল্যান্ড। অস্ট্রেলিয়ার ওলন্দাজ নাগরিক উইলিয়াম ওডারল্যান্ডই একমাত্র বিদেশি যিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সরকার কর্তৃক ‘বীর প্রতীক’ রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত হন।
ওডারল্যান্ড ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে জন্মগ্রহণ করেন। পুরো নাম উইলিয়াম আব্রাহাম সাইমন ওডারল্যান্ড। যদিও তার পিতৃভূমি অস্ট্রেলিয়ায়। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৩৪ সালে তিনি বাটা শু কোম্পানিতে সু-শাইনাররের চাকরি নেন। ১৯৩৬ সালে যোগ দেন জাতীয় সেনাবাহিনীতে। ১৯৪০ সালে সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে ওলন্দাজ বাহিনীর গেরিলা কমান্ডো হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-১৯৪৫) অংশগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নেদারল্যান্ডসের একজন রেডিও টেকনিশিয়ান, গোলা-বারুদ ও সমর বিশেষজ্ঞ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পান তিনি।
ওডারল্যান্ড ১৯৭০ সালে বাটা শু কোম্পানির প্রডাকশন ম্যানেজার হিসেবে ঢাকায় আসেন। কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি কোম্পানি-ম্যানেজার পদে পদোন্নতি লাভ করেন।
১৯৭১ সালের ৫ মার্চ। মেঘনা টেক্সটাইল মিলের সামনে শ্রমিক-জনতার মিছিলে ইপিআরের সদস্যরা শ্রমিক জনতার ওপর গুলি চালায়। এ ঘটনা ওডারল্যান্ডের মনে রেখাপাত করে।
দেখেছেন মার্চের গণআন্দোলন। ভয়াল ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চলাইট। মানুষকে কীভাবে রাতের অন্ধকারে আচমকা আঘাত করা হলো, কীভাবে গণহত্যা চালানো হলো সবকিছুই তিনি প্রত্যক্ষ করলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করবেন, অংশ নেবেন মুক্তিযুদ্ধে। তিনি তার নিজের যাবতীয় অভিজ্ঞতা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছেন।
প্রথমে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২২ বেলুচ রেজিমেন্টের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুলতান নেওয়াজের সঙ্গে তিনি সুসম্পর্ক তৈরি করেন। ফলে ঢাকা সেনানিবাসে তার যাওয়া-আসা শুরু হয়। ঢাকা সেনানিবাসে তিনি যোগাযোগ বাড়ালেন। অনেকের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক হয়ে গেল তার। এক পর্যায়ে লেফট্যানেন্ট জেনারেল টিক্কা খান, পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী, মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলিসহ আরও অনেক সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করে ফেলেন ওডারল্যান্ড।
তিনি এতটাই মিশে গিয়েছিলেন যে, নিয়াজীর ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টার তাকে ‘সম্মানিত অতিথি’ হিসেবে সম্মানিত করে। এই সুযোগে তিনি সব ধরনের ‘নিরাপত্তা ছাড়পত্র’ সংগ্রহ করেন। এই ছাড়পত্র কাজে লাগিয়ে তিনি সব জায়গায় অবাধ প্রবেশ শুরু করেন। এমনকি কারফিউ চলাকালীন সময়েও তিনি যে কোনো জায়গায় যেতে পারতেন। কেউ তাকে বাধা দেওয়ার ছিল না। তার অবস্থান এমন ছিল যে, সেনানিবাসে সামরিক অফিসারদের আলোচনা সভায় অংশগ্রহণেরও সুযোগ পেতেন তিনি। এক পর্যায়ে তিনি পাকিস্তানিদের গোপন সংবাদ সংগ্রহ করা শুরু করলেন। পাকিস্তানি সেনাদের পরিকল্পনাগুলো তিনি গোপনে প্রেরণ করতেন ২নং সেক্টরের ক্যাপ্টেন এটিএম হায়দারের কাছে।
এ কারণেই যুদ্ধের সময় পাক সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সহজেই পেয়ে যান এবং মুক্তিকামী বাঙালিদের যুদ্ধের পক্ষে তা কাজে লাগান। নিয়ে নেন যখন তখন সেনাসদরে যাওয়ার পাস। এই পাস দিয়ে কারফিউ চলাকালেও ঢাকা সেনানিবাসসহ বিভিন্ন স্থানে চলাফেরার অনুমতি ছিল। পরে ওই পাস কাজে লাগিয়ে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎপরতা ও পরিকল্পনা গোপনে পাঠাতে থাকেন ২ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টারে। আর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে হত্যা-নির্যাতনের ছবি তুলে গোপনে পাঠাতেন বিদেশের গণমাধ্যমে।
শুধু তাই নয়, ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধকালীন মুহূর্তে তিনি পাকিস্তানি রণকৌশল ও পদ্ধতি সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এমএজি ওসমানীর কাছে সরবরাহ করেছেন। পরে ওডারল্যান্ড সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়েন বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে।
টঙ্গীর বাটা কারখানার ভেতরে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন প্রশিক্ষণ শিবির। কমান্ডো হিসেবে অস্ত্র, গোলাবারুদ সম্পর্কে তার পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিল। নিজ হাতে প্রশিক্ষণ দেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ওডারল্যান্ড ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় গেরিলা যুদ্ধ চালান। ব্রিজ, কালভার্ট ধ্বংস করেন, রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। যুদ্ধের পাশাপাশি তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, তাদের নগদ অর্থ, খাদ্য ও কাপড়-চোপড় দিয়ে নানাভাবে সহায়তা করেছেন।
টঙ্গীতে ছিল বাটা শু কোম্পানির কারখানা। ওডারল্যান্ড এই বাণিজ্যিক কারখানাকে মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজনে কাজে লাগালেন। ওডারল্যান্ড টঙ্গীর এই জুতার কারখানার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য স্থাপন করলেন একটি গোপন ক্যাম্প। সেখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা রণকৌশলের প্রশিক্ষণ দেন। মুক্তিযোদ্ধারা এই কারখানাতে থাকত, রণকৌশল সাজাত। তাদের খাওয়া-দাওয়া, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সংগ্রহ, আর্থিক সাহায্য থেকে শুরু করে সবকিছুতেই নিজে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন ওডারল্যান্ড। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গেরিলা কমান্ডো হিসেবে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতাগুলো তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতেন। তাদের বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কে জানাতেন। মুক্তিযোদ্ধারা এখান থেকে বিভিন্ন গেরিলা অপারেশন করতে থাকেন। তারপর টঙ্গীসহ সেক্টর ১ এবং সেক্টর ২-এ গড়ে তোলেন গেরিলা বাহিনী। এ ব্যাপারে ওডারল্যান্ড তিনি লিখেছেন, ‘ইউরোপের যৌবনের অভিজ্ঞতাগুলো যেন আমি নিজের মধ্যে ফিরে পেয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশে যা কিছু ঘটছে বিশ্ববাসীকে সেসব জানানো উচিত।’
মুক্তিবাহিনীর সহযোগিতায় সক্রিয় হয়ে যুদ্ধের সময় স্ত্রী মারিয়াকে অস্ট্রিয়া পাঠিয়ে দেন। এমনকি বাসা পরিবর্তন করে সুবিধাজনক স্থানে বাসা ভাড়া নেন। পানির ট্যাঙ্ক খালি করে এতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদ করেন। ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় গেরিলা অপারেশনে নিজেই অংশ নিতে শুরু করেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে টঙ্গী-ভৈরব রেললাইনের ব্রিজ, কালভার্ট ধ্বংস করে দেন। এর ফলে ওই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে যায়। ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে বহু অপারেশন সংঘটিত হয়, যার অনেকগুলোই ছিল ওডারল্যান্ডের পরিকল্পনায়। যুদ্ধকালে তিনি প্রধান সেনাপতি এমএজি ওসমানীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।
বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে তার অবদানকে সম্মানিত করেছে বাংলাদেশ সরকার। তাকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। তিনিই একমাত্র বিদেশি যিনি মুক্তিযুদ্ধের জন্য এই খেতাব পেয়েছেন।
উইলিয়াম ওডারল্যান্ড ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ঢাকায় বাটা শু কোম্পানিতে চাকরিরত ছিলেন। তখন তিনি কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর। চাকরি থেকে অবসর নিয়ে তিনি ফিরে যান তার নিজ দেশ অস্ট্রেলিয়ায়। ২০০১ সালের ১৮ মে তিনি মৃত্যুবরণ করেন; জীবনের শেষ দিনগুলোতে প্রায়ই তিনি তার স্ত্রী ও কন্যাকে বলতেন: ‘বাংলাদেশ আমাদের ভালোবাসা; পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে আবেগের এ ধারা অব্যাহত রেখো। এ মুক্তিযোদ্ধাকে বীর প্রতীকের মর্যাদায় সমাধিস্থ করা হয়। ২০১০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি গুলশান-২-এর ৮৪ নম্বর সড়কটির নামকরণ করা হয় অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক বীর প্রতীক ডাব্লিউ এএস ওডারল্যান্ড সড়ক।
বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসার কারণেই ওডারল্যান্ড বাংলাদেশের হয়ে যুদ্ধ করেছেন। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেছেন। এমনকি তিনি ‘বীর প্রতীক’ উপাধিটি নামের সঙ্গে সবসময় ব্যবহার করতেন। এমন এক সাহসী বীরের প্রতি আমাদের জাতির অনেক ঋণ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এই বীরকে আমরা স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধায়, পরম মমতায়….।

কাজী সালমা সুলতানা , লেখক এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ।

Advertisements

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: