Wednesday April14,2021

শালা– যার শুদ্ধ বাংলা শ্যালক। শালা শব্দটি এমন একটি শব্দ, যে শব্দটির ভিতরে আদর/ ভালোবাসা এবং হিংসে/ বিদ্বেষ বা তর্জন/ গর্জন সবই জড়িয়ে আছে। বিষয়টি একটু খুলে বলি। শালা শব্দটি আমি/আপনি/ আমরা  প্রায়শই কথায় কথায় ব্যবহার নিশ্চয়ই করি। তবে কি বা কোন ধরণের উচ্চারণে শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে, উপরের বর্ণিত শালা শব্দটির উপসংহারগুলো সেই উচ্চারণের উপর শতভাগ নির্ভর করে।

উদাহরণ দিয়ে বলি । বন্ধু বন্ধুকে হাসিমুখে মাড়ির সবকটি দাঁত বের করে, সাথে অট্টহাসি বা মৃদুহাসি দিয়ে শালা বলে সম্বোধন করলে, আমরা বেশিরভাগই বুঝি, সেটা কেবলি বন্ধুত্বের গভীরতাকে প্রকাশ করা বা দুজন মানুষের মাঝে কতটা বোঝাপড়া আছে, চমৎকার সম্পর্ক আছে, ইত্যাদির সুমধুর বন্ধন বা আদর/ ভালোবাসার প্রকাশ থাকে ।

আবার উচ্চারণ ভেদে শালা শব্দটি , যেমন তেঁড়ে এসে, হাত উঁচিয়ে, মারমুখী ভঙিমায় ছুটে এসে, শালা শব্দটির ব্যবহারে, দুজন বন্ধু বা দুজন মানুষের মাঝে হিংসে/ বিদ্বেষ এমনকি মারামারি/ খুনোখুনি পর্যন্ত হতে পারে । অর্থাৎ কি টিউন বা উচ্চারণে ব্যবহার হলো, সেটাই প্রশ্ন ।

ইংরেজির প্রবাদ বাক্যেটি, ” টিঊন মেইক দি মিউজিক “ – কিভাবে উচ্চারণ ভেদে একি শব্দ ভিন্ন বা একেবারেই বিপরীতমুখী অর্থ বহন করে। বহুল ব্যবহৃত শালা শব্দটি দিয়ে শব্দের উচ্চারণের প্রকারভেদে ভিন্ন অর্থ বুঝতে শালা শব্দটি বরাবরই আমাদের ব্যবহারিক শব্দ বলেই আমিও এই শব্দটিকে উদাহরণ হিসেবে নিয়েছি মাত্র ।

আসুন একটু দেখার চেষ্টা করি, উচ্চারণ ভেদে শব্দের প্রয়োগের কথা কেন বললাম ?  গত দুদিন যাবৎ ফেইসবুকে একজন গার্মেনটস মালিকের ( একজন নারী ) একটি ভিডিওর কিছু অংশ ভাইরাল হয়ে আছে।

নিচের ভিডিওটি লক্ষ্য করুন , এই ভদ্রমহিলা(!)  একজন গার্মেনটসের মালিক। উনার গার্মেনটসের শ্রমিক কর্মচারীদের বিষয়ে কথা বলছেন। সাথে তিনি ইচ্ছামত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ধুয়ে দেবার  মুডে আছেন । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কেন উনার বীষের মতন লাগছে ? বিষয়টি জলের মতন সচ্ছ । কেননা আমাদের পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় এই গার্মেনটস ব্যবসায়ীরা ঘণ জনবসতিপূর্ণ দেশের লাখো শ্রমিকের ( যেখানে নারী শ্রমিক বেশি ) গায়ের রক্তকে পানি করে যে পুঁজি অর্জন করে, সেখানে খোলা হাটবাজার ( সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ) তাদের অন্যায়/ অবিচার/ অনাচারে প্রকাশ্যেই কথা উঠছে । সুতরাং এই মাধ্যম অবশ্যই তাদের অপছন্দনিয় হবে, এটাই স্বাভাবিক বটে।

[ একজন গার্মেনটস মালিকের ভিডিও  ]

লক্ষ্য করুন, এই ভদ্রমহিলা (!) শ্রমিকের খাবার / বেতন নিয়ে এমনভাবে বলছেন যে, শ্রমিকরা যেন উনাদের কেনা গোলাম। অনেকটা দাস প্রথার মতন তার ভাব। তিনি নিজেই বলছেন, যারা শ্রমিক পালে ! এর মানে কি ? শ্রমিক কি তার ঘাম দিয়ে পরিশোধ করে না, সেই বেতনের ঋণ। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বড় বড় কথা বলতে বারণ করছেন ! হ্যাঁ  তা তো করবেনই, এতে আশ্চর্য হবার কিছুই নাই । কেননা এই শ্রমিকের ঘামের টাকায় বিত্তশালী হয়ে এখনতো গার্মেনটসের মালিকরা দেশের মন্ত্রী থেকে শুরু করে গণমাধ্যম সবই দখল করে নিয়েছেন। বাঁকি এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। তবে এটা যে সম্ভব নয়, তাই সবার মুখ বন্ধও করা যাচ্ছে না । আর জ্বালাটা সেখানেই বেশি ।

শ্রমিককে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কেউ বেতন দিবে না , খাবার দিবে না, এটা ঠিক। কারণ এই মাধ্যম কোনো ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান নয়।  তবে এ কথা স্মরণ করা ভালো যে, স্বাধীনদেশে এ অব্দি যত বড় বড় দুর্যোগ, সেটা বন্যা/ ঘূর্ণিঝড়/ ভূমিকম্প / খড়া বা ভিন্ন কিছু, সব জায়গাতেই এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মানুষেরাই শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গাও গ্রাম পর্যন্ত তাদের গাঁটের টাকা দিয়ে, ছোটো/ বড় সংগঠন বা ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতার হাত বিনা প্রশ্নে বরাবরই বাড়িয়ে দেয় । শত শত প্রমাণ আছে। সেই সব দুর্যোগের সময় আপনাদের দেখা পাওয়া ভার।  এমন কিছু দেশে ঘটলেও আপনারা সরকারকে গ্যারাকলে ফেলে ফয়দা লুটার চেষ্টায় থাকেন, অনেক প্রমাণ উদাহরণ সহ আছে।

প্রশ্ন করা যাবে কি ,  রানা প্লাজার ঘটনায়  ১২ শত মানুষের উপরে যে শ্রমিকের লাশ আপনারা বানিয়েছিলেন, আপনাদের খামখেয়ালিপণার কল্যাণে, আপনারা সেই সব লাশের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন কি ? স্পেকট্রামে (যদি নামে ভুল না করি )  আপনাদের খামখেয়ালিতে আগুনে ২০০ এর উপরে লাশ অঙ্গার হয়েছিলো, ছিলেন কি সেই সব পরিবারের পাশে ? জানি রানা প্লাজার ঘটনায় কিছু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে ছিলেন বটে, তবে সত্যি সত্যি কতজন শ্রমিক তা পেয়েছিলো, তা আজও বড় প্রশ্ন হয়ে আছে । অপর ২০০ লাশের পরিবারের কথা বাদই দিলাম।

বলতে গেলে শত কথা বলা যাবে । সেদিকে আর যাচ্ছি না । তবে মনে রাখবেন, এই দেশটি যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছিলো, এই দেশের কৃষক/ শ্রমিক/ মেহনতি মানুষের রক্তে । এই স্বাধীন দেশে আপনারা যত বড় হয়েছেন, এখন যত ওজন দিয়ে কথা বলেন, সেখানেও এই শ্রমিকদের রক্ত জড়িয়ে আছে। সুতরাং শ্রমিকের পাশে থেকে এই দেশের আপামর জনসাধারণ কথা বলবেই ।

আজকে যখন আপনাদের ধমকের সুরের কথার বিবরণী লিখছি, সেই সময়ে আপনারা দেশের এই করোনা মহামারীতে শ্রমিকদের নিয়ে যে কর্মটি করলেন ( খামখেয়ালিপনা) , এটার উত্তর আপনাদের কাছে কি আছে ? সরকারের কাছ থেকে বরাবরের মতন দেশের ৪০/৪২ লাখ নারী শ্রমিকের কথা বলে, যে ফয়দা তুলেন, এবারো তেমনটিই করলেন ! সরকার তো তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ৫০০০ হাজার কোটি টাকার সহযোগিতা দিয়ে । ফলাফল স্বরুপ আপনারা সমগ্র জাতীকে করোনার মহামারী আরো দশ ধাপ বাড়িয়ে দেবার বন্দবস্ত করলেন। আপনাদের কল্যাণে এখন দেশে এই মহামারী নিশ্চিত দ্রুত বাড়বে, এর দায়ভার কে নিবে ? নিবেন কি আপনারা এর দায়ভার  ? 

অনেক অনেক কথা বলার ছিলো, তবে এখানেই থেমে গেলাম। কেননা নিচে আরো একটি ভিডিও জড়িয়ে দিলাম। এই ভিডিওটি আপনার/ আপনাদের একজন শ্রমিক নেত্রীর ( যদিও আপনাদের প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক ইউনিয়ন করা চাট্টিখানি কথা না বা প্রায় অসম্ভব) । পারবেন কি আপনি/ আপনারা আপনাদের এই শ্রমিক নেত্রীর প্রশ্নের উত্তরগুলো সঠিকভাবে দিতে ? 

[ একজন গার্মেনটস শ্রমিক নেত্রী ভাষ্যের ভিডিও]

উপরের গার্মেনটসের মালিক ভদ্রমহিলা (!) আপনাকে বলছি, আপনি যেভাবে ধমরের সুরে নিজের কড়া কড়া বাক্যবাণের ভিডিওটি তৈরি করে, আপনার/ আপনাদের অপছন্দের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়েছেন, এখন  সৎ ও সাহসী মালিক হলে, আপনার শ্রমিক নেত্রীর প্রশ্নের জবাবগুলোও ভিডিও করে আপনার অপছন্দের এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করুন। আমরাও উত্তরগুলো শুনি এবং আপনার প্রতি ধন্য ধন্য করি । আশা করা এতটুকু বুকেরপাটা ও সৎ সাহস আপনি নিশ্চয়ই ধারণ করেন।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম