Friday April16,2021

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী এবং হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী- এর মধ্যে আমার দৃষ্টিতে সূক্ষ্ম একটা পার্থক্য রয়েছে বলে মনে হয়। কেননা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী বলা হলে বঙ্গবন্ধুর মত  হাজার বছর পূর্বে পাল রাজা, সেন বংশ বা অন্য কোন বাঙালীর আবির্ভাব হয়েছিল বলে ধরতে হবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এমন একজন বাঙালী, যার কোন বিকল্প অতীতে ছিল না, বর্তমানেও নেই এবং ভবিষ্যতেও  পাওয়া যাবে না।  এজন্যই  একমাত্র তিনিই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর একটা যুদ্ধ আসন্ন- এটা বুঝতে আমার মত শিশুরও জ্ঞানের অভাব হয় নি। যুদ্ধটা কখন শুরু হবে সেটা দেখার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু এর ভয়াবহতা এত বিশাল এবং ভয়ংকর হবে তা ভাবতে পারিনি। আমাদের পারিবারিক একটি ঘটনা বলি। আমার বাবা (শরীফ মাস্টার) সে  সময়ে  একজন স্কুল শিক্ষক এবং ঘারিন্দা ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মত মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার কাজে লিপ্ত হলেন। বারবার অবস্থান পাল্টানোর ফলে বাবার সাথে আমাদের দেখা সাক্ষাত দূরহ হয়ে পড়ল। বাবাকে ধরার জন্য রাজাকার বাহিনী কর্তৃক  একটা ফাঁদ পাতা হল, যা আমরা টের পেলাম না। পহেলা জুলাই, ‘৭১ থেকে বাবার প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি হল। তাঁকে টাঙ্গাইল শহরে অবস্থিত জেলা শিক্ষা অফিসে যোগদানপত্র জমা দেয়ার জন্য বলা হল। আমাদের বাড়ি থেকে টাঙ্গাইল জেলা শিক্ষা অফিস তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই রাস্তাটুকু পার হতে রাজাকার এবং পাকবাহিনীর অনেকগুলো চেকপোস্ট পার হয়ে যেতে হয়। বাবা গ্রামের ভিতর দিয়ে ভিন্ন পথে জেলা শিক্ষা অফিসে পৌঁছালেন এবং যোগদানপত্র জমা দিয়ে দ্রুত অফিস থেকে বের হতেই দেখতে পেলেন আমাদের গ্রামের এক রাজাকার কমান্ডার (সোহরাব রাজাকার) চারজন পাকসেনাসহ দাঁড়িয়ে আছে। তারা বাবাকে গ্রেফতার করে পাকবাহিনীর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গেল এবং টর্চার সেল নামক এক অন্ধ কুঠুরিতে আটকিয়ে রাখল। শহরে যাওয়ার সময় বাবা মাকে বলে গিয়েছিলেন, তিনি দ্রুত ফিরে আসবেন। কিন্তু অনেক রাত পর্যন্ত ফিরে না আসায় আমরা চিন্তিত হয়ে পড়লাম। এভাবে সাতদিন পার হল, বাবা ফিরলেন না। তাঁর কোন হদিসও করতে না পেরে সকলে ধরে নিল হানাদার বাহিনীর হাতে তিনি নিহত হয়েছেন। এজন্য এই সাতদিনে কোথাও কোন লাশের খোঁজ পাওয়া গেলে আমাদের আত্মীয়স্বজন সেখানে  দৌড়িয়ে যেত এবং শরীফ মাস্টারের লাশ কিনা তা  শনাক্তের চেষ্টা করত। অষ্টম দিনে বেলা এগারটার দিকে বাবা বাড়িতে ফিরলেন। প্রথম দেখায় তাঁকে চেনাই যাচ্ছিল না। হানাদারবাহিনী ইলেকট্রিক শক ও নানা রকম অত্যাচার করায় আব্বার শরীর ফুলে কালো হয়ে গিয়েছিল। চোখগুলো সে তুলনায় ছোট দেখা যেত। বাবার কাছে যা শুনলাম, এভাবে গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁকে ক্যান্টনমেন্টের অন্ধকার কুঠুরিতে নানাভাবে নির্যাতন করে মুক্তিযোদ্ধা এবং আওয়ামীলীগের নেতাদের অবস্থান  সম্পর্কে তথ্য বের করার চেষ্টা করত। অষ্টমদিন সকালে বাবাকে অন্ধকার কুঠুরি থেকে চোখ বেঁধে বের করে বাইরে বসানো হল। সেদিনের লাইনে কতজন ছিলেন চোখ বাঁধা থাকায় আব্বা দেখতে পারেননি। কিন্তু কতক্ষণ পরপর একটা করে গুলির শব্দ, একটা আর্তনাদ এবং নিস্তব্ধতা- এসব বুঝতে পারছিলেন। একসময় আব্বার চোখের বাঁধন খুলে দেয়া হল। তিনি দেখলেন সামনে একজন হানাদার কর্মকর্তা বসা। একটু দূরে সদ্য নিহত হওয়াদের সারি এবং পিছনে চোখ বাঁধা অবস্থায় আরও অনেকে বসা রয়েছে। হানাদার কর্মকর্তা প্রথমে বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, নৌকায় ভোট দিয়েছ কিনা? বাবা বললেন, হ্যাঁ। আওয়ামীলীগ কর কিনা?  এবারও বললেন, হ্যাঁ। মুক্তিযোদ্ধা কিনা? এবার বললেন, না। এই কথার সাথে আরেকটু বেশী করে বললেন, আমি একজন স্কুল শিক্ষক। একথা শুনে হানাদার কর্মকর্তা জিজ্ঞাসা করলেন তোমার পরিবারে কে কে আছে? আব্বা সাত ছেলেমেয়ে রয়েছে  এ কথা  বলার পরে ছেলেরা কেউ মুক্তিযোদ্ধা কিনা- সে তথ্য বের করার কৌশল হিসেবে হানাদার কর্মকর্তা বাবাকে ছেলেদের নাম ও বয়স জিজ্ঞাসা করলেন। আব্বা বললেন, প্রথম ছেলের নাম শহীদ, সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। দ্বিতীয় ছেলের নাম জাহীদ, সে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। তৃতীয় ছেলের নাম……… এতটুকু শুনেই হানাদার কর্মকর্তা বললেন, থামো, আমার নামও জাহীদ। এই বলে সে আব্বার হাতের বাঁধন খুলে দেয়ার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, তোমাকে মুক্তি দিলাম। তবে মুক্তি দিলেই তুমি এখান থেকে বের হতে পারবে না। তুমি আমার গাড়িতে উঠে বস। এই বলে হানাদার কর্মকর্তা নিজে গাড়ি চালিয়ে ক্যান্টনমেন্ট পার হয়ে শহরের একটা নিরাপদ জায়গায় আব্বাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। আব্বা সে যাত্রায় বেঁচে গেলেন। ঘটনাটি কাকতালীয় হলেও সত্য। তবে, ‘৭৫ এর ২৭শে অক্টোবর রাতে জাসদ  গণবাহিনী আব্বাকে ধরার পর কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেনি, এমনকি মৃত্যুর আগে তাঁর কোন শেষ ইচ্ছা আছে কিনা তাও জানতে চায়নি। সরাসরি স্টেনগান দিয়ে ব্রাশফায়ার করে মৃত্যু নিশ্চিত করেছিল।

এরপর ২১ বছর চলে গেল, আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসতে পারেনি, এই ২১ বছরে আমাদের পরিবারে কোন ছেলে সন্তানেরও জন্ম হয়নি। ‘৯৬ সালে আওয়ামীলীগ জয়ী হয়ে ক্ষমতায় এলো। বঙ্গবন্ধু কন্যা সরকার গঠন করলেন। আমাদের ঘরেও জন্ম নিল একটা ‘জয়’, সেই থেকে জয় আমাদের।

92241558_220309365875787_6197232577963622400_n

জাহীদ হোসেন

সাবেক ছাত্রলীগ নেতা,সরকারী সা’দত কলেজ,করোটিয়া টাঙ্গাইল।