Sunday April11,2021

 

সমাজতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা কী এটি উপলব্ধি করার জন্য মানবসভ্যতার ইতিহাসে অনেক দৃষ্টান্ত ও উদাহরণ থাকলেও বর্তমান বিশ্বে করোনা ভাইরাস (COVID-19) সঙ্কটের চেয়ে দৃশ্যমান উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমার কাছে নেই। এই অনভিপ্রেত করোনা ভাইরাস সঙ্কট অল্প ক-দিনে সারাবিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছে (বস্তুত: দিচ্ছে যেহেতু এখনও এই সঙ্কট থেকে মানবসভ্যতা উত্তরণ হতে পারেনি) বিশ্বের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতি কতোটা দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন জনগণ হতে। আজকের পুঁজিবাদী রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিশ্বরাষ্ট্রের সরকারগুলো যখন ভয়াল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয় যার যার তার তার দেশ নিয়ে ব্যস্ত তখন সারাবিশ্বের মানব বাচাতে এগিয়ে এসেছে সমাজতান্ত্রিক দেশ গণচীন, কোরিয়া ও কিউবা।ভিয়েতনাম, লাওস তাদের দেশেও রুখে দিয়েছে করোনার থাবা।

করোনা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে সারা বিশ্ব। এই করোনার মধ্যেই সারা বিশ্বের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। করোনা মোকাবেলা কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। জনবান্ধব স্বাস্থ্যনীতির বিপরীতে পুঁজি ও মুনাফা কেন্দ্রিক স্বাস্থ্যনীতি সমালোচিত হচ্ছে। তাই তো কিউবার স্বাস্থ্যনীতি পছন্দনীয় হয়ে উঠছে অনেকের কাছেই। সামরিক খাতে ব্যয় কমিয়ে সেবামূলক খাতে বিনিয়োগ এর আলোচনা চলছে। কিউবা যে অলাভজনক ভাবে চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি লাভ করেছে তা সেদেশের জনগনের প্রতি দায়বদ্ধতা কে নির্দেশ করে।

ইতিমধ্যে বিডি অফিসের পার্টনার প্রতিষ্ঠানের COVID-19 ও nCov-19 স্পেশালিষ্ট চাইনিজ টিম এসে গেছে আমাদের দেশে।। চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানদের টিম আসবে ১৫ তারিখে। একইভাবে কিউবা ও চীনের মেডিকেল টীম করোনাভাইরাস চিকিৎসা দিতে ছুটে গেছে বিশ্বের করোনাভাইরাস আক্রান্ত বিভিন্ন দেশে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষিত করোনাভাইরাসের মহামারিতে এ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী মৃতের সংখ্যা ৯০ হাজার ছাড়িয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ভাইরাসের চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি দেখা দিয়েছে। চীন এ পর্যন্ত ৩৮৬ কোটি মাস্ক, ৩ কোটি ৭৫ লাখ সুরক্ষা পোশাক, ১৬ হাজার ভেন্টিলেটর এবং ২৮ লাখের বেশি করোনাভাইরাসের টেস্টিং কিট রপ্তানি করেছেন। চীন ১৪০ কোটি ডলারের চিকিৎসাসামগ্রী রপ্তানি করেছে। এটাই আজ আন্তর্জাতিক দুনিয়ার সবচেয়ে বড় খবর।

একইভাবে আমাদের দেশেও যখন বিশ্বমহামারি করোনাভাইরাস হামলে পড়েছে তখন পুঁজিবাদের দোসররা ব্যস্ত তাদের প্রণোদনা নিয়ে।বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল যার মালিকানা ধনিক শ্রেনীর হাতে সেগুলি তালাবন্ধ। পুঁজিবাদের ধারকবাহক গোষ্ঠী আজকে করোনার ভয়ে চিকিৎসা থেকে দুরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। চিকিৎসা দিতে নানা শর্তাবলি দিচ্ছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা করে চিকিৎসা উপকরণ পিপিই,মাস্ক,কীট,ভেন্টিলেটর নিয়ে শুরু করেছে তালবাহানা।পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ এর লেজুড় রাজনৈতিকদল নিজেদের শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে দফার পরে দফা দিয়ে চলেছেন। সমাজতন্ত্র নামধারী কেউ কেউ জনগনকে সহায়তার নামে করছেন ফটোসেশন।দিয়ে চলেছেন নামকাওয়াস্তে সহায়তার কাল্পনিক হাস্যকর ঘোষণা। যা আবার তাদের সহযোগীরা ফলাও করে প্রচারও করছেন।আর একটি পক্ষ মেতে আছেন ত্রাণের মালামাল চুরির পুরাতন নেশায়।আজ পর্যন্ত প্রায় চার থেকে পাচ হাজার বস্তা চাল চুরির খবর পত্রিকায় এসেছে।

দেশের যখন এমন বাস্তবতা তখন এই দেশের মানুষকে করোনাভাইরাস এর দানব থেকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছেন তিনজন বীরযোদ্ধা ডাঃ জাফরুল্লা চৌধুরী,ডাঃ মোসতাক হোসেন ও ডাঃ মনীষা চক্রবর্তী। এরা তিনজনই সমাজতান্ত্রিক চিন্তক।তারা তাদের মনন, মেধা ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন দেশের জনগণকে এই মরণব্যাধি করোনাভাইরাস এর আক্রমণ থেকে বাচাতে।

আজকে ডাঃ জাফরুল্লাহ তার প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য থেকে উৎপাদিত করোনাভাইরাস পরীক্ষার কীট অতি সল্পমুল্যে দেওয়ার জন্য আগামীকাল সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগে প্রেরণ করবেন।ডাঃ মোসতাক হোসেন শুরু থেকে এ রোগের তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করে জনগনকে সচেতন করে তুলছেন। তার বিরামহীন প্রচেষ্টা আজকে একমাত্র জনগনের আস্থার জায়গায় প্রতিষ্ঠা করেছে।আর ডাঃ মনীষা চক্রবর্তী এখন করোনাভাইরাস মোকাবেলার এক অনন্য মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছেন।দেশের জনগনকে করোনাভাইরাস থেকে রক্ষায় মাঠপর্যায়ে করনীয় কি হতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।।আজকে সারাদেশব্যপী একটি আলোচিত নাম ডাঃ মনীষা। কি মিডিয়া,কি অনলাইন পত্রিকা,জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সব কিছুতেই আজ আলোচিত মানুষ বাচাতে ডাঃ মনীষা ও তার একমুঠো চাল।গতকাল সে সামনে এনেছে তার বিনামুল্যের চিকিৎসা সেবার ইজিবাইক এম্বুলেন্স। তার বিরামহীন প্রচেষ্টা। নিজেই চিকিৎসক, দিচ্ছেন পরামর্শ, আছে বিনামুল্যে এম্বুলেন্স সেবা।।ক্লান্তি তাকেও ভর করেছে এটাও অবয়বে স্পষ্ট কিন্তু নেই কোন থেমে থাকার সুযোগ। প্রতিদিনের মত ত্রাণ কার্যক্রম চলছে। একইসাথে চলছে ফ্রি এম্বুলেন্স সার্ভিস এর প্রস্তুতি। গতকাল সকাল ১১.৩০এ বরিশালে অশ্বিনী কুমার হলচত্বরে ফ্রি এম্বুলেন্স সার্ভিস উদ্বোধন করা হয়েছে। এই দুর্যোগে ১০টি ব্যাটারিচালিত অটো এম্বুলেন্স হিসেবে করোনা ভাইরাস এর লক্ষণযুক্ত রোগী বা জরুরি রোগীকে হাসপাতালে বহন করবে ।।

এরা প্রমাণ করেছেন করোনা ভাইরাসের কারণে মহামারী ও অর্থনৈতিক মন্দা, জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলা অসাধ্য কোনো বিষয় নয়। এর জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা দরকার, যা জনগণকে সম্পৃক্ত করে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এ জাতীয় রাষ্ট্র ও সরকার তা গ্রহণ করবে না। আর তা গ্রহণ করতে বাধ্য করার রাজনৈতিক শক্তির অভাব আজ প্রায় তিন দশক ধরে।

আহমেদ ফজলুর রহমান

সাবেক ছাত্রনেতা এবং রাজনীতি বিশ্লেষক ।